calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Advertisements
Standard
Bengal, Bengali culture, calcutta

কোয়েস্ট মল, ধুতি এবং কাছাখোলা বাঙালিয়ানা

আমি নিজে যে কতখানি বাঙালি তা নিয়ে আমারই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই যেমন প্যানপেনে উত্তমকুমারের সিনেমা পছন্দ নয়, বাংলা রকের আদ্ধেক শব্দই বুঝতে পারিনা, বাংলা বই যে শেষ কবে পড়েছি তা মনে পড়েনা, বাংলা যেন তেমন শুনিনা – তার চেয়ে পছন্দ স্প্যানিশ পপ-রক নয় ইয়ান্নি/ভ্যানজেলিসের অর্কেস্ট্রা। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি রবীন্দ্রসঙ্গীতও শুনিনা তা নয়, কিন্তু সারাক্ষন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে থাকি তাও নয়। ধুপধুনো দিয়ে পুজো করিনা। বিবেকানন্দ পড়িনি, তিনি কি কি বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে গেছেন সেগুলো এদিক ওদিক একটু আধটু জেনে সন্দেহ হয় তাঁর ভাবনাচিন্তাগুলো আদৌ আজকের যুগে খাটে কিনা। সুভাষচন্দ্র যে এখনো বেঁচে আছেন তাও বিন্দুমাত্র মনে হয়না। কলকাতার চেয়ে ক্যালকাটা লিখতেই পছন্দ করি। আর ওই বাঙালিরা যে সবথেকে বুদ্ধিমান ভারতীয়দের মধ্যে, সেটা মনে হয় ডাহা ঢপ। ওই What Bengal thinks today প্রবাদটা চরম ক্ষতি করে গেছে বাঙালীজাতির ইগোর জন্যে, ওই একটা কথাতেই যা বার খেয়ে বসে আছে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, তার ঘোর এখনো ভাঙেনি।

তবু এসবের বাইরে বিদেশে বসে কারো সাথে বাংলা কথা বলতে পারলে মন ভালো হয়ে যায়, কেউ কলকাতা থেকে হজমি নিয়ে আসলে গুঁড়োগুলো হাত থেকে চেটে চেটে খাই, মাছ রান্না হলে থালায় ভাত নিই দুগুণ। স্প্যানিশ গান শুনে হেজে গিয়ে শেষে চালাই লক্ষীছাড়ার সোনালী, বা শানের ও মাঝিরে। বইয়ের কথা মনে পড়লেই চোখে ভাসে সুনীল শীর্ষেন্দু সমরেশ। আর ইন্দ্রজাল কমিক্স। বিদেশে থেকেও বন্ধুবান্ধবকে কাকুতিমিনতি করে জোগাড় করি দুর্লভ সব সংখ্যা। দুর্গাপুজোয় ৫ পাউন্ড চাঁদা দিয়ে ঠাকুর দেখতে যাই যদি খিচুড়ি আর লাবড়া পাওয়া যায় সেই আশায়। তাই সাবেকী মতে বাঙালি কিনা সে নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আদপে আমার নিজের সত্ত্বার মধ্যে অনেকটাই যে বাংলাভিত্তিক তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। টেনিদা ঘনাদা পটলদা – হাঁদা ভোঁদা নন্টেফন্টে বাঁটুল – সুমন অঞ্জন নচিকেতা – পরশপাথর লক্ষীছাড়া ভূমি চন্দ্রবিন্দু ঘুরেফিরে মনে ধাক্কা মেরে জানান দিয়ে যায় যে হুঁহুঁ বাবা ছাড় পাবে এতো সহজে? তবে বাঙালি বলে জাহির করার আদিখ্যেতা কখনো ছিলোনা আমার, আর এখনো চেষ্টা করি কোনরকম দল বা গোষ্ঠীর নড়া না ধরতে। একজন মানুষ – এর বাইরে যে কোনো পরিচয় খুঁজতে যাওয়া থেকেই যত বিপদ্রব। তবু আজ দুপুরে যখন পড়লাম যে এক পরিচালক ধুতি পরে এক মলে যাওয়ায় তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি, তখন মনে হলো বাঙালি বিপন্ন। তার খুব নিজের পাড়া কলকাতাতেই।

কোয়েস্ট মল, বেকবাগান
Source: http://www.skycrapercity.com

এটা যে একটা ছুটকো ঘটনা তা নয়। গত বছর মোকাম্বোতে এক ড্রাইভারকে ঢুকতে না দেয়া নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। তারপরের ঘটনাও পার্ক স্ট্রিটে, cross-dressing মানুষদের বুক করা মিটিংয়ে না যেতে দেয়া। তবে এই দুই ঘটনার পিছনেই রয়েছে অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য। ড্রাইভার সে যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল গরিব দেখতে লোকদের ঢুকতে না দেয়া। একইভাবে crossdresser দের না ঢুকতে দেয়ার পিছনে রয়েছে সামাজিক কলঙ্কের চিন্তা। ঠিক যে কথাটা বলছিলাম আগে, বিশেষ করে কলকাতায় বিভিন্ন জাতি ধর্মের লোক একসাথে বসবাস করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে ওপরের প্রতি সৌজন্যমূলক। তা বলে বাঙালি সমাজ যে কুসংস্কার মুক্ত, সেটা মনে করাটা হবে পাগলের প্রলাপ। সামাজিক ভেদাভেদ আগেও ছিল, গরিব মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ নতুন কিছু নয়। তেমনি নতুন নয় সমকামী মানুষদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা বিদ্রুপ। এই রোগ আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। লজ্জার ব্যাপার কিন্তু নতুন করে আশ্চর্য হবার কিছু না। এই কোয়েস্ট মলে হওয়া ঘটনাটা মনে দাগ কাটে কারণ কর্তৃপক্ষের না ঢুকতে দেয়ার নির্দেশের মূল লক্ষ্য হলো ধুতি পরা লোকজন। ধুতি পাঞ্জাবি হলো খাঁটি বাঙালিয়ানার এক প্রতীক। বাঙালি সংস্কৃতির খোদ রাজধানীতেই এই জাতীয় বৈষম্যের মধ্যে খানিকটা সিঁদুরে মেঘ দেখাটা স্বাভাবিক বৈকি।

জীবনে দুবার ধুতি পড়েছি ভাই আর বন্ধুর বিয়েতে। দুবারই পেট খারাপ হয়েছিল, একাধিকবার বড় বাইরে যাবার যে কি কেলো ধুতি নিয়ে, তার আমি ভুক্তভোগী। তার পর থেকে ঠিক করেছি লোকে পয়সা দিলেও ধুতি এড়িয়ে চলব আজীবন। কিন্তু আসল ঝামেলা তো ধুতি নিয়ে নয়। ধুতি তো একটা সিম্বলমাত্র। আসল সমস্যা হলো এই যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ, তা মোকাম্বোই বলুন বা ওয়ান স্টেপ আপ, কিম্বা কোয়েস্ট মল, যেখানে যে যার ইচ্ছেমতো নিয়ম তৈরী করে চলেছে। এদের নিয়মকানুনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন কেউ তোলেনি আগে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মোকাম্বোর ঘটনার এক বছর পরেও যে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে, সেই বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে কলকাতাকে লন্ডন বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, আদপে লন্ডন বানাতে গেলে শুধু যে গোটা দুই বিগ বেন খাড়া করলেই হবে তা তো নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও যে বদলাতে হবে সে দিকটা বোধহয় তিনি ভেবে দেখেননি। এই জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ পশ্চিমি দুনিয়ায় কেউ করলে তাকে জনগণ অবিলম্বে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। শুধু যে নিজের আঁতে ঘা লাগলে তখনই তা নয়। অঢেল উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ অবিচার দেখে ভুক্তভোগীদের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অঢেল উদাহরণ আছে কলকাতাতেও। আর আশ্চর্যের ব্যাপারটা সেখানেই। যে শহরে এক পয়সা ট্রামভাড়া বাড়ার প্রতিবাদে আগুন জ্বলেছিল, সেখানে এই জাতীয় ধ্যাষ্টামো করার সাহস এদের কোথা থেকে এলো আর কবে থেকে সেটাই ভাবার।

ব্রিটেনে ভোটের সময় এক ব্লগে লিখেছিলাম Know your enemy. এই শত্রূ ঠিক শ্রেণীশত্রূ নয়, বরং খুঁজে বার করা যে সমস্যাটার জন্যে মূল দায়ী কে। কোয়েস্ট মলের ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে গেলে আসলে দেখা যাবে সর্ষের মধ্যেই ভূত। আমরা তো মোকাম্বো কোয়েস্টএর মুণ্ডপাত করতেই পারি আর সেরকমটাই হতে চলেছে যখন মানুষজন কোয়েস্ট মলের সামনে ধুতি পরে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু এই যে বাঙালিয়ানার আঁতে ঘা লেগেছে সেই হুজুগে খানিক বাওয়ালি করা, তার বাইরে একটু ভেবে দেখা যাক এসবের ব্যুৎপত্তি কোথায়। এই যে ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন রেস্তোরাঁ বা শপিং মলের এদের তো একটাই উদ্দেশ্য, যত বেশি সম্ভব বিক্রিবাটা। এই সব মলের খদ্দের কারা? বাংলাটা ঠিক আসেনা টাইপের মিলেনিয়ালরা নয়? ধুতি পরে বাজার করতে এলে ম্যানেজমেন্টের কি আসে যায় । আসলে সমস্যা কি যারা বাজার করতে যায় তারাই চায় না অন্য শ্রেণীর লোকেরা সেখানে যাক? আর এই যে কোয়েস্ট মল নিয়ে এতো হাঙ্গামা, গোটা পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে ভাবলে কটা লোকে সেখানে যায় বা যাবার সামর্থ রাখে? রিপোর্টটায় আরেকটা ব্যাপার পড়লাম যেটা আরো দুশ্চিন্তার। প্রথমে যখন নিরাপত্তারক্ষী সে পরিচালককে ঢুকতে বাধা দেন তিনি নাকি তখন তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলেন ম্যানেজার কে জানতে চেয়ে। মানে সমস্যাটা কি আরো গভীর, যে কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমান করতে গেলে ইংরেজিতেই কথা বলতে হবে? নাহলে কি কপালে ঘাড়ধাক্কা? এই যে জেনারেশন এক্স ওয়াইদের বাংলা না বলতে পারার ক্যালি, ধুতি না পরতে জানার ক্যালি, যারা এসব করে তাদের প্রতি উন্নাসিকতা – এসব কারণও কি পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে কোয়েস্ট মলের কর্তৃপক্ষকে? নিজে অন্যের থেকে আলাদা হতে চাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু অন্য কেউ যদি আমার মতো না হয়, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করাটা বিকৃতরুচির পরিচয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন সব দোকানে বাংলা নাম লেখা নিয়ে আন্দোলন করছিলেন তখন ভেবেছিলাম আবার একটা সিম্বলিজম নিয়ে ক্যাও। কিন্তু ইদানিংকালের এই সব ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বাঙালির বাঙালিয়ানা বিলোপ করার একটা চেষ্টা চলছে। কে দায়ী, অবাঙালি ব্যবসায়ীকূল, নাকি না-বাঙালি ট্যাঁশ মিলেনিয়ালরা, নাকি মল মালিক আর রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা তার হিসেব পরে করা যাবে, কিন্তু সেটা প্রতিরোধ না করতে পারলে এরকম আরো ঘটনা ঘটবে ভবিষ্যতে। ঐতিহ্য সংস্কৃতি এসব নিয়ে আগে কখনও মাথা ঘামাইনি, এগুলো কারো পিতৃদত্ত্ব সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের ধারা মেনে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি এদেরও পরিবর্তন হতে বাধ্য, আপনি চান বা না চান। এবং সেই বদলে এয়ারটেলের বিজ্ঞাপনের খোরাকী বাংলাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু বাংলায় কথা বলা, বাঙালি পোষাক পরা, নাক উঁচু পাঁচতারা জায়গায় খেতে যাওয়া — এ সবই ব্যক্তিগত পছন্দের। কিন্তু কেউ যদি সেটা না করে, তাকে ব্রাত্য করে দেয়া, হীনমন্যতায় ভোগানো কখনোই মেনে নেয়া যায়না। এও একপ্রকার বৈষম্যবাদ, আর সেই জন্যেই এক একটা ছুটকো ঘটনার জন্য অগোছালো প্রতিবাদে চিঁড়ে ভিজবেনা।

