calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Advertisements
Standard
Bengali, Crime Thriller, One act play

ক্রস কানেকশান: একটি রহস্য নাটিকা

সে একটা নাটক শুনেছিলাম বটে একদিন। তখন বাড়িতে টিভি আসেনি আর তেমন বড় হইনি যখন বন্ধুদের সাথে ছুটির দিন পাড়ায় টো টো করে ঘুরবো। রবিবারগুলো কাটত হয় যোধপুর পার্কে মামার বাড়ি জেঠুর বাড়িতে নাহয় সকালে পাড়ায় পাশের বাড়ি মহাভারত দেখে ১১টা থেকে খানিক আড্ডা মেরে বা ক্রিকেট খেলে ১টায় বাড়ি তারপর চান খাওয়া সেরে রেডিও খোলা। কোন কোন রোববার সারা সকালটাই রেডিও শুনে কাটত। শুধু কানে শুনে সব ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা করার জন্য কল্পনাশক্তি অনেক জোরালো ছিল — পুরো ঘটনাগুলো চোখের সামনে ঘটতে দেখতে পেতাম। এরকম এক রবিবার দুপুরে খুব সম্ভব ২টো ৪৫য়ে কলকাতা ক’য়ে একখানা নাটক শুরু হল। পঁচিশ বছরেরও আগে শোনা সেই নাটকের কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। কার লেখা কে মুল চরিত্রায়ন করেছিল সেসব একদম মনে নেই তবে সেই নাটকের ছায়া অনুসরন করে এই নাটিকা লেখার প্রচেষ্টা। একটাই অঙ্ক দৃশ্যও ধরতে গেলে একটাই।

স্থান: লেকের উল্টোদিকে এক ফ্ল্যাটবাড়ি।
সময়: আশির দশকের শেষের দিকে জানুয়ারি মাস রবিবার দুপুর দুটো

শ্রীমতি সরকার খবরের কাগজ পড়ছেন বারান্দায় বসে, বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। বিধবা, একাই থাকেন এই বহুতল ফ্ল্যাটে। ছেলে সংসার নিয়ে বিদেশে। এক কাজের লোক আসে লক্ষ্মীকান্তপুরের দিক থেকে সে এখন দু সপ্তার ছুটি নিয়ে দেশে। এই কদিন তাই রান্নাটা নিজেকেই করতে হচ্ছে শ্রীমতি সরকারকে। সকাল থেকে ঝাড়পোঁছ শেষ করে দুপুরের খাওয়াটা সেরে সবে বসেছেন আনন্দবাজারটা নিয়ে। ছেলের ফোন করার কথা কিন্তু কদিন থেকে ফোনটা যা ঝামেলা করছে এক্সচেঞ্জ একদিন ঠিক থাকে তো দুদিন ডাউন। কাগজের ভেতরের পাতায় এক বাড়িওয়ালার খুনের খবর বেরিয়েছে।

শ্রীমতি সরকার (স্বগতঃ) : আবার একটা খুন! কি দিনকাল পড়েছে কাউকে বিশ্বাস করা যায়না। শেষে বিশ বছরের পুরনো কাজের লোক এভাবে ধোঁকা দিল? নাঃ পাহারাদার রাখার প্রস্তাবটা ভেবে দেখতে হচ্ছে ফ্ল্যাটের সবাই টাকা দিলে কত আর লাগবে? স্বস্তিতে থাকা যাবে অন্তত। দেখি ডায়াল টোনটা এলো কিনা যা ভোগাচ্ছে এ কদিন।

(শ্রীমতি সরকার বসার ঘরে গিয়ে কাঠের দেয়াল ইউনিটে ঢাউস রঙিন টিভির পাশে রাখা ফোনের রিসিভারটা তুললেন। ডায়ালটোন পাওয়া গেছে)

শ্রীমতি সরকার (স্বঃ) : এই তো কাজ করছে! ছেলেটা ফোন করলে হয় আবার বিগড়ে যাবার আগে। দেখি মৌসুমীকে ফোন করি অনেকদিন আসেনি এদিকে।

মৌসুমী শ্রীমতি সরকারের ভাইঝি। ঢাকুরিয়ায় বাড়ি মাঝে মধ্যেই এসে দেখা করে যায় পিসির সাথে।

(ফোনে হঠাৎ এক পুরুষকন্ঠের স্বর ভেসে এলো। রুক্ষ কর্কশ গলা। বেশ শাসানোর স্বরে আর কাউকে কিছু বলছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা কি কথা হচ্ছে। আবার শোনা গেল দ্বিতীয় এক কন্ঠ।)

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) উফ আর পারা গেলনা। ভাবলাম ফোন টা ঠিক হয়েছে তা না আবার ক্রস কানেকশন।

শ্রীমতি সরকার : এই যে ভাই এটা ক্রস কানেকশন হয়েছে আপনাদের আবার ফোন করতে হবে।

প্রথম কন্ঠ : এই দাঁড়া তো! শুনতে পেলি কারো গলা?
দ্বিতীয় কন্ঠ : না বস লাইনটা গড়বড় করছে বহুত। তুমি বলো।

(এবার গলা দুটো অনেক স্পষ্ট। শ্রীমতি সরকার দুটো কথাই শুনতে পেলেন।)

শ্রীমতি সরকার : (একটু জোরেই) ক্রস কানেকশন ভাই, শুনতে পাচ্ছেন?

শ্রীমতি সরকারের কথার মাঝেই প্রথম কন্ঠ আবার কথা শুরু করে দিল। বেশ জোরালো গলা, শুনে মনে হয় লোকজনকে হুকুম করে করে অভ্যস্ত।

প্রথম কন্ঠ : তুই সাবধানে কাজ শেষ করবি লোকজন যেন টের না পায়। কাজ হাসিল করে কদিন গায়েব হয়ে যেতে হবে তোকে। টাকার চিন্তা করিসনা আমি রেখে আসব গনেশের কাছে। পুলিশ যেন একদম সন্দেহ না করে।

পুলিশের কথায় মিসেস সরকারের একটু আগ্রহ জাগলো। চুপ করে শুনতে লাগলেন কি বলছে লোকদুটো। কথাবার্তার ভাবগতিক মোটেও ভালো ঠেকলনা শ্রীমতি সরকারের।

প্রথম কন্ঠ: আমি কভার করব তোকে ভয় নেই। আমি রাস্তায় দাঁড়াবো কান খাড়া রাখিস বেগতিক দেখলেই সিটি মারব সাথেসাথে বেরিয়ে আসবি কিন্তু দৌড়োবিনা। এমনিতে এই সময় সাদার্ন অ্যাভিনিউ ফাঁকাই থাকে চুপচাপ কাজ গুটিয়ে বিকেল গড়ানোর আগেই কেটে পড়তে হবে।
দ্বিতীয় কন্ঠ: গুরু খবর পাকা তো শুধুমুধু হানা মেরে খালি হাতে ফিরতে হবেনা তো?
প্রথম কন্ঠ: সেসব নিয়ে চিন্তা করিসনা খবর একদম পাকা। তুই শুধু যা করতে বলেছি ঠান্ডা মাথায় সেরে ফেলবি, কথার নড়চড় হবেনা আমার ষাট তোর চল্লিশ।

শ্রীমতি সরকারের উৎকন্ঠা বেড়ে গেল। লোকগুলো তো অবশ্যই কোনো বদ মতলব আঁটছে। ঠিক করলেন খানিকক্ষণ শুনবেন কি বৃত্তান্ত তারপর পুলিশকে ফোন করা যাবেখন। চুপ করে শুনতে লাগলেন।

