Bengal, calcutta, memories, Nostalgia

কুষ্টিয়ার কড়চা : দ্বিতীয় পর্ব ১৯৯২-২০০০

(যাঁরা ধৈর্য ধরে পুরো লেখাটা পড়বেন তাঁদের জানাই যে এখানে উল্লিখিত তথ্য প্রায় ২০-৩০ বছর আগের আর পুরোটাই স্মৃতিনির্ভর। হয়তো কিছু বিবরণের সময়সীমা ভুল হয়ে গেছে। সঠিক সময় / বিবরণ যদি দয়া করে জানান তাহলে সংশোধন করে নেব। আর এখানে পরিবেশিত ঘটনাগুলো যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভুলক্রমে কারও ভাবানুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।)

কথায় আছে একটা ছবি হাজারটা না-বলা কথা বলতে পারে। কুষ্টিয়া নিয়ে এই লেখাটা শুরু করার সময় মনে হচ্ছিলো যদি সংগ্রহে কিছু ছবি থাকতো তাহলে আরো অনেক কিছু যা লিখে উঠতে পারলামনা সেগুলো আরো সহজে সবার চোখের সামনে তুলে ধরা যেত। ছবি তোলা মানে তখন বিস্তর হুজ্জুতি। ক্যামেরায় ফিল্ম ভরতেই গোটা কয় ফিল্ম নষ্ট, তারপর ছবি তুলে সেগুলো স্টুডিওতে দিয়ে তার প্রিন্ট পেতে পকেট গড়ের মাঠ। তাই সবাইকে অনুরোধ প্রত্যেকের কাছেই নিশ্চই গোটা কয়েক হলেও পুরোনো ছবি আছে। সেগুলো সবাই যদি নেহাৎ মোবাইলে ছবি তুলে Kustia Pranksters গ্রূপে শেয়ার করে তাহলে পুরো কালেকশনটা আকারে বেশ বড়ই দাঁড়াবে। আপনি কি ভাবছেন?

১৯৯২-১৯৯৬

বোধকরি সব জায়গার সব মানুষের জীবনে একটা সময় আসে যে সময়টা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বয়ঃসন্ধির সেই চারটে বছর এত ঘটনাবহুল ছিল যে তার বিস্তার ধারাবিবরণী দেয়া মুশকিল। আমাদের বয়েসীদের কাছে এই সময়টা ছিল ছোটো থেকে বড় হবার প্রথম ধাপ। এক ধাপে পৃথিবীর চৌহদ্দিটা কুষ্টিয়া ছাড়িয়ে পৌছে গেল গড়িয়াহাট গোলপার্ক ভবানীপুরের সিনেমা পাড়া এসপ্ল্যানেড। পাড়া থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ছোঁক মেরে সিগারেট খেতে যাওয়া, এসপ্ল্যানেডে সোসাইটি বা রিগালে অ্যাডাল্ট ছবি দেখার নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ, ভিডিও দেখতে দেখতে গরম হয়ে যাওয়া বিয়ারের বোতলে প্রথম চুমুক মেরে মুখ বিকৃত করা, বা তপসিয়া গিয়ে বীফ রোল এগুলো দিয়েই শুরু হলো আমাদের যৌবনে পদক্ষেপ। কুমারদার পানের দোকানের বাঁধা খদ্দেরও বলতে গেলে তখন থেকে।

কোয়ার্টারে আবার এক তরফ রঙ হলো। আর বহু দিন ধরে বহু লোকজনের আপত্তির পর মেন গেট পেছনের দিকে থেকে সরিয়ে এলো সামনের দিকে, পিকনিক গার্ডেন রোডে। সবাই ভাবলো দারুন ব্যাপার প্রথম কয়েক সপ্তাহ তারপর দেখা গেল যে রিক্সা আসতে অসুবিধা নেই কিন্তু ব্যস্ত রাস্তা থেকে ওই ছোট্ট পরিধিতে গাড়ি ঘুরিয়ে কোয়ার্টারে ঢোকা বেশ কষ্টের। আগের ইঁটের রাস্তার বদলে তৈরী হলো পাকা রাস্তা পুকুরের পাশ দিয়ে এসে জুড়ল আগের পাকা রাস্তায় ক্লাবঘর আর নতুন কোয়ার্টারের মাঝে। মেন গেটের পাশে বেশ কিছুদিন ধরে তৈরী হলো মাদার ডেয়ারীর নতুন পাকা ডিপো। সকাল সন্ধ্যে গাড়ি এসে দুধের মেশিনে দুধ ভর্তি করে দিয়ে যেত, তারপর লোকজন যার যতটা দরকার ততটাই কিনতো, প্যাকেট বা বোতলের ধরাবাঁধা পরিমাপ আর রইলোনা। নতুন ডিপো হবার পরের আমাদের এল জির পাশের ডিপোটাও উঠে গেল, পড়ে রইলো খালি কাঠামোটা। কোয়ার্টারের চারপাশে ছোট বুক অবধি পাঁচিলটা বাড়িয়ে প্রায় আট ফুট উঁচু করা হলো, যাতে বাইরের থেকে লোকজন পাঁচিল ডিঙিয়ে না ঢুকতে পারে।

এত সব নতুন পরিবর্তনের সাথে আর একটা ব্যাপার ঘটছিল সেই সময় গোটা ভারত জুড়ে, যার প্রভাব আমাদের কুষ্টিয়াতেও এসে পড়ল। সেই নব্বইয়ের প্রথম থেকে পরের দিকের কুষ্টিয়ার যা স্মৃতি রয়েছে গত সময় জুড়েই সেই প্রভাব লক্ষ্যনীয় – সেটা ছিল বিশ্বায়নের প্রথম যুগ। সেই বিশ্বায়নের হাত ধরে কুষ্টিয়ায় প্রথম পা রাখল কেবল টিভি। রাসবাড়ির পেছনের দিকে পুকুর পাড়ে এক চিলতে ঘর ভাড়া করে শুরু হলো মাইতিদার ব্যবসা। ঠিক মনে পড়ছেনা ডিস অ্যান্টেনাগুলো কোথায় লাগিয়েছিলো রাসবাড়ির ছাদে খুব সম্ভব। প্রথম যখন কেবল টিভি আসে তেমন কোনো লোকজনই ঠিক জানতনা ব্যাপারটা কি। ফলে কানেকশান যারা প্রথম নিয়েছিল কোয়ার্টারে তাদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। তাছাড়া তখন অপসংস্কৃতির যুগ, যা কিছু অজানা, নতুন সংস্কৃতি তাকে অপসংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পরিত্যাগ করাটাই ছিল চল। উষা উত্থুপ হোক বা রুনা লাইলা বা বাপ্পী লাহিড়ী অনেকেই অপসংস্কৃতির কোপে পড়েছে। কেবল টিভিও সেই কোপ থেকে রেহাই পেলোনা। এইসব অগুন্তি কারণে আর তাছাড়া নব্বইয়ের প্রথম দিকে আবাসিকদের হাতে বাড়তি উপার্জনও তেমন না থাকায় কেবল টিভি তখনও শখের ব্যাপার হয়েই রয়ে গিয়েছিল। সেই প্রথম দিকে মাইতিদার সাথে কাজ করত শম্ভূ বাচ্চু ওদের সাথে আগে চেনাশোনা থাকার সুত্রে মাইতির অফিসে যাওয়া শুরু করলাম। তখন খুব বেশি চ্যানেল ছিলনা কিন্তু মাইতিদার একটা নিজের চ্যানেল ছিল আমরা কোনো সিনেমা দেখতে চাইলে মাইতিদাকে বললেই হয়ে যেতো। রাসবাড়ির পুকুরের পাশ দিয়ে ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে যে ওদের বাড়ির সামনের দিকে চলে যাওয়া যায় সেটা সেই প্রথম টের পেলাম। দূরদর্শনের একঘেয়ে অনুষ্ঠানের বাইরের জগতের সাথে সেই প্রথম পরিচয়। সেই সূত্রেই আমাদের মনের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ল বেভারলি হিলস, ওয়ান্ডার ইয়ার্স, রেসলিং, হলিউড, বে ওয়াচ ইত্যাদি। WWF রেসলিং এতটাই হিট হয়ে গেল যে পালা করে সবাই রেসলিং লড়তে শুরু করলাম বিল্ডিংয়ের ভেতরে আবার কখনো মাঠেও। সকাল দুপুর সন্ধ্যে হেরোদের মিটিং চলত যারা জেতে বারবার তাদের কোন প্যাঁচ মেরে হারানো যায়। আবার শনিবার কেবল চ্যানেলে অ্যাডাল্ট সিনেমা চালানো হত মাঝরাতের পর। সেই নিষিদ্ধ কৌতুহল নিয়ে মাঝরাতে ঘরের পোর্টেবল অ্যানালগ টিভির অ্যান্টেনা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে অনেক চেষ্টাই করেছি যদি সিগনাল পাওয়া যায়। প্রায় বছর দুয়েক চলার পর রেজ্জাক মোল্লার হস্তক্ষেপে সেটা বন্ধ হয়।

কেবল টিভির বাইরেও যে সংস্কৃতির একটা পরিবর্তন আসছে বাংলায়, সেটা টের পাওয়া গেল জীবনমুখী গানের সুত্রে। পাড়ায় পাড়ায় তখন সুমন-নচিকেতা-অঞ্জনের গানের বুলি ঘুরছে, সে বেলা বোস থেকে শুরু করে নীলাঞ্জনা, তোমাকে চাই অবধি। কে বড় গায়ক সে নিয়ে প্রবল জল্পনা-কল্পনা তর্ক-বিতর্ক। এরই মাঝে এসে গেল বাবা সায়গল। পাড়ার বাইরে বাপী একটা ক্যাসেটের দোকান দিল সেখানে এই সব নতুন সিনেমা ক্যাসেট এসব চলত।

৯২ থেকে পাড়ার মধ্যে আরো দুটো ব্যাপার চালু হলো। প্রথমটা হলো বাগান করার ধুম। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের দিকে আগে বাগান ছিল মোটে একটা, জয় জয়ন্তীর সামনেটায়। হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেল আরো অনেক বাগান, এল/এইচের সামনে রায়কাকুর বাগান, দুধের ডিপোর পাশে ভানুকাকুর বাগান আর আমাদের এল/জির পেছন দিকে হাজরা দাদুর বাগান। প্রচুর পরিশ্রম হয়েছিল কচুগাছ ঢাকা জমি পরিষ্কার করে বেড়া দিয়ে গাছগাছালি লাগলো, গরু তাড়ানো, গাছে নিয়ম করে জল দেয়া। তবে সেই বাগানের জন্যে এসে হাজির হলো কাতারে কাতারে মশা আর বর্ষাকালে সাপখোপ। বাগানগুলো বেশ কিছুদিন দেখভাল করার পর লোকজনের আর তেমন উৎসাহ রইলোনা আর বিনা তত্ত্বাবধানে আস্তে আস্তে গাছ মরে বেড়া ভেঙে আবার যে কে সেই। পুরনো কোয়ার্টারে বাগানগুলো করা হয়েছিল আরো আগে, আর তাদের নিয়মিত দেখাশোনা করা হত, তাই পুরনো কোয়ার্টারের বাগানগুলো বরং টিঁকে ছিল অনেক বেশি বছর। আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা চালু হলো সেটা ছিল রাতে পাহারা দেয়া। নব্বইয়ের দিকে আশেপাশে চুরি চামারির ধাত বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েক বার নাইট গার্ড দেয়া শুরু হয়েছিল, বাবাকেও যেতে হয়েছে প্রতিবারই। বিরাট ছ-সেলের টর্চ আর গোটাকয় মোটা পাকানো বাঁশের লাঠি আর হুইসল নিয়ে পাড়ায় টহল দেয়া হত। এরকমই এক দফায় রাতে পাহারা দেয়ার প্রথম দিনই ধরা পড়ল চোর। সে নাকি বিরাট জাঁদরেল চোর ছিল, দশাসই চেহারা, সাথে এনেছিল একটা পিস্তলও। কে ছিল মনে নেই তবে সে নাকি চোরকে তাড়া করে বড় মাঠের কোনে নিয়ে গেছে চোর ঘুরে দাঁড়িয়ে পিস্তল চালিয়ে দিল কিন্তু গুলি বেরোয়নি আর সেই পাহারাদার চোরের মুখে টর্চের বাড়ি মারে তাতে টর্চই বেঁকে যায়। অনেক দৌড়ঝাঁপের পর সামনের দাদুর বিড়ির দোকান থেকে যখন তাকে ধরে ক্লাবঘরে আনা হয়, ততক্ষণে বেদম মার শুরু হয়ে গেছে। আর পুলিশ আসার আগেই সে আগে যেখানে চুরি করেছিল সেখানকার লোকজন এসে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় ক্লাবঘরের সামনে থেকে। পুলিশ যতক্ষণে সেখানে পৌঁছয় লাঠি শাবল এসব দিয়ে মেরে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আজকের দিনে হয়ত এতটা বাড়াবাড়ি হতনা, তবে ঘটনাটার কথা ভাবলে এখনো মন খারাপই হয়ে যায় পেটের দায়ে চুরি করা একটা মানুষকে জলজ্যান্ত এভাবে মেরে ফেলায়। কদিন পর আবার ধরলাম এক চোর। এল/এর ছাদে দেখতে পেয়ে বিক্রম জিজ্ঞেস করলো কে রে তুই? চোর উত্তর দিলো বাচ্চা ছেলে। তাকে ধরে তারপর তিলজলা থানায় নিয়ে যাওয়া হলে ওসি আবার উল্টে আমাদের বললো কি কি চুরি করেছে থানায় নিয়ে আসবে? মাসের শেষ গাড়িতে তেল নেই। চুরি ডাকাতি বাড়ার সাথে সাথে অনেকে দরজায় ৭-৮-৯ লিভারের তালা বসিয়েছিলো। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের দিকে সবাই আরো একটা গেট লাগিয়ে নিলো সিঁড়ির পাশে। আর বারান্দায় বসতে লাগলো গ্রিল। অভিরুচির নস্করদের ছিল লোহার দোকান, বলাই বাহুল্য তাদের ব্যবসা বেড়ে গেলো এই সব সাপ্লাই করতে করতে। তবে চারতলায় এই গেটগুলো বসাতে আমাদের ছাদে ওঠার বেশ সুবিধা হয়েছিল। আগে মই ছাড়া ওঠা বেশ কষ্টকর ছিল।

আর তখন জলের অনেক টানাটানি ছিল। বড় পুকুরের পাশে নতুন পাম্পঘর বসলেও মাঝে মাঝেই সেই পাম্প অকেজো হয়ে যেত। জলের আকাল মেটাতে কর্পোরেশন গোটা তিন চার ট্যাপকলের ব্যবস্থা করে আর তা ছাড়াও ছিল গোটা তিন চার টিউকল। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে বাড়ির বাথরুমে জল চলে যাওয়ায় সব বন্ধুরা হইহুল্লোড় করে বালতি নিয়ে নিচে নেমে পড়েছি কলতলায় চান করে জল তুলে নিয়ে যাব বলে। আর কলতলায় লম্বা লাইন আমরা ছাড়াও পিসিমা কাকিমাদের। লোডশেডিং কমে এলেও জলের ঝামেলা পরেও লেগে ছিল। কোয়ার্টারের বাইরেটা যেমন পাল্টাচ্ছিল, তেমনি পাল্টাচ্ছিল বাড়ির ভেতরটাও। আগে লোডশেডিং হলে সারা পাড়া অন্ধকার হয়ে যেত, পাড়ায় নামলে দেখা যেত ঘরে ঘরে হ্যারিকেন মোমবাতির আলো। হাতে গোনা কয়েক বাড়িতে জ্বলতো এমার্জেন্সি লাইট। পরে অনেকের বাড়িতেই লাগানো হয় এমার্জেন্সি আলো। আর এই সময় আরো এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা যেত। আমাদের পুরো পাড়ার বিদ্যুৎ সাপ্লাই আসতো দুটো আলাদা জায়গা থেকে। কখনো কখনো লোডশেডিং হলে পুরোনো কোয়ার্টারে আলো চলে গেলেও নতুন কোয়ার্টারে আলো থাকতো। উল্টোটাও হতো কখনো কখনো। আমাদের আলো না গেলে অপেক্ষা করে থাকতাম কখন আমাদের আলো যাবে, যাতে নিচে নামা যায় আড্ডা মারতে। এমার্জেন্সি আলো ছাড়াও বাড়িতে বাড়িতে অনেক কিছু পাল্টে গেছে ততদিনে। রান্নাঘরের চুল্লি উনুন আর তখন কেউ ব্যবহার করতোনা। বেশির ভাগ বাড়িতেই সেই উনুন ভেঙে রান্নাঘর বড়ো করা হয়ে গেছে। সিমেন্টের রান্না করার স্ল্যাবটাও ততদিনে প্রায় ঝুরঝুরে, অনেকেই তখন সেসব ভেঙে নিজের মতো করে রান্নাঘর বানিয়ে নিচ্ছে। রান্নাঘরে বসছে এক্সস্ট ফ্যান, তার জন্যে অনেক ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের জানলার ওপরে গোল করে কাটা ঘুলঘুলি। উনুনের ধোঁয়া ছাড়ার যে পাইপগুলো লাগানো ছিল রান্নাঘরের দেয়াল বেয়ে সেগুলো আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে লাগলো। ভেঙে পরে গেলে সেগুলো আর পাল্টানো হতোনা পরের দিকে। আর ধীরে ধীরে এক-দু বাড়িতে বসানো হলো এসি। কারো কারো বাড়িতে ছোটো কুলার, অনেকে আবার দেয়াল কেটে বড়ো এসি।