এয়ারটেল পোস্টপেড মোবাইলের বিজ্ঞাপন আনন্দবাজার পত্রিকায়
Source : Facebook

এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম কাল, মজা করে বললাম হোকক্যালানো। খবরটা পড়ে হয়তো অনেকেরই তাই মনে হয়েছে। এই ধরনের খবর বাজারে বেরোলেই সবার ষোল আনা বাঙালিয়ানা চাগিয়ে ওঠে। অনেকটা তেড়ে মেরে ডান্ডা করে দিই ঠান্ডা ধরনের হাবভাব। কিন্তু দায়ী কে সেটা ঠিক করবে কে? দায়ী কি সিকিউরিটি গার্ড যে নামমাত্র বেতনের বিনিময়ে হয়তো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে লোককে আটকাচ্ছে চাকরি না খোয়ানোর জন্যে? মলের ম্যানেজমেন্ট যারা নিত্যনতুন সুযোগসুবিধা না দিলে লোকে শপিং করতে যাবে অন্য জায়গায়? দায়ী কি মলের মালিকরা যারা হয়তো লাখ লাখ টাকা উপরি দিচ্ছে লোকাল পার্টিকে? নাকি দায়ী আমরা সাধারন পাবলিক যারা শাড়ির দোকানে বাংলা বললেও ঝাঁ চকচকে মলে গেলেই ইংরেজীতে কথা বলতে শুরু করি, অষ্টমীর দিন কেত মেরে ধুতি পাঞ্জাবি পরি কিন্তু অন্য সময় রাস্তায় ধুতি পরা লোক দেখলে নাক সিঁটকাই। আমরা যারা কলকাতার বাঙালিয়ানাকে এক ও অদ্বিতীয় ভেবে নিয়ে বাকী পশ্চিমবঙ্গের কথার টান, পোষাকআষাক আচার আচরন নিয়ে হাসাহাসি করি। আর যারা এই ব্যবহারগুলি করি তারাও কী সম্পূর্ণ দোষী? আমাদের যেভাবে বড় করা হয়েছে যেখানে বাংলা বই পড়া বারন, ইংরেজীতে কথা না শিখলে কপালে জোটে তিরস্কার, আবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে দক্ষিণীর স্বরলিপিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াটাও চাই। ক্যালানি যে দেবেন, কাকে দেবেন ক্যালানি? ওই সিকিউরিটি গার্ডটা আমাদের ঠুনকো অন্তঃসারশূন্য সমাজের এক বলির পাঁঠা মাত্র। মারধোর করে এই বিকার থামানো যাবে কি? চাই নতুন আইন যেখানে কোন শ্রেণী, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে পক্ষপাতমুলক ব্যবহার হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মনে পড়ে কিভাবে শব্দবাজি বন্ধ করা হয়েছিল? বা ময়দান থেকে বইমেলা সরানো? প্রশাসনের উদ্যোগ থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। একদিনে না হলেও সুরাহা সম্ভব। চাই উদ্যোগ আর সদিচ্ছা।

তাহলে উপায়? প্রতিবাদের কী দরকার নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু দরকার সেই প্রতিবাদ যাতে ঠিক জায়গায় পৌঁছায়। আর শুধু প্রতিবাদ নয়, তাই আমাদের নিজেদের মনের ভেতর উঁকি মেরে দেখা। আমরা প্রস্তুত তো এই জড়দ্গব সমাজ পাল্টানোর জন্য? চাই আরো সহমর্মিতা মানুষের প্রতি। কেউ বাকী সবার থেকে আলাদা হওয়া মানেই যে সে উদ্ভট, অপাংক্তেয় নয় সেই চিন্তা করার ক্ষমতা যেদিন হবে সেদিন আর বাঙালিয়ানা রক্ষা করার জন্যে দারোয়ান ঠ্যাঙাতে হবেনা।

Standard
Bengali culture, calcutta, France, religion, Travel

Bong Connection 2.0 : Rediscovering Calcutta in Lisieux

As the summer time approached, we were engaged in another holiday search; the destination was as usual France, so it wasn’t too far to drive, and we could enjoy the freedom of going anywhere we wanted, and anytime. We booked a camping site in a small village in Normandy called Le Brévedent. Normandy evokes a lot of familiarities, the most significant of them is, of course, the D-day landing sites. So our choice was made, that D-day beaches will definitely be the place not to miss. The first item sorted on the list, we were gazing through TripAdvisor and Visit Normandy websites to look for other attractions. There were many places to choose from — historic Caen and its patrimony related to William the conqueror, the famous Bayeux tapestry and other museums, the Riviera of Normandy Deauville-Trouville and Honfleur, picturesque small villages in Pays d’Auge region. Amongst all these difficult choices, almost by chance, I came across Basilique St. Thérèse de Lisieux, one of the most important places in France for Catholic pilgrimage. Our penchant for religious architecture made me tentatively put it on our list, although apart from looking at an elegant edifice almost reminiscent of Basilique de sacré-cœur in Montmartre, I had no idea about the place, its significance in Catholicism or what I’ll soon be discovering — an arcane connection between a remote catholic monastery in rural Normandy and me!

Spending most of my youth in Calcutta, the city is in my veins. A place I still call home, the city I’d not replace with any other place. In a world rapidly transforming at a lightning speed, it still didn’t bother me how Calcutta dug its heels in and held on to the character it portrayed for over last 300 years. The rickety facades along the bylanes of north Calcutta leading to an ocherous swathe we call Ganga, the fish markets of Gariahat where you desperately want to look close at the fish but don’t want the mud splatter on your new sandals, the central Calcutta with its confluence of nationalities and religions living in harmony and camaraderie, and to the swank South City shopping mall or affluent Alipore mansions — Calcutta has a vibe about it that I seldom found anywhere else. A perfect example of adopting a multilingual and multicultural personality without banishing its own inherent cultural roots and character, Calcutta is indeed a fatal attraction. And that attraction, or familiarity, is not just limited to India, but across the world. Apart from being known as the pearl of the British Empire in its heydays, and the perceived cultural capital of India, there is one person whose reputation has made the City of joy known to people from far corners of the world, not just amongst the intellectual circles, where most of the renowned Calcuttans belonged. That person is Mother Teresa, who’d soon be canonised as the Saint of the gutters. I don’t believe she cured the unknown Brazilian man long after her death, but she had nevertheless made miracles happen while standing by the poor and distressed population of Calcutta, who we never thought of while pontificating about the cultural richesse of our beloved city. Shadow under the lamp was a term we often used during our school years; Mother Teresa was the light to that darkness in a city where, despite old money from the Raj reigned, there were more and more people in poverty and destitution, especially during the war and after the partition.

It was during searching for her early life that I came across the name of Lisieux. Agnes wanted to be named after St. Thérèse de Lisieux, the patron saint of the missionaries; and through her life she followed the footsteps of Thérèse, devoting her life to the service of thousands, and inspire millions. So as the opportunity came to visit Lisieux drew closer, it was no longer a tourist destination – marvelling at the awe-inspiring architecture of Basilique St. Thérèse de Lisieux, but it was a pilgrimage for me as well, of a different kind, of witnessing the place where the journey began for Thérèse, and therefore for Teresa, one of the greatest ambassadors of the city I always call home.

The surprise didn’t end there. Lisieux highlighted another connection to Calcutta that I never thought existed. Carmel school for girls in Jadavpur is one of many high echelon missionary schools in Calcutta that boasts of excellent educational standards and alumnae. My friends, ex-colleagues, relatives — I knew many Carmelites. In fact, my own cousin is a teacher there, the familiarity is that close. I often heard their alumnae be referred as Carmelites but the term never made me delve further into its origin. Not until I learned that Thérèse joined the Carmelite order in Lisieux, a thirteenth-century order originated from monasteries in Mount Carmel near Haifa. Voilà! It was the Carmelite missionaries who were inspired by the success of the order in Lisieux, and travelled the world and opened new convents. Carmel in Calcutta is one of them. Now, there were two reasons that Lisieux became a must see place, as a place that popularised the Carmel convents across the world, and above all, pay visit to the Basilique St. Thérèse de Lisieux and the shrine of Thérèse, and understand who this young lady was, who made a profound inspiration on young Agnes, beckoning her to come to Bengal. I almost felt a sense of belonging to Lisieux without even being there, through the connections it has with Calcutta.

Our travel to Normandy was a nightmare involving a broken down car, rain, lost day stranded in a hotel with the entire week in jeopardy…so on the second day, when we were told that the car won’t be looked at until another day, our decision was made. With a replacement car, when we crossed the Seine on the bridge of Normandy, our holiday had suddenly become a reality again! The closest resemblance I could think of is when you wait for a cricket match and it rains, the pitch and outfield were all wet and you keep hoping that the match doesn’t get cancelled and after a long wait the sun suddenly makes an appearance, and although curtailed, it’s all ready to go ahead again. We had to shorten out plans to fit all the things we wanted to see in three days rather than four, but Lisieux was only 16km away, and en route the nearest McDonald’s; hence, our plan to visit Lisieux didn’t change.

After our trip to the nearest shopping our first day in Le Brévedent, on our way back to the camping site that I first noticed the Basilica. It was getting dark and the sky was overcast as it only stopped raining a while ago, and I had no clue where we were. But just as I looked around our car, the silhouette suddenly jumped out into our view. In that dim background, on the hill on our left situated the structure I already felt familiar, yet it looked like a surreal dream. There are moments when you see something remarkable and wished you had a camera in hand, and all I had in my hand then was the steering wheel. Yet, that view will be stored in my mind for a long time, if not forever.

Basilique St Thérèse de Lisieux

Basilique St. Thérèse de Lisieux

Two days later, on our way back from historic Caen, we decided to come to Lisieux. The eerie silhouette finally gained its shape, a shape that was familiar yet the size and grandeur was out of proportions from what was seen on a TripAdvisor page. The off white neo-Byzantine edifice was awe-inspiring, just as were the breathtaking intricate designs at the interiors and the crypt. The description of the building stops here as this is not a travelogue, and the rest can be found in any travel guide. On the contrary, it was my attempt to connect the dots in my mind, with a young Albanian nun starting her life of sacrifice and charity, her becoming an inseparable part of the persona of Calcutta, and therefore my existence and identity, and me standing there in the suburbs of a quaint town in Calvados country looking at the shrine of Thérèse, where this all began about 125 years ago. And another set of dots following the footsteps of the Carmelite monks, which would throw me much further back in history, at least 900 years and up to the genesis of Abrahamic faiths thousands of years ago.