দ্বিতীয় কন্ঠ: বস সাবাড় করতেই হবে না মুখ চোখ বেঁধে ফেলে আসবো?
প্রথম কন্ঠ: এই হারামি এতবার করে বললাম শেষে তুই এই বুঝলি? সালা জানে না মারলে পুলিশ তো আসবে, তোকে কিরম দেখতে তার ছবিও একটা বানাবে, তারপর তোর্ ধরা পড়তে আর কতদিন? ছেনালীপনা বন্ধ কর, ফ্ল্যাটে ঢুকবি মুখ চেপে ধরে বাঁধবি চিল্লাতে না পারে মত তারপর মাল হাতিয়ে মালিককে সাবাড় করবি। যতদিনে পুলিশ বা পড়শি দরজা ভেঙ্গে ঢুকবে ততদিনে সব সোনা গালিয়ে বাজারে চালান হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় কন্ঠ: আরে দাদা রেগে যাচ্ছ কেনো? কোনো চিন্তা নেই একলা মানুষ তো আরামসে কাজ হয়ে যাবে। সেই বেলেঘাটার বুড়োটার মত তো আর হবেনা।

ফোনটা আবার গন্ডগোল করছে। লাইনে কড়কড় আওয়াজ আসছে।

প্রথম কন্ঠ: নে নে … দেরী করিসনা। সবকিছু … … … নিয়েছিস তো?
দ্বিতীয় কন্ঠ: হ্যাঁ সব আছে ওস্তাদ। ফ্ল্যাটের চাবি যন্তর … …
প্রথম কন্ঠ: ঠিকানা মনে … …
দ্বিতীয় কন্ঠ: হ্যাঁ হ্যাঁ বস একশো … … দার্ন অ্যাভিনি… সব আমার এলাকা চোখ বন্ধ …… যেতে পারি।
প্রথম কন্ঠ: নে নে আর ক্যালি … … হবেনা। ঠিক তিন … … বাড়ির পাশের … রোডে আমি দাঁড়িয়ে … …
দ্বিতীয় কন্ঠ: ঠিক আছে গুরু … …

(লাইন কেটে গেল। খালি মিসেস সরকারের ফোন তখনো কড়কড় করছে। রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন)

শ্রীমতি সরকারের মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। চোখে মুখে আতঙ্ক। একে প্রেসারের রোগী তার ওপর হঠাৎ করে এমন এক ভয়ঙ্কর খবর। নম্বরটা শুনতে পেলেননা ফোনে কিন্তু শ্রীমতি সরকারের বাড়ির নম্বর একশ তিরাশি, তার মানে বাড়ির কাছাকাছিই। কি করবেন ঠিক করে উঠতে পারছেননা। লোকটা বলল বিকেলের মধ্যে কাজ সারবে তার মানে এক দেড় ঘন্টার মধ্যে বাড়ির কাছাকাছি একটা খুন বা ডাকাতি ঘটবে।

(দেয়াল ইউনিট ধরে দাঁড়ালেন খানিকক্ষণ। ধাতস্থ হয়ে গেলাসে জল ঢেলে খেলেন অল্প একটু)

শ্রীমতি সরকার (স্বঃ): কি সাংঘাতিক। ঘরের দোরগোড়ায় খুন! এ হতে দেয়া যায়না।

(ফোন ডায়াল করলেন থানায়)

শ্রীমতি সরকার: হ্যালো, লেক থানা?
পুলিশ অফিসার: বলছি। আপনার নাম?
শ্রীমতি সরকার: আমার নাম বসুন্ধরা সরকার, একটা খুব জরুরি খবর আছে।
পুলিশ অফিসার: কি ব্যাপার বলুন।
শ্রীমতি সরকার: আমি এইমাত্র ফোনে ক্রস কানেকশন হয়ে দুজন লোকের কথা শুনতে পেলাম। তারা সাদার্ন অ্যাভেনিউর এক ফ্ল্যাটে ডাকাতি আর মালিককে খুনের ফন্দি করেছে।
পুলিশ অফিসার: ইন্টারেস্টিং, একটু খুলে বলুন ক্রস কানেকশন কিকরে হলো?
শ্রীমতি সরকার: আমাদের এক্সচেঞ্জটা কাজ করছেনা কয়েকদিন, ফোনে প্রায়ই গন্ডগোল। এখুনি ডায়ালটোন খুঁজতে গিয়ে গলা দুটো শুনতে পেলাম। আজ দুপুরে তারা কোনো একটা বাড়ি ঢুকে মালিককে খুন করে বাড়ির সব সম্পত্তি হাতানোর কথা বলছিল।
পুলিশ অফিসার: এই বললেন ফ্ল্যাট আবার বলছেন বাড়ি ঠিক কি বলল লোকগুলো?
শ্রীমতি সরকার: না না ফ্ল্যাটই বলল।
পুলিশ অফিসার: আচ্ছা। লোকগুলোর নাম শুনতে পেলেন?
শ্রীমতি সরকার: না তবে একজন ভারি গলা আর অন্যজন একটু কম বয়েসের মনে হয়। ভারী গলা মনে হয় প্ল্যান করছে সব।
পুলিশ অফিসার: কোন বাড়ি, কি নাম কিছু শুনতে পেলেন?
শ্রীমতি সরকার: না না লাইনটা আবার বিগড়ে গেল যে। বলল একশ কিছু একটা, সাদার্ন অ্যাভিনিউই মনে হয় বলল, ঠিক শুনতে পেলামনা।
পুলিশ অফিসার: ম্যাডাম ঠিক শুনেছেন তো, এই তো বললেন আদ্ধেক শুনতে পাননি।
শ্রীমতি সরকার: না প্রথম দিকে তো ক্লিয়ারই ছিল। দেখুন আপনারা তাড়াতাড়ি কিছু করুন দয়া করে, এরা তো খুনের কথা বলছে।
পুলিশ অফিসার: আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়ান ওসির সাথে কথা বলে দেখি। লাইনে থাকুন।
শ্রীমতি সরকার: আচ্ছা।

শ্রীমতি সরকার অধৈর্য্য হয়ে উঠলেন কিন্তু আর যে কি করবেন ভেবে পাচ্ছেননা। প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল পুলিশের সাড়াশব্দ নেই।

(ফোনের রিসিভারটা ধরে অস্থির পায়ে খানিক হাঁটতে শুরু করলেন। পুলিশ অফিসারের গলা শুনতে পাওয়া গেল আরো ২-৩ মিনিট পর।

পুলিশ অফিসার: ম্যাডাম আচ্ছেন নাকি লাইনে?
শ্রীমতি সরকার: হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন। কি বললেন ওসি?
পুলিশ অফিসার: দেখুন ম্যাডাম আপনি তো ঠিকঠাক কোনো ইনফরমেশনই দিতে পারছেননা। ঠিকানা শুনতে পাননি, ফ্ল্যাটের নম্বর ঠিক জানেননা, মালিকের নাম শোনেননি, কোন ভরসায় তদন্ত করা শুরু করি বলুন তো?
শ্রীমতি সরকার: যা যা শুনলাম বললাম তো আপনাকে।
পুলিশ অফিসার: দেখুন অপরাধ নেবেননা। হয়ত কেউ ফোনে মস্করা করেছে সেটাও তো হতে পারে?
শ্রীমতি সরকার: একদন না, যেভাবে লোকগুলো কথা বলছিল…
পুলিশ অফিসার: তাতে কিছুই প্রমান হয়না। আপনার বাড়ির নম্বরটা কি যেন বললেন?
শ্রীমতি সরকার: একশ তিরাশি। ছতলায় ফ্ল্যাট এগারো।
পুলিশ অফিসার: দেখুন ওদিকটা তো গোলপার্ক থানা, আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে। আপনি বরং গোলপার্ক থানায় একটা ফোন করুন।
শ্রীমতি সরকার: কি আশ্চর্য মানুষের জীবনমরণ সমস্যা আর আপনারা এলাকা দেখাচ্ছেন?
পুলিশ অফিসার: দেখুন আপনার দেয়া তথ্যে কাজ করা যায়না। তাছাড়া রোববারের বাজার থানায় লোকই নেই যে টহলে পাঠানো যাবে। গোলপার্ক থানায় করুন ওরা কিছু করতে পারে কিনা দেখুন। আচ্ছা ধন্যবাদ।

(কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল কট করে।)

শ্রীমতি সরকার: হ্যালো হ্যালো?…কি ছোটলোক!