বিশ্বায়নের যে হাওয়া কলকাতায় লেগেছিল তার ছোঁওয়া আমাদের কুষ্টিয়াতেও ভালমতই এসে পৌঁছেছিল। কেবল টিভি আর দূরদর্শনের এম টিভিই নয়, তার বাইরেও। মনে হয় এই চার বছর সময়টাকে ধরা যেতে পারে দুটো যুগের যুগান্তরের সীমানা। নতুন যুগের আধুনিকতার সাথে সাথে মানুষজন যে অল্প একটু ঘরকুনো হয়ে গেল, তার শুরু এই সময়তেই। আমরা তখন তেমন বড় নই, তখন শুনতাম আগে পাড়া কেমন গমগম করত। অত আগের ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী না হলেও ৮৫র পর থেকে দেখা সময়েই বদলে যাওয়া দিনের ছাপ কুষ্টিয়াতে পড়তে দেখেছি ধীরে ধীরে। আগের মত খেলাধুলো স্পোর্টস হলেও তাতে সেরকম স্ফূর্তি ছিলনা। আর আগে যেমন প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে হত সব অনুষ্ঠান তাতেও বেশ কিছুটা ঘাটতি পরে গেল। রবীন্দ্র জয়ন্তীর জায়গায় শুরু হলো রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল সন্ধ্যে। তাতে উৎসাহী লোকজন আগের মত ভিড় করে অংশ নেয়া বন্ধ করে দিল। ক্লাবের চাতালের ওপর সতরঞ্চি পেতেই নম নম করে সারা হয়ে যেত এই অনুষ্ঠানগুলো। খেলার ব্যাপারেও তাই। খেলাধুলার চল বজায় থাকলেও কোথায় যেন উৎসাহে একটা ভাঁটা পরে গিয়েছিল। বর্ষাকালে শনি-রবিবারগুলোয় বড় মাঠ ফাঁকাই পড়ে থাকত, সেখানে মাঝে মাঝে পালপাড়ার ছেলেরা এসে ফুটবল খেলত, আমাদের পাড়ার লোকজন খেলায় তেমন আগ্রহ দেখাতনা। ব্যাডমিন্টন খেলা পুরোপুরিই উঠে গেল। আর ক্রিকেটের মরশুমে ফুটবল খেলা এবড়োখেবড়ো জমিতে জল দিয়ে রোল করে সমান করতেই আদ্ধেক সিসন খতম। তবু টুর্নামেন্ট হত তখনও রীতিমত। চোখে লেগে আছে এখনো দেভেন্দর পাপ্পুর বলে বলে ছয় মারা। পাড়ার ক্রিকেট টিম তখনও বেশ ভালো, পুরনো প্লেয়াররা যেমন দীপদা শুভঙ্করদা উজ্জলদা এরা জায়গা করে দিচ্ছে আমাদের বয়েসীদের – বাপ্পা (গ্যাড্ডা), ডাকু, সোনাদা, ছোট পাপ্পু এদের। তখনও চুটিয়ে টপ ফর্মে খেলে যাচ্ছে তাতুদা বাবুয়াদারা। ক্লাবঘরের নতুন হলদে রঙের দেয়াল আর মেরুন রঙের কলামগুলোও আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর বড় মাঠের গোলপোস্টের পেছনের দিকের খাকি সবুজ জানলাটা ফুটবলের বাড়ি খেয়ে খেয়ে ভেঙেচুরে একসা। তবে ফুটবল মাঠে একটা নতুন ব্যাপার চালু হলো এই সময় – ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ম্যাচ। রেষারেষি চিরকালই ছিল সাপোর্টারদের মধ্যে, মারাদোনা বড় না পেলে সে নিয়ে তর্কেরও শেষ ছিলনা, এবার সেই দ্বন্ধ মাঠে মিটিয়ে নেবার সুযোগ চলে এলো দুপক্ষের কাছে। ব্রাজিলের এককাট্টা সমর্থক হলেও সেই ম্যাচগুলোতে খেলার চান্স কখনো মেলেনি, তার বদলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গেছি সমানে। বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলে বড় মাঠের পাশের মাঠটা জলে ভরে যেত, সেখানে চলত ফুটবল আর রাগবির মাঝামাঝি খেলা, ফুটবলের চেয়ে আছাড় খাওয়াতেই যেন বেশি আনন্দ ছিল। মনে রয়ে গেছে নিপুর ঘাড়ে চড়ে বসা ট্যাকল, রাজার ল্যাং খেয়ে খোকার গড়াগড়ি, বুকুদার বুক দিয়ে বল রিসিভ করা, আর ফুটবলের সাথে সাথে অমলদার লাফ। আর গোল করতে না পারলেই “কেষ্ট” বলে বকা। তারপর পুকুরে গিয়ে চান। চানের কোথায় মনে পড়ল একবার রায় বাবাইকে সাঁতার শেখাব বলে পুকুরের মাঝামাঝি অবধি গেছি হঠাৎ বাবাই তলায় পা না পেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে আমাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। মনাদা না কে একটা বাবাইকে সামলে পাড়ে না নিয়ে গেলে হয়ত দুজনেই ডুবতাম সেদিন।

পাড়ার বাইরেটাও এই চার বছরে দুড়দাড় করে পাল্টে যেতে লাগলো। আমাদের এল/জির সামনের কলোনিটায় তিনতলা বাড়ি উঠে গেল চোখের সামনে। মেন গেটের বাইরে দুধের ডিপোর পাশে অরাদার নতুন রোলের দোকান খুললো অভিরুচির সাথে পাল্লা দিয়ে। বাসস্ট্যান্ডের পাশে খুলল আরো একটা তেলেভাজার দোকান। আর মোড় ঘুরে কুষ্টিয়া রোড যেখানে তপসিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে, সেদিকে খানিক এগিয়ে খুলল আরো একটা চপ কাটলেটের দোকান। আর তার পাশে ছিল একটা ভিডিও পার্লার। কম্পিউটার ইন্টারনেটের আগে সেটাই ছিল প্রযুক্তির সাথে প্রথম মোলাকাৎ। বিভিন্ন গেম খেলা যেত রঙিন পর্দায় তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল সুপার মারিও। অনেক বন্ধুবান্ধবই তখন ভিডিও গেমসের পেছনে অনেক পয়সা নষ্ট করেছে। কুষ্টিয়া পার্কের ধারে ছিল পেপসির কারখানা, সেখানে ২০ কি ২৫ পয়সায় পেপসি পাওয়া যেত, সেই কারখানার ইতিও ৯২-৯৩য়ের দিকে। মেন গেটের ডানদিকে রায়বস্তির ঢোকার মুখে চালু হলো আরেকটা শনি মন্দির। আগের মেন গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘোষপাড়ার দিকে যে শনি মন্দির ছিল সেখানে অনেকে যেতে পারতনা, এই নতুন মন্দির হওয়ায় অনেকে তখন সেখানেই যেতে শুরু করলো। ফলে প্রতি শনিবার বড় রাস্তায় জ্যাম বাড়তে শুরু হয়ে গেল। আর চালু হয়ে গেল অটো রিক্সা বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পিকনিক গার্ডেন অবধি। ৯৬য়ে এসবের মাঝে আড়ালে আড়ালে বেদিয়াডাঙা মসজিদ আর দোকানপাটের পেছনে কাজ শুরু হয়ে গেল বন্ডেল গেট উড়ালপুলের। আর কোয়ার্টারের পেছন দিকে শ্রীধর রায় রোডের দিকে তৈরী হতে লাগলো অনেক বাড়ি। ঘোষপাড়ার দিকে এতদিন ছিল সব ফাঁকা, হঠাৎ সবার কেনা জমিতে বাড়ি বানানোর হিড়িক পরে গেল। সরস্বতী পুজোর জন্যে বাঁশ চুরি করতে যেতাম, আর সে সুযোগ রইলোনা পরের দিকে।

যা বলে শুরু করেছিলাম, যে ৯২ থেকে ৯৬ ছিল আমাদের বাচ্চা থেকে হঠাৎ বড় হয়ে যাবার গল্প, সেখানে দুটো ব্যাপার না বললে আবাসনের পরিবর্তনের বর্ণনা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। প্রথমটা হলো মাধ্যমিক। ৯২ থেকে ৯৪ য়ের মধ্যে আমাদের গ্রুপের সবাই মাধ্যমিক দিয়ে ফেলল। আমার পালা এল ৯৪য়ে। মাধ্যমিকের আগে অবধি বেশির ভাগ ছেলেমেয়েরাই পড়ত একই স্কুলে, সাউথ পয়েন্টে যেত প্রায় সবাই, তাছাড়া ছিল মডার্ন, সেন্ট লরেন্স, পাঠ ভবন, কমলা গার্লস। মাধ্যমিক শেষ হওয়া যেন অনেকটা পালা ভাঙার পালা। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার জন্যে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। বুড়িরা চলে গেল অন্য কোথায় বাড়ি করে। কেউ কেউ আবার চলে গেল কলকাতারই বাইরে। পিনাকীরা নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেল কিছুদিন পর, আর অভি, সাদিক কাকুরা গেল সি এন রায় রোডে নতুন ফ্ল্যাটে। ওদের ফ্ল্যাটে এলো সানিরা। মাধ্যমিকের পর বিক্রম চলে এলো পাড়ায়। মনে আছে মাধ্যমিক শেষ হলো মোক্ষম সময়ে, এসে গেল ৯৪য়ের ওয়ার্ল্ড কাপ। রাত জেগে খেলা দেখে কখনো কখনো দল বেঁধে ভোর বেলা যেতাম ঢাকুরিয়া লেকে সাঁতার কাটতে। রেজাল্ট বেরোনোর পর অনেক ভাবনা চিন্তা করে শেষে মায়া কাটাতে না পেরে রয়ে গেলাম তিলজলা হাই স্কুলে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সময়টা অনেকটা ঘোরের মধ্যে দিয়েই কেটে গেল। পড়াশোনার চাপ বাড়ার সাথে সাথে সিনেমা, কেবল টিভি সে সবের নেশাও বাড়ল তার সাথে জুড়ল আড়ালে আবডালে সিগারেট খেতে যাওয়া। এমন করেই একদিন উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডীও কাটিয়ে ফেললাম। তারপর তো এলো বেরিয়ে পড়ার পালা উজানে গা ভাসিয়ে।

অন্য দিকে এই চারটে বছর আমাদের কাছে যেন ছিল নিজেদের বীরত্ব প্রমান করার সময়, যে আমরা এখন বড় হয়েছি। আর সেই সূত্রেই ঘটে গেল একের পর এক বাওয়াল। মাঝেমধ্যে হতো পাঞ্জা লড়াই। সেটা ছিল অনেকটা আমাদের বড়দেরকে চ্যালেঞ্জ করার একটা উপায়। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কোনো তিক্ততা বা রেষারেষি ছিলোনা, কিন্তু চাপা টেনশনটা টের পাওয়া যেত। আমাদের গ্ৰুপে চ্যাম্পিয়ন ছিল রাজা। ও অনেক বড়োদেরকেও হারিয়েছে, আবার অনেক সময় এমনও হয়েছে যে চ্যালেঞ্জ করে নিজেই গোহারান হেরেছে। মাঝে তারপর স্ট্যালোনের ওভার দ্য টপ বলে পাঞ্জা লড়াইয়ের সিনেমা দেখে সবাই বিভিন্ন রকম গ্রিপ প্রাকটিস করতাম। তাছাড়া কখনো আমাদের গ্রুপের কেউ কেউ ওপরের গ্রুপের ছেলেদের সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া, তো কেউ কখনো বাইরের লোকজনের সাথে। প্রথম ঝামেলা ছিল সেই ৯২য়ের শেষে বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে। যেদিন ঝামেলা শুরু হয় সেই রাতে তখন দক্ষিন আফ্রিকার সাথে ক্রিকেট খেলা দেখছি। দাঙ্গা তেমন বাধেনি, খালি তপসিয়ার লোকজন ভাঙচুর করতে এসেছিল বড় রাস্তা অবধি সবাই লাঠিসোটা নিয়ে আবার তাদের পেছনে তাড়া করে তপসিয়া পাঠিয়ে দিল। কার্ফু জারি হওয়ায় বাজার করার বেশ ঝামেলা দেখা দিল, মাঝখান থেকে যে সাইকেল করে মাছ বিক্রি করতে আসত তার বেশ জাঁকিয়ে ব্যবসা হয়ে গেল কয় দিন। আমরাও মহানন্দে স্কুল ছুটি তাই পাড়ায় আড্ডা মেরে কাটালাম। অনেকে আবার দাঙ্গার ভয়ে কামারশালা থেকে তলোয়ার বানিয়ে এনেছিল। এছাড়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাইরের লোকজন এসে একবার মাঠে নেমে গন্ডগোল পাকিয়ে দিল, ইঁট ছোঁড়াছুঁড়ি মাথা ফাটানো এসবের পরে ছানুকাকু টুর্নামেন্টই বন্ধ করে দিল। আর একবার টুর্নামেন্ট চলার সময় সি এন রায়ের চিন্টুকে প্রচুর আওয়াজ দিলাম আমরা, খেলা শেষে চিন্টু ডাকুর সাথে মারামারি বাধালো। ঝামেলা প্রায় থেমে এসেছে এমন সময় বিক্রম বেপাড়ার লোক মনে করে পাড়ারই এক দাদাকে এক লাথি মেরে দিল। ব্যাস সবাই মিলে তখন বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চিন্টু আর তার দল বিনা বাধায় ফিরে গেলো সি এন রায় হাউসিংয়ে। এছাড়া লেগেই থাকত পালপাড়ার সাথে। রেষারেষি ছুটকো ছাটকা ঝামেলা আগে লেগে থাকলেও ৯৫-৯৬ থেকেই সেটা আস্তে আস্তে তিক্ত হতে থাকে। খুব সম্ভব ৯৫য়ে বিশাল ঝামেলা লাগলো বেদিয়াডাঙায় সইফুলদার সাথে ঝামেলা বাধায় দোকানপাটের পেছনে বেআইনি মদের ঠেক ভাঙা নিয়ে। প্রথম দিন বেশ কিছু ঠেক ভাঙার পর স্থানীয় লোকজন তেড়ে আসে আমাদের মারতে। সেদিনই প্রথম আবিষ্কার করি যে প্রানের দায়ে আমি বেশ জোরেই দৌড়তে পারি। আর আরেকটা ব্যাপারও এই সব ঘটনা গুলো থেকে পরিস্কার হতে থাকে যে আগে যেমন লোকে ঝামেলা বাধিয়ে নিজে নিজেই মোকাবিলা করত সে দিন আর নেই। আগেকার পাড়ায় মস্তান বলে যে ব্যাপারটা ছিল সেটার চল আস্তে আস্তে উধাও হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। তখন কোনো গন্ডগোল হলেই “দাঁড়া অমুক পাড়া থেকে ছেলে নিয়ে আসছি” টাই ছিল আরো জবরদস্ত হুমকি। কে কত বাইরের লোকজনকে চেনে তার ওপর তার ঘ্যাম। একবার মনে আছে বুল্টুর ভাই বাবু ফোন করলো রাত্রি বেলা, ওকে নাকি কে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে গড়িয়াতে। সব তোড়জোড় করে এদিক ওদিকে থেকে লোকজন যোগাড় করে সবাই ট্যাক্সি নিয়ে গড়িয়ার দিকে রওনা দেব তখন খবর এলো যে না ও নাকি মজা করতে ফোন করেছিল। সব ঝামেলা যে অন্যদের সাথেই হত সেরকম নয়, ওই চার বছরে নিজেদের বন্ধুদের মধ্যেও কম ঝামেলা হয়নি। কিন্তু ঝামেলা যেমন হয়েছে, মিটেও গেছে সাথে সাথে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল উৎপলদা চিকু খোকন অজু বড়কা এদের ক্যারাটের ট্রেনিং দিত, সবাই তখন বীরপুরুষ হবার নেশায় বুঁদ। উৎপলদা একদিন বড়কাকে পিছিয়ে যেতে বলেছে, ও শুনলো এগিয়ে আসতে, ব্যাস লাঠি খেয়ে বেশ কদিন হাসপাতালে।

শেষ একটা তুলনা দিয়ে এই চার বছরের ব্যাখ্যান শেষ করব। যেমন আগে বলেছিলাম রাসমেলা আর দুর্গা পুজো দিয়ে বিচার করা যেত সময় কিভাবে পাল্টে যাচ্ছে, তার ছবিই এখানে খানিকটা তুলে ধরলাম। বড় রাস্তার কাঁচা নর্দমার ওপর কভার লাগানোতে বিভিন্ন ব্যাপারীর সোনায় সোহাগায দাঁড়ালো রাসমেলার সময়। কভারগুলো তাদের পসরা সাজানোর জায়গা হয়ে দাঁড়ালো। রাসবাড়ির মূল যে জমি জায়গা ছিল প্রথমের দিকে, সিইএসসি ট্রান্সফরমার বসানোয় সেই মাঠের অনেকটাই উধাও হয়ে গেল। এই কোনেই আগে যাত্রাপালা বসত। জায়গার অভাবে নাকি দর্শকের অভাবে, যাত্রাপালা উঠে গেল আস্তে আস্তে। রাসবাড়ির উল্টোদিকে আগে বসত কাঠের নাগরদোলা,তার জায়গায় এলো উঁচু ইলেকট্রিক নাগরদোলা। কিছুদিন পর বসলো এরোপ্লেন যেটা কোনাকুনি ঘুরত আর আর মনে আছে এরোপ্লেনের বৃত্তের এক প্রান্ত দেয়ালের বাইরে পুকুরের ওপর ঝুলে থাকত। রাসমেলা যতটা জায়গা জুড়ে বসত, পিকনিক গার্ডেন রোডের সেই অংশে একটু একটু করে নতুন বাড়ি দোকান ইত্যাদি গড়ে ওঠায় মেলার বিস্তৃতি অনেকটাই কমে আসে। সেটা পোষাতে আস্তে আস্তে মেলার চৌহদ্দি পূর্বে কুষ্টিয়া মোড় থেকে পশ্চিমে তিলজলা রোড ছাড়িয়ে প্রায় বন্ডেল বাজার অবধি। তবে দোকান বাড়লেও রাসমেলায় ভিড় তেমন আগের মত হতনা। আর বাজির জমকও আর তেমন আগের মত ছিলনা, আলোর বাজির সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় শুন্যে এসে থেকেছিল শেষের দিকে। অন্যদিকে দুর্গা পুজোয়ও একই রকম দৃশ্য। নতুন কোয়ার্টারের দিকে আমরা বরাবরই বলতাম যথেষ্ট পরিমান আলো দেয়া হয়না, কিন্তু নব্বইয়ের মাঝামাঝি দিকে আলোর পরিমান আরো কমে গেল। আগে ক্লাবঘরের চাতালের ওপর দুটো ভাগ করে একদিকে প্যান্ডেল অন্যপাশে স্টেজ বানানো হত, সেই স্টেজ সরে প্রথমে গেল আই/এর সামনে তারপর এল/এর সামনে বড় মাঠে। পুজোর বাজেট একটু একটু করে বাড়তে লাগলো সেই সাথে চাঁদাও।তবে তার বিনিময়ে প্যান্ডেলের একটু শ্রীবৃদ্ধি হলো। পুজোর আগে আগে বসে আঁকো হতো, আর যারা প্রাইজ পেতো তাদের আঁকাগুলো প্যান্ডেলে টাঙানো থাকতো পুজোর কদিন। আঁকার হাত অনেকেরই ভালো থাকলেও দুজনের নাম প্রথমেই মনে আসে এল/এইচের তোতন আর আই/এর বাবাই। বেশির ভাগ সময় ওদের গ্ৰুপের প্রাইজ ওরা দুজনই পেতো। আর তার উল্টোপিঠে ছিলাম আমি, অনেকটা পরীক্ষায় রচনা মুখস্থ করে যাবার মত দু তিনটে থিমের ওপর প্র্যাক্টিস করে যেতাম, সেগুলো এলে ভালো নাহলে পাতায় হিজিবিজি এঁকে চলে আসতাম। আমার আরেক বন্ধু ছিল আরো এক কাঠি ওপরে। স্কেল দিয়ে লাইন আঁকতো। প্রতিমা আসা শুরু হলো কুমোরটুলি থেকে। শুরু হলো ভোগ বিতরণ। আর পুজোর আগে পুজো নিয়ে পাড়া বেশ সরগরম হয়ে উঠত, কে বা করা কোনো বছর পুজো আয়োজন করবে। পুজোর সন্ধ্যেয় নাটক বন্ধ হয়ে গেল, তার জায়গায় কয়েক বছর পর আসবে অন্তাক্ষরি। আর তেমন কোনো পরিবর্তন মনে পড়ছেনা তেমন, তবে মনে হয় যে কোয়ার্টারের পুজো নিয়ে আবাসিকদের উৎসাহ খানিকটা কমেই এসেছিল। আমার বা আমাদের বয়েসীদের অবশ্য সেটা মনে হওয়া স্বাভাবিক কারণ আমরা তখন কোয়ার্টারের গন্ডী ছাড়িয়ে বাইরে বেরোতে ব্যস্ত। দুর্গাবাড়ি ম্যাডক্স স্কোয়ার এসব দিকেই নজর তখন আমাদের, পাড়ায় খালি রাত জেগে আড্ডা মারার চিন্তা। আর আগে ভাসানে যেতামনা আর বড়রা বারণ করত, সেসব আস্তে আস্তে উঠে গেল, আমরা বড় হওয়ার সাথে সাথে ভাসানে যেতে শুরু করলাম। শুধু তাই নয় কোন লরিতে যাব, কে লরির মাথায় বসবে সব কিছু নিয়ে চরম উত্তেজনা।