And there I was, teleported to the daily life of Thérèse in Alençon, to her life in the monastery in Lisieux…walking along the sections in the crypt detailing Thérèse’s life, it started to cast more light on the early life of Agnes, and a striking similarity between the aspirations of the two women, to serve the most deprived and forlorn strata of the population…

If I ever become a saint, I will surely be one of “darkness.”  I will continually be absent from Heaven–to light the light of those in darkness on earth.” – Blessed Teresa of Calcutta

“I love the night as much as the day…I want to spend my heaven in doing good on earth. Yes, if God answers my desires, my Heaven will be spent on earth until the end of the world.” – Saint Thérèse of Lisieux

That was the revelation for me. My circle was complete. It became evident that these two extraordinary women took the same trajectory of life, making small changes to people’s lives that led to phenomenal transformations. I felt like Robert Langdon standing in front of the inverted pyramid in Louvre. I was standing at the place that spiritually inspired Agnes to come to Calcutta, the city she gave all her life to, and in turn transfused the traits of her self into the character of Calcutta that I imbibed. My pilgrimage was complete — the answer to “why of all saints, Thérèse de Lisieux?” had been found, as was the answer for who the Carmelite missionaries were.

I think the natural curiosity would set me on the course for the Carmelites monks all the way to Mount Carmel in Israel. But let’s not go that far yet…let’s first wait for a discussion on Palestine!

Disclaimer:


I thought that this post would need a few disclaimers on my motivation for writing this, and here they are…
 
1. Is this religious post?
No, it is about nostalgia with me searching for the influences on Calcutta and its image outside West Bengal.
 
2. Does this make me feel more religious?
I’m as raving an atheist as I ever was. I have a hate-hate relationship with religion where I don’t know religion thinks of me but I’m all in to send it away to somewhere like Azkaban, banished forever from human contact.
 
3. Less religious then?
No, I never was religious to become any LESS religious.
 
4. Why then I still visit religious sites?
Because despite their religious origin, I see them as brilliant examples of architecture and craftsmanship, erected by ordinary men for the extraordinary greed and hunger for power for their rulers. The same applies to my interests in religious texts as well.
 
5. So, do I support Sainthood of Mother Teresa?
Yes and No. No, because her deed didn’t need a convoluted story to establish her miracles. She made miracles happen to the lives she transformed. Perhaps Vatican needs to reassess their policy what they treat as a miracle. Yes, because if she did this for her religion, she deserved the highest acclaim the church could proffer. And her contribution meant actually life changing transformations through care and humility, not phoney cures with lights passing through a photo or any such trash.

Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — অন্তিম পর্ব ১৯০০-১৯৮০

লেখাটা শুরু করেছিলাম কলকাতা নিয়ে আমার যা যা স্মৃতি আছে সেগুলো বয়ান করার জন্য। দেখতে দেখতে সেই লেখা হয়ে দাঁড়ালো কলকাতার তিনশ বছরের ইতিহাসে। ইতিহাসে কোনো আগ্রহ স্কুলে থাকার সময় একদম ছিলনা, পরে ইতিহাস জানার ইচ্ছে হলেও দেখলাম ইতিহাস আসলে হলো যে যেরকম করে বলতে চায় তার বলা গল্প। আগের দুটো পরিচ্ছদে কলকাতা নিয়ে যা লিখলাম সেটা আমার ভার্সন বলা যেতেই পারে, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর তথ্যের সঙ্কলন। যা শুরু করেছি তা শেষ অবধি চালিয়ে যাব বলেই মনস্থির করলাম, তাই এই লেখাটা কলকাতার আধুনিক যুগ নিয়ে, তবে রেঞ্জটা ১৯৮০ তেই শেষ করব।  বাকি অংশটা অন্য আরেক লেখায় লিখব, আমার নিজের স্মৃতি থেকে, বেদের মত চর্বিতচর্বন করে নয়।  

বিংশ শতকের গোড়ার কলকাতা বলতে গেলে অতীতের কঙ্কাল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতাকে ঘিরে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য তখন শেষের দিকে। আঠার শতকের সেই লন্ডনকে টেক্কা দেয়া বিত্ত বৈভব তখন প্রায় লুপ্ত, উত্তর কলকাতার বাবুসমাজও তখন অবক্ষয়ের পথে।  কোম্পানিকে ভর করে সঞ্চিত সম্পদ অপব্যয় করে তাদের অবস্থা পড়তির দিকে। বরং সমাজে চালকের জায়গা করে নিয়েছে উচ্চবংশের উচ্চশিক্ষিত মানুষজন, তবে আগের দুই শতকে যা খুব কম দেখা গেছে সেই সাধারণ ঘরের অতি মেধাবী মানুষেরাও তখন একাসনে অবস্থান করে নিয়েছে। ১৮৮৫ সালে গড়ে ওঠা কংগ্রেসের হাত ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও শুরু হয় উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ঠিক করলেন বাংলার এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার উত্থান বন্ধ করার জন্যে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা কে দুই ভাগে ভাগ করা হবে।  সারা ভারত তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল, যার প্রধান বিরোধিতা হলো কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। বহু প্রতিবাদ বিরোধ জনআন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে।  কিন্তু সেই Divide  and Rule এর যে বিষ ছড়িয়ে দিয়ে গেল ব্রিটিশ সরকার সেই ছ বছরে, তার জের এখনো হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান পরিবার ভোগ করে চলেছে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার সাথে সাথে ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেল দিল্লিতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁচ যাতে সরকারের গায়ে না লাগে।  দুশ বছরেরও বেশিকাল ধরে যে কলকাতাকে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বানিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, বাংলা বিহার উড়িষ্যা অসমের কাঁচামাল হরণের পর তার প্রয়োজন তখন ফুরিয়েছে, আর কলকাতার সেই তিলোত্তমা রূপও তখন আর নেই – কলকাতা মানে তখন এক পূতিগন্ধময় অস্বাস্থ্যকর Black Hole।

কলকাতার গল্প তো এখানেই শেষ হতে পারত, অতীতের সেই সোনার দিনগুলো পেরিয়ে সে তখন কাতারে কাতারে মানুষের ভারে ন্যুব্জ এক শহর, যার তুলনা হতে পারতো মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন বা উর। না, কলকাতা সেখানে থেমে যায়নি, বরং রাজধানী খেতাব থেকে মুক্তি পেয়ে বোধহয় আপন খেয়ালে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে।  তার প্রধান কারণ অবশ্যই যে ব্রিটিশ রাজধানী হবার সূত্রে যে পরিকাঠামো গত দুই শতকে তৈরী হয়ে ছিল, তার প্রভাব বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয়নি, অন্তত রাজধানী বদলের সাথে সাথে তো নয়ই।  কলকাতা তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী, তাই তার রাজনৈতিক প্রভাব বা তাৎপর্য ব্রিটিশদের কাছে তখনও অশেষ। তার সাথে যোগ হবে কলকাতার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাফল্যের তুঙ্গে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ আশুতোষ জগদীশচন্দ্র প্রফুল্লচন্দ্র সি ভি রমন বিবেকানন্দ প্রমুখ মানুষের  অবদানের পথ ধরে কলকাতার উনিশ শতক থেকে কুড়ির শতকে পা রাখা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে প্রফুল্লচন্দ্র গড়লেন বেঙ্গল কেমিকেল যা এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে।  ১৯০৮ অলিম্পিক এ শোভাবাজার এর নর্মান প্রিচার্ড  সোনা পেলেন, ১৯১৩য় রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রথম এশীয় নোবেল। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইতিহাস সৃষ্টি করলো প্রথম ভারতীয় ফুটবল দল যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।  এসব তথ্য এখন হয়ত কেবলই পরিসংখ্যান অথবা কুইজের প্রশ্ন কিন্তু সেই সময়ে ফিরে গেলে কলকাতার যে আমূল পরিবর্তন ঘটছিল দুশ বছর পুরনো এক ঔপনিবেশিক সত্ত্বার প্রভাব কাটিয়ে দেশীয় স্বাধীন চিন্তা এবং মেধার উন্মেষে তা এককথায় অভূতপূর্ব আর বিস্ময়কর। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারত স্বাধীন হওয়া অবধি কলকাতার ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভিত্তি করে।  ক্ষুদিরাম প্রাফুল্ল চাকি থেকে শুরু করে সেই বিপ্লবী প্রতিবাদ জারি রয়ে গেল বারীন ঘোষ, চিত্তরঞ্জন, অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষ যতীন দাস বিনয় বাদল দীনেশ এঁদের মধ্যে। গোটা ভারতের মত কলকাতাও সেই জ্বালাময়ী সময়ের সাক্ষী বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে সারা বাংলা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সবার দান অশেষ আর প্রত্যেকের অবদান নিয়েই এক একটা গোটা অধ্যায় লিখে ফেলা যায় কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলনের ভূমিকা কলকাতার পরবর্তীকালের ইতিহাসের পক্ষে অপরিসীম হলেও সে বিষয়ে আর গভীর আলোচনায় জড়ালাম না।

এরই মাঝে মাঝে কিছু বিক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা আজকের কলকাতার উত্থানের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে সেগুলো তুলে ধরলাম। ১৯২৪ সালে কলকাতা অবশেষে পেল সেই অপূর্ব মর্মর সৌধ যার ভিত্তিপ্রস্তর ইংলন্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ করে গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে – ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কলকাতায় এখনো কেউ আসলে যদি জিগ্গেস করে কি কি দ্রষ্টব্য ছাড়া চলবেনা, ভিক্টোরিয়া সেই তালিকায় একদম প্রথমে থাকবে। প্রায় একশ বছর পেরিয়েও এই সৌন্দর্য আর লাবন্যে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। এই ১৯২৪ সালেই কলকাতা কর্পোরেসানের প্রথম মেয়র হলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।  এর কিছুদিন পরেই এসে উপস্থিত হলেন এক যুগোস্লাভিয় সেবিকা, যাঁর নাম এখন কলকাতার পরিচয়ের সাথে সমার্থক। সুদুর লাতিন আমেরিকার, দূর প্রাচ্যের ক্যাথোলিক দেশগুলিতেও কলকাতার নাম ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে এই মহিয়সী মহিলার আত্মদান অনস্বীকার্য —  মাদার টেরেসা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে গঙ্গার দুকুল বাঁধা পড়ল কারিগরী বিদ্যার এক অসাধারণ উদাহরণে। হাওড়া ব্রিজ আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় কোন নাটবল্টু ছাড়া কেবলমাত্র রিভেট দিয়ে গড়া এই সেতু কেমন করে আজও এই বিপুল পরিমান যানবাহন বহন করে চলেছে। এই সময়ের কলকাতা যেমন দেখেছে প্রগতি আর সাফল্য তেমনই ক্ষণেক্ষণে ঢেকে গিয়েছে দুঃশঙ্কার মেঘে। বিদেশীদের divide and rule নীতির কবলে পরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে বিভেদের বিষ ছড়িয়ে গেল, তার সাক্ষ্য বহন করবে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার বলি হলো সবচেয়ে বেশি মানুষ। কলকাতার পুরনো কিছু ছবিতে দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা লাশ হিংস্র ধর্মান্ধতার আর সাম্রাজ্যবাদের শিকার। বিশ্বযুদ্ধের সময় গোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের উপহার কলকাতার মন্বন্তর যেখানে লাখে লাখে মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায় খাদ্যের যোগান থাকা সত্তেও। ১৯৪১ এ ২২শে শ্রাবণ চলে গেলেন কবিগুরু, কলকাতা তথা বাংলার সাহিত্য জগতে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি করে।  আর কিছু বছর পর, ১৯৪৫ য়ে জাপান যাবার পথে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন ভারতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতাহী সুভাষ যাঁর অন্তর্ধান আজও এক রহস্য।  এই সব টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৭ সালে এল সেই দিন, যার জন্যে সারা ভারতের মাতা কলকাতাও অপেক্ষা করে ছিল অনন্ত কাল, নতুন ভারতের পটভূমিতে সূচনা হল কলকাতার নতুন রূপান্তরের।  ঔপনিবেশিক অতীতকে ভিত্তি করে, এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের উদ্দেশ্যে সেই রূপান্তর।

