calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — দ্বিতীয় পর্ব ১৮০০-১৮৯৯

সেই ১৬৯০ সালে জোব চার্নক ইজারা নেবার সময়ের তিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রাম থেকে আঠার শতকের শেষে শৌর্য স্থাপত্য বৈভবে লন্ডনের সমগোত্রে উত্থান — কলকাতার এই একশ বছরের যাত্রা রূপকথার চেয়ে কম বৈচিত্রপূর্ণ নয়। তবে সেই ঠাটবাট কেবলমাত্র সীমিত ছিল এক শ্রেণীর মানুষের উপর যারা ব্রিটিশ শাসকদের তোষামোদ করে তাদের স্নেহভাজন হয়েছিল। কলকাতাবাসী বাঙালি সমাজে তখনও ভাগ ছিল দুটো, ধনী আর গরিব। শহরের সেই আমূল পরিবর্তনের সময় উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের বর্ণনা আধুনিক বাঙলা সাহিত্যের শুরুর দিকের লেখায় পাওয়া গেলেও সাধারন মানুষের জীবনযাপন নিয়ে তেমন লেখালেখি হয়নি। উনিশ শতকের কলকাতা সাক্ষী হয়ে থাকবে আর এক আমূল পরিবর্তনের যার কেন্দ্রে থাকবে সেই অকিঞ্চিৎকর মানুষদের জীবনযাত্রার বদল, আর শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিবর্তন। 

প্রথম পরিচ্ছেদের আঠার শতকের কলকাতায় লিখেছিলাম কলকাতা আগাগোড়া ব্রিটিশদের গড়া শহর, এই শহরের শুরু থেকে এমনকী এখনো পর্যন্ত সেই সময়কার প্রভাব কলকাতার অস্থিমজ্জায় জুড়ে আছে প্রায় সকল ক্ষেত্রে —শিল্প শিক্ষা সমাজব্যবস্থার পরিকাঠামোয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পরিকাঠামো তৈরীর পর ইংরেজদের প্রয়োজন হয়ে পড়ল skilled workforce বা শিক্ষিত লোকবল সেই বিশাল আর ক্রমবর্ধমান প্রসাশনিক কার্যকলাপ আর সাম্রাজ্য চালানোর জন্য যা জীবিকার খোঁজে আসা ইংরেজদের মধ্যে ছিলনা। ফলে সেই ঘাটতি মেটানোর জন্য কলকাতাবাসী বাঙালি অধিবাসীদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হল এক শিক্ষাব্যবস্থা যা পরবর্তীকালে কলকাতা তথা বাঙালি চিন্তার উন্মেষ আর বিকাশে এক অনস্বীকার্য অবদান। স্বাধীন চিন্তার বিকাশের জন্য ইংরাজী শিক্ষা যে অপরিহার্য নয় তার উদাহরন মধ্যযুগে চৈতন্যদেব থেকে কবীর থেকে লালন ফকির, সেখান থেকে রামকৃষ্ণ অবধি অনেকেই আছে, কিন্তু ইংরেজী শিক্ষা এবং সাহিত্যের মাধ্যমে এক নতুন চিন্তাধারা, শত সহস্র মাইল দুরের এক জগৎ সম্বন্ধে ধারনা আর সেখানকার সাহিত্য বিজ্ঞান শিল্প কলায় প্রভাবিত হয়ে বাংলা ভাষা আর চিন্তাধারার নবজাগরন সেই প্রথাকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালানোর পরিকল্পনা থেকে একের পর এক চালু হল হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল, স্কটিশ চার্চ, প্রেসিডেন্সি কলেজ ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেগুলো এখনো পর্যন্ত কলকাতার শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের প্রথম সারিতে। 