১৯৯৬-২০০০

আমাদের গ্রুপের বেশীরভাগ বন্ধুবান্ধবরাই ৯৬ সালে সাবালক হয়ে গেল। আঠারোয় পা দিয়ে হঠাত লাগামছাড়া হবার সব লক্ষনই তখন ছিল আমাদের। ৯৬য়ে আমি আর বিক্রম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেলাম জলপাইগুড়ি, তেমনি একে একে পাড়ার অনেকেই তখন কলেজ জয়েন করেছে। নতুন বন্ধুবান্ধব, নতুন কলেজ এসব নিয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, পাড়া রইলো পাড়ার মতই। আগের চার বছর যেমন ছিল আমাদের বড় হয়ে ওঠার গল্প, এই চার বছর তেমনি আমাদের পরের গ্রুপের। বুড়ো বাবাই বাবান রুবেন বুবলা সুর্য এরা সব হুট করে কেমন বড় হয়ে গেল চোখের সামনে। আর এই চার বছর পাড়ায় একটানা না থাকায় এই পরিবর্তনটা আরো বেশি করে চোখে পড়ত। এইসব কচিকাঁচারা যখন বড়ো হয়ে উঠছে আমাদের তখন সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক হবার উচ্ছাস। এতদিন যা সব নিষিদ্ধ ছিল হঠাৎ করে সেসব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্রথম প্রথম যেমন প্রচুর উৎসাহ ছিল জমে থাকা আশ মিটিয়ে নেবার, আস্তে আস্তে যেন সেই অত্যাগ্রহী দশাটা কেটেও গেলো সেই চার বছরে। এতদিন স্কুলের বন্ধুবান্ধব থাকলেও খেলাধুলো, আড্ডা সিনেমা সবই ছিল পাড়ার বন্ধুদের ঘিরে। কলেজ চাকরি এই সব শুরু হয়ে আস্তে আস্তে সেই পাড়া নির্ভরতাটা কেমন যেন ঢিমে হয়ে আসছিলো তখন। তবুও কম্পিউটার তখন সব সময় গ্রাস করে নেয়নি, মোবাইল ফোন দুর্লভ, ফেসবুক হোয়াটস্যাপ এসবের সৃষ্টিকর্তারাও তখন স্কুলপড়ুয়া। পাড়া ছিল তখনও জমজমাট, যদিও আগের দশকের সিকিভাগও না। স্পোর্টস প্রতি বছর হতোনা, শীতকালে ক্রিকেট টুর্নামেন্টও বন্ধ হয়ে গেলো বিভিন্ন ঝামেলাঝাঁটির জেরে। পাড়ায় বাইরের লোকজনের আনাগোনা একটু বেশিই চোখে পড়তো আগের চেয়ে। তবু তখন যারা আসতো বেশিরভাগই কোয়ার্টারের কারো না কারো বন্ধুত্বের সূত্রে।

পাড়ার বাইরেটা এই সময় বদলায় পাড়ার ভেতরের চেয়ে ঢের তাড়াতাড়ি। ঘোষপাড়ার দিকটা আগেই যেমন জলাজঙ্গল আর বাঁশবাগানে ভর্তি ছিল সেগুলো সব ভোল পাল্টে বাড়িঘরে ছেয়ে গেলো। পাশে কুষ্টিয়া রোডেও জেঁকে বসলো গোটাকয় এসটিডি বুথ আর জেরক্স। বাসস্টপের কোনের বাড়িটা পাকা হয়ে গেলো, আর এসে গেলো আর এক নতুন মিষ্টির দোকান। আগে সুধীরদার দোকানে না গেলে মিষ্টি কিনতে যেতে হতো পালপাড়া পেরিয়ে। নতুন দোকান হয়ে সুধীরদার বাসি মিষ্টির চাহিদা আরো কমে গেলো। আর মেন্ রাস্তার ওপারে কাঁটাপুকুরের দিকেও একই অবস্থা। পুকুর জল জমি বুজিয়ে উঠতে লাগলো একের পর এক বাড়ি। আর আমাদের বাড়ির সামনের বস্তিতেও চালাঘর গুলো ভেঙে উঠতে লাগলো একের পর এক তিন চারতলা বাড়ি।প্রথম আসার পর যে দিগন্ত জোড়া আকাশ দেখা যেত বাড়ির জানলা থেকে, ২০০০ সালের দিকে সেসব প্রায় অনেকটাই ঢেকে গেছে নতুন বহুতল বাড়িতে। বন্ডেল গেট উড়ালপুলের কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের জমি বাড়ির চাহিদা হঠাৎই হু হু করে বেড়ে উঠলো। পাড়ার ভেতরেও তখন নতুন বিল্ডিঙের কাজ শুরু হচ্ছে আর কি। তাছাড়া আমাদের চৌহদ্দির যে দেয়াল, তাকে আবার নতুন করে বানানো হলো, আরও উঁচু করে। আগে যে কোনো দিক থেকেই পাঁচিল ডিঙিয়ে পাড়ায় আসা যেত কিন্তু পাঁচিল উঁচু হওয়ায় টপকানো প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে গেলো। পাড়ায় ঢোকার তখন খালি তিনটে রাস্তা – মেন্ গেট, পালপাড়া আর রাসবাড়ির পেছনদিকটা। আর ক্লাবঘরের পাশের তিনকোনা পার্কটাকে দেয়াল দিয়েএ ঘিরে ফেলা হলো। বাইরের পরিবর্তনের জোয়ার খানিকটা পাড়াকেও যে ছেয়ে ফেলেছিলো তা বলাই বাহুল্য।

আবার যদি রাসমেলার নিরীখে বিচার করি তাহলে দেখা যাবে যে সে সময় রাসমেলার সবচেয়ে পড়তি অবস্থা। রাসমেলার বেশিরভাগ জমিই তখন বিক্রি হয়ে গেছে, এমনকি রাজবাড়ীর খানিকটা অংশও। রাসমেলার সময় ভিড় তেমন আর জমতোনা। কিছু চেনা মুখ প্রতি বছরই ঘুরেফিরে আসতো – জিলিপি গজা ঝুরিভাজাওয়ালা, কার কত জোর মাপার মেশিন নিয়ে আসত এক বুড়ো যাতে ৫০০ টানতে পারলে পয়সা ফেরত, ঘুগনিয়ালা বসত মেলার মুখের দিকটায়, কাঠগোলার পাশে, আর শিবমন্দির পেরিয়ে যাবার পর শুধু বিভিন্ন ধরণের পুতুল খেলনার রকমারি পসরা। জায়গার অভাবে আগের মতো নাগরদোলা, চরকি ইত্যাদি আর বসতনা কিন্তু এরোপ্লেনটা তখনও বসত। কিন্তু রাসমেলা আসছে সেটা তখনও বোঝা যেত যখন দেখতাম মেলা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই বেশ কিছু দোকানি উনুন বাঁধছে, আর রাস্তার ধারে বেশ কিছু আখওয়ালা। সেদিক থেকে দুর্গাপুজো তখনও বেশ রমরমা করেই হচ্ছে। পুজোর সময়কার জমজমাট ভাবটা তখনও অক্ষুন্ন ছিল। প্রত্যেক বছর কোনো না কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে বাগবিতণ্ডা চলতই তবে আগে যেমন কি কি করা হবে না হবে এসব নিয়ে মতানৈক্য হতো, পরের দিকে সেটা গিয়ে দাঁড়ালো কে পুজো করবে তাই নিয়ে। আবাসনের ভেতর বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভাজন আগেও ছিল কিন্তু নিজেদের পারদর্শীতা দেখানোর জন্যে দুর্গাপুজোর মতো সুযোগ আর অন্য কখনও পাওয়া যেতোনা। এ বছর এই দাদারা তো পরের বছর ওই কাকুরা। এভাবেই দুর্গাপুজো চলে আসত বছর বছর। আগেই বাচ্চা ছেলে বলে সবাই দূরে সরিয়ে রাখতো, কিন্তু আঠেরো হবার পর থেকে আমরাও দুর্গাপুজোয় আরো বেশি করে যোগ দিতে লাগলাম। বিশেষ করে চাঁদা তোলা, ঠাকুর আনতে যাওয়া চতুর্থীর রাতে, ঠাকুর ভাসান, প্যান্ডেল পাহারা দেয়া। দুর্গাপুজোর বাজেটে ধীরে ধীরে ভাঁটার টান পড়লেও পুজোর অনুষ্ঠানের সময় তার ঘাটতি খুব বেশিমাত্রায় পড়েনি তখনও। যতদূর মনে পরে এই সময়ই প্রথম শুরু হলো অন্তাক্ষরী নবমীর সন্ধ্যেয়। আর প্রতি বছর আসতো মনীষাদির নাচের ট্রুপ। আর সাবালক হবার পর আমাদের ছাড়পত্র জুটলো দশমীর দিন সিদ্ধি খাবার। আগে কুলফিয়ালার কাছেই মিলতো কিন্তু আমাদের কেউ বিক্রি করতোনা বা আমরাও ধরা পড়ার ভয়ে কিনতে যাইনি। দশমীর সন্ধ্যেবেলা জয়দাদের ব্লকে সিদ্ধি তৈরী হতো। আমাদের ভাগ্যে জুটতো ছিটেফোঁটা, তবু সেটাই যেন ছিল বিরাট প্রাপ্তি, অনেকটা যেন বড়ো হয়ে যাবার স্বীকৃতি।

আমাদের নতুন কোয়ার্টারের সরস্বতী পুজোর ইতিও এই সময়েই। বেশির ভাগ বন্ধুরাই ছিলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে, তাছাড়া তখন কলেজ ইত্যাদি নিয়ে সঙ্গত কারণেই মাতামাতি বেশি ছিল। আর সরস্বতী পুজোটা ছিল অনেকটা আমাদের বয়েসীদের খানিকটা প্রতিবাদী অবস্থান। আমাদের অবর্তমানে আমাদের পরের গ্ৰুপ এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি তখন। তবু শুনেছি দর্পন নাকি কয়েক বছর নিজে খরচ করে সরস্বতী পুজো করেছিল। সে পুজোর নাকি জাঁকজমকই আলাদা ছিল, লোকে নাম দিয়েছিলো দর্পন শেঠের পুজো। সে পুজো চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তবে সরস্বতী পুজো নিয়ে যে আগ্রহ আর তেমন নেই সেটা প্রকটভাবে বোঝা যাচ্ছিলো। আর নতুন কোয়ার্টারের দিকে যেন একটা জেনারেশন গ্যাপ তৈরী হয়েছিল। আমাদের পরের দিকে বলতে গেলে খালি বুড়ো, বাবান, সানি, রুবেন আর বুবলা। মেয়েরাও বলতে গেলে হাতেগোনা, আর সবার নিজের নিজের বাড়ি সরস্বতী পুজো হওয়ায় তারাও তেমন গা করেনি কখনো। ক্লাবের পুজোও সারা হতো নমো নমো করে। পুজো করা শুরু করলো আই/এর বাবাই। আগে কে করতো জানা নেই, সরস্বতী পুজোর সময় আগে কখনো ক্লাবমুখো হইনি।

পুজো বাদ দিয়ে অন্য সময় পাড়া অনেকটাই খালি লাগতো। তবে পরের দিকের অবস্থা ভাবলে মনে হয় তখনও রাস্তায় নামলেই লোকজনের দেখা মিলতো তা সে ভোর ৫টাই হোক কি রাত ১১টা। কেবল টিভি তখনও সব ঘরে পৌঁছয়নি। খেলাধুলোর চল আগের মতো না হলেও যে মরশুমের যা খেলা অন্তত শনি রবিবারে লোকজন মাঠে নেমে পড়তো খেলতে না হয় খেলা দেখতে। আগে আমরা ক্রিকেট খেলতাম এল/এফের সামনের মাঠে। আর ফুটবল হতো এল/জের সামনে। যত বোরো হতে থাকলাম, তখন আর নতুন পুরোনো কোয়ার্টারের বিভাজনটা আর তেমন প্রকট ছিলোনা, ততদিনে সবাই একসাথে খেলতাম। ফুটবল চলে গেলো বড়ো মাঠে, আর ক্রিকেট শুরু হলো নতুন আর পুরোনো বিল্ডিঙের মাঝে রাস্তার ওপর। প্রথমদিকে ওভারহ্যান্ড শুরু হলেও আস্তে আস্তে সবাই রাস্তায় আন্ডারহ্যান্ড ক্রিকেটই খেলতো বেশি। আগের মতো লম্বা টুর্নামেন্ট আর হতোনা। তার এক কারণ বাজেট, আর দুই তখন লোকজনের সারা মরশুম ধরে টুর্নামেন্ট খেলার মানিসিকতা আস্তে আস্তে পাল্টাচ্ছিল। অনেকে খেপ খেলতে যেত ঠিকই কিন্তু জেতার অঙ্ক বেশি না হলে তাগিদ বেশি থাকতোনা। ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধ তখন, যদিও খেলার চল থামেনি সেই হারে। কোয়ার্টারে যারা খেলোয়াড় হিসেবে নাম ছিল, তারা আশেপাশের টুর্নামেন্ট থেকে ডাক পেতে লাগলো। অনেক একদিনের টুর্নামেন্ট চালু হয়ে গেলো আশেপাশে। তপসিয়া,ট্যাংরা,ঘোষপুকুর থেকে শুরু করে সোনারপুর অবধি লোকে যেত খেলতে। ফাইনাল হতো রাতে ফ্লাডলাইটে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ এর দিকে ক্লাবে তাস খেলার চল শুরু হলো পুরোদমে। আগেও তাস খেলা হতো কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে বা নব্বইয়ের শুরুতে আমাদের তাস খেলতে দেয়া হতোনা ক্লাবে। এই সময় সেই চলটা আস্তে আস্তে পাল্টে গেলো। একদিকে আমরা আর তখন বাচ্চা ছিলাম না, আর অন্যদিকে যারা এইসব খেলা না খেলার বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল তারাও তাদের অবস্থান পাল্টাতে খানিকটা বাধ্যই হয়েছিল ক্লাবে বেশি সদস্য আনার জন্যে। আর তাছাড়া দিন বদলানোর সাথে সাথে তাস পাশা সর্বনাশা ইত্যাদি পুরোনো রীতিনীতিগুলো আর তেমন লোকজন মানতোনা।

আমাদের কোয়ার্টারে ঢোকার রাস্তার মুখে হঠাৎ এক-দুটো রিকশা দাঁড়ানো শুরু করলো। এর আগে রিক্সাস্ট্যান্ড ছিল কুষ্টিয়া মোড়ে। সেখান থেকেই লোকে যেত কলোনি বাজার, বন্ডেল বাজার, কেউ কেউ কসবা বাজার। আগেভাগে খদ্দের জোগাড়ের ধান্ধায় প্রথম প্রথম ১-২জন রিকশাওয়ালা আসতো, কিন্তু আস্তে আস্তে বেশিরভাগ লোকই যখন আমাদের গেট থেকে রিক্সা ধরতে লাগলো, রিক্সার সংখ্যাও একে একে বাড়তে লাগলো। আর কুষ্টিয়া পার্ক তখন লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দেয়ায় রিক্সাস্ট্যান্ড সেখান থেকে উঠে রাস্তার উল্টোদিকের টেলিফোন অফিসের পাশের গলিতে চলে গেলো। পিকনিক গার্ডেন রোড ধরে আরো ২তো নতুন বাসরুট চালু হলে গেলো। ৩৯ এ/২ যেত কুষ্টিয়া রোড দিয়ে তপসিয়া হয়ে কলেজ স্ট্রীট হাওড়া। আর দেজ মেডিকেল মিনিবাস রুট দেজ মেডিকেল ছাড়িয়ে বেড়ে দাঁড়ালো ৩৯ বাসস্ট্যান্ড অবধি। ভিআইপি বাজার যেতে হলে এতদিন অটো ছাড়া উপায় ছিলোনা। ৩৯এ/২ চালু হয়ে লোকে তখন বাইপাস অবধি চলে যেতে পারতো সহজে। সল্টলেক রাজারহাট তখনও তেমন রমরমা হয়নি, চালু হয়নি তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে সমৃদ্ধ অফিসকাছারি। সল্টলেকে তখন সরকারি অফিসেই লোকজন যেত বেশি – বিদ্যুৎ ভবন, পূর্ত ভবন, সেচ ভবন এইসব। তবে ইস্টার্ন বাইপাস চালু হয়ে আমাদের সল্টলেক যাওয়া অনেকটাই সোজা হয়ে গেলো। ৩৯এ যেত সল্টলেক সারা দুনিয়া ঘুরে। বাইপাস ধরে রাজ্য সরকারের স্টেট্ বাস চলা শুরুর সাথে সাথে ৩৯এ বাসে চড়ে সল্টলেক যাবার লোকের সংখ্যা প্রায় ছিলোনা বললেই চলে। মাঝখানে খুব সম্ভব বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো ৩৯এ রুট, পরে আবার নতুন করে চালু হয় কয়েক বছর পর। এদিকে পাড়ায় রাজাদা একদিন কিনে ফেললো মিনিবাস। দেজ মেডিকেল রুটের। এতদিন পাড়ায় বাসের মালিক বলতে এক তাতুদা। তাতুদার বাস কিছুদিন চলে তারপর পরে ছিল আই/বির পাশে পুকুরপাড়ে। তারপর খানিক সরে বাস রাখা হলো জলের ট্যাঙ্কের উল্টোদিকে। সেখানেই সেই বাসের সমাধি। কাঠামোটা এখনো ওখানেই পড়ে আছে।