স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতা যে রাতারাতি এক সম্পূর্ণ পরিবর্তীত মহানগরে পরিনত  হবে সেই আশা কেউই করেনি। তখনকার কলকাতা প্রাণে ভারতীয় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি কার্যকলাপে তখনও বিদেশী, ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেলেও অধিকাংশ শিল্প বানিজ্য প্রতিষ্ঠান তখনও চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। এছাড়া স্বাধীনতার পরে দেশভাগের সাথে সাথে কাতারে কাতারে হিন্দু পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে, আর স্বভাবতই রোজগারের আশায় বেশির ভাগই হাজির হয় কলকাতায়। কলকাতার তখনকার নগর পরিকাঠামো এই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জন্যে বিন্দুমাত্রও প্রস্তুত ছিলনা, কিন্তু তখনকার কলকাতায় সম্প্রসারণের জায়গা ছিল প্রচুর। হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের ঠাঁই হলো কলকাতার দক্ষিনে যোধপুর যাদবপুর টালিগঞ্জ বেহালা বেলেঘাটা ইত্যাদি এলাকায়। এই বিপুল পরিমান মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা করে দেয়ার জন্যে সরকার অনেক ফ্ল্যাট তৈরির কাজে হাত লাগলেও, বেশির ভাগই তৈরী করে নিল নিজেদের আশ্রয় জমি দখল করে বস্তি বানিয়ে। তুলনামূলক ভাবে অবস্থাপন্ন বাঙালরা গেল আর একটু উত্তরে, বালিগঞ্জ কালিঘাট ভবানীপুরের দিকে, প্রধানত এপার বাংলার মানুষদের এলাকার সীমানায়। পূর্বের বাঙাল আর পশ্চিমের ঘটি এই দুই বিপরীত সংস্কৃতির মানুষের এই প্রথম বিপুল হারে সংমিশ্রন। ভাষা আচার জীবনযাপনের যে চরম বৈষম্য ছিল প্রথমের দিকে, সেটা সম্পূর্ণ দূর হতে লেগেছে আরো কয়েক দশক, কিন্তু এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রনে কলকাতার বাঙালি সমাজ এক নতুন এবং অনন্য মাত্রা পেল।  স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া এবং আরো বেশ কিছু বছর পর অবধি আরো প্রচুর মানুষ প্রানের ভয়ে বা জীবিকার সন্ধানে পূর্ব বাংলা থেকে বাসা গুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে কলকাতায়, আর এই শহর তাদের গ্রহণ করেছে সানন্দে। নিউ ইয়র্ককে লোকে বলে big apple কিন্তু কলকাতা যে পরিমান মানুষের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের উপায় করে দিয়েছে সে হিসেব খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তার পরিবর্তে এই শহর পেয়েছে তার অনন্য পরিচয়। এ শহর ঘটির নয়, বাঙালের নয়, দেশ স্বাধীনের পর রয়ে যাওয়া হাজার হাজার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের নয়, চিনে দর্জি, ইহুদি পারসী আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের নয় নয় জীবিকার খোঁজে আশা বিহারী ঠেলাওয়ালা উড়ে ঠাকুর মারোয়ারী ব্যবসায়ীর — এ শহর এদের সবার সম্মেলনে গড়ে ওঠা এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো নয় কিন্তু ভাষা ধর্ম জাতির বৈচিত্রে কলকাতার সমগোত্রের মহানগরী ভারতে কেন সারা পৃথিবীতে বিরল। 

এই বিপুল সংখ্যক জনগণ কলকাতায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে আরো একটা ঘটনা ঘটছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে তার হার অনেকগুণ বেড়ে গেল। ভারতবর্ষে কম্যুনিস্ট মার্ক্সবাদী দর্শন এবং রাজনীতির পথিকৃৎ বলতে গেলে মানবেন্দ্রনাথ রায়।  জমিদার সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার দাবি করার প্রস্তাব বিশেষ করে ভারতবর্ষের মত বৈষম্যমূলক দেশে সাধারণ মানুষের কাছে প্রবল সমর্থন পেতে লাগলো। বিশেষ করে দেশভাগের পর যখন ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে কংগ্রেস ছাড়া আর কারো নাম করা যায়না আর কংগ্রেস তখন কুলীন জনগনের পার্টি আম জনতার নয়।  এই পটভূমিতে কলকাতায় বামপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় স্বাধীনতার পর পরই যার চূড়ান্ত পরিনতি হলো বামপন্থী দলের ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসীন হওয়া। ষাটের দশকে গোটা বিশ্বের বামপন্থী আন্দোলনের হাওয়া কলকাতাতেও চরম ভাবে প্রতিফলিত হয় যার হাত ধরে এলো কলকাতার দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁস ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। সাহিত্যে সুনীল সমরেশ শীর্ষেন্দু শক্তি চলচ্চিত্রে সত্যজিত ঋত্ত্বিক মৃনাল সেন অভিনয়ে উত্তম সুচিত্রা সৌমিত্র উৎপল দত্ত সঙ্গীতে মান্না দে সলিল চৌধুরী এঁদের হাত ধরে বাঙালির যে চরম বুদ্ধিগত উত্তরণ ঘটে এই সময় তার মূলে ছিল বামপন্থী আন্দোলন এবং উদারিকরনের আহ্বান। সেই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক বিস্তারে কলকাতার অবদান অনস্বীকার্য। ধর্মতলা কলেজ স্ট্রীট পার্ক স্ট্রীট এককথায় সমগ্র মধ্য এবং দক্ষিন কলকাতা এই নতুন সীমানাহীন জীবনের হাতছানিকে বাস্তবে রুপান্তরের অভিযানের কেন্দ্রে।

বামপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কলকাতার তরুণ প্রতিভারা নেতৃত্বে থাকলেও আসল লড়াইটা চলছিল সমস্ত বাংলায়, কৃষক শ্রমিক মজুরদের হাত ধরে।  একই ভাবে কলকাতার শহরতলীতেও সেই প্রতিবাদী বামপন্থী আন্দোলনের কৃতিত্ত্ব লেখক শিল্পীদের সাথে সাথে সেই অগুন্তি অদৃশ্য মানুষদের যাদের এতদিন কোনো ভাষা ছিলনা।  মিছিল ধর্মঘট অবস্থান ঘেরাও সব বিভাগে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের যে জোয়ার কলকাতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ষাটের দশকে সেখানে বড় ভূমিকা ছিল কলকাতার সেই উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গীয় সম্প্রদায়ের।  যাদবপুর বিজয়্গড় লেক গার্ডেন্স টালিগঞ্জ বালিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষদের কলোনিগুলো হয়ে উঠলো সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা এই মানুষরা ভারতে এসেছিল সবকিছু খুইয়ে, কলকাতায় তাদের আশ্রয় বলতে অস্বাস্থ্যকর একচালা ঘর, জীবনধারনের জন্য প্রত্যেকদিন লড়াই।  এই অবস্থায় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্যবাদ এই মানুষদের আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল বৈষম্যমুক্ত এক সমাজের। 

এই ছবিটা আমূল পাল্টে গেল সত্তরের দশকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বাধ্য করলো লাখে লাখে হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসতে। সবাই যে আসতে পেরেছিল তা নয়, তবু কলকাতার জনসংখ্যা এই সময় যেমন হঠাত এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেল, তেমনি বিশ্বজুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের নুতন ভাঙাগড়ার প্রভাব এসে পৌছালো কলকাতার অলিগলিতেও। এক শ্রেণী চাইছিল সশস্ত্র সংগ্রাম বলশেভিক বিপ্লবের মত বা মাওয়ের পথ অনুসরণ করে।  অন্য দল ছিল তখনও রাশিয়াবাদী, তাত্ত্বিক বামপন্থাকে প্রশ্ন করা মানেই প্রতিক্রিয়াশীল ছাপ পড়ে যাওয়া। এই টানাপোড়েনের মাঝে শুরু হলো নকশালবাড়ি আন্দোলন, যার আঁচ কলকাতাকেও গ্রাস করে নিল সাথে সাথে। শুরু হয়ে গেল প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্ধ, ছেচল্লিশয়ের দাঙ্গার পর আবার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭২ সালে মুখ্যমন্ত্রী হলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।  নকশাল বিপ্লব দমন করতে তিনি তাদের চেয়েও ক্রুর ভূমিকা নিলেন যেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কিনা জানা নেই। শুরু হয়ে গেল পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক হত্যা, গুপ্ত হত্যা, নকশালদের হাতে পুলিশ আর সিপিএম খুন, সিপিএমের হাতে নকশাল খুন, কংগ্রেস আর পুলিশের হাতে নকশাল আর সিপিএম খুন। অবশেষে এসবের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৭ সালে সেই প্রায় কুড়ি বছরের আন্দোলনের ফল হিসেবে সিপিএম এলো ক্ষমতায় — তবে নকশাল পিরিয়ড চলেছিল আরও অনেক বছর ধরে, সিপিএম ক্ষমতায় আসার পরেও।