শ্রীমতি সরকার খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রিসিভারটার দিকে, যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেননা যে পুলিশ অমনভাবে লাইন কেটে দিতে পারে।

(এই সময় আড়াইটের ঘন্টা বাজলো দেয়াল ঘড়িতে ঢং করে। খানিকটা চমকে উঠে ঘড়ির দিকে দেখলেন শ্রীমতি সরকার।)

শ্রীমতি সরকার: (স্বঃ) আড়াইটে বেজে গেলো? গোলপার্কের পুলিশগুলোও এরকমই হবে নাতো? দেখা যাক।

(ডাইরেক্টরি খুঁজে গোলপার্ক থানার নাম্বার যোগাড় করে ডায়াল করলেন)

পুলিশকন্ঠ: গোলপার্ক থানা এসি সুমন আচার্য বলছি।
শ্রীমতি সরকার: হ্যালো আমার নাম বসুন্ধরা সরকার। খুব জরুরী ব্যাপার।
এসি: বলুন মিসেস সরকার কী সাহায্য করতে পারি?
শ্রীমতি সরকার: একটু আগে আমার ফোনে ক্রস কানেকশন হয়ে গিয়েছিল। দুজন লোক সেখানে কাউকে খুন করে তাদের ফ্ল্যাটে ডাকাতি করার প্ল্যান করছিল। আজ দুপুরেই কাজ সারবে বলছিল। আমি লেক থানায় ফোন করলাম ওরা বলল কিছু করতে পারবেনা আপনাদের থানায় ফোন করতে হবে। তাড়াতাড়ি কিছু করুন।
এসি: হ্যাঁ লেক থানার একটু দুর্নাম আছে এ ব্যাপারে আমাদের থানায় কেস দায়ের করানোর। খুলে বলুন একটু কি শুনেছেন ক্রস কানেকশানে?
শ্রীমতি সরকার : দুজন লোক কথা বলছিল, একজন মনে হয় আসল মাথা অন্যজন অর্ডার নিচ্ছিল কি করতে হবে। সাদার্ন অ্যাভিনিউর একশ কিছু নাম্বারের বাড়িতে ডাকাতি করবে, মালিককে মেরে ফেলে বাড়িতে সোনাদানা লুঠ করবে।
এসি : হুম এতো বেশ সিরিয়াস ব্যাপার। লোকগুলোর গলা শুনলে চিনতে পারবেন?
শ্রীমতি সরকার : হ্যাঁ তা ঠিক পারব। কিন্তু লোকগুলো তো বলছিল এই দুপুরেই কাজ সারবে। আপনি কোনো পুলিশ লাগাতে পারবেন না? পুলিশ দেখলে হয়ত প্ল্যান পাল্টাতে বাধ্য হবে।
এসি : সে আমরা দেখছি। রবিবারে এমনিতে কম পুলিশ থাকে থানায়, এমার্জেন্সি ছাড়া গাড়ি ইয়ুজ করিনা তবে খুনের ব্যাপার তো সিরিয়াস। আর কোনো ক্লু শুনতে পেলেন? বাড়ির নাম্বার বা নাম?
শ্রীমতি সরকার : নাহ। বাড়ির নাম্বার একশ তারপর কি বলল শুনতে পাইনি ঠিক। লাইনটা আবার গন্ডগোল করছিল। কিন্তু নাম্বারের পর সাদার্ন অ্যাভিনিউ পরিস্কার শুনলাম। দুজনে বাড়ির পাশের কোন এক রোডে মিট করবে। তবে বলছিল যদ্দিনে পুলিশ ফ্ল্যাটে ঢুকবে সোনাদানা ততদিনে গালিয়ে বাজারে পাচার হয়ে গেছে। আর যে ডাকাতি করবে সে আগেও অনেক এরকম কাজ করেছে আর খুনও করেছে। যে সাগরেদ সে কদিন গায়েব হয়ে যাবে কিন্তু ভাগ গনেশ বলে কারো কাছে থাকবে।
এসি : বটে, তাহলে তো পুরনো পাপী। তবে গয়না গালিয়ে বাজারে চালান ক্রিমিনালদের রেগুলার প্রসেস…গনেশ নামটা খতিয়ে দেখতে হবে লোকাল ক্রিমিনাল লিস্টে।
শ্রীমতি সরকার : আর হ্যাঁ, বলছিল বেলেঘাটার কোনো বুড়ো নাকি খুব ট্রাবল দিয়েছিল এদের।
এসি : (চমকে) বেলেঘাটার বুড়ো?!!! আপনি স্পষ্ট শুনেছেন তো?
শ্রীমতি সরকার : হ্যাঁ কেনো এটা কোনো ক্লু বুঝি?
এসি : বেলেঘাটায় রিসেন্টলি একটা নৃশংস খুন হয়। এক বুড়ো মানুষের ফ্ল্যাটে দুজন লোক ডাকাতি করতে যায়। ভদ্রলোক এক্স সার্ভিসম্যান, ডাকাতদের বিনা মোকাবিলায় যেতে দেননি। শেষে এত শব্দ হয় যে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন হাঁক মারতে থাকে, ডাকাত দুজন পালিয়ে যায় কিছু না হাতিয়েই। বৃদ্ধ অনেক ছুরির আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু সারভাইভ করতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। তবে পুলিশকে স্টেটমেন্ট দেন মারা যাবার আগে, আর পাড়ার লোকজনদের কাছে থেকে ডাকাতদের একটা আইডিয়াও পাওয়া যায়।
শ্রীমতি সরকার : কি সাংঘাতিক!!
এসি : হ্যাঁ। এটা কলকাতা পুলিশের একটা বড় তদন্ত। সব থানাই মোটামুটি জানে কেসটার ব্যাপারে। আপনার তথ্য অনুযায়ী এরাই তাহলে সেই দল মনে হচ্ছে। তবে শুনে তো মনে হচ্ছে শুধু দুজন লোক অপারেট করছে, আমাদের ধারণা ছিল অর্গানাইজড ক্রাইম। কম লোকের গ্যাং ধরা কঠিন।
শ্রীমতি সরকার : তাহলে তাড়াতাড়ি কিছু করুন। এক দেড়ঘন্টা তো বাড়ি বিকেল হতে।
এসি : হ্যাঁ হ্যাঁ আমি দেখছি কি করা যায়। এখুনি টিম তৈরী করছি। আপনি আপনার ডিটেলস গুলো একটু বলুন ডায়রি করার জন্যে।
শ্রীমতি সরকার : লেক থানাকেও তো দিলাম ডিটেলস। শুরু করুন তবে।
এসি : স্ট্যান্ডার্ড প্রসেস ম্যাডাম। আপনার নামটা আর একবার বলুন। সরকার বললেন তো?
শ্রীমতি সরকার : হ্যাঁ। বসুন্ধরা সরকার।
এসি : বাড়ির ঠিকানা?
শ্রীমতি সরকার : একশ তিরাশি সাদার্ন অ্যাভিনিউ। ছ তলায় ফ্ল্যাট এগারো।
এসি : ওকে। আর আপনি বলছিলেম যে বাড়িতে ডাকাতি করার প্ল্যান সেটাও একশোর ঘরের নাম্বার?
শ্রীমতি সরকার : হ্যাঁ সেরকমই তো শুনলাম।
এসি :তাহলে তো আপনার বাড়ির আশেপাশে। ছতলা বললেন না? আপনি আমাদের হেল্প করতে পারেন বারান্দা থেকে সন্দেহজনক কোনো অ্যাকটিভিটি দেখলে পুলিশকে খবর দিতে পারেন।
শ্রীমতি সরকার : ঠিক আছে আমি চোখ রাখবো রাস্তায়।
এসি : থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। গ্রুপটাকে হাতেনাতে ধরতে পারলে আপনার একটা পুরস্কারও জুটতে পারে দু হাজার টাকা কোলকাতা পুলিশ থেকে।
শ্রীমতি সরকার : আমার আর এই বয়সে টাকাপয়সার দরকার নেই ভাই। একা থাকি বাড়িতে পাড়ার আশপাশটা যদি নিরাপদ থাকে সেটাই নিশ্চিন্তি।
এসি : হুঁ। আপনি একা থাকেন তাহলে ফ্ল্যাটে?
শ্রীমতি সরকার : হ্যাঁ একাই আপাতত। কাজের একটা মেয়ে থাকে সারাদিন সে এখন ছুটিতে।
এসি : ওকে। আপনি যখন একা বাড়িতে একটু এক্সট্রা কেয়ারফুল থাকবেন। নাম না জিগ্যেস করে দরজা খুলবেননা সে যখনই হোক না কেন।
শ্রীমতি সরকার : আমি খুলিনা বিশেষ করে ইদানীং ফ্ল্যাটে ডাকাতি শুরু হবার পর আরোই না। কাজের মেয়েটাকেও শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছি।
এসি : এক্সেলেন্ট। আচ্ছা ম্যাডাম আমি অপারেশন চালু করছি। আপনি নজর রাখুন। আচ্ছা ধন্যবাদ।
শ্রীমতি সরকার : ধন্যবাদ।