উনিশ শতকের প্রথম দিকে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে কলকাতার বাঙালী সমাজের উদারপন্থা বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল। বোম্বাই মাদ্রাসের মত প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতেও এই পরিবর্তন ঘটেছিল, তবে বাঙালি জীবনে দীর্ঘদিনের ভিনদেশী শাসনের প্রভাবে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যুক্তিবাদী চিন্তাধারা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল, যার ফল হল কলকাতায় পাঠশালার পরিবর্তে ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রথম দিকের স্নাতকদের মধ্যে মুক্তচিন্তার  প্রসার যার শুরু আঠার শতকে রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব এবং এই তালিকায় জুড়ে গেল আরো অনেক নাম — বিদ্যাসাগর , ঠাকুর পরিবার, বিবেকানন্দ, ডিরোজিও, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ। সংস্কৃতে একটা কবিতার লাইন এই সময়ের চিন্তার বিবর্তনের সাথে যথোপযুক্ত “বিদ্যত্বঞ্চ নৃপতঞ্চ নৈব তুল্য কদাচন। স্বদেশে পুজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে॥”  সমাজে অর্থবলই যে সম্ভ্রম উপার্জনের একমাত্র উপায় নয় সেটা উনিশ শতকের এই চিন্তাবিদদের উত্থানে প্রমানিত হয়ে গেল কলকাতার বাঙালি সমাজে, যেখানে উচ্চশিক্ষিত আইকনের অভাব ছিল এই সময়ের আগে পর্যন্ত। ফলে প্রথমদিকে কলকাতার শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞানচর্চায় অগ্রনী মানুষরা সচ্ছল অর্থবান পরিবার থেকে আসলেও শতাব্দীর শেষের দিকে শিক্ষার ওপর ধনী মানুষদের কায়েমী অধিকার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। 

এই প্রসিদ্ধ মানুষদের নতুন চিন্তাধারার পরিনাম হল বাংলার রেনেসাঁস আর সামাজিক উদারীকরণ।  রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার গল্প এখন ইতিহাস কিন্তু তার রূপায়ন তখনকার গোঁড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে কিরকম দুঃসাধ্য এখনকার সমাজ চেতনা থেকে তা কল্পনা করাও দুস্কর। সেরকম বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য বিদ্যাসাগরকে কুলীন বাঙালি সমাজের কাছে কেমন হেনস্থা হতে হয়েছিল তা কারও অজানা নয়। এই জাতীয় প্রথাগুলোর বিলুপ্তি বা পরিবর্তনের পিছনে তখনকার নব্য বাঙালি চিন্তাধারার মানুষদের অবদান বিচার করলে তার খানিকটা কৃতিত্ব যাবে তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের আর তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার। Change comes from within কথাটা এক্ষেত্রে খুব উপযুক্ত, কারন তারা আগ বাড়িয়ে কেবলমাত্র প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ করে সেই প্রথাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেনি, যেটা করলে সেটা দেখাত শাসকশ্রেণীর সম্পূর্ণ বাঙালি জাতীর ওপর হস্তক্ষেপ, ফলে তার প্রতিবাদ হতো অনেক জোরালো। তার পরিবর্তে ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত বা জীবনদর্শনে অনুপ্রেরিত বাঙালি সমাজের প্রতিভু মানুষদের মাধ্যমে আনা পরিবর্তনগুলোয় সাধারন মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে সেই সমাজ পরিবর্তক মনিষীরা যাদের পরবর্তীকালে সমাজ সাগরে গ্রহন করেছে তাদের দূরদর্শিতার প্রমান পেয়ে আর সেই সাথে সমাজে শিক্ষার বিকাশের মাধ্যমে উদার চিন্তার উন্মেষে। 

উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন এই ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কার্যকলাপ চালানোর জন্য বিভিন্ন স্কুলকলেজ স্থাপনা করা হচ্ছিল, সেখানে সাধারণত খুব মেধাবী না হলে সাধারন নিম্নবিত্ত (নাকি সাধ্যবিত্ত!) মানুষদের উপস্থিতি ছিল নগন্য যা পাল্টাতে শুরু করে শতাব্দীর মাঝামাঝি মিশনারিদের আগমনে। খ্রীষ্টধর্ম যে পৃথিবীর সব ধর্মের চেয়ে মহান এবং অন্য ধর্মের মানুষদের তাদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি — এই ধারনা সেই মিশনারিদের প্রধান লক্ষ্য হলেও তাদের জীবনের মূল ব্রত ছিল সেবা তা অনস্বীকার্য, আর সেই ব্রত থেকেই প্রধানত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য হলেও, বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল স্থাপনার মাধ্যমে সাধারন মানুষদের কাছে খুলে গেল শিক্ষা বিন্যাসের দরজা। লা মার্টিনিয়ার, সেন্ট জেভিয়ার্স, লোরেটো, বেথুন, ক্যালকাটা বয়েজ প্রমুখ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও কলকাতার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জগতে অগ্রনী ভুমিকায় রয়েছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রগতির সাথে সাথে শিল্প আর বানিজ্যের বিপুল সম্প্রসারণ ঘটেছিল উনিশ শতাব্দীর কলকাতায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী হিসাবে কলকাতার হয়ে উঠেছিল আমদানী-রপ্তানির মুল কেন্দ্র। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে কলকাতায়ও শুরু হল এক শিল্প বিপ্লব যা উনিশ শতকের কলকাতার সেই আমূল পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অণুঘটক। প্রথম একশো বছর কলকাতা বন্দর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কিন্তু বানিজ্যের পরিমান সেই তুলনায় তেমন বেশী ছিলনা। শুরুর দিকে কলকাতা বন্দরের পশ্চাদভুমি সীমিত ছিল হাওড়া হুগলি চব্বিশ পরগনা থেকে উত্তরে নদিয়া মুর্শিদাবাদ অবধি। উনিশ শতাব্দী মাঝামাঝি সেই পশ্চাদভুমি বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল বিহার উড়িষ্যা সমগ্র পূর্ব ভারত, সম্পূর্ণ অবিভক্ত বাংলা, উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলি। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতা বন্দরের যতগুলো জেটি ছিল তার বেশীর ভাগই এই সময়ে নির্মিত। এই বিশাল বিস্তারের মুল কারন ছিল গঙ্গার দুই পাড়ে পাটশিল্পের আর সেই সাথে বস্ত্রশিল্পের পত্তন। ইংরেজদের মূল রপ্তানির বস্তু ছিল সেই পাট আর কাপড়, সেই সাথে যেত নীল ইউরোপে আর আফিম চিনে। নীল চাষিদের দুর্দশার বিবরন অনেকেরই জানা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে কিন্তু সেই নীলকর সাহেব বা তাদের তাঁবেদার জমিদারেরাও যে কলকাতার সেই বাড়বাড়ন্তের অংশীদার সেদিক থেকে ভেবে দেখলে কলকাতার ইতিহাস সেই শুরু থেকেই স্থানীয় মানুষদের শোষন আর নিপীড়নের কাহিনী। 

পাট আর বস্ত্রশিল্পের বাইরে খনি বিশেষ করে কয়লাখনির ব্যবসাও এই সময়ে প্রথম চালু হয়। আসানসোল রানীগঞ্জ ইত্যাদি কয়লা বলয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয় রেলপথে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেই পারে যে কলকাতা ততদিনে বাকী ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর সাথে রেলপথে যুক্ত হয়ে গেছে, ফলে আভ্যন্তরিন খনিজ অঞ্চলগুলোর সাথে রেল যোগাযোগ ও তার সাথে রপ্তানির পরিমান বৃদ্ধি কলকাতা বন্দরের সম্প্রসারণের প্রধান কারন। কলকাতাকে আমদানি রপ্তানির কেন্দ্র করে গঙ্গার দুই তীরে গড়ে উঠেছিল আরো বিভিন্ন কারখানা জেসপ টিটাগড় পেপার মিল। সেই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে সামিল হতে অনেক ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরাও চলে আসে কলকাতায়, যারা বেশীরভাগ ইংরেজ হলেও ছিল ডাচ ফরাসী জর্জিয় আর্মেনিয়রা। এই বাকী শ্রেণীর মানুষরা সাধারণত খুচরো ব্যবসায় সামিল হলেও, ইংরেজরা সেই ক্রমবর্ধমান বাজার থেকে মুনাফা বাড়ানোর আশায় চালু করল এক সিস্টেম যেখানে কাঁচামাল আসত ব্রিটেন থেকে, তারপর তৈরী হওয়ার পর ফেরত যেত আবার সেই বিলেতে, অনেক বেশীগুন লাভে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝি তাই কলকাতার বাজার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে খুচরো ব্যবসায়ীরা দোকান বা কাঁচা বাজারে ব্যবসা চালাতে লাগল, অন্যদিকে পাইকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করল বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যম গোটা দেশের সাথে বানিজ্য। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বলতে যা বুঝি তার প্রথম সংস্করন এই ব্যবসাগুলি। সাধারন কাঁচা ব্যবসা গোটা শহরে ছড়িয়ে থাকলেও, এই দ্বিতীয় প্রকারে ব্যবসাগুলি ছড়িয়ে ছিল কেবল চৌরঙ্গী, এসপ্ল্যানেড স্ট্র্যান্ড রোড অবধি —যা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাহেবদের খাস তালুক। এসপ্ল্যানেডের নতুন জৌলুসি দোকানপাট সুপারস্টোরের পরতের পিছনে গলিঘুঁজিতে এস এন ব্যানার্জি রোড বা বিবাদী বাগে এখনও চোখে পড়বে সেইসব দোকানগুলোর অবশেষ। 