রাজনীতি নিয়ে বিশেষ কিছু লিখবোনা। তবু আঠেরোয় পা দেয়া মানেই ভোট। কপালজোরে তখন আর ব্রজনাথে যেতে হয়না ভোট দিতে,আমাদের ক্লাবঘরেই ভোটের সেন্টার পড়ে। ভোটের আগেই থেকে পাড়া সরগরম হয়ে উঠতো বিভিন্ন সভা সমাবেশে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা দরজায় দরজায় একটা ক্লিষ্ট হাসি হেসে ভোট চাইতেন। অনেকটা হ্যালির ধূমকেতুর মতো তাদের ৫ বছর পরপর দেখা মিলতো। তবে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহের কোনো খামতি ছিলোনা। মনে পড়েনা কখনো ভোট নিয়ে বড় ঝামেলা হতে দেখেছি কোয়ার্টারে। আমাদের ওয়ার্ডে নির্দল হিসেবে দাঁড়াতো একজন তার নাম নেপালি বুড়ো। নেহাত নামেই ফিদা হয়ে ভোট ও দিয়েছিলাম একবার। দেয়াল লিখনের এটাই শেষের দিক। এরপর সব দলই পোস্টার ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়াল লেখা ছেড়ে।

এই প্রসঙ্গটা আগেই উল্লেখ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি বিভিন্ন কারণে, তাই এখানেই বলি। প্রথম যখন আমরা কুষ্টিয়াতে আসি, আমাদের খবরের কাগজ দিতো নারুদা। তার আবার অন্য নাম ছিল শান্তিদা, যে যা ইচ্ছে তাই বলেই ডাকতো। কোয়ার্টারে আহার প্রথম দিকের স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটা যেমন ছিল প্রদীপদার নেট টাঙিয়ে বোলিং প্র্যাক্টিস, তেমন ছিল নারুদার সাইকেল L/A ব্লকের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে খবরের কাগজ বিলি করা। সকালে যারা মর্নিং ওয়াকে বেরোতো তারা খবরের কাগজ হাতে করে নিয়ে যেত নারুদার থেকে। আমাদের যখন কালেভদ্রে কাগজ বা পত্রিকা কেনার ইচ্ছা হতো, নারুদার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। বাড়তি কাগজ থাকলে বাড়িতে দিয়ে যেত। কেন জানিনা খুব মনে হচ্ছে যে প্রথম দিকে নারুদা ছাড়া অন্য একজনও কাগজ বিক্রি করতো, কিন্তু আস্তে আস্তে বেশির ভাগ লোকই নারুদার থেকে কাগজ নেয়া শুরু করায় অন্যজন কাগজ দেয়া বন্ধ করে দেয় পরের দিকে। এই তথ্যটা ভুলও হতে পারে, হলে ত্রুটি সংশোধন করে নেব। তবে নারুদার কাগজ বিলি করা ছিল এক দর্শনীয় ব্যাপার। পুরো চারতলা থেকে একতলা কাগজ দরজায় ঝুলিয়ে কড়া নেড়ে এক ব্লক সারতে নারুদা খুব সম্ভব সময় নিতো ৩০ সেকেন্ড। কারো যদি কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার থাকতো, নারুদাকে সিঁড়িতে ধরা প্রায় অসাধ্যসাধনের সমান। ব্যবসা বাড়ার সাথে সাথে নারুদার এক সাগরেদ জুটলো। তখন দুজন মিলে কাগজ বিলি করতো, যদিও অন্যজন নারুদার চেয়ে অনেক কম বয়েসী, নারুদার স্পীডের কাছে সে ছিল তুচ্ছ। আর সপ্তার পর সপ্তা, মাসের পর মাস যে কাগজ জুটতো বাড়ি বাড়ি, সেগুলো কিনে নিয়ে যেত খবরকাগজওয়ালা। তাদের সাথে দর কষাকষি ছিল আবশ্যিক। প্রথমে তাদের হাঁক মেরে ডাকা হতো দর জানার জন্যে, তারপর বিল্ডিংয়ে ডেকে চলতো আরও দরদাম। যাই হোক, ১৯৯৬ এর প্রসঙ্গে ফেরা যাক। নারুদা ওই সময় থেকে শুরু করে অন্যান্য বিল দেয়া। মানে বাড়ি ভাড়া দেয়া, CESCর বিল এইসব। পারিশ্রমিক নিতো বিল প্রতি ২টাকা। জানিনা সেটা চালু করেছিল ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে না খবরের কাগজ বেঁচে লাভ কমে যাওয়ায়। তবে নারুদার প্ল্যান যে সফল হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য, কোয়ার্টারের অনেকেই ঝামেলা এড়াতে আর সময় বাঁচাতে নারুদাকে দিয়েই বিল জমা করতো।

এই অধ্যায়টা শেষ করবো হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। আগেও যেমন বলেছি দিন পাল্টানোর সাথে সাথে কুষ্টিয়াতে আমরা যারা বড় হয়ে উঠছিলাম, এবার তাদের পালা চলে এলো স্বাবলম্বী হয়ে যাবার। আমাদের কাছাকাছি বয়েসের মানে কয়েক বছরের কমবেশি লোকজন সব তাদের নিজের নিজের সবে শুরু হওয়া জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। অনেকে বেরিয়ে পড়লো কুষ্টিয়ার গন্ডী পেরিয়ে। পড়াশোনা, কাজ, পরিবার। অনেকে আবার ততদিনে নিজেদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই চলে গেলো। সদ্য পাড়া ছাড়া বলে তখনও সবাই পাড়ার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাই মাঝেমাঝেই হাজির হতো রবিবার বা অন্য দিন সন্ধ্যেবেলা। আমরা যারা রয়ে গেলাম কোয়ার্টারে তাদের জীবনে তেমন তারতম্য আসেনি, তবু পরিবর্তনটা বোঝা যেত তখন থেকেই যে কোয়ার্টার লোকজনের মুখগুলো পাল্টে যাচ্ছে। তবে অনেক চেনা মানুষকে যেমন আর দেখা যেতোনা, তেমনি অনেক নতুন মুখ আসতে শুরু হলো কুষ্টিয়ায়। দিব্যেন্দুদা, ডাকুকাকু, আমাদের ব্লকে বুড়িদের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধ দম্পতি, শুভাশিস। এদের অনেকে সাথে সাথে মিশে গেলো আমাদের সাথে, অনেকের লেগে গেলো বহুদিন। তবে হারিয়ে যাবার বৃত্তান্ত শুধু যারা কুষ্টিয়া ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো তারাই নয়। ১৯৯৬র থেকে ২০০০ য়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো বেশ কিছু আবাসিক, আত্মীয়, বন্ধু, পরিজন। অনেকে অকালে, অনেকে বার্ধক্যের কারণে। আলাদা করে কারও নাম করলামনা বাকিদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে। সময়ের চাকা যে থামিয়ে রাখা যায়না সেই উপলব্ধিও সেই একই সময়ে। এই সময় যে মানুষগুলো হারিয়ে গিয়েছে আমাদের জীবন থেকে, এই স্মৃতিচারণ খানিকটা তাদের সময়ের কুষ্টিয়াকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের এক আপাত-নিষ্ফল প্রচেষ্টা।

(চলবে )
Advertisements
Standard
Bengal, calcutta, memories, Nostalgia

কুষ্টিয়ার কড়চা : প্রথম পর্ব ১৯৮৫-১৯৯২

(যাঁরা ধৈর্য ধরে পুরো লেখাটা পড়বেন তাঁদের জানাই যে এখানে উল্লিখিত তথ্য প্রায় ২০-৩০ বছর আগের আর পুরোটাই স্মৃতিনির্ভর। হয়তো কিছু বিবরণের সময়সীমা ভুল হয়ে গেছে। সঠিক সময় / বিবরণ যদি দয়া করে জানান তাহলে সংশোধন করে নেব। আর এখানে পরিবেশিত ঘটনাগুলো যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভুলক্রমে কারও ভাবানুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।)

আমার বরাবরের ইচ্ছে ছিল কলকাতার স্মৃতিগুলো নিয়ে কিছু লেখার। তাই আগের লেখাগুলো পড়ে যখন রাজা বলল কুষ্টিয়া নিয়ে কিছু লিখতে, তখন ভাবলাম নয় কেন? তবে ফরমায়েশ মত ছোটবেলার বদমায়শিগুলোর বয়ান এ যাত্রা লিখলাম না, সেটা লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে আর জানিনা কে বা কারা পড়বে এই লেখা তারপর কার কি গোপন কথা ফাঁস করে দেব। তবে সময়মত লিখব তা নিয়েও কিন্তু রেখেঢেকে। এখনো যারা ভাবছে কুষ্টিয়াটা কি তাদের জন্য বলি কুষ্টিয়া হাউজিং তিলজলার এক সরকারি আবাসন যেখানে আমার জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময় কেটেছে। কুষ্টিয়াতে কাটানো পঁচিশ বছর আশির দশক থেকে শুরু করে মিলেনিয়াম ছাড়িয়ে একুশ শতকের কলকাতার বদলানো সময়ের প্রতিচ্ছবি। প্রথম দিকের সেই দিনগুলোর সাথে সাম্প্রতিক কালের ছবিগুলো মেলানোর চেষ্টা করলে দেখতে পাই যে মানুষের জীবন কী পরিমান বদলেছে এই পঁচিশ বছরে। এখানে সেই পুরো সময়টার মানচিত্রই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম যাতে এই ঘটনা বা স্মৃতিগুলোর সাথে যারা সম্পর্ক খুঁজে পায় তাদেরকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই পুরনো সময়ের নস্টালজিয়ায় হাবুডুবু খাইয়ে আনা যায়।

কুষ্টিয়ার পুরো ইতিহাস আমার জানা নেই। দেশভাগের পর কলকাতা যখন নাগরিকদের থাকার জায়গা যোগাতে নাজেহাল ঠিক সেই সময় সরকারি প্রচেষ্টায় কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে তখনকার সময়ের শহরতলিতে তৈরী করা হয় বহু চারতলা ফ্ল্যাট, বাসস্থানের স্বল্পতম চাহিদাটুকু মেটানোর জন্যে। Lower Income Group বা LIG নামের এই ফ্ল্যাটগুলো সাধারণত বরাদ্দ করা হয় সরকারের হাউজিং বিভাগে আবেদনের ক্রমানুসারে। কুষ্টিয়া এরকমই এক LIG ফ্ল্যাটবাড়ির কলোনি, পূর্ব কলকাতায় তিলজলা এলাকায়। ষোলটা ফ্ল্যাটবাড়িতে ৩১৬টা ফ্ল্যাট এই ছিল কুষ্টিয়ার সমষ্টি। ১৬টার মধ্যে ১২টা তৈরী হয় সত্তর দশকের শেষের দিকে আর আবাসিকরা আসা শুরু করে খুব সম্ভব ১৯৭৭ সালে। বাকি চারটে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরী হয় পরে, খুব সম্ভব সেখানে লোকে থাকা শুরু করে আশির দশকের গোড়ায়। এই নতুন আর পুরনো কোয়ার্টারদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ রেষারেষি প্রথম থেকেই ছিল, সেটা এখনো চলে আসছে তবে সদ্য তৈরী ফ্ল্যাটে সাত বছর আগে পরের মধ্যে যা তফাত সেটা তিরিশ বছর পর আর তেমন প্রকট নয়, তবে সে প্রসঙ্গে পরে আসব। পূর্ব কলকাতা তখন জলাজমিতে ভর্তি, বালিগঞ্জের সমৃদ্ধ এলাকার প্রান্তে শিয়ালদা সাউথ সেকশনের রেললাইন পেরিয়ে এঁদো রাস্তার দুপাশে খাটাল মাঠ ঘাট পেরিয়ে খোঁজ পাওয়া যাবে কুষ্টিয়ার। অনুমান করা যায় প্রথম দিকে আসা আবাসিকদের কথা, হঠাৎ এই জনমানুষহীন প্রান্তরে গড়ে ওঠা সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে আসা কম কথা নয়। চারপাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা নতুন তৈরী বহুতল বাড়িতে কুষ্টিয়া চারপাশের পরিবেশের মাঝে মরুদ্যানের মত ছিল। কুষ্টিয়া তৈরী হয় কলকাতার বাড়ন্ত বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে, এখানকার বেশিরভাগ আবাসিক ছিল সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর আর প্রতি ব্লকে ১ নম্বর ফ্ল্যাট বরাদ্দ ছিল ভিআইপি লোকদের জন্যে, তাই আবাসনে মন্ত্রী আমলা অফিসার কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের বড় সমাবেশ ছিল।

তারিখটা ঠিকঠিক মনে নেই তবে খুব সম্ভব ১৯৮৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী আমরা প্রথম এলাম কুষ্টিয়ায় যখন বাবা কলকাতায় বদলি হলো কৃষ্ণনগর থেকে। বাবা আগে আসবাবপত্র সব এনে রেখেছিল, আমি আর মা এলাম মামার বাড়ি থেকে, সময়টাও মনে আছে, বিকেল বেলা। আমার বয়েস তখন সাড়ে ছয়। কুষ্টিয়ার সেই প্রথম ছবিগুলো মনের মধ্যে এখনো গেঁথে আছে যা হয়ত কখনও ভুলবনা। গাড়ি তখন খুব কমই আসতো তবে কোয়ার্টারের মেন গেট ছিল পেছনের দিকে, কুষ্টিয়া রোড দিয়ে ঘুরে ঘুরে আসতে হতো। সেই রাস্তার ডানদিকে পুরনো কোয়ার্টার আর বাঁদিকে বড় মাঠ, ক্লাব ঘর আর মাঠ পেরিয়ে চারখানা নুতন কোয়ার্টার। গাড়ি ঢোকার জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলেও বাসরাস্তা থেকে আসা ছিল খুব সোজা। কুষ্টিয়া বাসস্টপ থেকে মেন রাস্তা ধরে একটু পিছনে হেঁটে এসে ছোট গেট যা আসলে দুটো ইঁটের দেয়াল। সেই ছোট গেটের পাশে PWD কোয়ার্টারের মেন্টেনেন্সের জন্য সেখানে এক কেয়ারটেকার ছিল, আর ছিল যত যন্ত্রপাতি, মায় একটা রোডরোলার অবধি। ছোট গেট থেকে ইঁটের ফুটপাথ বাঁদিকে দেয়াল তারপর রায়বস্তি আর ডানদিকে ছিল দুটো ডোবা। সেই ফুটপাথ বাঁদিকে বেঁকে ক্লাবঘরের সামনে দিয়ে পুরনো কোয়ার্টারের দিকে চলে গেছে, আর নতুনের দিকে একটা পায়ে চলা রাস্তা ঘাস ভরা মাঠের মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে মেন রাস্তা কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে যেখানে দুভাগে ভাগ হয়ে একটা পুরনো আর একটা নতুন বিল্ডিংয়ের দিকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পুরনো বিল্ডিংগুলোর দিকে দেখলে ডানদিকে এল আর বাম দিকে আই নাম্বারের ব্লক। নতুন গুলো সবই এল নাম্বার, আমরা এলাম এলজি তে, নতুন বাড়িগুলোর মধ্যে একদম প্রান্তে। আমরা যখন এলাম এলজিতে একতলায় মিলিটারী দাদু, রিজুরা, দাসকাকু আর জয়জয়ন্তী দোতলায় বুড়িরা, টাবু পিসি, হাজরাদাদু আর চক্রবর্তীরা, তিনতলায় আমরা গাঙ্গুলি জেঠুরা মিষ্টুরা আর পাল জেঠু চারতলায় পুনাম, মামনদিরা রিনিদিরা আর মানসকাকুরা। আমাদের বিল্ডিংয়ের পর পাঁচিল সেখানে দুধের ডিপো আর মাছ বিক্রির বাক্স। রোজ সকালে এই জায়গা ঘিরে ব্যাপক ব্যস্ততা, হরিণঘাটার দুধের গাড়ি এসে থামল কি সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল লাইনে হাতে তিন রঙয়ের কার্ড তিন রকম দুধের জন্যে। পাশে মাছের বাক্সে একজন মাছ বিক্রি করত বিভিন্ন রকম, সেটা সরকারি স্কিমে কিনা জানা নেই। ছোট গেটের পাশে পুকুরপাড়ে গোটা আবাসনের সব জঞ্জাল ফেলা হত। পুকুর দুটো ভরাট করে নতুন বাড়ি তৈরিই ছিল সরকারের মূল উদ্দেশ্য। গোটা কোয়ার্টারের ভেতরটা তখন বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলেও গেট দিয়ে ঢুকেই সেই নারকীয় দৃশ্য হয়তো এড়ানো যেত কিন্তু কর্তৃপক্ষ তেমন মাথা ঘামায়নি তা নিয়ে। ফ্ল্যাটের ভেতর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি প্রথম থেকে এখন অবধি খালি রান্নাঘরে ছাড়া। রান্নাঘরে লম্বালম্বি ছিল একটা সিমেন্টের রান্না করার জায়গা, যার নিচে গ্যাস সিলিন্ডার রাখারও ব্যবস্থা ছিল। সেই টেবিলের পর বাসন মাজার জায়গা আর অন্য কোণে ছিল একটা কংক্রিটের উনুন যেটার চুল্লি উনুন থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ির দেয়ালে পাইপ দিয়ে ছাদের ওপরে অবধি যেত। আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার ছিল ভেতরের ঘর আর বাইরের ঘরের মধ্যের করিডোরের ওপর জিনিসপত্র রাখার জায়গা।