(ফোন কেটে গেল। শ্রীমতি সরকারের ভাবভঙ্গি অনেক আশ্বস্ত। ঘড়ি দেখলেন। তিনটে বাজতে দশ। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন যদি কিছু দেখা যায়।)

(বারান্দার বাইরে শীতের বিকেলের দৃশ্য। পড়ন্ত মিঠে রোদে লেকের জল ঝিলমিল করছে। দুরে বড় লেকে দুটো রোয়িং নৌকো প্র্যাকটিস করছে। রাস্তায় জনমানুষের চিহ্ন নেই। মাঝে হঠাৎ হুশ করে চলে গেল একটা ২২১ গোলপার্কের দিকে। দুরে কোনো মাঠে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, ভেসে আসছে ব্যাটবলের ঠক ঠক শব্দ আর মাঝেমধ্যে হাউজ্যাট)

শ্রীমতি সরকারের মনটা খারাপ হয়ে গেল। শীতের এ কটা মাসই যা উপভোগ করা যায় গরম আর বৃষ্টি ছাড়া। এ সময়টা তিনি আয়েস করে এককাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসেন, এই নিরিবিলি বিকেলটা এনজয় করেন। কিন্তু এই দিনটা যে একেবারে অন্যরকম। এই অপরূপ শীতের বিকেলের পটভূমিতে ঘটতে চলেছে এক বর্বর হত্যাকাণ্ড। খানিকটা উত্তেজিতও হয়ে উঠলেন যদি সত্যিই পুলিশ ধরতে পারে খুনিগুলোকে। গোয়েন্দা গল্পের তেমন ভক্ত না হলেও লীলা মজুমদারের রোমাঞ্চকর গল্পগুলো মনে পড়ে গেল। কলকাতা পুলিশ কি সত্যি তাঁকে পুরস্কার দেবে?

(আনমনা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন শ্রীমতি সরকার, চমক ভাঙলো ঘড়িতে তিনটে বাজতে। রাস্তার দিকে চাইলেন যদি কিছু দেখা যায়। গাছে ঢাকা সাদার্ন অ্যাভিনিউ যেন হলদে পাতার জালে জড়ানো। শ্রীমতি সরকার ব্যালকনি থেকে গোলপার্ক আর স্টেডিয়াম দুদিকেই দেখে নিলেন। রাস্তা যে কে সেই ফাঁকা।)

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) আর কতক্ষণ যে বাকী! পুলিশের দেখা নেই এখনো।

(অস্থির হয়ে ঘড়ির দিকে দেখলেন আবার। সবে তিনটে পাঁচ। শ্রীমতি সরকার অপেক্ষা করছেন কখন চারটে বাজবে। স্কুল ছুটি হলেই এদিকটা আবার জমজমাট। গোলপার্কের দিক থেকে একটা ২২১ দাঁড়াল শ্রীমতি সরকারের ফ্ল্যাটবাড়ি ছাড়িয়ে লেক কালীবাড়ি স্টপেজে।

হঠাৎ চোখে পড়ল ২২১টা যেদিক থেকে এসেছিল সেদিক থেকে একটা সাইকেল আসছে। অন্য দিন হলে ঠাহর করে দেখতেননা কিন্তু আজ ভাল করে দেখতে হবে বলে নজরে রাখলেন। হতেও পারে এই খুনি কিম্বা প্লেন ড্রেসের পুলিশ। সাইকেলটা ডানদিকে ঘুরে কেয়াতলা রোডের দিকে মোড় নিল।)

শ্রীমতি সরকারের বারান্দা থেকে ওদিকটা দেখা যায়না কিন্তু বসার ঘরের অন্য জানলা গিয়ে পুরোটাই চোখে পড়ে। ফ্ল্যাটবাড়িটা দুই রাস্তার কোনে না হলেও কোনের তিনটে বাড়ি দুই আর তিনতলা তাই কেয়াতলা রোডের একটা ফুটপাথ পুরোটাই নজরে আসে।

(শ্রীমতি সরকার বসার ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারলেন কেয়াতলা রোডের দিকে। সাইকেলওয়ালা সাইকেল দেয়ালে দাঁড় করিয়ে অন্য একজন লোকের সাথে কথা বলছে। খানিক দুরে এক ফুচকাওয়ালা টিউকল থেকে জল ভরছে। লোকদুটো ফুচকাওয়ালার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে আবার কথা শুরু করল। সাইকেলওয়ালার পরনে চেক শার্ট হাতকাটা সোয়েটার খাকি প্যান্ট হাওয়াই চটি সাইকেলের হাতল থেকে একটা সাদা ব্যাগ ঝুলছে। অন্য লোকটার গায়ে নীল ফুলহাতা সোয়েটার জিনস স্পোর্টস শু অল্প টাক। কথা বলতে বলতে দুজনেই চারপাশের বাড়িগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো, শ্রীমতি সরকারের ফ্ল্যাটের দিকেও দেখল, শ্রীমতি সরকার ঝট করে সরে এলেন। মনে হয় এতো দুরে দেখতে পায়নি তাঁকে।)

(শ্রীমতি সরকার ফোন তুলে ডায়াল করলেন গোলপার্ক থানা। ডায়াল করে রিসিভারটা কানে তুললেন। ফোন আবার ডেড, কোনো ডায়ালটোন নেই। খালি মাঝেমধ্যে কড়কড় আওয়াজ)