ইন্টারনেটে একটা লিঙ্কে দেখলাম কলকাতা বন্দরে এইসব ব্যবসার প্রসারে প্রায় দু কোটি ডলারের আমদানি রপ্তানি হত উনিশ শতকের মাঝের দিকে। সেই বিপুল পরিমান বানিজ্যকে সাহায্য করতে কলকাতা শহরের নাগরিক পরিকাঠামোর প্রচুর উন্নতি হয়েছিল সেই যুগে। কলকাতা শহরে চলল প্রথম ট্রাম, শুরু হল প্রথম রেলপথ। একে একে তৈরী হল গঙ্গার ওপর সেতু দুই পাড়কে রেল আর সড়কপথে জুড়তে।  কলকাতার বিভিন্ন সব সৌধ বা দর্শনীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থাপত্যগুলি যেমন রাজ ভবন, শহীদ মিনার সব উনিশ শতকেই তৈরী। এই সময়ে কলকাতার ভৌগোলিক কী পরিবর্তন হয়েছিল তা ঠিক জানা নেই তবে মনে পড়ছে জিপিও বা ইস্টার্ন রেলের অফিসের পেছনে গঙ্গা বইত যা এখন অনেক পশ্চিমে সরে গিয়েছে। তবে কলকাতার সেই বানিজ্যিক সুবর্ন যুগে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে চলে আসে প্রচুর মানুষ। মাল পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে সড়ক বা রেলব্যবস্থা তখনকার দিনে বহুল প্রচলিত হলেও যাত্রী পরিবহন ছিল বিরল এবং দামী, ফলে সাধারন দিনমজুরদের পক্ষে সেই পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করা ছিল দুঃসাধ্য। এর পরিনাম হিসাবে সেই শ্রমিকরা কলকাতাতেই বসবাস করা শুরু করে সাধারণত ব্রিটিশদের সেবকদের এলাকায়। এই জায়গাগুলো সাধারণত ছিল জীবনধারণের অনুপযুক্ত, নিকাশী ব্যবস্থা প্রায় অদৃশ্য, পানীয় জলও অস্বাস্থ্যকর — কলকাতার বস্তি অঞ্চলগুলোর সূত্রপাত সেই সময় থেকে।

Tristram Hunt এর লেখা একটা বই হঠাৎ চোখে পড়েছিল একদিন এই ব্লগ লেখার সময়। বইটার নাম Ten cities that made the empire। দোকানে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে নিলাম কি বক্তব্য কলকাতা নিয়ে সেটা জানার জন্য। দেখা যাচ্ছে যে উনিশ শতকের শেষের দিকে নয়, এই অধোগতির শুরু প্রথম দিকেই। ২০০৮ এর লেম্যান ব্রাদার্স এর পতন দিয়ে যেমন বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা শুরু, তেমনই ১৮৩০ সালে এক সিন্ডিকেট ব্যবসার পতনকে হান্ট বলছেন কলকাতার জাঁকজমকের শেষ অধ্যায়। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে ম্যানচেস্টারে তাঁতশিল্প্রের বিপুল সম্প্রসারণে কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব তখন অনেকটাই বিলুপ্ত। কলকাতাকে ঘিরে কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তখনকার লেখাতে পরিস্কার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, প্রাসাদনগরী জাতীয় ভুষণের পরিবর্তে কলকাতা মানে তখন দাঁড়িয়েছিল দারিদ্র্য, মহামারী, আকাল, অস্বাস্থ্যকর ইত্যাদি রূপকে। 