৮৫তে যখন এলাম কোয়ার্টারের বাইরের পরিবেশটাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট গেট দিয়ে মেন রাস্তায় পড়লে রাস্তার উল্টোদিকে কুমারের সিগারেটের দোকান তার পাশে দাদুর দোকান। কুমারের দোকান থেকে বাসস্ট্যান্ড অবধি তখন ছিল সুনীলদার মুদির দোকান আর সুবীরদার মিষ্টির দোকান, মাঝখানে কাঁটাপুকুর যাবার রাস্তা। তারপর ছোটুদের লোহার দোকান আর তার পাশে চুল কাটার সেলুন, নামে উত্তম সেলুন হলেও চুল কাটত দুই ভাই, তাদের কারো নামই উত্তম ছিলনা। বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে টেলিফোনের বড় বাড়ি। আর রাস্তার উল্টোদিকে তখন কিছুই ছিলনা। কুষ্টিয়া মোড়ে খালি একটা বাঁশ বাখারী বিক্রির দোকান ছিল। আর তার পাশে ছোলা মুড়ি বাদাম ভাজার দোকান। আমাদের এলজি ব্লকের পেছন দিকে ছিল খাটাল। তিনতলার দক্ষিনমুখী বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যেত খাটাল বড় রাস্তা কাঁটাপুকুর ছাড়িয়ে আরো অনেক দূর। বিজন সেতু আর টালিগঞ্জের টিভি টাওয়ার। ছোট গেটের ডানদিকে দুটো মুদির দোকান আর একটা তেলেভাজার দোকান তারপর দেখা যেত ঢাউস রায়বাড়ি তাদের বিরাট বড় বাগান, রাস্তা থেকে লোহার প্যাটার্নের রেলিং। রাস্তার উল্টোদিকে দাদুর বিড়ির দোকান পেরিয়ে কয়লার গোলা আর গুটুর চায়ের দোকান অশ্বত্থ গাছের গায়ে। তারপর ছিল খালি জমি সবই রায়দের। পাঁচিল ঘোরা সেই জমিতে তাল তাল গোবর জমা করত লোকে খাটাল থেকে তারপর সেগুলো দিয়ে ঘুঁটে তৈরি হতো। অন্যদিকে বড় গেটের বাইরে ছিল ডাক্তারবাড়ি আর থাকত টুয়ারা। টুয়াদের বাড়ির পাশে একটা চারতলা বাড়ি তৈরী হতে হতেও হয়নি খালি বাড়ির খাঁচাটা খাড়া হয়ে ছিল বছরের পর বছর। বড় মাঠের কোনে ছিল অমলদাদের কলোনি। এইসবের বাইরে তখন ছিল শুধু ডোবা পুকুর আর বাঁশবাগান। ৩৯ আর ৪২এ বাস চলে যেত পিকনিক গার্ডেনের দিকে, আর ছিল পিকনিক গার্ডেন হাওড়া মিনি। যাতায়াতের এই সম্বল। আর হ্যাঁ আর একটা ব্যাপারও চোখে পড়ত তখন যে পাড়ার বাইরে বেরোলেই দুদিকে কাঁচা নর্দমা। আশেপাশে যত খাটাল ছিল তাদের আবর্জনা এসে পড়ত এই ড্রেনগুলোয়। আর সকাল বেলায় দেখা যেত সারি সারি বাচ্চারা এই ড্রেনের ধারে বসে সকালের কাজ সারছে ছোট বড় দুরকম বাইরেই। খানিক বৃষ্টি হলেই গরু মোষ মানুষের গু ভর্তি নর্দমা উপচে পড়ত বড় রাস্তায় যার থেকে কোনো নিস্তার ছিলনা। বাতাসে ভেসে আসত চার নম্বর ব্রিজের নিচের ট্যানারীর পচা গন্ধ আর ক্যালকাটা কেমিকেলের রাসায়নিকের গন্ধ — ফিনাইল, সাবান। সকাল দুপুর রাতে শিফট বদলের সময় ভোঁ বাজত, তখন আর ঘড়ি লাগতনা কটা বাজল জানতে। চারিদিক এতো নিরিবিলি ছিল যে বন্ডেল গেটের ট্রেন যাবার শব্দও শোনা যেত। আর একটা ব্যাপার না বললে তখনকার সময়ে আমাদের এলাকার নামডাক কেমন ছিল সেটা বোঝানো যাবেনা। কোনো জায়গা থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ফিরতে হলে কুষ্টিয়া বললে ড্রাইভাররা চিনতনা কিন্তু তিলজলা বললেই বেশীরভাগ ড্রাইভার তেল নেই, বাড়ি যাচ্ছি এই জাতীয় অজুহাত দেখিয়ে ভেগে পড়ত। হাতে গোনা সৎ কিছু ড্রাইভার স্বীকার করত এদিকে আসবেনা গোলমেলে এলাকা বলে।

তখনকার কুষ্টিয়ায় বিকেলের দিকে সারা পাড়াটা ভরে যেত বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েতে। নতুন কোয়ার্টারের ছেলেরা খেলত চারটে বাড়ির মাঝে। ক্রিকেট হত এল/এফ আর এল/জের মাঝে কিম্বা এল/জের সামনের দিকে। ফুটবল খেলা হত এল/জের সামনের মাঠে কিম্বা এল/জি আর এল/এইচের মাঝে। বড়রা ফুটবল ক্রিকেট খেলত মাঝের বড় মাঠে। পুরনো কোয়ার্টারের ছেলেরা খেলত আই/এর সামনের তেকোনা মাঠে। আমি নিচে নামতামনা তেমন কিন্তু রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখতাম সবকিছু। মেয়েরা খেলতে নামত অন্যান্য মেয়েদের সাথে। সেরকমই দেখতে পেতাম পাড়ার কাকীমা জেঠিমারাও নিচে নামত গল্প করতে, হাঁটতে। সব মিলিয়ে তখনকার কুষ্টিয়ায় এক দারুন প্রাণবন্ততা ছিল। রবিবার হলেই দলে দলে বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েরা আসতো আমাদের ব্লকের একতলায় জয়জয়ন্তীতে গানবাজনা শিখতে। গীটার, তবলা, সেটার, তানপুরা, সরোদ, গানের রেয়াজ সারাটা দিন মুখর হয়ে থাকত। তারপর ১০টা -১১টার দিকে খেলাধুলো শুরু হতো, ১ টায় সব বাড়ি। এখন ফিরে দেখলে মনে হয় যে তখন শুধুমাত্র আমাদের বয়েসের বা একটু বেশি বয়েসের ছেলেমেয়েরা যে পাড়ায় বেরোত তা নয়, আমাদের বাবা-মা বা তাদের কাছাকাছি বয়েসের মানুষটাও তখন অনেক তরুণ ছিল, তাই পাড়াটাও তখন অন্তত ছুটির দিনে গমগম করত। ৮৫-৮৬য়ের দিকে তারপর শুরু হলো কিশোর বাহিনী, তাতে খানিকটা স্বেচ্ছায় খানিকটা চাপে পড়েই ভর্তি হয়ে গেল কোয়ার্টারের বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীরা। তাদের কুচকাওয়াজ ইত্যাদিতে বিকেলবেলাটা বেশ সরগরম হয়ে থাকত। তাছাড়া চলতেই থাকত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্পোর্টস ইত্যাদি। শীত বসন্তের সময়টায় প্রথমে শুরু হত বসে আঁকো প্রতিযোগিতা তাতে সারা দিন ধরে সব বয়েসের ছেলেমেয়েরা যোগ দিত। তার কয়েক সপ্তা পর হত স্পোর্টস। আগের দিন সারাদিন ধরে চুন দিয়ে লাইন টানা, বিরাট বড় স্পোর্টস জাজদের ক্যাম্প, চোঙ লাগানো মাইক সবই থাকত। সকাল থেকেই মাইকে অ্যানাউন্স শুরু হয়ে যেত “যে সব প্রতিযোগী এখনো চেস্ট নাম্বার নেয়নি তাদেরকে অনুরোধ করা হচ্ছে যেন এখান থেকে নাম্বার নিয়ে যায়” অথবা “অমুক ইভেন্টে এখনো নাম নেয়া হচ্ছে” ইত্যাদি। সারাদিন বিভিন্ন রকমের প্রতিযোগিতার পর স্পোর্টস শেষ হত মহিলাদের মিউজিক্যাল চেয়ার আর পুরুষদের হাঁড়িভাঙা দিয়ে। তারপর সন্ধ্যাবেলা শুরু হত Go As You Like বা যেমন খুশি তেমন সাজো। নতুন বনাম পুরনো কোয়ার্টার কে কত বিভাগে জিতলো তার তেমন রেশারেশি ছিলনা কিন্তু এল বনাম আই একটা তুলনা সব সময় চলত। স্পোর্টস ছাড়াও বছর জুড়ে লেগে থাকত ফুটবল টুর্নামেন্ট ছোটদের বড়দের, তারপর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ফুটবল লীগ বিভিন্ন পাড়ায় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এছাড়া চলত ভলিবল ব্যাডমিন্টন তাস ক্যারম দাবা একটা না একটা কিছু। আর ছিল রাজনীতি। তখনকার দিনে পাড়ায় রাজনীতি বলতে সিপিএম, দু চারজন অন্যান্য বামপন্থী দলের সমর্থক থাকলেও খুব কম। বিপক্ষে কংগ্রেস সমর্থক ছিল হাতে গোনা। মাসে অন্তত একদিন কোনো না কোনো মিটিং মিছিল লেগেই থাকত তার বেশির ভাগই লাল ঝান্ডা কাঁধে নিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলতে বলতে কোয়ার্টারে চক্কর মেরে চলে যেত মেন গেট দিয়ে বাইরে। ভোটের দিন সাজসাজ ব্যাপার কিন্তু প্রথমের দিকে ভোটের সিট পড়ত ব্রজনাথে পরের দিকে কোয়ার্টারে ক্লাবঘরে ভোট নেয়া শুরু হয়ে অনেকেরই সুবিধা হয়েছিল।

আর একটা ব্যাপার যেটা না বললে আমাদের আশেপাশের পরিবর্তনটাকে বলে বোঝানো যাবেনা সেটা হলো রাসমেলা। আমাদের পাশের রায়বাড়ি খুব সম্ভব বৈষ্ণব, তারা প্রতি বছর রাসমেলার আয়োজন করত রাস পূর্নিমার সময়। এমনিতে এক সপ্তাহের জন্য চলত মেলা কিন্তু প্রথম যে বছর এলাম মেলা দেখে তাক লেগে গিয়েছিল। রায়বাড়ির জমিজায়গা তখন বেচাকেনা শুরু হয়নি, তাই বাড়ির পুরো চৌহদ্দিটাই মেলার দোকান পাটে ভরে যেত। আমাদের কুষ্টিয়া বাসস্টপ থেকে শুরু করে মেলার দোকান ছড়িয়ে থাকত প্রায় বন্ডেল গেট অবধি। রায়বাড়ির ভেতরে সাজানো হত রাধা কৃষ্ণের মূর্তি আর বিভিন্ন মডেল অনেকটা ঝুলন যাত্রার মত। বাড়ির বাইরে সামনের মাঠে বসত রাশি রাশি দোকান আর কোনে যাত্রার তাঁবু। রাস্তার উল্টোদিকের জমিগুলো বছরের বাকি সময় পাঁচিলে ঘেরা থাকত গরু মোষ চড়ানোর জন্যে কিন্তু রাসমেলার সময় সেই পাঁচিল ভেঙ্গে বসত বিভিন্ন দোকান আর নাগরদোলা। রাসমেলা শুরু প্রথম চারদিন রাত ১০টার দিকে পোড়ানো হত বিচিত্র সব বাজি বেশির ভাগই আলোর বাজি এখনকার দিনের মত, শব্দবাজি ছিলনা বললেই চলে। তখনকার দিনে ওই বাজি যোগাড় করতে কত যে খরচ হত কে জানে। তবে আমরা বাড়ির জানলা দিয়ে পুরো সময়টা দারুন এনজয় করতাম। শেষের দিনে স্পেশাল থাকত গাছবাজি। সেই আশির মাঝামাঝি রাসমেলার কাছাকাছি সময়ে প্রথম যেটা চোখে পড়ত সেটা হলো রাশি রাশি আখ। আর প্রচুর দোকান খালি জিলিপি নিমকি কাঠি আর বাদামভাজার। সেই তখন থেকে পরের ২৫ বছরে রাসমেলা কিভাবে পাল্টেছে তার বর্ণনা পরে করব।

আমার সেই প্রথম কয়েক বছর কুষ্টিয়ার স্মৃতিতে পুজোর সময়গুলো তেমন মনে নেই ভালো করে। বর্ষার মাঝামাঝি একটা পুজো কমিটি বসত তাতে সবাই ঠিক করত কি কি করা হবে, কত চাঁদা নেয়া হবে ইত্যাদি। পাড়ার দুর্গাপুজো তখন নমো নমো করেই সারা হত। বিজ্ঞাপন তেমন কিছু আসতনা, বাজেটও ছিল সীমিত। ক্লাবের চাতালটা জুড়ে প্যান্ডেল করা হত প্রতিমা আসতো বাড়ির কাছাকাছি কোথাও থেকে, আলো মাইক সাপ্লাই দিত পাড়ার সাপ্লায়ার তাতে নীল সবুজ টিউবলাইট আর হলুদ রঙের বাল্বের চেন আর গোটাকয় হ্যালোজেন এই সম্বল। পুজোর কয়দিন আগে বিলি করা হতো পুজোর ম্যাগাজিন যেখানে থাকত সম্পাদকীয়, পুজো নির্ঘন্ট আর বাঁধাধরা গোটাকয় বিজ্ঞাপন। কিন্তু পুজোটা সেই সময় উপভোগ করত সবাই, পুজোর জন্যে নাটকের মহড়া চালু হত কয়েক মাস বাকি থাকতেই। ক্লাবঘরের পাশে তালগাছে চোঙা বেঁধে চলত গান, পুজোর নির্ঘন্ট বলা। সেই প্রথম আসা থেকেই শুনে আসছি শিবদার গলা, এই এতো বছর ধরে এতো পরিবর্তনের মাঝে শিবদার অ্যানাউন্সমেন্ট পাল্টায়নি কখনও। বড় রাস্তার দিকে পুকুরপাড়টা ঘিরে দেয়া হত কাপড় দিয়ে যাতে জঞ্জাল দেখা না যায়। সন্ধ্যেবেলা পাড়ার প্রায় সব লোকই নামত নিচে, বিচিত্রানুষ্ঠান হাতে গোনা হলেও বেশ আকর্ষক ছিল। লক্ষ্মীপুজো ক্লাবে হত বলে মনে পড়েনা হলেও একদমই বিনা আড়ম্বরে। কালী পুজোর বাজেটও হাতে গোনা, তবে কালী পুজোর তখনকার আসল আকর্ষণ ছিল বাজি, কার বোমের শব্দ কত বেশি। আলু বোম চকলেট বোম বেচা দোদমা ধানী পটকা কালী পটকা কত রকমের পটকা যে ছিল তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের লোকাল বিখ্যাত বোম ছিল বেচা, যেটা বিক্রি করত বেচাদা, ব্রজনাথের দিকে কোনো এক গলিতে। তার আওয়াজ বুড়িমার ব্র্যান্ডেড বোমের আওয়াজকে আরামসে টেক্কা দিয়ে দিত। কেউ কেউ বাজি বানাত বাড়িতেই। আর অনেকে যেত নুঙ্গিতে কম দামে নিত্যনতুন বাজি জোগাড় করতে। প্রায় সব বাড়িতেই চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হত আর যারা ইলেকট্রিক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালবাসত তারা জ্বালাত নিজেদের বানাত টুনি লাইটের চেন। কালী পুজোর পর লম্বা অপেক্ষা নতুন ক্লাসে উঠে সরস্বতী পুজোর। ক্লাবে একটা পুজো হত ঠিকই কিন্তু আরো বেশ কয়েকটা সরস্বতী পুজো হত একটা আমাদের নতুন কোয়ার্টারে, পুরনো কোয়ার্টারে আরো তিন চারটে। পুজোর দিন লোকজন তাদের নিজেদের ব্লকের পাশের পুজোতেই যোগ দিত বেশি, সেই নিয়ে ক্লাবের লোকজনের সাথে পরের দিকে কম গন্ডগোল হয়নি।

প্রথম তিন বছরে কুষ্টিয়ার স্মৃতি তেমন নেই বললেই চলে। এই কয় বছর আমি একদম ঘরকুনো হয়ে ছিলাম, স্কুল বাড়ি আর আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ছাড়া তেমন কারো সাথেই মিশতাম না। কিছু কিছু ঘটনা মনে আছে এই সময়ের যেমন একদিন বাড়ি ফিরছি বাড়ির সামনে সবাই ক্রিকেট খেলছে দর্পণ আমায় খেলতে ডাকলো, হাতে ব্যাট ধরিয়ে। ছটা বল খেলে তিনবার বোল্ড হয়ে খেলবনা বলে বাড়ি চলে গেলাম। ৮৫-৮৬ সালের দিকে নতুন কোয়ার্টারের দিকে গাছ গাছালি লাগানো শুরু হয়, প্রধানত হাজরা দাদুর উদ্যোগে। ছোট ছোট গাছ লাগিয়ে তাদের বাড়ার অপেক্ষা, প্রথমে কঞ্চি বা বাখারির বেড়া তারপর গাছ বড় হলে ইঁটের ঘেরাটোপ। সকালে বাবা সাইকেল চালাতে দিত, সেই সাইকেল চালানোর সুত্রে আর বাড়ি ভাড়া জমা দেয়ার জন্যে যেতাম পুরনো কোয়ার্টারের দিকে, তখন পাম্পঘর তৈরী হয়নি, বাড়িতে জল আসে মেরিনদের ফ্ল্যাটের সামনের জলের ট্যাঙ্ক থেকে। ১৯৮৬ সালে কুষ্টিয়া হাউজিং নাম পাল্টে হলো অবন্তিকা আবাসন, ক্লাবঘরের দেয়ালের পাশে এক চিলতে টিনের ফলক, তার উদ্বোধন করে গেলেন খুব সম্ভব প্রশান্ত সুর, তখনকার এমপি। আর একটা ঘটনা আবছা মনে আছে ক্লাবের চত্বরে একটা তথ্যচিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল ড্রাগের কুফল নিয়ে। একজন মাইমও অভিনয় করেছিল সেই সাথে। মূকাভিনয়ের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা। ৮৬তে চালু হল ৩৯এ বাস সল্টলেক অবধি। বাবা সাইকেল ছেড়ে সেই বাসে অফিস যাওয়া শুরু করল বিদ্যুৎ ভবনে। উত্তম সেলুনে নতুন মালিক এলো তার নাম সত্যিসত্যিই উত্তমদা।