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) উঃ ঠিক যখ্খুনি দরকার তখনই ফোনটা আবার গেল? কোন কাজে আসেনা ক্যানসেল করে দেব সামনের মাসে। মরতে ক্রস কানেকশানটাই যে কেন হতে হল, কলটা না শুনলে তো পুরো রবিবারের বিকেলটা এমন বরবাদ হতনা।

(আবার বসার ঘরের জানলা দিয়ে চাইলেন। লোকদুটো গায়েব। ফুচকাওয়ালা জল নিয়ে অনেকটা দুরে এখন। শ্রীমতি সরকারের কেন যেন মনে হচ্ছে ওই দুটো লোকই কালপ্রিট। ঘড়ির দিকে তাকালেন আবার। সময় যেন থেমে গেছে ঘড়িটায়। সোয়া তিনটেও বাজেনি এখনো। পুলিসকে আবার ফোন করার জন্য ফোন তুললেন। ডায়ালটোন নেই। বারান্দায় গিয়ে নিচের দিকে চাইলেন। নীল সোয়েটার সাদার্ন অ্যাভিনিউর ওপারে কেয়াতলা রোডের মোড়ের উল্টোদিকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। সাইকেলওয়ালাকে দেখা যাচ্ছেনা)

(গোলপার্কের দিক থেকে হঠাৎ দেখা গেল একটা পুলিশ জিপ। শ্রীমতি সরকার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।)

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) বাঁচাল তবে! এসি লোকটা তাহলে কথা রেখেছে। পুলিসকে এখনো ভরসা করা যায়। অন্য লোকটা কোনদিকে গেল কে জানে।

(নীল সোয়েটারকে একটু অস্থির দেখাচ্ছে। চট করে সিগারেট ফেলে পকেটে হাত ঢোকালো। পুলিশ গাড়ি কিন্তু থামলোনা। বরং হুশ করে চলে গেল শরৎ বোস রোডের দিকে। নীল সোয়েটার আবার আরাম করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দেখে মনে হচ্ছে লোকটা কেয়াতলা রোডের দিকেই তাকিয়ে আছে। সাইকেলওয়ালা তাহলে ওদিকেই গেছে মনে হয়। শ্রীমতি সরকার অন্য জানলার দিকে গেলেন।)

(কেয়াতলা রোড শুনসান। আরো ভালো করে দেখার জন্য ঝুঁকে দেখলেন জানলা থেকে। নিচে ফ্ল্যাটে ঢোকার মেন বড় গেট। আর একটু মাথাটা বাড়িয়ে দেখলে ফ্ল্যাটবাড়ির কমন উঠোন পেরিয়ে বাড়ির মেন এনট্রান্সটা দেখা যায়। সেদিকে একবার চাইলেন শ্রীমতি সরকার। দেখলেন সাদা ব্যাগ আর হাওয়াই চটি পরা একটা খাকি প্যান্ট পা উধাও হয়ে গেল বাড়ির ভেতরে।)

বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল শ্রীমতি সরকারের। মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন লোকগুলো ফোনে যা বলছিল। সাদার্ন অ্যাভিনিউ, কেয়াতলা রোডে দেখা করার কথা, একশো তিরাশির বাড়ি। যে অংশগুলো শুনতে পাননি সেগুলো এখন খাপেখাপে জোড়া লেগে যাচ্ছে।

(শ্রীমতি সরকার আবার ফোন ট্রাই করলেন। পুলিশ ভ্যানটা খুব বেশীদুর যায়নি হয়ত। রিসিভারে ডায়ালটোন শোনা যাচ্ছে। উদগ্রীব হয়ে সব বলার জন্য তৈরী হঠাৎ শোনা গেল সেই পরিচিত গলা “এই নম্বরটি এখন ব্যস্ত। দয়া করে একটু পর আবার ডায়াল করুন”)

(শ্রীমতি সরকার অধৈর্য হয়ে বসার ঘরে পায়চারী করছেন। আবার বারান্দায় গেলেন। যদি পুলিশ ভ্যান দেখেন চিৎকার করবেন। নীল সোয়েটার তখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। ঘড়িটা দেখে নিল একবার তারপর ওপর দিকে চাইল…)

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) একী এ তো আমারই দিকে দেখছে। তবে কী…

(লোকটা তাকানো শেষ করে হাঁটা দিল কেয়াতলা রোডের দিকে)

আতঙ্কে শ্রীমতি সরকারের রক্ত জল হয়ে গেল। এতক্ষণ তিনি ক্রস কানেকশানে কথা শুনে বিন্দুমাত্রও ভাবেননি যে এরা তাঁকেই মারার প্ল্যান করছে। খুন রোখার সঙ্কল্পে পুলিসকে ফোন করে রিপোর্ট করতে করতে তিনিও যে তাদের লক্ষ্য হতে পারেন সেটা একবারও ভাবেননি। তবু একবার আবার মনে করার চেষ্টা করলেন চব্বিশ ফ্ল্যাটের বাড়িতে আর কে কে একা থাকে। নীল সোয়েটার হয়ত গেল সাগরেদকে সাবধান করতে।

(শ্রীমতি সরকারের চিন্তার জাল তছনছ হয়ে গেল পায়ের শব্দে। খুব হাল্কা শব্দ কিন্তু পরিস্কার। সিঁড়ি ভেঙে খসখস আওয়াজটা তাঁর দরজার সামনেই থামল। শুনতে পাচ্ছেন ঠুংঠাং চাপা ধাতব শব্দ।)

নড়াচড়ার কোন শক্তি আর নেই শ্রীমতি সরকারের। শুধু মনে পড়ে গেল তাঁর সব সোনাদানা ব্যাঙ্ক থেকে কদিন আগে তুলে এনেছিলেন অন্য ব্যাঙ্কে রাখবেন বলে, তাঁর নিজের সব গয়না তার ওপর ছেলের বৌয়ের কয়েকটা। মনে পড়ে যাচ্ছে কাজের মেয়ে ভারতীকে বলছেন পরের বার বলবেন ওদের গয়না যেন নিয়ে যায় সাথে করে। একলা মানুষ বাড়িতে, সোনাগয়না রাখা বাড়িতে–আসল টার্গেট যে তিনিই সেটা অনুমান করতে এত সময় লাগল। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

শ্রীমতি সরকার : (স্বঃ) না এ হতে পারে না… শেষে কিনা আমিই…(দৌড়ে বারান্দায় গেলেন)…বাঁচাওওও

(শ্রীমতি সরকারের চিৎকার তেমন জোরে শোনা গেলনা। গলা শুকিয়ে কাঠ। দরজার ইয়েল লকটা আস্তে আস্তে ঘুরে গেল। দরজাটা অল্প খুলতে দেখা গেল উল্টোদিকে নব ধরে আছে চেক শার্ট পরা একটা হাত…)

যবনিকা

Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — অন্তিম পর্ব ১৯০০-১৯৮০

লেখাটা শুরু করেছিলাম কলকাতা নিয়ে আমার যা যা স্মৃতি আছে সেগুলো বয়ান করার জন্য। দেখতে দেখতে সেই লেখা হয়ে দাঁড়ালো কলকাতার তিনশ বছরের ইতিহাসে। ইতিহাসে কোনো আগ্রহ স্কুলে থাকার সময় একদম ছিলনা, পরে ইতিহাস জানার ইচ্ছে হলেও দেখলাম ইতিহাস আসলে হলো যে যেরকম করে বলতে চায় তার বলা গল্প। আগের দুটো পরিচ্ছদে কলকাতা নিয়ে যা লিখলাম সেটা আমার ভার্সন বলা যেতেই পারে, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর তথ্যের সঙ্কলন। যা শুরু করেছি তা শেষ অবধি চালিয়ে যাব বলেই মনস্থির করলাম, তাই এই লেখাটা কলকাতার আধুনিক যুগ নিয়ে, তবে রেঞ্জটা ১৯৮০ তেই শেষ করব।  বাকি অংশটা অন্য আরেক লেখায় লিখব, আমার নিজের স্মৃতি থেকে, বেদের মত চর্বিতচর্বন করে নয়।  