কলকাতার স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেটা দাঁড়াল রাজনৈতিক ইতিহাসে কিন্তু কলকাতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে রাজনীতি তাই এর চেয়ে সহজভাবে এই তিরিশ বছরের  ঘটনাবলী লেখা যেতনা। রাজনীতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কলকাতার গতিবিধি নজর করে নেয়া যাক এক ঝলকে। স্বাধীনতার পর থেকে বিপুল পরিমান মানুষের সমাগম কলকাতার নগর পরিকাঠামোর উপর অসীম চাপ সৃষ্টি করে।  বিধান রায়ের স্বপ্নের প্রকল্প সল্টলেক এলাকায় নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জলাজমি ভরিয়ে গড়ে ওঠা সেই উপনগরিতে তখন মানুষ যাবার কোন আগ্রহই দেখায়নি, তবু দুই দশক পরে যখন কলকাতার পথব্যবস্থা প্রায় অচল, প্রচুর পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা এই উপনগরী তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু যারা সল্টলেকে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত মানুষ জমি এবং বাড়ি তৈরির মূলধন তাদের তখন ছিল।  তবে সল্টলেকে সরকারি কিছু ফ্ল্যাটও তৈরী হয় সাধারন নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য। একইভাবে বলা যেতে পারে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তৃতি। বালিগঞ্জ ছাড়িয়ে গোলপার্ক ঢাকুরিয়া যাদবপুর সেই সময়ে প্রচুর সম্প্রসারিত হয়, বিশেষ করে রিফিউজি মানুষদের সংস্থানের জন্য। একের পর এক গড়ে ওঠে সরকারি চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি ন্যুনতম ভাড়ায়। আরেক দিকে কলকাতা বেড়ে উঠছিল দক্ষিন পশ্চিমে বেহালায় যা স্বাধীনতার আগে ছিল মূলত জলাঞ্জলি আর শিল্পাঞ্চল। কলকাতার পরিবহন পরিষেবা গড়ে ওঠে ষাটের দশকের গোড়ায় মূলত সরকারি CSTC বাস দিয়ে, তার পর একে একে যুক্ত হয় প্রাইভেট বাস মিনিবাস ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে তৈরী হয় মেট্রো রেলের মাস্টার প্ল্যান যার পরিনতি ১৯৮৪ সালে ভারতবর্ষের প্রথম ভূতল পরিবহম ব্যবস্থা যা আজও কলকাতার গর্ব। ষাটের দশকে গড়ে ওঠে রবীন্দ্র সদন।  জীবনযাত্রার দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলকাতা তখন শিক্ষা সংস্কৃতি পান্ডিত্যে ভারত সেরা যার নমুনা চলচ্চিত্রে সংগীতে লেখায় শিল্পে অগুন্তি।  মানুষ বামপন্থী আন্দোলনের আবেগে অনুপ্রানিত হয়ে প্রতিবাদী চিন্তাধারার প্রতিভূ যেখানে expressionয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কলকাতায় তখন পাড়ায় পাড়ায় গান নাচ আবৃত্তি আঁকা ইত্যাদির ছড়াছড়ি। সেখানে খেলার স্থান তবে শুন্য। কলকাতার তিন প্রধান ছাড়াও প্রথম ডিভিসন ফুটবল লিগের দলগুলো অসাধারণ ফর্মে থাকলেও, কলকাতা থেকে খুব কম ফুটবলারই উঠে এসেছে সেই সময়। তবু তখনো ভারতে ফুটবল মানেই কলকাতা। 

আশির দিকে কলকাতায় এলেন ফরাসী লেখক দমিনিক লাপিয়ের। শহর তাঁর মন জয় করে নিল, কলকাতাকে তিনি বললেন City of Joy. এ শহরে দারিদ্র্য প্রবল, পরিকাঠামো অচল তবু মানুষের মুখে হাসি আছে, আছে জীবনকে উপভোগ করার আত্মবিশ্বাস। একাধারে কলকাতা যেখানে যাত্রা শুরু করেছিল কুড়ির শতকের গোড়ায়, সেই একই প্রগতি বজায় থেকেছিল আশির দশকের গোড়া অবধি। আশির পরের কলকাতায় প্রগতি থেমে যায়নি বরং বেড়েছে, শুধু পরবর্তী সময়কালের লেখাটা নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা করে লিখব বলেই আশিতে এই লেখা থামানোর পরিকল্পনা। কলকাতা এই সময় অবধিও ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসে কলকাতার যে হার না মেনে নেয়ার ক্ষমতা দেখা গেছে, সেখান থেকেই বলা যেতে পারে যে কলকাতা এখনো মৃতনগরী নয়, কলকাতা আছে কলকাতাতেই। আমার শহর আমার গর্ব আমার City of Joy.

Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — দ্বিতীয় পর্ব ১৮০০-১৮৯৯

সেই ১৬৯০ সালে জোব চার্নক ইজারা নেবার সময়ের তিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রাম থেকে আঠার শতকের শেষে শৌর্য স্থাপত্য বৈভবে লন্ডনের সমগোত্রে উত্থান — কলকাতার এই একশ বছরের যাত্রা রূপকথার চেয়ে কম বৈচিত্রপূর্ণ নয়। তবে সেই ঠাটবাট কেবলমাত্র সীমিত ছিল এক শ্রেণীর মানুষের উপর যারা ব্রিটিশ শাসকদের তোষামোদ করে তাদের স্নেহভাজন হয়েছিল। কলকাতাবাসী বাঙালি সমাজে তখনও ভাগ ছিল দুটো, ধনী আর গরিব। শহরের সেই আমূল পরিবর্তনের সময় উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের বর্ণনা আধুনিক বাঙলা সাহিত্যের শুরুর দিকের লেখায় পাওয়া গেলেও সাধারন মানুষের জীবনযাপন নিয়ে তেমন লেখালেখি হয়নি। উনিশ শতকের কলকাতা সাক্ষী হয়ে থাকবে আর এক আমূল পরিবর্তনের যার কেন্দ্রে থাকবে সেই অকিঞ্চিৎকর মানুষদের জীবনযাত্রার বদল, আর শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিবর্তন। 

প্রথম পরিচ্ছেদের আঠার শতকের কলকাতায় লিখেছিলাম কলকাতা আগাগোড়া ব্রিটিশদের গড়া শহর, এই শহরের শুরু থেকে এমনকী এখনো পর্যন্ত সেই সময়কার প্রভাব কলকাতার অস্থিমজ্জায় জুড়ে আছে প্রায় সকল ক্ষেত্রে —শিল্প শিক্ষা সমাজব্যবস্থার পরিকাঠামোয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পরিকাঠামো তৈরীর পর ইংরেজদের প্রয়োজন হয়ে পড়ল skilled workforce বা শিক্ষিত লোকবল সেই বিশাল আর ক্রমবর্ধমান প্রসাশনিক কার্যকলাপ আর সাম্রাজ্য চালানোর জন্য যা জীবিকার খোঁজে আসা ইংরেজদের মধ্যে ছিলনা। ফলে সেই ঘাটতি মেটানোর জন্য কলকাতাবাসী বাঙালি অধিবাসীদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হল এক শিক্ষাব্যবস্থা যা পরবর্তীকালে কলকাতা তথা বাঙালি চিন্তার উন্মেষ আর বিকাশে এক অনস্বীকার্য অবদান। স্বাধীন চিন্তার বিকাশের জন্য ইংরাজী শিক্ষা যে অপরিহার্য নয় তার উদাহরন মধ্যযুগে চৈতন্যদেব থেকে কবীর থেকে লালন ফকির, সেখান থেকে রামকৃষ্ণ অবধি অনেকেই আছে, কিন্তু ইংরেজী শিক্ষা এবং সাহিত্যের মাধ্যমে এক নতুন চিন্তাধারা, শত সহস্র মাইল দুরের এক জগৎ সম্বন্ধে ধারনা আর সেখানকার সাহিত্য বিজ্ঞান শিল্প কলায় প্রভাবিত হয়ে বাংলা ভাষা আর চিন্তাধারার নবজাগরন সেই প্রথাকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালানোর পরিকল্পনা থেকে একের পর এক চালু হল হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল, স্কটিশ চার্চ, প্রেসিডেন্সি কলেজ ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেগুলো এখনো পর্যন্ত কলকাতার শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের প্রথম সারিতে। 

উনিশ শতকের প্রথম দিকে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে কলকাতার বাঙালী সমাজের উদারপন্থা বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল। বোম্বাই মাদ্রাসের মত প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতেও এই পরিবর্তন ঘটেছিল, তবে বাঙালি জীবনে দীর্ঘদিনের ভিনদেশী শাসনের প্রভাবে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যুক্তিবাদী চিন্তাধারা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল, যার ফল হল কলকাতায় পাঠশালার পরিবর্তে ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রথম দিকের স্নাতকদের মধ্যে মুক্তচিন্তার  প্রসার যার শুরু আঠার শতকে রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব এবং এই তালিকায় জুড়ে গেল আরো অনেক নাম — বিদ্যাসাগর , ঠাকুর পরিবার, বিবেকানন্দ, ডিরোজিও, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ। সংস্কৃতে একটা কবিতার লাইন এই সময়ের চিন্তার বিবর্তনের সাথে যথোপযুক্ত “বিদ্যত্বঞ্চ নৃপতঞ্চ নৈব তুল্য কদাচন। স্বদেশে পুজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে॥”  সমাজে অর্থবলই যে সম্ভ্রম উপার্জনের একমাত্র উপায় নয় সেটা উনিশ শতকের এই চিন্তাবিদদের উত্থানে প্রমানিত হয়ে গেল কলকাতার বাঙালি সমাজে, যেখানে উচ্চশিক্ষিত আইকনের অভাব ছিল এই সময়ের আগে পর্যন্ত। ফলে প্রথমদিকে কলকাতার শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞানচর্চায় অগ্রনী মানুষরা সচ্ছল অর্থবান পরিবার থেকে আসলেও শতাব্দীর শেষের দিকে শিক্ষার ওপর ধনী মানুষদের কায়েমী অধিকার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। 

এই প্রসিদ্ধ মানুষদের নতুন চিন্তাধারার পরিনাম হল বাংলার রেনেসাঁস আর সামাজিক উদারীকরণ।  রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার গল্প এখন ইতিহাস কিন্তু তার রূপায়ন তখনকার গোঁড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে কিরকম দুঃসাধ্য এখনকার সমাজ চেতনা থেকে তা কল্পনা করাও দুস্কর। সেরকম বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য বিদ্যাসাগরকে কুলীন বাঙালি সমাজের কাছে কেমন হেনস্থা হতে হয়েছিল তা কারও অজানা নয়। এই জাতীয় প্রথাগুলোর বিলুপ্তি বা পরিবর্তনের পিছনে তখনকার নব্য বাঙালি চিন্তাধারার মানুষদের অবদান বিচার করলে তার খানিকটা কৃতিত্ব যাবে তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের আর তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার। Change comes from within কথাটা এক্ষেত্রে খুব উপযুক্ত, কারন তারা আগ বাড়িয়ে কেবলমাত্র প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ করে সেই প্রথাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেনি, যেটা করলে সেটা দেখাত শাসকশ্রেণীর সম্পূর্ণ বাঙালি জাতীর ওপর হস্তক্ষেপ, ফলে তার প্রতিবাদ হতো অনেক জোরালো। তার পরিবর্তে ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত বা জীবনদর্শনে অনুপ্রেরিত বাঙালি সমাজের প্রতিভু মানুষদের মাধ্যমে আনা পরিবর্তনগুলোয় সাধারন মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে সেই সমাজ পরিবর্তক মনিষীরা যাদের পরবর্তীকালে সমাজ সাগরে গ্রহন করেছে তাদের দূরদর্শিতার প্রমান পেয়ে আর সেই সাথে সমাজে শিক্ষার বিকাশের মাধ্যমে উদার চিন্তার উন্মেষে। 

উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন এই ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কার্যকলাপ চালানোর জন্য বিভিন্ন স্কুলকলেজ স্থাপনা করা হচ্ছিল, সেখানে সাধারণত খুব মেধাবী না হলে সাধারন নিম্নবিত্ত (নাকি সাধ্যবিত্ত!) মানুষদের উপস্থিতি ছিল নগন্য যা পাল্টাতে শুরু করে শতাব্দীর মাঝামাঝি মিশনারিদের আগমনে। খ্রীষ্টধর্ম যে পৃথিবীর সব ধর্মের চেয়ে মহান এবং অন্য ধর্মের মানুষদের তাদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি — এই ধারনা সেই মিশনারিদের প্রধান লক্ষ্য হলেও তাদের জীবনের মূল ব্রত ছিল সেবা তা অনস্বীকার্য, আর সেই ব্রত থেকেই প্রধানত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য হলেও, বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল স্থাপনার মাধ্যমে সাধারন মানুষদের কাছে খুলে গেল শিক্ষা বিন্যাসের দরজা। লা মার্টিনিয়ার, সেন্ট জেভিয়ার্স, লোরেটো, বেথুন, ক্যালকাটা বয়েজ প্রমুখ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও কলকাতার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জগতে অগ্রনী ভুমিকায় রয়েছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রগতির সাথে সাথে শিল্প আর বানিজ্যের বিপুল সম্প্রসারণ ঘটেছিল উনিশ শতাব্দীর কলকাতায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী হিসাবে কলকাতার হয়ে উঠেছিল আমদানী-রপ্তানির মুল কেন্দ্র। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে কলকাতায়ও শুরু হল এক শিল্প বিপ্লব যা উনিশ শতকের কলকাতার সেই আমূল পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অণুঘটক। প্রথম একশো বছর কলকাতা বন্দর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কিন্তু বানিজ্যের পরিমান সেই তুলনায় তেমন বেশী ছিলনা। শুরুর দিকে কলকাতা বন্দরের পশ্চাদভুমি সীমিত ছিল হাওড়া হুগলি চব্বিশ পরগনা থেকে উত্তরে নদিয়া মুর্শিদাবাদ অবধি। উনিশ শতাব্দী মাঝামাঝি সেই পশ্চাদভুমি বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল বিহার উড়িষ্যা সমগ্র পূর্ব ভারত, সম্পূর্ণ অবিভক্ত বাংলা, উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলি। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতা বন্দরের যতগুলো জেটি ছিল তার বেশীর ভাগই এই সময়ে নির্মিত। এই বিশাল বিস্তারের মুল কারন ছিল গঙ্গার দুই পাড়ে পাটশিল্পের আর সেই সাথে বস্ত্রশিল্পের পত্তন। ইংরেজদের মূল রপ্তানির বস্তু ছিল সেই পাট আর কাপড়, সেই সাথে যেত নীল ইউরোপে আর আফিম চিনে। নীল চাষিদের দুর্দশার বিবরন অনেকেরই জানা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে কিন্তু সেই নীলকর সাহেব বা তাদের তাঁবেদার জমিদারেরাও যে কলকাতার সেই বাড়বাড়ন্তের অংশীদার সেদিক থেকে ভেবে দেখলে কলকাতার ইতিহাস সেই শুরু থেকেই স্থানীয় মানুষদের শোষন আর নিপীড়নের কাহিনী। 

পাট আর বস্ত্রশিল্পের বাইরে খনি বিশেষ করে কয়লাখনির ব্যবসাও এই সময়ে প্রথম চালু হয়। আসানসোল রানীগঞ্জ ইত্যাদি কয়লা বলয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয় রেলপথে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেই পারে যে কলকাতা ততদিনে বাকী ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর সাথে রেলপথে যুক্ত হয়ে গেছে, ফলে আভ্যন্তরিন খনিজ অঞ্চলগুলোর সাথে রেল যোগাযোগ ও তার সাথে রপ্তানির পরিমান বৃদ্ধি কলকাতা বন্দরের সম্প্রসারণের প্রধান কারন। কলকাতাকে আমদানি রপ্তানির কেন্দ্র করে গঙ্গার দুই তীরে গড়ে উঠেছিল আরো বিভিন্ন কারখানা জেসপ টিটাগড় পেপার মিল। সেই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে সামিল হতে অনেক ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরাও চলে আসে কলকাতায়, যারা বেশীরভাগ ইংরেজ হলেও ছিল ডাচ ফরাসী জর্জিয় আর্মেনিয়রা। এই বাকী শ্রেণীর মানুষরা সাধারণত খুচরো ব্যবসায় সামিল হলেও, ইংরেজরা সেই ক্রমবর্ধমান বাজার থেকে মুনাফা বাড়ানোর আশায় চালু করল এক সিস্টেম যেখানে কাঁচামাল আসত ব্রিটেন থেকে, তারপর তৈরী হওয়ার পর ফেরত যেত আবার সেই বিলেতে, অনেক বেশীগুন লাভে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝি তাই কলকাতার বাজার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে খুচরো ব্যবসায়ীরা দোকান বা কাঁচা বাজারে ব্যবসা চালাতে লাগল, অন্যদিকে পাইকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করল বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যম গোটা দেশের সাথে বানিজ্য। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বলতে যা বুঝি তার প্রথম সংস্করন এই ব্যবসাগুলি। সাধারন কাঁচা ব্যবসা গোটা শহরে ছড়িয়ে থাকলেও, এই দ্বিতীয় প্রকারে ব্যবসাগুলি ছড়িয়ে ছিল কেবল চৌরঙ্গী, এসপ্ল্যানেড স্ট্র্যান্ড রোড অবধি —যা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাহেবদের খাস তালুক। এসপ্ল্যানেডের নতুন জৌলুসি দোকানপাট সুপারস্টোরের পরতের পিছনে গলিঘুঁজিতে এস এন ব্যানার্জি রোড বা বিবাদী বাগে এখনও চোখে পড়বে সেইসব দোকানগুলোর অবশেষ। 

ইন্টারনেটে একটা লিঙ্কে দেখলাম কলকাতা বন্দরে এইসব ব্যবসার প্রসারে প্রায় দু কোটি ডলারের আমদানি রপ্তানি হত উনিশ শতকের মাঝের দিকে। সেই বিপুল পরিমান বানিজ্যকে সাহায্য করতে কলকাতা শহরের নাগরিক পরিকাঠামোর প্রচুর উন্নতি হয়েছিল সেই যুগে। কলকাতা শহরে চলল প্রথম ট্রাম, শুরু হল প্রথম রেলপথ। একে একে তৈরী হল গঙ্গার ওপর সেতু দুই পাড়কে রেল আর সড়কপথে জুড়তে।  কলকাতার বিভিন্ন সব সৌধ বা দর্শনীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থাপত্যগুলি যেমন রাজ ভবন, শহীদ মিনার সব উনিশ শতকেই তৈরী। এই সময়ে কলকাতার ভৌগোলিক কী পরিবর্তন হয়েছিল তা ঠিক জানা নেই তবে মনে পড়ছে জিপিও বা ইস্টার্ন রেলের অফিসের পেছনে গঙ্গা বইত যা এখন অনেক পশ্চিমে সরে গিয়েছে। তবে কলকাতার সেই বানিজ্যিক সুবর্ন যুগে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে চলে আসে প্রচুর মানুষ। মাল পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে সড়ক বা রেলব্যবস্থা তখনকার দিনে বহুল প্রচলিত হলেও যাত্রী পরিবহন ছিল বিরল এবং দামী, ফলে সাধারন দিনমজুরদের পক্ষে সেই পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করা ছিল দুঃসাধ্য। এর পরিনাম হিসাবে সেই শ্রমিকরা কলকাতাতেই বসবাস করা শুরু করে সাধারণত ব্রিটিশদের সেবকদের এলাকায়। এই জায়গাগুলো সাধারণত ছিল জীবনধারণের অনুপযুক্ত, নিকাশী ব্যবস্থা প্রায় অদৃশ্য, পানীয় জলও অস্বাস্থ্যকর — কলকাতার বস্তি অঞ্চলগুলোর সূত্রপাত সেই সময় থেকে।

Tristram Hunt এর লেখা একটা বই হঠাৎ চোখে পড়েছিল একদিন এই ব্লগ লেখার সময়। বইটার নাম Ten cities that made the empire। দোকানে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে নিলাম কি বক্তব্য কলকাতা নিয়ে সেটা জানার জন্য। দেখা যাচ্ছে যে উনিশ শতকের শেষের দিকে নয়, এই অধোগতির শুরু প্রথম দিকেই। ২০০৮ এর লেম্যান ব্রাদার্স এর পতন দিয়ে যেমন বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা শুরু, তেমনই ১৮৩০ সালে এক সিন্ডিকেট ব্যবসার পতনকে হান্ট বলছেন কলকাতার জাঁকজমকের শেষ অধ্যায়। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে ম্যানচেস্টারে তাঁতশিল্প্রের বিপুল সম্প্রসারণে কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব তখন অনেকটাই বিলুপ্ত। কলকাতাকে ঘিরে কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তখনকার লেখাতে পরিস্কার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, প্রাসাদনগরী জাতীয় ভুষণের পরিবর্তে কলকাতা মানে তখন দাঁড়িয়েছিল দারিদ্র্য, মহামারী, আকাল, অস্বাস্থ্যকর ইত্যাদি রূপকে। 

রবীন্দ্রনাথের “ধনের ধর্মই অসাম্য” কথাটা কলকাতার পত্তন আর বিস্তারের ক্ষেত্রে দারুনভাবে প্রযোজ্য। উনিশ শতকের শুরু থেকে শেষ অবধি কলকাতা যত বেড়েছে তত বেড়েছে অসাম্যও — একদিকে ব্রিটিশদের কুলীন কলকাতা এসপ্ল্যানেড চৌরঙ্গী ফোর্ট উইলিয়াম অন্যদিকে বাবুদের চারণক্ষেত্র উত্তর কলকাতা। এই দুইয়ের মাঝে ফাঁকফোকরে গলিঘুঁজিতে জায়গা করে নিচ্ছিল ভাগ্যের খোঁজে আসা খেটে খাওয়া মানুষের দল। এই অসাম্য সমাজের সব স্তরেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। ইংরেজরা প্রথম কলকাতা আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদারেরা ছিল তাদের সহযোগী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারা ভারত জুড়ে ব্যবসা বিস্তার করার পর তাদের আর এই আঞ্চলিক সাহায্যের দরকার রইলনা, তাই ইংরেজদের সহায়ক বাবু সম্প্রদায় উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশদের অধীনে খিদমত খাটা পোষ্যে পরিনত হল। ক্ষমতালোভী কিছু মানুষ সেটা মেনে নিয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশদের প্রশাসনিক পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এনেছিল। সেই স্বাধীনতার প্রথম বিপ্লবের আগে অবধি ব্রিটিশদের ধারনা ছিল যে তাদের বণিকের ছদ্মবেশ মানুষ মেনে নিয়েছে কলকাতার জাঁকজমক দেখে বা ভাগ্যের পরিহাস ভেবে। সিপাহী বিদ্রোহ তাদের সেই ধারনা ভেঙে দেখিয়ে দিল যে অসন্তোষ খোদ ব্রিটিশদের রক্ষাকারী সেপাইদের মধ্যেই অনেক, বাকী নিপীড়িত লোকজন যাদের দুর্দশার ফলে ব্রিটিশদের সেই প্রাচুর্য, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তো আরো অনেকগুন বেশী। তাছাড়া সিপাহী বিদ্রোহে মানুষ যে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত সেটাও ইংরেজরা টের পেল ১৮৫৭ তে, আর নজর দিল রাজস্ব আদায়, কোনরকম রাখঢাক না রেখে আর তাদের বিরুদ্ধে রব তোলা প্রতিবাদীদের রাজদ্রোহ ইত্যাদির মোড়কে কঠোর বিচারে। 