রবীন্দ্রনাথের “ধনের ধর্মই অসাম্য” কথাটা কলকাতার পত্তন আর বিস্তারের ক্ষেত্রে দারুনভাবে প্রযোজ্য। উনিশ শতকের শুরু থেকে শেষ অবধি কলকাতা যত বেড়েছে তত বেড়েছে অসাম্যও — একদিকে ব্রিটিশদের কুলীন কলকাতা এসপ্ল্যানেড চৌরঙ্গী ফোর্ট উইলিয়াম অন্যদিকে বাবুদের চারণক্ষেত্র উত্তর কলকাতা। এই দুইয়ের মাঝে ফাঁকফোকরে গলিঘুঁজিতে জায়গা করে নিচ্ছিল ভাগ্যের খোঁজে আসা খেটে খাওয়া মানুষের দল। এই অসাম্য সমাজের সব স্তরেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। ইংরেজরা প্রথম কলকাতা আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদারেরা ছিল তাদের সহযোগী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারা ভারত জুড়ে ব্যবসা বিস্তার করার পর তাদের আর এই আঞ্চলিক সাহায্যের দরকার রইলনা, তাই ইংরেজদের সহায়ক বাবু সম্প্রদায় উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশদের অধীনে খিদমত খাটা পোষ্যে পরিনত হল। ক্ষমতালোভী কিছু মানুষ সেটা মেনে নিয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশদের প্রশাসনিক পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এনেছিল। সেই স্বাধীনতার প্রথম বিপ্লবের আগে অবধি ব্রিটিশদের ধারনা ছিল যে তাদের বণিকের ছদ্মবেশ মানুষ মেনে নিয়েছে কলকাতার জাঁকজমক দেখে বা ভাগ্যের পরিহাস ভেবে। সিপাহী বিদ্রোহ তাদের সেই ধারনা ভেঙে দেখিয়ে দিল যে অসন্তোষ খোদ ব্রিটিশদের রক্ষাকারী সেপাইদের মধ্যেই অনেক, বাকী নিপীড়িত লোকজন যাদের দুর্দশার ফলে ব্রিটিশদের সেই প্রাচুর্য, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তো আরো অনেকগুন বেশী। তাছাড়া সিপাহী বিদ্রোহে মানুষ যে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত সেটাও ইংরেজরা টের পেল ১৮৫৭ তে, আর নজর দিল রাজস্ব আদায়, কোনরকম রাখঢাক না রেখে আর তাদের বিরুদ্ধে রব তোলা প্রতিবাদীদের রাজদ্রোহ ইত্যাদির মোড়কে কঠোর বিচারে। 

প্রথম দেড়শ বছরে কলকাতার যে বিস্তার জাঁকজমক হয়েছিল সেখান থেকে পরবর্তী সময়ের পতনের কাহিনীও উনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই শুরু। সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজদের অত্যাচার যেমন বেড়ে গিয়েছিল তেমনি এটাও পরিস্কার ছিল যে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও সম্ভব। এছাড়া ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত মানুষরা ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে সেখানকার স্বাধীন মুক্ত সমাজের ধারনায় দিক্ষিত হয়ে এক স্বাধীন ভারতের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠল। স্বাধীনতা সংগ্রামে সেই নতুন মাত্রা যোগ হয়ে উনিশ শতকের শেষের কলকাতা তখন ভারতের ব্রিটিশ বিরোধিতার পুরোভাগে। সেই প্রতিবাদ তীব্র আকার নেয় কয়েক বছর পর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ রায়ের সময়, যার ফলস্বরূপ ১৯১১য় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লিতে। কলকাতা পরবর্তী শতাব্দীতে তার অস্তিত্বের গুরুত্ব ক্রমাগত হারাতে থাকে সেই সময় থেকেই। কলকাতাকে নদীর গতিপথের সাথে তুলনা করলে আঠার শতকে কলকাতা ছিল দুর্দম উচ্ছল দুর্বার পার্বত্য অঞ্চলে নদীর প্রবাহের মত। উনিশ শতকে তার প্রকৃতি সমভুমিতে নদীর মত বিপুল বিস্তৃত আর শেষের শতকে কলকাতা মোহনার দিকে চলা নদীর মত দিকে দিকে চড়া দ্বীপ ইত্যাদিতে পরিপূর্ন, প্রথম অধ্যায়ের সেই বাঁধনছাড়া উচ্ছাসের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই, বরং অত্যধিক ব্যবহারে পলি জমে জমে নদীর চেয়ে চড়া বড় হয়ে উঠেছে। বিংশ শতকের কলকাতা যেমন আকার আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনই তার অবক্ষয়ের হারও সমানুপাতিক বেড়েছে। 

একাধারে বিচার করলে কলকাতার ঠাটবাট যেমন প্রবল পরিমান বেড়েছিল উনিশ শতকের প্রথম দিকে, তারপর মাঝের বছরগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে আর তার সাথে স্থাপিত হয় গঙ্গার দুই তীরের শিল্পবলয়, আর শেষের বছরগুলো পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃত। কলকাতার ইতিহাসের এরকম ঘটনাবহুল শতাব্দী বোধহয় আর আসেনি যেখানে শুরুর ব্রিটিশ প্রভাব কাটিয়ে শেষের দিকে এই শহর এগিয়ে চলেছিল তার নিজের সত্তার সুলুকসন্ধানে, যা পরবর্তী যুগে কলকাতার বিবর্তনের প্রথম ধাপ। 
Advertisements
Standard