প্রথম কয়েক বছরে কুষ্টিয়া কেমন দেখতে ছিল সেই বর্ণনার থেকে সরে এসে যদি দেখা যায় দিনকালের সাথে আমাদের কোয়ার্টার কেমন আর কতখানি বদলেছে, সেই তুলনার জন্য পরের কুড়ি বছরকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে নিলাম। এতে বিভিন্ন ঘটনা গুলোর ঠিকঠাক সন তারিখ না দিয়েও একটা ধারনা দেয়া যায় কোন বছরে সেটা ঘটেছিল।পরবর্তী অংশগুলোতে সেই ভাগগুলোরই বিবরণ রইলো।

কুষ্টিয়ায় তোলা এটাই আমার প্রথম ছবি। সাল খুব সম্ভব ১৯৮৬। পেছনে এল/জি ব্লক আর দুই ব্লকের মাঝের সেপটিক ট্যাঙ্ক। ছবি তোলার জন্য আদর্শ প্রেক্ষাপট।

১৯৮৮-১৯৯২

এই বছরগুলোয় প্রথম পাড়ায় বন্ধুত্ব পাতানো শুরু করি। বিকেলের দিকে নিচটা এত লোকের এত রকমের কার্যকলাপে গমগম করত যে ভয় পেতাম কাউকে চিনিনা কি করব নিচে গিয়ে। প্রথম বন্ধুত্ব হয় বুল্টুর সাথে, কমিকস আদান প্রদানের মাধ্যমে। তার আগে বাড়ির জানলায় বসে বসে ববিদা টিঙ্কু ভাস্করের সাথে আলাপ হয়েছে কিন্তু ওই অবধিই। আর ব্রজনাথে পড়ার সুত্রে চিনতাম ছোট রাজাকে। ও আসত ওর মার সাথে আমাদের বাড়ি, আমার পছন্দের তোতনের জায়গায় নাড়ু ডাকনামটা পাড়ায় ছড়ানোর দায় ছোট রাজারই। প্রথম প্রথম পাড়ায় নেমে কি করব বুঝে পেতাম না, বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েরা খেলছে, ঠিক কাদের সাথে ভিড়ব কোনো ধারনাই ছিলনা। শেষে গিয়ে জুটলাম পাকা রাস্তায় ক্রিকেট খেলা বাবুনদা, বাবলাদা, শোভনদা এদের দলে, উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতাম বল কুড়িয়ে এনে দেব বলে। তারপর কয়েকদিন খেললাম আমাদের ওপরের গ্রুপটায় পান্টুদা টুটুনদা এদের সাথে ক্রিকেট খেলে। তারপর আস্তে আস্তে আলাপ হলো আমাদের বয়েসী ছেলেদের সাথে, তখন আমাদের গ্রুপটা ছিল অনেক বড়, তাই খেলার সময় বেশির ভাগ সময় কাটত পাশে বসে। আমিও তাতে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করে খেলা দেখতে আর শিখতে লাগলাম। তারপর কিছুদিন বাদে এক্সট্রা গোলকীপার, বা ৫ মিনিট ব্যাকে খেলা এভাবেই খেলাধুলো আর তার সাথে পাড়ার বন্ধুরা দুটোর সাথেই পরিচয় হলো। সেই সময় খেলার জন্যে প্রচুর ভিড় হত, আগে আগে নেমে মাঠে না দাঁড়ালে টিমে ঠাঁই পাওয়া মুশকিল। আমাদের ব্লকে তখন খালি আমি, বাবাইদের ব্লকে বাবাই লম্বা বুম্বা তোতন, বুল্টুদের ব্লকে বুল্টু ববিদা টিঙ্কু টুনাদা ভাস্কর আর ডাকুদের ব্লকে দর্পণ চন্দন পিম্পু রাজা ডাকু বাপ্পা সোনাদা অভি। বাইরে থেকে আসত টুয়া, আর রাজু খেলতে আসত আমাদের সাথে যদিও ও থাকত পুরনো কোয়ার্টারে। ৮৮তে মনে আছে বিরাট বড় করে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হলো। প্রতি রবিবার করে বিভিন্ন দলের ম্যাচ, একটা বড়দের একটা ছোটদের টুর্নামেন্ট। বোধহয় সেই প্রথম পুরনো কোয়ার্টারে আমাদের বয়েসী ছেলেদের নাম জানতে পারলাম – ছোট পাপ্পু, বড় পাপ্পু, নিপু, ছুটকি, রাজা সেন, বুম্বা, ট্যারা বাবাই, মেরিন, খোকন। বড়দের টুর্নামেন্টে তখন প্রচুর রেষারেষি। একটা ম্যাচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছি তাতুদা আর দেবুদার খুব ঝগড়া লাগলো, তাতুদা কি একটা ফোড়ন কেটেছিল দেবুদা বলে দুম করে এক লাথি মারলো দুটো বাচ্ছা মেয়ে খেলা দেখছিল ঠিক তাদের দুটো মাথার মাঝখানে বল লাগলো, দুজন দুদিকে ছিটকে পড়ে গেল। ঝগড়া ওখানেই শেষ। আর একবার মনে পড়ে স্পোর্টসের দিনে শেষ বড় ইভেন্ট শটপুট আমরা বলতাম বাংলা গোলা। লাইন কেটে লোকজনকে তার ভেতরে না আসতে বললেও লোকজনের প্রচুর উৎসাহ, মাথাটা একটু বাড়িয়ে যদি একটু বেশি দেখা যায়। দীপদা ছুঁড়লো বলটা, সেটা গিয়ে পড়ল একটা অতি উৎসাহী লোকের ঘাড়ে। সে সেখানেই অজ্ঞান, তারপর হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স অনেক কিছু অবধি গড়ালো।

কুষ্টিয়ায় তখন খেলাপ্রেমী মানুষের সংখ্যা আর উদ্যোগ কোনটারই কমতি ছিলনা। ফুটবল ছাড়াও ক্রিকেটের মরসুমে প্রথম থেকে শুরু হত পিচ রোল করা, ক্রিজ বানানো তারপর শুরু হত প্র্যাকটিস। আর মনে পড়ে শীতের শুরু থেকেই নেট টাঙিয়ে বোলিং প্র্যাকটিস করত প্রদীপদা (নামটা ঠিকই লিখলাম মনে হয়), তা সে যতই শীত পড়ুক বা যতই কুয়াশা থাকুক। বাঁহাতে বোলিং করলেও আমরা বলতাম আড়ালে আড়ালে কপিলদেব। তখন অতশত খতিয়ে না ভাবলেও অধ্যবসায় শব্দটার মানে এখনও সেই কপিলদেবের সকল পাঁচটা থেকে এক নাগাড়ে বল করে যাওয়ার ছবি। ৮৮র দিকে ক্লাবঘরের চালচিত্রটাও বেশ বদলে গেল। ভাবতাম ক্লাবঘর মানেই বড়দের জায়গা আমাদের যাওয়া বারণ। কিন্তু সেই সময় ক্লাবঘরের খোলনলচে পাল্টে গেল। ছোটদের খেলাধুলায় উৎসাহ যোগানোর জন্যে সবাইকে ক্লাবের মেম্বার করে নেয়া হলো, ইচ্ছা অনিচ্ছার ধার না ধরেই। চাঁদা মাসে ২ টাকা। আমাদের বয়েসীদের খেলার সময় ধার্য করে দেয়া থাকত, তখন বড়রা কেউ আমাদের জিনিস নিয়ে খেলতে পারবেনা। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ করে সবার দাবা খেলার প্রচুর ঝোঁক শুরু হলো। বুল্টু আর আমি প্রায় পুরো ধার্য সময়টাতেই দাবা খেলে কাটাতাম, তখন সবাই দিব্যেন্দু বড়ুয়া আনন্দ বা কাসপারভ। আমাদের একতলার মিলিটারি দাদুর সাথেও অনেক দাবা খেলেছি সেই সময়, তবে তখন আমাদের সাথে দাবা খেলত বুম্বা, যার পোষাকি নাম রক্তিম ব্যানার্জী, নামকরা দাবাড়ু হয় পরে। পাড়ার পুরনো পাকা দাবা খেলুড়ে মাস্টারদা সুব্রতদা মিলিটারি দাদু সবার সাথে বুম্বার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে ভিড় জমে যেত। তাছাড়া ছিল ক্যারম আর লুডোও তবে ক্যারমে চান্স পাওয়া যেতনা এত ভিড় হত।

আশির শেষের দিকে কোয়ার্টারে খুব লোডশেডিং হত সন্ধ্যেবেলা। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়িতে বসে না থেকে অনেকেই নিচে নেমে পড়ত। তখন আমাদের সাথে সাথে আমাদের ওপরের গ্রুপটারও বয়েস তেমন হয়নি, তাই বাজে গুলতানি তেমন মারা হতনা, অন্ধকারে শুরু হত কুইজ, ধাঁধা গানের লড়াই ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে জমত যেটা সেটা হলো আইসপ্রাইস। আইসপ্রাইস আমরা আগেও খেলতাম বিকেলে খেলাধুলার পর বাড়ি যাবার আগে কিন্তু অন্ধকারে সে খেলার মজাই ছিল আলাদা। তখন লুকোবার জায়গার অভাব ছিলনা, অনেকে লুকোত দুধের ডিপোয়, ডাকু চিরকালই ডানপিটে, ও পাইপ বেয়ে সানশেডের ওপর লুকোত। আমাদের ক্রিকেট খেলার জায়গাটাও পাল্টে গেল এই সময়, নতুন পিচ হলো বুল্টুদের বাড়ির সামনে। ওদের বাড়ির সামনের ইঁটের রাস্তা ছিল আন্ডারহ্যান্ডের ক্রিজ আর মাঝে মধ্যে ওভারহ্যান্ড হলে তখন আরেকটু পেছন থেকে। ৮৯য়ে খেলতে গিয়ে হাত ভাঙলাম বাপ্পার শট আটকাতে গিয়ে। অমলদাকে বললাম হাত মনে হয় ভেঙ্গেছে অমলদা দুস পাগল কিচ্ছু হয়নি বলে সেই ভাঙ্গা হাত খানিকক্ষণ ঝাঁকিয়ে দিল। আর কয়েক বছর পর শুরু হলো ফুটবল খেলে পুরনো কোয়ার্টারের পুকুরে চান করতে যাওয়া। আমাদের খেলাধুলায় তখন প্রচুর বাধা দেয়ার লোক। রিজু অভি পাপানদের সাথে এলজির সামনে খেললে ওয়াটার কোম্পানি (আসল নাম বললামনা ) জানলা থেকে গামলা গামলা জল ঢালত মাঠে যাতে আছাড় খেয়ে পড়ে যাই, রায়কাকু বারণ করত তবে দোতলায় বল গেলে, মিলিটারি দাদুর বারান্দা ছিল গোল তাই ক্ষণেক্ষণেই বল লাগত গ্রিলে। ক্রিকেট খেলার সময় বুল্টুদের ব্লকে ছিল মিহির জেঠু, ওদের বাড়ি বল গেলে আর সেটা ফেরত পাওয়া যেতনা, বঁটি দিয়ে বল কেটে ফেরত দিয়েছিল একবার মনে আছে। ববিদার মা খুব চেঁচামেচি হলে চুপ করতে বলত কিন্তু ওই অবধি।

খেলাধুলোর বাইরে আর যে ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের প্রচুর উৎসাহ ছিল তা হলো সরস্বতী পুজো। বাড়ি বাড়ি পুজো ছাড়াও তখন পাড়ায় নয় নয় করে পাঁচ ছটা পুজো। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের ছোটদের করা পুজোটা আমাদের মতে ছিল সবচেয়ে ভালো আর বড়, ঠিক ভুল এখন সেটা আর যাচাই করা যাবেনা। জানুয়ারী মাস থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত কি বাজেট কোথা থেকে ঠাকুর আসবে এই সব। বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলতে যেতাম অনেক রকম প্রতিশ্রুতি নিয়ে – বিল্ডিংয়ে আলো লাগানো হবে, প্রসাদ দেয়া হবে, খালি বাংলা গান চালানো হবে সিনেমার গান না আরো কত কি। পুরনো কোয়ার্টারেও যেতাম তবে শুধু চেনা লোকদের বাড়ি। এই চাঁদা তোলার মাধ্যমেই পাড়ার আশপাশটা আরো ভালো করে জানতে পারলাম। পুজোর প্যান্ডেলের জন্যে বাঁশ না কিনে কোথায় কার বাগানে চুরি করা যায় সেই সন্ধানে চলে যেতাম ঘোষপাড়া হয়ে ব্রজনাথ স্কুল অবধি। ধরা পড়লে ঠ্যাঙানি কিন্তু কখনও সেটা হয়নি, বরং এক বাড়িতে বাঁশ চুরি করে ধরা পড়ে সেই বাঁশ ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়ে পাঁচ টাকা চাঁদাও পেয়েছিলাম। পুজোর দুদিন আগে কেনা হত বাখারী বাসস্ট্যান্ডের কোনের দোকান থেকে। আর লাইট মাইক ভাড়া নিতাম কাঁটাপুকুরের শম্ভুর থেকে। পুজোর দুদিন আগের সন্ধেবেলা অমলদা আসত প্যান্ডেলের মূল কাঠামো কেমন হবে সে সব ঠিক করে দিতে। তার পরদিন শুরু হত শেষ করার কাজ, প্রথমে খবরের কাগজ তারপর মার্বেল পেপার বা অন্যান্য প্যাটার্ন। পুজোর দিন সকালে ঝটপট উঠে প্যান্ডেলের বাকি কাজ শেষ করে অঞ্জলি দিয়ে তারপর আমাদের পুজো শুরু। ভানুকাকুই বরাবর পুজো করে এসেছে অনেক জেরাজেরী করেও ৫০ টাকাই ছিল দক্ষিনা। তারপর সারাদিন খুব গর্ব করে বসে থাকতাম প্যান্ডেলের পাশে, তাছাড়া পাহারা দেয়াও জরুরি ছিল কেউ এসে যাতে প্যান্ডেল নষ্ট করে না দিয়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও চলত সিনেমার গান, ভানু আর উত্তম দাসের কৌতুক নকশা। পরের দিকে ভোগ দেয়াও শুরু করেছিলাম সেটা খালি আমাদের পুজোয়ই চালু হয়েছিল, ববিদাদের বাড়ি রান্না হত ভোগ আর লাবড়া। ক্লাবের পুজোয় মাছি ভনভন করত তাই আমরা ছিলাম অনেকেরই চক্ষুশুল। ক্লাব থেকে অনেকবারই পুজো বন্ধ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমরা চালিয়ে গেছিলাম সবার সমর্থনে। আর পুজো মানেই ছিল ব্রেক ড্যান্স। আশির শেষ নব্বইয়ের শুরু তখন মাইকেল জ্যাকসন খ্যাতির চুড়ায়। তাই সন্ধ্যে হলেই মাইকে মাইকেল জ্যাকসন, বনি এম আরো সব নাম না জানা পশ্চিমী সুর আর বাপ্পা আর রাজুর ব্রেক ড্যান্স, আমরা ভিড় করে দেখতাম। আরেকটু বড় হলে তখন আস্ত ভিডিও সারা রাত ধরে বুল্টুদের বাড়ি না হয় ববিদাদের বাড়ি, রকি রেম্বো শোয়ারজেনেগারদের সাথে সাক্ষাত সেই প্রথম। ভিডিও দেখার বাজেট আলাদা, চাঁদার টাকা থেকে আসতনা তবে দেখি বা না দেখি ভিডিওর চাঁদা দিতেই হত। পুজোর শেষে সব বাঁশগুলো আবার চলে যেত পাম্পঘরের মাথায় সামনের বছরের জন্যে।

খেলাধুলার বাইরে সোশাল জীবনেও যে আস্তেআস্তে ছেলেবেলা কাটিয়ে কৈশোরে পা দিচ্ছি সেটা বোঝা যেত। প্রথমদিকে খেলতাম মেয়েদের সাথেও, সবসময় না কখনো কখনো, পরের দিকে ছেলেরা মেয়েরা আলাদা আলাদা যে যার মত গ্রুপে কাটাত। আমাদের আলোচনায় আসতে আসতে ঢুকতে শুরু করলো মেয়েরা এবং তাদের অ্যানাটমি। দু চারজন বন্ধু এরই মধ্যে সিগারেট ধরেছে, নিয়মিত না হলেও সিনেমায় গেলে বা পুজোয় বেরোলে তখন দু একটা টান মেরে হাতে হাতে ঘুরত। ৯১য়ে বুল্টু আর বাপ্পা পাপাইদাদের গ্রুপের সাথে চিড়িয়াখানায় যাবে বলে ঠিক করেছিল, শেষে রান্নাবান্নার ঝামেলা হওয়ায় আমাকে আর ভাস্করকে যোগ করলো সেই দলে, যদি আমরা লুচি বানিয়ে নিয়ে যাই। সেই প্রথম বেড়াতে যাওয়া বড়দের সাথে। পুজো ছাড়াও কখনো সখনো ভিডিও আনা হত, সব বন্ধুরা সন্ধ্যেুবেলা আসলেও রাতের দিকে হাতে গোনা কয়েকজন থাকতাম, সেখানে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল অ্যাডাল্ট ছবি। পাড়ায় খেলতে নেমে বাড়ি ফেরার সময় পাল্টাতে পাল্টাতে ৬টা – ৭টা -৮টা হয়ে গেল, আমাদের বয়েসী তেমন কেউই থাকতনা, যারা থাকত তাদের নাম মার্কা পড়ে গেল বখাটে বলে।