প্রথম দেড়শ বছরে কলকাতার যে বিস্তার জাঁকজমক হয়েছিল সেখান থেকে পরবর্তী সময়ের পতনের কাহিনীও উনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই শুরু। সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজদের অত্যাচার যেমন বেড়ে গিয়েছিল তেমনি এটাও পরিস্কার ছিল যে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও সম্ভব। এছাড়া ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত মানুষরা ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে সেখানকার স্বাধীন মুক্ত সমাজের ধারনায় দিক্ষিত হয়ে এক স্বাধীন ভারতের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠল। স্বাধীনতা সংগ্রামে সেই নতুন মাত্রা যোগ হয়ে উনিশ শতকের শেষের কলকাতা তখন ভারতের ব্রিটিশ বিরোধিতার পুরোভাগে। সেই প্রতিবাদ তীব্র আকার নেয় কয়েক বছর পর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ রায়ের সময়, যার ফলস্বরূপ ১৯১১য় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লিতে। কলকাতা পরবর্তী শতাব্দীতে তার অস্তিত্বের গুরুত্ব ক্রমাগত হারাতে থাকে সেই সময় থেকেই। কলকাতাকে নদীর গতিপথের সাথে তুলনা করলে আঠার শতকে কলকাতা ছিল দুর্দম উচ্ছল দুর্বার পার্বত্য অঞ্চলে নদীর প্রবাহের মত। উনিশ শতকে তার প্রকৃতি সমভুমিতে নদীর মত বিপুল বিস্তৃত আর শেষের শতকে কলকাতা মোহনার দিকে চলা নদীর মত দিকে দিকে চড়া দ্বীপ ইত্যাদিতে পরিপূর্ন, প্রথম অধ্যায়ের সেই বাঁধনছাড়া উচ্ছাসের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই, বরং অত্যধিক ব্যবহারে পলি জমে জমে নদীর চেয়ে চড়া বড় হয়ে উঠেছে। বিংশ শতকের কলকাতা যেমন আকার আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনই তার অবক্ষয়ের হারও সমানুপাতিক বেড়েছে। 

একাধারে বিচার করলে কলকাতার ঠাটবাট যেমন প্রবল পরিমান বেড়েছিল উনিশ শতকের প্রথম দিকে, তারপর মাঝের বছরগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে আর তার সাথে স্থাপিত হয় গঙ্গার দুই তীরের শিল্পবলয়, আর শেষের বছরগুলো পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃত। কলকাতার ইতিহাসের এরকম ঘটনাবহুল শতাব্দী বোধহয় আর আসেনি যেখানে শুরুর ব্রিটিশ প্রভাব কাটিয়ে শেষের দিকে এই শহর এগিয়ে চলেছিল তার নিজের সত্তার সুলুকসন্ধানে, যা পরবর্তী যুগে কলকাতার বিবর্তনের প্রথম ধাপ। 
Standard
calcutta, History

কলকাতা একাল সেকাল — প্রথম পর্ব ১৬৯০-১৭৯৯

স্কুলে পড়ার সময় ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে আমাদের পিটি টিচার মেহেবুব আলি স্যার কোন একটা ক্লাস নেবার সময় বলেছিলেন —

“উড়ে মেড়ো আর শালপাতা
এই তিন নিয়ে কলকাতা”
সে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা, তখন লোকজন অত ঠুনকো সেন্টু নিয়ে ঘুরতনা, আজকের দিনে হলে হয়ত আলি স্যারের এতদিনে শোকজ, ফেসবুকে ছবি শেয়ার, ঘেরাও, হ্যাশট্যাগে আলি নিপাত যাও — আরো কত কিছু ঘটে যেত। সেই সময় এসব কিছুই হয়নি বরং ক্লাসের উড়ে মেড়ো বন্ধুরাও হোহো করে হেসেছিল। পরে যখন নিজেকে সিউডো-আঁতেল মনে করতে শুরু করেছি, তখন কথাগুলো একটু স্থুলরুচির লেগেছিল বটে কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তার চেয়ে বেশি সরলভাবে কলকাতাতেই বর্ণনা করা যাবেনা। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তিরিশ বছর সময় নিতান্তই খাটো কিন্তু এই তিরিশ বছরে সময় বদলেছে অনেকটাই, বিশেষ করে শহরটা। বদলে গেছে চেনা জানা শব্দ, দৃশ্য, বর্ণ, গন্ধগুলো। এখন সেই শহরের থেকে হাজার হাজার মাইল দুরে বৃষ্টির ছাঁট যখন গা-মাথার সাথে মনটাকেও ভিজিয়ে দিয়ে যায়, তখন মনে পড়ে সেই প্রিয় শহরের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো। তবে যে কলকাতার কথা মনে পড়ে তার সাথে এখনকার কলকাতার কতটা মিল তা বলা কঠিন। কলকাতার একাল আর সেকাল পেরনোর যাত্রায় ঝাঁক মারার ইচ্ছা থেকেই শুরু করলাম এই লেখা। ঐতিহাসিক বা উইকিহাসিক অনুসন্ধান আমার কর্ম নয় বরং চেনা জানা তথ্য আর স্মৃতি মিশিয়ে তৈরী করা বেনিআসহকলা কলকাতার ছবিটাই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। 
 
কলকাতা জানতাম এতদিন জোব চার্নক সাহেবের সৃষ্টি, ২৪শে আগস্ট ১৬৯০ সালে এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হয়। এখন দেখা যাচ্ছে যে ১৬৯০ সালে চার্নক সাহেব কলকাতাকে হাওয়া থেকে আমদানি করেননি, কলকাতা ছিল কলকাতাতেই তার বহু আগে থেকে। মুর্শিদাবাদের নবাবদের থেকে চার্নক খালি খাজনা আদায়ের চুক্তি পায়। তাই কলকাতার জন্মদিন নিয়ে বহু বাগবিতন্ডা ঘটেছে ইদানীং কালে, সাবর্ণ চৌধুরীদের পরিবারবর্গ আর বিশিষ্ট কিছু ঐতিহাসিকদের তত্ত্বাবধানে। তাঁরা এখন প্রতিবাদ করে ২৩শে আগস্টকে কলকাতার জন্মদিন হিসাবে পালন করার প্রস্তাব রেখেছেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে জন্মলগ্ন থেকেই কলকাতা মানে ক্যাচাল। সেই একই ক্যাচাল নামের মাহাত্ম্য নিয়েও। কলকাতা কি কলির কাতা থেকে এসেছে না কাল কাটা? কালীক্ষেত্রও পিছিয়ে নেই সেই লিস্টে। কালো কুত্তা থেকে কলকাতার রূপান্তর নিয়ে কেউ কিছু ভেবেছে কিনা জানা নেই। তবে হ্যাঁ, সুতানুটি গোবিন্দপুর আর কলকাতার মধ্যে সাহেবদের কাছে কলকাতাটাই সুবিধের ঠেকেছিল ভাগ্যিস। শেক্ষপীর মশাই লিখে গেছিলেন বটে নামে কী আসে যায় — তা অনেকটাই আসে যায় বইকি। গোবিন্দপুর নাম হলে সেটাকে সাহেবরা কী বলত ভেবেই বেশ আমোদ লাগছে গবিন্ড্যাপোর বা সিউটানিউটে জাতীয় নামগুলো ভেবে। তার ওপর তখন আর কেউ বলতনা ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর, হয়তো ধ্যাদ্ধেড়ে কলকাতা বলত।
 
তবে যতদিন আগে থেকেই থাকুক না কেন, কলকাতার স্থাপন আর বাড়বাড়ন্তের পিছনে যে ব্রিটিশদের অবদান প্রায় একশো ভাগ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই শহর ছিল আগাগোড়া ব্রিটিশদের বানিজ্য থেকে সাম্রাজ্য চালানোর ঘাঁটি, আর এখনকার সাবেকী বনেদি জমিদার পরিবার বা তখনকার বাঙালী নব্য চিন্তাধারার ধারক আর বাহকরা যে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের ফসল। তাই যে কলকাতা ছিল সাহেবদের চোখের মনি, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ারে তারা যখন পাততাড়ি গুটিয়ে দিল্লিতে নিয়ে গেল রাজধানি, কলকাতার পতন সেই তখন থেকেই শুরু। ভেবে দেখলে অনেকটা ইন্টারনেট আসার আগে আর পরের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মত। তবু যে কলকাতা টিঁকে রয়েছে আর বেড়েও চলেছে, বাকী মহানগরীগুলোর সাথে পাল্লা না দিতে পারলেও কলকাতা যে থেমে যায়নি বরং বদলানো সময়ের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য বয়ে চলেছে গত তিনশ বছর ধরে, সেসব ভাবলে কলকাতাকে ধুস কোনো ফিউচার নেইদের দলে ফেলে দিতে এখনও খানিকটা দ্বিধা হয়। 
 
কখনো কখনো পুরনো কলকাতার ছবিগুলো দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে সেই সময়কার জীবন ঠিক কেমন ছিল, কলকাতার হরাইজন কেমন দেখতে ছিল। আবার সেই গোড়ার সময়ে ফিরে গেলে সুতানুটি ছিল জাল বোনার জায়গা আর কলকাতা না গোবিন্দপুর গঙ্গার ধারে জেলেদের গ্রাম। নবাবদের পেয়াদা আসত কর নিতে সেখানেই কলকাতার উল্লেখ। জোব চার্নক কলকাতার ইজারা নেবার পর ধরে নেয়া যেতেই পারে যে এই তিন গ্রামের সুযোগসন্ধানি মানুষজন বাড়তি কিছু আয়ের আশায় সাহেবদের দপ্তরে হাজির হয়ে গিয়েছিল, আর চার্নকেরও দরকার ছিল লোকজনের তাই সেখান থেকেই যাত্রা শুরু শহর কলকাতার। ইংরেজরা যত গেঁড়ে বসতে শুরু করল, কলকাতার গুরুত্বও তত বাড়তে লাগল তাদের কাছে, ফলে ব্রিটিশ ধাঁচের ঘরবাড়ি অফিসকাছারি সবই তৈরী হতে লাগল তবে যতদুর জানা আছে সেসব পুরোদমে শুরু হয় পলাশীর যুদ্ধে নবাবদের তথা মুর্শিদাবাদের পতনের সাথে সাথে। ফোর্ট উইলিয়াম যা ইংরেজদের সামরিক শক্তির ঘাঁটি ছিল, তাকে ঘিরেই বেড়ে উঠতে লাগল কলকাতা। কলকাতার অবস্থানগত গুরুত্ব তখন অশেষ একদিকে মুর্শিদাবাদের নবাবতন্ত্র লুপ্ত হওয়ায় ব্রিটিশদের একচেটিয়া রাজত্ব, তার ওপর উত্তরে ফরাসীদের গঙ্গায় নদীপথে যাতায়াতেও লাগাম দেয়া যাবে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। 
 
পলাশীর যুদ্ধ, যাকে আমরা স্কুলে পড়তাম বণিকের মানদন্ড পরিনত হল শাসকের রাজদন্ডে, সেখান থেকেই কলকাতার পরিবর্তনের শুরু। ইংরেজরা যখন অপ্রতিদ্বন্ধী হয়ে ব্যবসা তথা সাম্রাজ্য বাড়ানোর পথে অগ্রসর হচ্ছে, একদিকে যেমন তখন দরকার পড়ল স্থানীয় লোকবল সেই ব্যবসা চালানোর জন্য, তেমন শয়ে শয়ে ব্রিটিশ মানুষ ভাগ্যের খোঁজে এসে জুটল কলকাতায়, কিছু যোগ দিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ব্যবসা করতে বাকিরা যোগ দিল সৈন্যদলে। তাদের রুটি রুজির সাথে সাথে মাথার ওপর একটা ছাদেরও দরকার ছিল, তাই সেখান থেকে শুরু হল বিপুল পরিমান বাড়িঘর তৈরি, সেই সাথে অফিস গুদাম কাছারি থানা পুলিশ যানবাহন আমোদপ্রমোদ লেখাপড়া পরিবার—সবকিছু মিলে এক বিশাল কর্মকান্ড। 
 