বিংশ শতকের গোড়ার কলকাতা বলতে গেলে অতীতের কঙ্কাল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতাকে ঘিরে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য তখন শেষের দিকে। আঠার শতকের সেই লন্ডনকে টেক্কা দেয়া বিত্ত বৈভব তখন প্রায় লুপ্ত, উত্তর কলকাতার বাবুসমাজও তখন অবক্ষয়ের পথে।  কোম্পানিকে ভর করে সঞ্চিত সম্পদ অপব্যয় করে তাদের অবস্থা পড়তির দিকে। বরং সমাজে চালকের জায়গা করে নিয়েছে উচ্চবংশের উচ্চশিক্ষিত মানুষজন, তবে আগের দুই শতকে যা খুব কম দেখা গেছে সেই সাধারণ ঘরের অতি মেধাবী মানুষেরাও তখন একাসনে অবস্থান করে নিয়েছে। ১৮৮৫ সালে গড়ে ওঠা কংগ্রেসের হাত ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও শুরু হয় উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ঠিক করলেন বাংলার এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার উত্থান বন্ধ করার জন্যে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা কে দুই ভাগে ভাগ করা হবে।  সারা ভারত তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল, যার প্রধান বিরোধিতা হলো কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। বহু প্রতিবাদ বিরোধ জনআন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে।  কিন্তু সেই Divide  and Rule এর যে বিষ ছড়িয়ে দিয়ে গেল ব্রিটিশ সরকার সেই ছ বছরে, তার জের এখনো হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান পরিবার ভোগ করে চলেছে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার সাথে সাথে ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেল দিল্লিতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁচ যাতে সরকারের গায়ে না লাগে।  দুশ বছরেরও বেশিকাল ধরে যে কলকাতাকে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বানিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, বাংলা বিহার উড়িষ্যা অসমের কাঁচামাল হরণের পর তার প্রয়োজন তখন ফুরিয়েছে, আর কলকাতার সেই তিলোত্তমা রূপও তখন আর নেই – কলকাতা মানে তখন এক পূতিগন্ধময় অস্বাস্থ্যকর Black Hole।

কলকাতার গল্প তো এখানেই শেষ হতে পারত, অতীতের সেই সোনার দিনগুলো পেরিয়ে সে তখন কাতারে কাতারে মানুষের ভারে ন্যুব্জ এক শহর, যার তুলনা হতে পারতো মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন বা উর। না, কলকাতা সেখানে থেমে যায়নি, বরং রাজধানী খেতাব থেকে মুক্তি পেয়ে বোধহয় আপন খেয়ালে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে।  তার প্রধান কারণ অবশ্যই যে ব্রিটিশ রাজধানী হবার সূত্রে যে পরিকাঠামো গত দুই শতকে তৈরী হয়ে ছিল, তার প্রভাব বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয়নি, অন্তত রাজধানী বদলের সাথে সাথে তো নয়ই।  কলকাতা তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী, তাই তার রাজনৈতিক প্রভাব বা তাৎপর্য ব্রিটিশদের কাছে তখনও অশেষ। তার সাথে যোগ হবে কলকাতার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাফল্যের তুঙ্গে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ আশুতোষ জগদীশচন্দ্র প্রফুল্লচন্দ্র সি ভি রমন বিবেকানন্দ প্রমুখ মানুষের  অবদানের পথ ধরে কলকাতার উনিশ শতক থেকে কুড়ির শতকে পা রাখা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে প্রফুল্লচন্দ্র গড়লেন বেঙ্গল কেমিকেল যা এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে।  ১৯০৮ অলিম্পিক এ শোভাবাজার এর নর্মান প্রিচার্ড  সোনা পেলেন, ১৯১৩য় রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রথম এশীয় নোবেল। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইতিহাস সৃষ্টি করলো প্রথম ভারতীয় ফুটবল দল যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।  এসব তথ্য এখন হয়ত কেবলই পরিসংখ্যান অথবা কুইজের প্রশ্ন কিন্তু সেই সময়ে ফিরে গেলে কলকাতার যে আমূল পরিবর্তন ঘটছিল দুশ বছর পুরনো এক ঔপনিবেশিক সত্ত্বার প্রভাব কাটিয়ে দেশীয় স্বাধীন চিন্তা এবং মেধার উন্মেষে তা এককথায় অভূতপূর্ব আর বিস্ময়কর। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারত স্বাধীন হওয়া অবধি কলকাতার ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভিত্তি করে।  ক্ষুদিরাম প্রাফুল্ল চাকি থেকে শুরু করে সেই বিপ্লবী প্রতিবাদ জারি রয়ে গেল বারীন ঘোষ, চিত্তরঞ্জন, অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষ যতীন দাস বিনয় বাদল দীনেশ এঁদের মধ্যে। গোটা ভারতের মত কলকাতাও সেই জ্বালাময়ী সময়ের সাক্ষী বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে সারা বাংলা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সবার দান অশেষ আর প্রত্যেকের অবদান নিয়েই এক একটা গোটা অধ্যায় লিখে ফেলা যায় কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলনের ভূমিকা কলকাতার পরবর্তীকালের ইতিহাসের পক্ষে অপরিসীম হলেও সে বিষয়ে আর গভীর আলোচনায় জড়ালাম না।

এরই মাঝে মাঝে কিছু বিক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা আজকের কলকাতার উত্থানের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে সেগুলো তুলে ধরলাম। ১৯২৪ সালে কলকাতা অবশেষে পেল সেই অপূর্ব মর্মর সৌধ যার ভিত্তিপ্রস্তর ইংলন্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ করে গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে – ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কলকাতায় এখনো কেউ আসলে যদি জিগ্গেস করে কি কি দ্রষ্টব্য ছাড়া চলবেনা, ভিক্টোরিয়া সেই তালিকায় একদম প্রথমে থাকবে। প্রায় একশ বছর পেরিয়েও এই সৌন্দর্য আর লাবন্যে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। এই ১৯২৪ সালেই কলকাতা কর্পোরেসানের প্রথম মেয়র হলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।  এর কিছুদিন পরেই এসে উপস্থিত হলেন এক যুগোস্লাভিয় সেবিকা, যাঁর নাম এখন কলকাতার পরিচয়ের সাথে সমার্থক। সুদুর লাতিন আমেরিকার, দূর প্রাচ্যের ক্যাথোলিক দেশগুলিতেও কলকাতার নাম ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে এই মহিয়সী মহিলার আত্মদান অনস্বীকার্য —  মাদার টেরেসা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে গঙ্গার দুকুল বাঁধা পড়ল কারিগরী বিদ্যার এক অসাধারণ উদাহরণে। হাওড়া ব্রিজ আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় কোন নাটবল্টু ছাড়া কেবলমাত্র রিভেট দিয়ে গড়া এই সেতু কেমন করে আজও এই বিপুল পরিমান যানবাহন বহন করে চলেছে। এই সময়ের কলকাতা যেমন দেখেছে প্রগতি আর সাফল্য তেমনই ক্ষণেক্ষণে ঢেকে গিয়েছে দুঃশঙ্কার মেঘে। বিদেশীদের divide and rule নীতির কবলে পরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে বিভেদের বিষ ছড়িয়ে গেল, তার সাক্ষ্য বহন করবে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার বলি হলো সবচেয়ে বেশি মানুষ। কলকাতার পুরনো কিছু ছবিতে দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা লাশ হিংস্র ধর্মান্ধতার আর সাম্রাজ্যবাদের শিকার। বিশ্বযুদ্ধের সময় গোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের উপহার কলকাতার মন্বন্তর যেখানে লাখে লাখে মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায় খাদ্যের যোগান থাকা সত্তেও। ১৯৪১ এ ২২শে শ্রাবণ চলে গেলেন কবিগুরু, কলকাতা তথা বাংলার সাহিত্য জগতে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি করে।  আর কিছু বছর পর, ১৯৪৫ য়ে জাপান যাবার পথে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন ভারতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতাহী সুভাষ যাঁর অন্তর্ধান আজও এক রহস্য।  এই সব টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৭ সালে এল সেই দিন, যার জন্যে সারা ভারতের মাতা কলকাতাও অপেক্ষা করে ছিল অনন্ত কাল, নতুন ভারতের পটভূমিতে সূচনা হল কলকাতার নতুন রূপান্তরের।  ঔপনিবেশিক অতীতকে ভিত্তি করে, এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের উদ্দেশ্যে সেই রূপান্তর।