আমরা কুষ্টিয়ায় আসার পর ৯০-৯১ য়ের দিকে প্রথম দেখলাম বাড়িগুলোর রিপেয়ার শুরু হয়েছে। প্রথমে পুরনো কোয়ার্টার তারপর নতুন গুলো, সবের ওপর নতুন ফ্যাকাশে হলুদ রঙের আস্তরণ পড়ল। একতলা থেকে ছাদ অবধি বাঁশের ম্যারাপ বেঁধে বিরাট কর্মকান্ড, তখন কনট্র্যাক্টরদের কাজ পাইয়ে দেবার জন্যে একবার কাজ শুরু হলো তো শেষ হবার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ততদিনে বেশির ভাগ বাড়িতেই গ্যাস বা কেরোসিনের স্টোভে রান্না হয়, তাই আগের উনুনের জন্যে লাগানো চুল্লিগুলোর আর তেমন দরকার রইলোনা, সেগুলো যেমনকার তেমনই রয়ে গেল। তখনও সিঁড়ি ধোয়ার চল চালু ছিল। আমাদের জমাদার পরমেশ্বর আসত প্রতি দু সপ্তায় প্রতি ফ্ল্যাট থেকে এক বা দু বালতি জল ঢেলে দেয়া হত সিঁড়িতে, কয়েক ঘন্টা গেলেই সিঁড়ি আবার ঝকঝকে। আর মনে আছে হাজরা দাদু পরমেশ্বরকে সব নর্দমাগুলো পরিস্কার করাতো আর বারান্দা থেকে নজর রাখতো পাছে ফাঁকি না মারে।

৮০র শেষের দিকের সেই সময়ে আরেকটা ব্যাপারের বেশ চল ছিল। খাঁচা ভ্যান। কোয়ার্টারের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই পড়তো সাউথ পয়েন্ট না হয় পাঠ ভবনে। আমাদের কুষ্টিয়া থেকে সেটা কম দূর না। আগে সবাই বাবা-মার হাত ধরে স্কুলে যেত কিন্তু খাঁচা ভ্যান আসার পর থেকে লোকে খাঁচা ভ্যান করেই যাতায়াত করতো স্কুলে। খাঁচা ভ্যান হলো তিন চাকা রিকশা ভ্যান যা মোট বওয়ার জন্যে ব্যবহার হয়, শুধু এখানে পাটাতনের বদলে টিনের খাঁচা। দুদিকে দুটো কাঠের তক্তা দিয়ে বসার জায়গা। তখন গ্রীষ্মকাল এখনকার মতো গরম হতোনা, তবু ওই খটখটে রোদ্দুরে চারদিক ঢাকা টিনের খাঁচায় যাতায়াত যে খুব একটা সুখকর ছিলোনা সেটা অনুমান করাই যায়। খাঁচা ভ্যান চালাতো অমলদা। তাই ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো সংশয় ছিলোনা। অমলদার সাথে তাদের সম্পর্ক বাড়ির লোকের মতোই ছিল। পরে খাঁচা ভ্যান কেন বন্ধ হয়ে গেলো তা জানা নেই। হয়তো বন্ডেল গেটের জ্যামে এত সময় নষ্ট হতো যে পরের দিকে লোকজন হেঁটেই আগে পৌঁছে যেত। আর তাছাড়া বালিগঞ্জ ফাঁড়ি অব্দি অটো চালু হবার পর খুব অল্প সময়েই সাউথ পয়েন্ট বা পাঠ ভবনে চলে যাওয়া যেত।

কোয়ার্টারে পরিবর্তনের সাথে সাথে তখন বাইরেটাও পাল্টে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। আমাদের বাড়ির সামনে বস্তিতে একদিন তালগাছ দুটো কেটে ফেলা হলো চোখের সামনে। সেখানে দু তিনটে বাড়ি তৈরী হলো ভাড়া দেয়ার জন্যে। পুরসভায় তখন সবে নিয়ম পাশ হচ্ছে সব খাটালকে শহরের বাইরে নিয়ে যাবার জন্যে। সেই নিয়ম মেনে বাড়ির সামনের খাটালটাও উধাও হয়ে গেল একদিন। কুমারের সিগারেটের দোকানের বিক্রিবাটা বাড়তে শুরু করলো আমাদের বন্ধুবান্ধব আর আমাদের ওপরের পাপাইদাদের গ্রুপ তখন একটু বড় হয়ে যাওয়ায়। কুমারের দোকানের পাশে চালু হলো নতুন এক মনিহারী দোকান, তার মালিককে আমরা ডাকতাম আঙ্কেল। ৯১-৯২ য়ের দিকে সেখানে এলো হুইস্কি রাম জিন ইত্যাদি স্বাদের লজেন্স। আর কাঁটাপুকুর যাবার রাস্তার পরে নস্করদের বিরাট বাড়ির সামনের দিকে চালু হলো অভিরুচি, আমাদের প্রথম রেস্টুরেন্ট। চপ কাটলেট মোগলাই সেসবের সেই শুরু। বড় রাস্তার দুপাশে এতদিন যে কাঁচা নর্দমা ছিল তার ওপরে বড় বড় কংক্রিটের চাঁই বসল। এতদিন রাস্তায় হাঁটাচলা করতে খুব অসুবিধা হত, প্রান হাতে করে গাড়ি চলা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হত। বর্ষার সময় রাস্তা ডুবে গেলে আরো দুর্দশা, রাস্তার মাঝের দিকে গেলে গাড়িচাপা পড়ার ভয় আবার বেশি ধারের দিকে গেলে ঝপ করে নর্দমায় গিয়ে পড়তে হবে। সেই কভার বসে এতদিন চলে আসা সমস্যার একটা সুরাহা হল। কিন্তু কদিন পরই সেই কভার দখল হয়ে গেল অরার রোলের দোকান, হাটকার চায়ের দোকান এর তার রিক্সা ঠ্যালাগাড়ি সব মিলে আবার পূনর্মুষিকো ভবঃ।

এই সময়ই প্রথম কোয়ার্টারের বাইরের লোকজনের সাথে প্রথম আলাপ হওয়া শুরু। অজু বড়কা বাপি পলাশ টিয়া এদের সাথে সেই প্রথম পরিচয়। তারপর এত দিন ধরে বিভিন্ন টানাপোড়েনের শেষে কেউ কেউ রয়ে গেছে বন্ধু, কারো সাথে কোনো দেখা সাক্ষাত নেই বহুকাল। পাড়া থেকে লোকজন বেরোনোও শুরু করে নব্বইয়ের প্রথম দিকেই। টুনাদা গেল শান্তিনিকেতন, ভাস্কর চলে গেল উত্তর কলকাতায়, বিক্রম নরেন্দ্রপুর। তখনও পুরনো কোয়ার্টারের দিকে খুব বেশি জনকে চিনিনা তাই সেভাবে নাম ধরে বলা মুশকিল কে ঠিক কখন কোয়ার্টার ছেড়েছিল।

(চলবে )
Standard
calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Standard
Bengali, Life experience, Memory, Nostalgia

জলপাইগুড়ির দিনরাত্রি

সেই কবে তারাপদ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম এক জবরদস্ত অযোধ্যা সিং-এর রাম খাওয়ার গল্প, যার শেষের লাইনটা ছিল সেই অযোধ্যা আর নেই, আর সেই রামও আর নেই। নাঃ এটা পলিটিক্যাল লেখা নয়, রাম নিয়ে রসিকতা করার ধ্যাষ্টামো আমার নেই। সে রাম খালি হনুমানদের, আমি যে রামের কথা বলছি সেটা একান্তই এই হনুর। মাল গাঁজা সহযোগে বেলেল্লাপনার চরম উদাহরণ রেখে গেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার দিনরাত্রিতে। হঠাৎ করে সে বইয়ের কথা মনে পরে মনটা চলে গেলো ১৮-১৯য়ে, হ্যাঁ সে ছিল একটা সময় বটে। জলুতে তখন ফার্স্ট ইয়ার। সব পোনাদের উপদেশ মেনে লেখাপড়া ডকে, আরে বাপু ক্যাম্পাসিং এমনিও হয়না, ওমনিও হয়না, পড়ে আর কি ছিঁড়বি। কাজেই চালাও দেদার বিড়ি সিগ্রেট বাংলু। জলুর কথা মনে পড়ায় ভাবলাম, সুনীল সমরেশ সন্দীপনের কলকাতার দিনরাত্রির চেয়ে আমাদের জলুর দিনরাত্রিগুলো কম রঙিন ছিলোনা। রামের কথাই যখন উঠল তাহলে রাম দিয়েই শুরু করি। ফোর্থ ইয়ারের নামকরা মাতাল পোদুদা একদিন রাতে আমাদের হোস্টেল এ এসে আমাদের দুজনকে নাম ধরে খোঁজা শুরু করলো, কিবে তোর নাম হনু? হ্যাঁ দাদা। আর তুই খেঁচু। হ্যাঁ। শুনেছি তোরা নাকি হেভি মাল খাস? এই দেখ এক বোতল রাম, চল রুমে চল। আর বোতল মানে পাঁইট ফাঁইট নয়, পুরো খাম্বা। তবে আদ্ধেক আগেই সাঁটিয়ে এসেছিলো মহাপুরুষ। আহা সেই যে হল অফ ফেমে নাম ওঠার অনুভূতি হয়েছিল, জীবনে আর কখনো সেরম কৃতার্থ বোধ করিনি। পুরো চার বছরের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ উজাড় হয়ে যাবে, সেসব থেকে বেছে বেছে দুটো ঘটনাই শেয়ার করলাম। তখনকার বন্ধুবান্ধব সব এখন দায়িত্বশীল চল্লিশ ছুঁইছুঁই ধেড়ে মানুষ, কাজেই তাদের আর বিব্রত করলাম না আসল নামধাম বলে, পড়ে যাদের যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে যাবে, আর বাকিদের বলি আসল নাম দিয়ে কি ঘন্টা হবে হ্যাঁ?

দিন

সেটা ৯৭ সালের মে মাসের কথা। ফার্স্ট ইয়ার। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার ২ সপ্তা আগে অন্ডকোষ টাকে উঠে গেছে, তখন প্রমাদ গণছি কেন সারাটা বছর না ঘষে কাটিয়েছি, এবার হয়ত খেলাম ইয়ার ল্যাগ। এমন সময় টাউনে ব্যাপক বাওয়াল হয়ে কলেজ বন্ধ। সে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। এবার কি করা? বাড়ি যাবার বেশ ১০-১২ দিন দেরি আছে কিন্তু কলেজে কিচ্ছু করার নেই আর টাউনে যাওয়া বন্ধ ফের বাওয়ালির ভয়ে। এমন সময় একদিন সকল ৯টায় সবে দাঁত মাজছি এমন সময় হোস্টেলের করিডোরে দেখতে পেয়ে রামুদা হাঁক মারলো, হনু মদ খাবি চল। ভাবলাম খোরাক দিচ্ছে, উত্তর দিলাম দাঁড়াও ৫ মিনিটে আসছি। ৫ মিনিট পর দেখি কি কেলো, রামুদা এসে হাজির, আমাকে আর খেঁচুকে নিতে। ভাবলাম হোস্টেলে বসে বসে ছেঁড়ার চেয়ে খানিক মাল টেনেই দেখা যাক, সকালে কখনো খাইনি। সাড়ে ৯টা নাগাদ তিন মূর্তি গিয়ে হাজির হলাম কলেজ মোড়ে. পাতি দরমার দোকান, তাতে সকালে খিচুড়ি চা বিস্কুট এসব বাদ দিয়ে আড়ালে আবডালে বাংলাও পাওয়া যায়। চেনা লোকদের পেতে একটু সুবিধা বেশি। তা সে দোকানে গিয়ে গোটা কয় বাংলা নিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। সামনে NH 31 ফাঁকা বললেই চলে। গরম আসছে আসছে তবে তখন আজকালেরমতো পেছন ফাটানো গরম পড়তোনা। তাই গাছের ছায়ায় আরাম করে বসে আড্ডা জমলো চরম, সাথে বাংলার মৌতাত। তখন সিগারেট খাওয়া ছাড়িনি তাই মদ সিগারেট জুটি জমে গেলো। ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে বাংলার বোতলের সারিও জমতে লাগলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে কেএকজন এসে ক্যারমবোর্ড পেতে ফেললো, ব্যাস সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন কে পাল্লা দিয়ে কত বোতল মাল টানলো তার একটা কম্পিটিশন ছিল, তাই পরিষ্কার মনে আছে ৯টা সাড়ে নটা থেকে দুপুরে খাবার সময় অবধি পাঁচ বোতল বাংলা সাঁটানো হয়ে গেছে। দুপুরে গিয়ে অনেক্ষন ধরে চান করলাম যাতে ধুনকিটা কমে আসে। রাতে আবার গাঁজলুদার সাথে মাল খাবার প্ল্যান যাতে কেঁচে না যায়। ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে উইংসে ঢুকেছি তো ছানা ধরলো আমায়, মাল খেতে গেলাম ওকে বলিনি কেন। কি কান্ড, বললাম আবার চল তাহলে। আবার চললাম কলেজ মোড় সাইকেল চেপে। ছানা সবে মাল খাওয়া ধরেছে, খানিক ট্রেনিং দিয়ে দিলাম বাংলা কিভাবে খেতে হবে তার। এক দেড় বোতল খাবার পর কে একজন এসে জুটলো, খুব সম্ভব চামচিকে। ছানাকে এর মধ্যে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে বেশ গোটাকয় রসগোল্লা খাইয়ে দিয়েছি যাতে নেশাটা চড়া হয়। আবার একের পর এক বোতল জমতে লাগল। মনে আছে যে বেঞ্চিতে বসে মাল খাচ্ছিলাম আমাদের পাশে একটা ট্রাকওয়ালা ভাত খাচ্ছিলো। নেশার ঘোরে ছানাকে বললাম এই দ্যাখ, লোকটা না মাছভাজা খাচ্ছে। এই বলে দুজনে যা অট্টহাস্য লাগলাম, ট্রাকওয়ালা হাফ খাবার খেয়েই মানে মানে কেটে পড়লো। সময় প্রায় আড়াইটে তিনটে হঠাৎ মনে হলো যে না, এবার যথেষ্ট হয়েছে। নেশাটা বেশ চড়েছে, সাইকেল চালিয়ে ফিরতে আর পারবোনা। মনে হয় পাকেচক্রে আবার রামুদাকেই খুঁজে পেলাম রিক্সা করে হোস্টেল দিয়ে আসার জন্যে। ছানা তো তখন বেশ বুঁদ হয়ে আছে। মুখ বন্ধ পাছে জনতা খোরাক দেয়। এদিকে আমার ততক্ষনে ন বোতল বাংলা খাওয়া হয়ে গেছে। খেয়াল ছিল যে বমি করতে হতে পারে, তাই আমার বালতিখানা নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমার রুমমেটের খাটে। প্ল্যান হলো একটু ঘুমোনো।

তা সে গুড়ে বালি, জনগণ মাতাল পেলেই উল্লাসে ফেটে পরে খোরাক দেখার জন্যে। সেদিন আমি ছিলাম পুরো ঠিকঠাক, বুঝতে পারছিলাম নেশা বেশি হয়ে গেছে কিন্তু একটু ঘুমিয়ে নিলেই কেটে যাবে। এদিকে জনগন বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্যে রুম ভর্তি করে ফেলেছে। আমার রুমমেট পড়েছে চরম বিপদে। বমি করলে ওর বিছানা নষ্ট, এদিকে আমাকে সরাতেও পারছেনা। চেষ্টা করলো খানিক তেঁতুলজল কোথা থেকে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতে। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও যখন মুখে গ্লাস গুঁজে দিলো, তখন ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। মুখ ভর্তি তেঁতুলজল পাশ ফিরে ওর খাটের পাশ দিয়ে ফেলে দিলাম। অবস্থা বেগড়বাঁই দেখে রুমমেট হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে ওর খাটেই ঘুমোতে দিলো।

এদিকে নেশার ঘোরে থাকায় ছানার খোরাক মিস করে গেলাম। ছানা ছিল খুব অধ্যবসায়ী ছেলে। শরীরচর্চা করতো, নিয়ম মেনে চলতো। মদ খেয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল চলে গেছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা। রুমে ফিরে ছানা নাকি তাই গোটা পঞ্চাশ ডনবৈঠক দিয়ে দিলো, তার পরও কিছু হচ্ছেনা দেখে আমাদের কাঠের আলমারিতে নাকি দুমদাম ঘুঁষি মারতে শুরু করলো। আমাদের তাপস পাল ছিল পালোয়ান, ছানার রুমমেট, সেও ছানার সেই ফর্ম দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছিলো কি করে ফেলে সেই ভয়ে।

খোঁয়ারি যখন ভাঙলো, দেখি সন্ধ্যে নটা। যতদূর মনে পড়ছে স্পেশাল খাবার ছিল সেদিন। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে গেলাম গাঁজলুদাকে ধরতে আবার রাতের রাউন্ড শুরু করার জন্যে, কিন্তু সব কীর্তিকলাপ শুনে সেদিন আর গাঁজলুদা নিয়ে গেলোনা সাথে। ওই দিনের আগে পরে বেশ কিছু বার সারা দিন ধরে বেলেল্লাপনা করেছি কিন্তু ন বোতল বাঙলার রেকর্ড সেই একবারই।

রাত

দিনের বেলা মাতলামির গল্প মনে করা সহজ কারণ খুব বেশিদিন সারাদিন ধরে ড্রিংক করা হয়ে ওঠেনি। রাতের বেলার গল্প আলাদা। এতো রাশি রাশি গল্প মনে আসে রাতের যে তার ফিরিস্তি একসাথে দেয়া মুশকিল। গোলমালের ব্যাপার হলো যে তার অনেক গল্পেই বাকি সবাই খোরাকের অংশীদার আমি ছাড়া, আমিই ছিলাম খোরাকের কারণ। সে দিনগুলোর কথা আর নাই বা বললাম, তবে ইয়ারমেটদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমাকে সামলে রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। ফার্স্ট ইয়ারের কথাই বলি, কারণ সেকেন্ড ইয়ার থেকে আমরা খানিকটা হলেও সিনিয়র হয়ে গেলাম। তাই প্রথম বছর উইংসে বাইরে থেকে মদ কিনে সদলবলে খাওয়ার আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