ভারতে ব্যবসা করতে আসার শুরু থেকে বিলিতি সাহেবদের তাঁবেদারের অভাব ছিলনা, সবাই নিজের আখের গোছানোর চক্করে ইংরেজদের বানিজ্য বিস্তারে প্রচুর সাহায্য করেছিল। সেযুগের অবস্থাপন্ন কুলীন বাঙালি লোকজন ছিল সেই লিস্টের একদম প্রথমে। এঁদের সমাজে হয়ত নাম ছিল কিন্তু মান তেমন ছিলনা যার আশায় এঁরা ব্রিটিশদের দপ্তরে হাজিরা দিতেন। এদের মধ্যে শিক্ষিত মানুষ কিছু থাকলেও বেশীরভাগই অজ্ঞ আর দাম্ভিক, হেমন্ত মুখার্জির স্ত্রী ছবির “খিড়কী থেকে সিংহদুয়ার এই তোমাদের পৃথিবী” গানটা এদের জীবনযাত্রার নিখুঁত বিবরণ। সুযোগসন্ধানি জাত ব্যবসায়ী ইংরেজরা এদের ক্ষমতালোলুপ স্বভাব থেকে ফায়দা তোলার জন্য এঁদেরকে বিভিন্ন খেতাবে ভুষিত করতে লাগল রাজা, রায়বাহাদুর, লাট, রায়চৌধুরী ইত্যাদি। বলাই বাহুল্য যে এগুলো ছিল ফাঁপা উপাধিমাত্র, এদের ক্ষমতা ছিল বাড়ির মানুষজন আর চাকরবাকর অবধি। খুবই কার্যকর কনসেপ্ট, অনেকটা অ্যামওয়ে ডায়োটেকের মত ডাইরেক্ট মার্কেটিং, লোকে ভাবল আহা আমি এখন অমুক সার্কেল তমুক সার্কেলের সদস্য, মাথার ওপর যে পঞ্চাশটা ওরকম সার্কেল রয়েছে সেটা মাথায় থাকেনা। এই পাইয়ে দেয়ার আর স্বজনপোষনের যে রীতি চালু হল আঠের শতকে, তার ফলস্বরূপ বাঙালি পেল বাবু সংস্কৃতি যা এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি, বাকী ভারতে আমরা এখনও বাঙ্গালিবাবু বা বাবুমোশায় কেমোন আছে আমি রসোগোল্লা খাবে জাতীয় ব্যঙ্গের খোরাক। 
 
ইংরেজরা ভারতে শাসন করে কী পরিমান অর্থ উপার্জন করেছিল তার উদাহরন ইংল্যান্ডে বিভিন্ন প্রাসাদ কেল্লাগুলোয় জমিয়ে রাখা বিত্ত আর সেইসব আঞ্চলিক আর্ল ডিউকদের জীবনযাপন দেখে। অন্যদিক থেকে দেখলে হয়তো আর এক উদাহরন পাওয়া যাবে এই বাবুদের জীবনযাপন দেখে। ব্রিটিশরা বাংলা থেকে যা উপার্জন করত, এই তাঁবেদার বাবুরা তার ছিঁটেফোঁটাও পেতনা তবু যা পেত তা থেকেই এই বাবুদের যেরকম দৃষ্টিকটু বৈভবের পরিচয় পাওয়া যায় — তা সে দুর্গাপুজার ধুম হোক বা পায়রা পোষা, বেড়ালের বিয়ে দেয়া, ব্রুহাম/ফিটন গাড়ি চড়া যাই হোক না কেন — তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকেনা ইংরেজরা কি পরিমান সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল যাতে তার বিন্দুমাত্র দিয়েও কলকাতার বাবু সম্প্রদায় ঐজাতীয় বিলাসিত করতে পারে। এই বাবুদের প্রাসাদসম বাড়িঘর তৈরীর জন্য কলকাতার সীমানা বাড়ানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ল যাতে বিভিন্ন বাবুদের এলাকা আলাদা থাকে। এই সময়ই কলকাতা দুই ভাগ হয়ে গেল, দক্ষিণে খিদিরপুর ফোর্ট উইলিয়াম আর কলকাতা বন্দর অবধি ব্রিটিশদের এলাকা অফিস বাড়িঘর গীর্জা কবরস্থান ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্য সব এই এলাকায় যোগ হতে লাগল, আর উত্তরে কলকাতা বাড়তে লাগল বনেদি বাঙালি বাবুদের পয়সা ছড়ানোর জায়গা হিসেবে। এভাবেই কলকাতার মানচিত্রে জায়গা করে নিতে লাগল বৌবাজার শোভাবাজার শ্যামবাজার বড়বাজার জোড়াসাঁকো কাশীপুর।  তবু সাহেবরা খুব সুক্ষ্ণভাবে বাঙালী আর ইউরোপীয় সমাজকে আলাদাই রেখেছিল, দহরম মহরম থাকলেও এই বাবুদের সাথে সাহেবদের সম্পর্ক প্রভুভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ছিলনা, শুধু ঠুলি পরা বাবুরা ভাবত তারা সাহেবদের কাছের লোক। 
 
আঠের শতকে কলকাতার এই বিপুল সম্প্রসারণ ছাড়া আরো দুটো ব্যাপার ঘটছিল এই সময়ে। এই সময়ে ইংরেজরা তাদের সাম্রাজ্য বাড়াচ্ছিল বটে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তখনো সোচ্চার হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকরা যতই অন্যভাবে মানুকনা কেন, নবাগত কাজের সন্ধানে আসা সাধারন ইংরেজদের কোম্পানি তখন স্থানীয় মানুষদের সাথে মেলামেশা, হিন্দু ও মুসলিম মহিলাদের বিয়ে করে কলকাতায় পরিবার স্থাপন করা এসবে উৎসাহিত করত। ফলস্বরূপ কলকাতা পেয়েছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ যা এখনো কলকাতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তৈরী হল মধ্য কলকাতা যা আসলে কলকাতার পূর্বদিকে বৃদ্ধি, পশ্চিমে এসপ্ল্যানেড থেকে পূর্বে যার বিস্তার ছড়িয়ে গেল এন্টালি মৌলালী অবধি। দ্বিতীয় ঘটনাটা অবশ্যই আরো গুরুত্বপূর্ণ কলকাতার ভবিষ্যতের জন্য। পলাশীর যুদ্ধজয়ের পর থেকে ব্রিটিশরা কলকাতাকে তাদের সাম্রাজ্যের রাজধানী বানানোর জন্য প্রস্তুত করতে লাগল, ফলে শিল্প বানিজ্য স্থাপত্য এসবের সাথে দরকার হয়ে পড়ল সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন শিক্ষা স্বাস্থ্য আইন সব দিকেই। প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য দরকার হয়ে পড়ল ইংরেজী শিক্ষিত কেরাণীদের কিন্তু নতুন বৃটিশ মানুষেরা ছিল স্বল্পশিক্ষিত খেটে খাওয়া মজুর তাই সেই দায় বর্তাল কলকাতাবাসী বাঙালি জনগনের ওপর, যেখান থেকে কলকাতার ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থা সুত্রপাত। কলকাতার সাংস্কৃতিক বিকাশের সেটাই প্রথম পদক্ষেপ যা এতদিন সামাজিক বৈষম্যের জালে জড়িয়ে থাকা বাঙালী মানুষদের চিন্তাধারার বিকাশ আর সেই সুত্রে শুধু শিক্ষা নয়, চরিত্র নির্মানেও উল্লেখযোগ্য ভুমিকা নেবে পরবর্তী দুই শতাব্দী জুড়ে। 
 
কলকাতার এই প্রথম শতকে তৎকালীন ইংরেজ শাসিত ভারতের রাজধানি হিসেবে কলকাতার বিত্তবৈভব একমাত্র এক শহরের সাথেই তুল্য ছিল, তা হল ব্রিটিশদের মুল রাজধানী লন্ডন যার সাথে জুড়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, কলকাতা যার কাছে অভিজ্ঞতায় নিতান্তই এঁড়েগরু। সেই সুনামের জেরেই আঠার শতকের শেষের দিকে কলকাতায় পা রাখল চিনে, আর্মেনিয়, ইহুদী সম্প্রদায়ের মানুষরা। আজকের যুগে আমরা যাকে বলি মাল্টিকালচারাল কসমোপলিটান দুশ বছর আগে কলকাতায় সেই যুগান্তরটাই ঘটছিল, যা আজকের কলকাতার জাতিগত ভাষাগত ধার্মিক বৈচিত্রপূর্ণতার পথে প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তী দুই শতকে কলকাতার ও সেই সাথে নাগরিকদের বিবর্তন বিবেচনা করলে শুরুর সেই একশ বছর যা ঘটনাবহুল ছিল সেই তুলনায় আজকের পরিবর্তনগুলো নিতান্তই মামুলি। জন্মলগ্ন আর শৈশব থেকে তারপর চোখ রাখা যেতে পারে উনিশ শতকে যা বাংলার রেনেসাঁস যুগ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তবে সেটা পরবর্তী কিস্তিতে। 
 (চলবে)
Standard
calcutta, Memory, Nostalgia

Nostalgia or stagnation??

Last Sunday, 2nd March I went to watch “Vantage point”, a thriller movie, in New Empire. Well, this s been my most frequent pastime since I came back to Calcutta in 2000. And I always follow the same route. A bus to the flea market under 4no Bridge, cross the rail tracks with small shops of fish and beef and Attars on both sides-then take an auto-rickshaw that passes through the most culturally, religiously diverse areas of Calcutta – Park circus, Circus Avenue, Elliott road, Ripon st, Rafi Ahmed kidwai road to Esplanade. Those streets remained the same as I’ve been seeing then since last 15 years.

The movie was quite interestingly told, analysing a 23min duration event from different angle. The story started to take a twist when I found the yellow rectangle with “Interval” written on it. The low wattage bulbs were lit…people started to move out of the theater to grab some chips and coke. As I remained in the seat, the gloomy lights suddenly reminded me of that dreamy scene of “La vita e bella”, the unforgettable red carpet scene. And it suddenly felt like a dream, that its not 2008 but 1993- the worn out and broken seats, dimly lit interior, same Mariah carey tracks-everything was just the same even 15 years ago. may be people didn’t carry cellphones with them, but they bought the same chips that smell of oil. And it suddenly appeared to me, that the people have not changed at all. perhaps I’m changed somewhat. The shy 15 year old student who came to watch Batman and Robin and the 30 year old engineer watching Vantage point are not the same persons, but the crowd, <>, their collective character has not changed.

I was thinking, these small moments, snapshots evoke nostalgia. But then, it also means that it keeps us tied to the past. Setups of a hall reminds me of a day 15years ago : it certainly connotes that no improvement took place in last 15 years. With the rest of the world moving fast ahead, some part of Calcutta are stuck to their ’70s state. In every building complex, shopping complex, new multiplexes come up. On the other hand, the old halls of Calcutta are being closed because of employee strike or being transformed into another shopping mall.

Well it certainly means stagnation to some extent, yet I would love as long as the people sustaining it continue to live happily and thrive. I want to continue walking along the muddy streets behind New Market, I would love Nizam to get back it’s older look and older menu (it’s NO BEEF tell me that I cant eat beef anymore anywhere), I want Society and chaplin and Jamuna to open again and Society get its huge porch reconstructed, I want the streets of central Calcutta remain narrow and cracked along the tram tracks…and yes, the rest of the city can prosper, I don’t mind that! Coz the rest are not my part of the world.

Standard