স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতা যে রাতারাতি এক সম্পূর্ণ পরিবর্তীত মহানগরে পরিনত  হবে সেই আশা কেউই করেনি। তখনকার কলকাতা প্রাণে ভারতীয় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি কার্যকলাপে তখনও বিদেশী, ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেলেও অধিকাংশ শিল্প বানিজ্য প্রতিষ্ঠান তখনও চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। এছাড়া স্বাধীনতার পরে দেশভাগের সাথে সাথে কাতারে কাতারে হিন্দু পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে, আর স্বভাবতই রোজগারের আশায় বেশির ভাগই হাজির হয় কলকাতায়। কলকাতার তখনকার নগর পরিকাঠামো এই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জন্যে বিন্দুমাত্রও প্রস্তুত ছিলনা, কিন্তু তখনকার কলকাতায় সম্প্রসারণের জায়গা ছিল প্রচুর। হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের ঠাঁই হলো কলকাতার দক্ষিনে যোধপুর যাদবপুর টালিগঞ্জ বেহালা বেলেঘাটা ইত্যাদি এলাকায়। এই বিপুল পরিমান মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা করে দেয়ার জন্যে সরকার অনেক ফ্ল্যাট তৈরির কাজে হাত লাগলেও, বেশির ভাগই তৈরী করে নিল নিজেদের আশ্রয় জমি দখল করে বস্তি বানিয়ে। তুলনামূলক ভাবে অবস্থাপন্ন বাঙালরা গেল আর একটু উত্তরে, বালিগঞ্জ কালিঘাট ভবানীপুরের দিকে, প্রধানত এপার বাংলার মানুষদের এলাকার সীমানায়। পূর্বের বাঙাল আর পশ্চিমের ঘটি এই দুই বিপরীত সংস্কৃতির মানুষের এই প্রথম বিপুল হারে সংমিশ্রন। ভাষা আচার জীবনযাপনের যে চরম বৈষম্য ছিল প্রথমের দিকে, সেটা সম্পূর্ণ দূর হতে লেগেছে আরো কয়েক দশক, কিন্তু এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রনে কলকাতার বাঙালি সমাজ এক নতুন এবং অনন্য মাত্রা পেল।  স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া এবং আরো বেশ কিছু বছর পর অবধি আরো প্রচুর মানুষ প্রানের ভয়ে বা জীবিকার সন্ধানে পূর্ব বাংলা থেকে বাসা গুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে কলকাতায়, আর এই শহর তাদের গ্রহণ করেছে সানন্দে। নিউ ইয়র্ককে লোকে বলে big apple কিন্তু কলকাতা যে পরিমান মানুষের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের উপায় করে দিয়েছে সে হিসেব খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তার পরিবর্তে এই শহর পেয়েছে তার অনন্য পরিচয়। এ শহর ঘটির নয়, বাঙালের নয়, দেশ স্বাধীনের পর রয়ে যাওয়া হাজার হাজার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের নয়, চিনে দর্জি, ইহুদি পারসী আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের নয় নয় জীবিকার খোঁজে আশা বিহারী ঠেলাওয়ালা উড়ে ঠাকুর মারোয়ারী ব্যবসায়ীর — এ শহর এদের সবার সম্মেলনে গড়ে ওঠা এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো নয় কিন্তু ভাষা ধর্ম জাতির বৈচিত্রে কলকাতার সমগোত্রের মহানগরী ভারতে কেন সারা পৃথিবীতে বিরল। 

এই বিপুল সংখ্যক জনগণ কলকাতায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে আরো একটা ঘটনা ঘটছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে তার হার অনেকগুণ বেড়ে গেল। ভারতবর্ষে কম্যুনিস্ট মার্ক্সবাদী দর্শন এবং রাজনীতির পথিকৃৎ বলতে গেলে মানবেন্দ্রনাথ রায়।  জমিদার সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার দাবি করার প্রস্তাব বিশেষ করে ভারতবর্ষের মত বৈষম্যমূলক দেশে সাধারণ মানুষের কাছে প্রবল সমর্থন পেতে লাগলো। বিশেষ করে দেশভাগের পর যখন ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে কংগ্রেস ছাড়া আর কারো নাম করা যায়না আর কংগ্রেস তখন কুলীন জনগনের পার্টি আম জনতার নয়।  এই পটভূমিতে কলকাতায় বামপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় স্বাধীনতার পর পরই যার চূড়ান্ত পরিনতি হলো বামপন্থী দলের ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসীন হওয়া। ষাটের দশকে গোটা বিশ্বের বামপন্থী আন্দোলনের হাওয়া কলকাতাতেও চরম ভাবে প্রতিফলিত হয় যার হাত ধরে এলো কলকাতার দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁস ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। সাহিত্যে সুনীল সমরেশ শীর্ষেন্দু শক্তি চলচ্চিত্রে সত্যজিত ঋত্ত্বিক মৃনাল সেন অভিনয়ে উত্তম সুচিত্রা সৌমিত্র উৎপল দত্ত সঙ্গীতে মান্না দে সলিল চৌধুরী এঁদের হাত ধরে বাঙালির যে চরম বুদ্ধিগত উত্তরণ ঘটে এই সময় তার মূলে ছিল বামপন্থী আন্দোলন এবং উদারিকরনের আহ্বান। সেই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক বিস্তারে কলকাতার অবদান অনস্বীকার্য। ধর্মতলা কলেজ স্ট্রীট পার্ক স্ট্রীট এককথায় সমগ্র মধ্য এবং দক্ষিন কলকাতা এই নতুন সীমানাহীন জীবনের হাতছানিকে বাস্তবে রুপান্তরের অভিযানের কেন্দ্রে।

বামপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কলকাতার তরুণ প্রতিভারা নেতৃত্বে থাকলেও আসল লড়াইটা চলছিল সমস্ত বাংলায়, কৃষক শ্রমিক মজুরদের হাত ধরে।  একই ভাবে কলকাতার শহরতলীতেও সেই প্রতিবাদী বামপন্থী আন্দোলনের কৃতিত্ত্ব লেখক শিল্পীদের সাথে সাথে সেই অগুন্তি অদৃশ্য মানুষদের যাদের এতদিন কোনো ভাষা ছিলনা।  মিছিল ধর্মঘট অবস্থান ঘেরাও সব বিভাগে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের যে জোয়ার কলকাতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ষাটের দশকে সেখানে বড় ভূমিকা ছিল কলকাতার সেই উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গীয় সম্প্রদায়ের।  যাদবপুর বিজয়্গড় লেক গার্ডেন্স টালিগঞ্জ বালিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষদের কলোনিগুলো হয়ে উঠলো সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা এই মানুষরা ভারতে এসেছিল সবকিছু খুইয়ে, কলকাতায় তাদের আশ্রয় বলতে অস্বাস্থ্যকর একচালা ঘর, জীবনধারনের জন্য প্রত্যেকদিন লড়াই।  এই অবস্থায় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্যবাদ এই মানুষদের আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল বৈষম্যমুক্ত এক সমাজের। 

এই ছবিটা আমূল পাল্টে গেল সত্তরের দশকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বাধ্য করলো লাখে লাখে হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসতে। সবাই যে আসতে পেরেছিল তা নয়, তবু কলকাতার জনসংখ্যা এই সময় যেমন হঠাত এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেল, তেমনি বিশ্বজুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের নুতন ভাঙাগড়ার প্রভাব এসে পৌছালো কলকাতার অলিগলিতেও। এক শ্রেণী চাইছিল সশস্ত্র সংগ্রাম বলশেভিক বিপ্লবের মত বা মাওয়ের পথ অনুসরণ করে।  অন্য দল ছিল তখনও রাশিয়াবাদী, তাত্ত্বিক বামপন্থাকে প্রশ্ন করা মানেই প্রতিক্রিয়াশীল ছাপ পড়ে যাওয়া। এই টানাপোড়েনের মাঝে শুরু হলো নকশালবাড়ি আন্দোলন, যার আঁচ কলকাতাকেও গ্রাস করে নিল সাথে সাথে। শুরু হয়ে গেল প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্ধ, ছেচল্লিশয়ের দাঙ্গার পর আবার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭২ সালে মুখ্যমন্ত্রী হলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।  নকশাল বিপ্লব দমন করতে তিনি তাদের চেয়েও ক্রুর ভূমিকা নিলেন যেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কিনা জানা নেই। শুরু হয়ে গেল পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক হত্যা, গুপ্ত হত্যা, নকশালদের হাতে পুলিশ আর সিপিএম খুন, সিপিএমের হাতে নকশাল খুন, কংগ্রেস আর পুলিশের হাতে নকশাল আর সিপিএম খুন। অবশেষে এসবের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৭ সালে সেই প্রায় কুড়ি বছরের আন্দোলনের ফল হিসেবে সিপিএম এলো ক্ষমতায় — তবে নকশাল পিরিয়ড চলেছিল আরও অনেক বছর ধরে, সিপিএম ক্ষমতায় আসার পরেও।

কলকাতার স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেটা দাঁড়াল রাজনৈতিক ইতিহাসে কিন্তু কলকাতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে রাজনীতি তাই এর চেয়ে সহজভাবে এই তিরিশ বছরের  ঘটনাবলী লেখা যেতনা। রাজনীতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কলকাতার গতিবিধি নজর করে নেয়া যাক এক ঝলকে। স্বাধীনতার পর থেকে বিপুল পরিমান মানুষের সমাগম কলকাতার নগর পরিকাঠামোর উপর অসীম চাপ সৃষ্টি করে।  বিধান রায়ের স্বপ্নের প্রকল্প সল্টলেক এলাকায় নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জলাজমি ভরিয়ে গড়ে ওঠা সেই উপনগরিতে তখন মানুষ যাবার কোন আগ্রহই দেখায়নি, তবু দুই দশক পরে যখন কলকাতার পথব্যবস্থা প্রায় অচল, প্রচুর পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা এই উপনগরী তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু যারা সল্টলেকে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত মানুষ জমি এবং বাড়ি তৈরির মূলধন তাদের তখন ছিল।  তবে সল্টলেকে সরকারি কিছু ফ্ল্যাটও তৈরী হয় সাধারন নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য। একইভাবে বলা যেতে পারে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তৃতি। বালিগঞ্জ ছাড়িয়ে গোলপার্ক ঢাকুরিয়া যাদবপুর সেই সময়ে প্রচুর সম্প্রসারিত হয়, বিশেষ করে রিফিউজি মানুষদের সংস্থানের জন্য। একের পর এক গড়ে ওঠে সরকারি চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি ন্যুনতম ভাড়ায়। আরেক দিকে কলকাতা বেড়ে উঠছিল দক্ষিন পশ্চিমে বেহালায় যা স্বাধীনতার আগে ছিল মূলত জলাঞ্জলি আর শিল্পাঞ্চল। কলকাতার পরিবহন পরিষেবা গড়ে ওঠে ষাটের দশকের গোড়ায় মূলত সরকারি CSTC বাস দিয়ে, তার পর একে একে যুক্ত হয় প্রাইভেট বাস মিনিবাস ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে তৈরী হয় মেট্রো রেলের মাস্টার প্ল্যান যার পরিনতি ১৯৮৪ সালে ভারতবর্ষের প্রথম ভূতল পরিবহম ব্যবস্থা যা আজও কলকাতার গর্ব। ষাটের দশকে গড়ে ওঠে রবীন্দ্র সদন।  জীবনযাত্রার দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলকাতা তখন শিক্ষা সংস্কৃতি পান্ডিত্যে ভারত সেরা যার নমুনা চলচ্চিত্রে সংগীতে লেখায় শিল্পে অগুন্তি।  মানুষ বামপন্থী আন্দোলনের আবেগে অনুপ্রানিত হয়ে প্রতিবাদী চিন্তাধারার প্রতিভূ যেখানে expressionয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কলকাতায় তখন পাড়ায় পাড়ায় গান নাচ আবৃত্তি আঁকা ইত্যাদির ছড়াছড়ি। সেখানে খেলার স্থান তবে শুন্য। কলকাতার তিন প্রধান ছাড়াও প্রথম ডিভিসন ফুটবল লিগের দলগুলো অসাধারণ ফর্মে থাকলেও, কলকাতা থেকে খুব কম ফুটবলারই উঠে এসেছে সেই সময়। তবু তখনো ভারতে ফুটবল মানেই কলকাতা। 

আশির দিকে কলকাতায় এলেন ফরাসী লেখক দমিনিক লাপিয়ের। শহর তাঁর মন জয় করে নিল, কলকাতাকে তিনি বললেন City of Joy. এ শহরে দারিদ্র্য প্রবল, পরিকাঠামো অচল তবু মানুষের মুখে হাসি আছে, আছে জীবনকে উপভোগ করার আত্মবিশ্বাস। একাধারে কলকাতা যেখানে যাত্রা শুরু করেছিল কুড়ির শতকের গোড়ায়, সেই একই প্রগতি বজায় থেকেছিল আশির দশকের গোড়া অবধি। আশির পরের কলকাতায় প্রগতি থেমে যায়নি বরং বেড়েছে, শুধু পরবর্তী সময়কালের লেখাটা নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা করে লিখব বলেই আশিতে এই লেখা থামানোর পরিকল্পনা। কলকাতা এই সময় অবধিও ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসে কলকাতার যে হার না মেনে নেয়ার ক্ষমতা দেখা গেছে, সেখান থেকেই বলা যেতে পারে যে কলকাতা এখনো মৃতনগরী নয়, কলকাতা আছে কলকাতাতেই। আমার শহর আমার গর্ব আমার City of Joy.

Standard