এমনি এক দিন দিনু মানে দিনবাজার থেকে এক বোতল হুইস্কি কেনা হয়েছে, গোটা ৭-৮ জন খাবো বলে। আমাদের ৭ নম্বর রুম ছিল তাস, সিগারেট আর মালের ঠেক, তাই আমাদের রুমেই সব এসে জুটলো। সবে পেগ বানিয়ে দু চুমুক দিয়েছি দেখি দরজা দিয়ে কে উঁকি মারছে। পানুপন্ডিত। পানু ছিল আমাদের পাশের রুমে। সিধেসাধা ছেলে, আমাদের ইয়ারের এক মেয়ের ওপর তার প্রচুর ব্যথা তখন। সবে দিন দুই আগে উইংসের সবাই ওকে পরামর্শ দিয়েছে যে সেই মেয়ের মন জিততে হলে গান গাইতে হবে। সেই দু দিন ধরে পানুর রুমমেটরা আমাদের গালি পাড়ছিলো যে সারাদিন পানু তাদের বেসুরো গলায় গান শোনাতে চাইছে। ভাবলাম বেশ তো সুযোগ। পানু আমাদের জিজ্ঞেস করলো, তোরা কি মদ খাচ্ছিস? – হ্যাঁ তুই খাবি? ভেবেছিলাম বলবে না, দেখি ঝপ করে রুমে চলে এসে আমাদের মাঝে বসে পড়লো। – বড় বড় গায়করা স্টেজে গান গাইতে ওঠার আগেই মদ খায়। আমিও খাই, গলাটা ভালো হবে। পানুর যুক্তি শুনে আমরা হাঁ। খোরাক দেখার জন্যে আমরা পানুকে বড় বড় পেগ বানিয়ে দিলাম। সেই তার প্রথম মাল ধরা, কিন্তু টপাটপ বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে ফেললো। আমরাও মজা দেখার জন্যে ওকে আরো বড় পেগ বানিয়ে খাওয়ালাম। নেশাটা যাতে চড়ে আরো, তাই খানিক চিনি, গ্লুকন ডি এই সব ও খাওয়ালাম যখন ও বললো যে মাথা ঝিমঝিম করছে। ওকে বলা হলো যে সুগার কমে গেছে, বেশি করে চিনি খেতে হবে। এখনো জানিনা চিনি খেলে নেশা বাড়ে কিনা কিন্তু তখন সেটা সবাই বিশ্বাস করতাম। হুইস্কির বোতল আর হাফ কৌটো গ্লুকন ডি শেষ করার পর ঠিক করলাম এবার হোস্টেলের বাইরে যাওয়া যাক।

রাতের সেই সবে শুরু। পানুকে বললাম তুই যদি সেই মেয়ের মন জয় করতে চাস তাহলে চল বাইরে লেডিস হোস্টেলে। বাইরে হাওয়া খেলে নেশাও কমবে আর সুস্থ বোধ করলে তাকে একটা গানও শোনাতে পারবি। পানুপন্ডিত টোপ খেয়ে গেলো। দলবল মিলে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেলের বাইরে। দু চারটে সিনিয়র দাদারা কমন রুম থেকে আমাদের সাবধান করে দিলো। ১ নম্বর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সব হাঁটা মারলাম কলেজের দিকে। প্ল্যান ছিল একে একে সব লুকিয়ে পড়বে, তারপর পানুকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করবে আর খোরাক নেবে। সাইকেল ভাড়া নেয়ার দোকান অবধি গিয়ে পানু বসে পড়লো বেঞ্চিতে। ওর নাকি বেদম মাথা ঝিমঝিম করছে। আমরা ওকে লেডিস হোস্টেলের রাস্তা দেখিয়ে বললাম চল হোস্টেলে ফিরে চল। খোঁয়াড়ি অনেকটা হলেও পানু ঠিকই ধরে ফেলল ওকে কোথায় যেতে বলছি। এদিকে পানু বলছে ও হোস্টেলে ফিরবে, আর আমরা মজা লোটার জন্যে বলছি আমরা এখন হাওয়া খেতে বেড়িয়েছি, এক্ষুনি ফিরবোনা, ওর ইচ্ছে হলে ও একা ফিরতে পারে। আমরা গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে আর পানু এদিকে ২-৩ বার হোস্টেল যাওয়ার চেষ্টা করে গোটা ৫০ গজ গিয়ে আবার ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে পড়লো। এখনো মনে আছে পানুর দুলে দুলে খানিক দুর হেঁটে আবার ফিরে আসা।

সেই বসে থাকা অবস্থায় পানুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো যে মদ খাওয়া অতীব খারাপ কাজ আর আমি আর খেঁচু হলাম গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাকি আমরাই খারাপ করে দিয়েছি। ভাবো কান্ড কুড়ি বছরের ধেড়ে খোকা যেচে রুমে এসে হাফ বোতল ফাঁক করে দিয়ে গেলো, আর আমরা হলাম গিয়ে দোষী। যাক সেসব গায়ে না মেখে সবাই বসে রইলাম কি করে তা দেখার জন্যে। অবশেষে আমাদের হোস্টেলের থার্ড ইয়ারের গোটা দু-তিন দাদারা বাইরে থেকে মাল খেয়ে ফিরছিলো, পানু তাদের দেখে ধরলো। দাদা আমাকে একটু হোস্টেল পৌঁছে দেবে আমি আজকে মদ খেয়েছি খুব মাথা ঝিমঝিম করছে। তা সে দয়ালু দাদারা নিজেরা খোরাক নেয়ার জন্যে পানুকে সাইকেলে চাপিয়ে হোস্টেলে নিয়ে গেলো।

ব্যাপারটা সেখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু দুটো ভিন্ন ধরনের ঘটনা বললাম কারণ সব সময় সব কিছু অনাবিল ফুর্তি আর খোরাক দিয়ে শেষ হয়নি তাই। হোস্টেলে চুলকানোর লোকের অভাব ছিলোনা। সেরকমই একজন আমাদের ইয়ারমেট দেখলো বেশ মজার ব্যাপার পানুপন্ডিত আমাদের মানে আমার আর খেঁচুর ওপর খেরে আছে। ও পানুকে প্রচুর পিন মারলো যে আমরা একদম বাজে ছেলে, পানুর উচিত আমাদেরকে বাওয়াল দেয়া। ও আমাদের ক্যালালে আমরা নাকি পালাবার পথ পাবোনা। আর পানুর ব্যথা পানুর হিরোগিরির খবর শুনে নিশ্চয় ওর ওপর ফিদা হয়ে যাবে। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে পরদিন চান করার সময় অন্য উইংসের আরেক পানু আমাদের পানুর প্যান্ট গামছা সব লুকিয়ে দিলো। পিন খেয়ে পানু ভাবলো সেটাও আমাদের কীর্তি। সন্ধ্যে বেলা পানু ধরলো খেঁচুকে, গালাগাল ধাক্কাধাক্কি পানুর নাক ভাঙলো, আমাদের দুজনের আবার ragging শুরু হলো, পানুর বাবার বন্ধু প্রফেসর আমাদের দুজনকে সাসপেন্ড করার হুমকি দিলো – মানে সব মিলে ঘেঁটে ঘ। মোটের ওপর খোরাকটা মনে হয় আমাদের ওপর দিয়েই গেলো, পানুকে রোজ রোজ নাক দেখাতে টাউনে নিয়ে যাওয়া আসা করতে করতে। তবে হ্যাঁ, অত সবের পর শিক্ষা একটা হয়েছিল তবু, যে পাঁড় মাতাল ছাড়া কারো সাথে মদ খেতে বসার অনেক ঝঞ্ঝাট। সে ঘটনার পর থেকে পেঁচো মাতালদের সাথেই ঠেক হতো বেশি।

জলু গিয়েছি প্রথম বার তা সে নয় নয় করে হয়ে গেছে একুশ বছর প্রায়। এখন স্বাধীনতা প্রচুর, লুকিয়ে চুরিয়ে ব্ল্যাকে মদ কিনতে হয়না। ঘরেই খাওয়া যায়। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার, ফাইনাল, চাকরি – যত বয়েস বেড়েছে, মাল খাবার সুযোগও বেড়েছে, আর সেটা যত সহজলভ্য হয়েছে, নেশাভাঙের যে থ্রিলটা ১৩-১৪ তে ছিল, ২৩-২৪এ তার অনেকটাই চলে গেছে। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার যে রোমাঞ্চ সেটা চলে যাবার পর মদ খাওয়াটা তেমন আর উপভোগ্য রইলোনা। দারু খেতে বসে মদের চেয়ে খাওয়ার অর্ডার হতো বেশি। শেষ যে কবে মাল খেয়ে আউট হয়ে গেছি মনেই পড়েনা। ৭ বছর আগে পুজোয় বাড়ি গিয়ে, সেটাই বোধহয় শেষ বার।

তাই জলুর রঙবেরঙের দিনরাত্রির কথাগুলো মনে পড়লে মন চলে যায় কুড়ি বছর পেছনে। বিছানার পাশে বালতি। খোরাকের থেকে বাঁচতে ছাদের ট্যাঙ্কের ওপর শোয়া দালাল। অ্যানিভার্সারীর বাংলা মেশানো রসনা। সিদ্ধিতে মেশানো মাকড়সার জাল। ফাঁকা বোতল ভেঙে নেশার ঘোরে তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়া। হাইওয়ের ধারে বাংলা আর ক্যারম। কলেজে প্রথম দিন ফাইনাল ইয়ারের ছেলের জল বলে দেয়া বাংলা। পোদুদার কাছে ব্যাপ্টিজম। Holy Water এর বদলে রাম। নস্টালজিয়া। কোথায় আজ সেই রাম, কোথায় সেই অযোধ্যা, থুড়ি জলু। হেথা নয় বন্ধু অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। নাকি জলু আছে সেই জলুতেই, খালি চরিত্রগুলো পাল্টে গেছে?
Standard
Bengali culture, Cuisine, Nostalgia

পৌষ পার্বন পুলি পিঠে আর বিশ্বায়ন

আজ মকর সংক্রান্তি। জানতাম না, মনে থাকার কথাও নয় তবু সকাল বেলা ফেসবুকে দেখি পাড়ার পুরনো বন্ধু মেরিন বেজায় চটে লিখেছে মকর কেমন দেখতে হয় জানা আছে? যুক্তিটা ফেলার নয় আর এই সোশাল আদিখ্যেতা দেখে আমারো একই রকম পিত্তি জ্বলে গেল। হয়ত আর কিছুদিন পর অমাবস্যা পূর্ণিমা অম্বুবাচী ঘেঁটুপুজো কোনো কিছুই বাকী থাকবেনা। আমাদের পূর্বজ বাম লিডাররা যেকোনো পরিবর্তনকে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র বলে চালানোর চেষ্টা করতো, তবে একটু খতিয়ে দেখলে মনে হতেই পারে যে এই সব লোকাচার কেমন ভাবে বিশ্বায়নের গ্রাসে চলে যাচ্ছে। একদিকে সময় আর সামাজিক যোগাযোগের কমতিতে এসব মকর সংক্রান্তি-টান্তি শিকেয় উঠেছে, আবার সেরকমই বাজার অর্থনীতির হাত ধরে এসব হারিয়ে যাওয়া আচারবিচার থেকে মুনাফা তুলতে হাজির পুরনো আচার আচরনের ধুয়ো তোলা সংস্থারা। যেমন ঘরোয়া খাবার নিয়ে উপস্থিত ভজহরি মান্না, তেরো পার্বন, ৬ বালিগঞ্জ প্লেস। প্রথমে বিশ্বায়ন মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডালের বদলে কেএফসি ডোমিনোস ইত্যাদি খাওয়া শিখিয়ে তারপর নস্টালজিয়ার খোঁচা মেরে সেই মাছের মাথার ডাল ঘরে ২৫/- টাকার বদলে ২০০/- টাকা দিয়ে কেনাচ্ছে। সেভাবেই হয়ত অদুর ভবিষ্যতে আমরা পেয়ে যাবো পৌষ পার্বনে পুলি পিঠের হোম ডেলিভারি। তারপর মুখে গোটাকয় পিঠে ঠেসে সেলফি— ব্যাস ষোল আনা বাঙালিয়ানা ফলানো হয়ে গেল।

সব প্রজন্মই মনে হয় ভাবে যে তাদের জীবনকালটাই সবচেয়ে সেরা, নতুন পুরনো দুইয়ের নিপুন সম্মিলন। আমারো সেরকমই মনে হল আজ যে অন্তত আমাদের আশির দশকে বড় হওয়া প্রজন্ম এসব প্রচলিত প্রথাগুলোর সাথে বহুল পরিচিত ছিল। সেই ভাবনা থেকেই ইচ্ছে হল বিশ্বায়নকে তুলোধোনা বা ফেসবুকে মাকড় সংক্রান্তি জাহির না করে খানিক পৌষ পার্বনের আসল উৎকর্ষ নিয়েই খতিয়ে দেখা যাক। হ্যাঁ পিঠে পায়েস এইসব।

মকর সংক্রান্তি খালি নামেই ছিল, আমরা চিরকাল জেনে এসেছি যে এটা পৌষ পার্বন, পিঠে খাওয়ার দিন। ধর্মীয় আচার-টাচার হয়তো কিছু আছে কিন্তু সেসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি চোখের সামনে রসে টইটম্বুর পিঠের ছবি ভেসে ওঠায়। আর আগে খাওয়া মানে যে শুধু নিজের মাইক্রো পরিবার তা তো ছিলনা, আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী এমনকী কিছু দুরে থাকা আত্মীয়স্বজন সবাইকেই দিয়েথুয়ে তারপর যা পড়ে থাকতো তা দিয়েই পরের তিন দিন টানা পিঠে খাওয়া চলত। বাবার অফিস, আমার স্কুল সবেতেই টিফিন পিঠে তারপর খেলতে যাবার আগে গোটাকয় আর সন্ধ্যাবেলা টিফিনে আবার সেই পিঠে। এখানে সেই পিঠেরই একটা পাঁচালি লেখার চেষ্টা করলাম। যদি কেউ আর কিছু মনে করতে পারেন লিখে পাঠালে বাধিত রইব।

পিঠের লিস্টি

১) পাটিসাপটা : পৌষ পার্বনের ন্যুনতম লেভেল। আর কিছু না হলেও খানকতক পাটিসাপটা ঠিকই হত বাড়ি বাড়ি। আর বানানোর কিছু কিছু ট্রিক মনে আছে। চালগোলা চাটুতে দিয়ে তারপর আস্ত তেজপাতা দিয়ে মিশ্রনটাকে ছড়িয়ে দিতে হত। পরে বিদেশে প্যানকেক বা ক্রেপ বানানোর পদ্ধতি দেখে সেই পাটিসাপটাই মনে পড়ে যেত। আর পুর বানানোরও বিশাল সরঞ্জাম আগের রাত থেকে নিরামিষ বঁটির মাথায় নারকেল কোরার যন্ত্র। তারপর গুড় দিয়ে কড়াইতে মেশানো। জল মরে গিয়ে গুড় আর নারকেল মিশে গেলে পুর তৈরী হয়ে গেল। কেউ কেউ গুড়ের জায়গায় চিনি দিয়েও বানাতো পুর। খোয়ার পুর এলো বেশ কিছুদিন পর।

২) মালপোয়া : ভানুর সেই মাসিমা মালপো খামুর মালপোয়া ছিল দ্বিতীয় কমন পিঠে। মালপোয়ায় পুরও লাগেনা তাই বানানো সবচেয়ে সোজা। নিতান্ত আনাড়ি রাঁধুনি যে আর কোন পিঠে পারেনা, সে অবধি মালপোয়া বানাতে পারদর্শী। পিটুলি গোলা বা ময়দার গোলা তৈরি করে গরম তেলে ভেজে তারপর চিনির শিরায় ডুবিয়ে নিলেই মালপোয়া রেডি। মালপোয়ার গোলায় খানিক মৌরি মিশিয়ে দিলে বেশ স্বাদ হয়। কতখানি পিটুলিগোলা কিভাবে কড়ায় দেয়া হল মালপোয়ার আকার আর স্বাদ তার ওপর নির্ভর করে। অল্প জায়গা জুড়ে বানালে ভেতরটা বেশ নরম থাকে। আর বেশী জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে দিলে মালপোয়া হয় বেশ মুচমুচে। বানানো এত সোজা বলে পৌষ পার্বন ছাড়াও অন্যান্য সময় পাড়ার মিষ্টির দোকানে বা লুচি কচুরির দোকানেও মালপোয়া বিক্রি শুরু হয়ে যায় দস্তুরমত।

৩) গোকুল পিঠে : গোকুল পিঠে বানানো তেমন কঠিন না হলেও খুব যে চল ছিল তেমন নয়। যতদুর মনে পড়ে, পাটিসাপটার যে পুর সেটা দিয়েই গোকুল পিঠের পুর বানানো যেত। নারকেল কোরা আর গুড়ের পুর চেপ্টে অনেকটা আলুর চপের পুরের আকারে বানিয়ে পিটুলি গোলায় ডুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে নিলে বড়া তৈরী। তারপর বড়াগুলো চিনির শিরায় ডুবিয়ে নরম হয়ে এলে গোকুল পিঠে রেডি।

৪) রস বড়া : পিঠেদের মধ্যে এটা বানানো বেশ কঠিন। বিউলির ডাল আগের রাতে ভিজিয়ে ডাল মিহি করে বেটে ছোট ছোট গোল্লা বানিয়ে ডুবো তেলে প্রথমে ভাজা হতো। বড়াগুলো বেশ লালচে হয়ে এলে নামিয়ে চিনির শিরায় ডুবিয়ে রেখে দিয়ে গোল্লাগুলো নরম হয়ে গেলে রস বড়া তৈরী। তবে, কঠিন পার্টটা হলো ডালবাটা কতটা ঘন হবে সেটা। খুব ঘন হলে বড়ার ভেতরটা রান্না হবেনা, ডাল কাঁচা কাঁচা রয়ে যাবে। আর অন্যদিকে ডালবাটা বেশি পাতলা হলে তেলে ছাড়ামাত্র ডালগুলো আলাদা হয়ে যাবে। বড়া কতখানি ভাজা হবে সেটাও জরুরি। কম ভাজা হলে ডাল ভেতরে কাঁচা থেকে যাবে, যা খেতে অখাদ্য। আর ভাজা বেশি হলে বাইরেটা কড়া হয়ে যাবে, রসে ডোবালে বড়াগুলো তেমন রস শুষতে পারবেনা। প্রত্যেক বছর পৌষ পার্বনে বাবা খুব উৎসাহ নিয়ে রসবড়া বানানোর চেষ্টা করলেও কোনো না কোনো দুর্যোগে পারফেক্ট রসবড়া কখনো খাওয়া হয়নি।

৫) দুধ পুলি : দুধ পুলি ছিল পৌষ পার্বনের ম্যাগনাম ওপাস। খেতে অসাধারণ কিন্ত ঠিকঠাক বানানো প্রায় দুঃসাধ্য। পুলিগুলো বানানো হত ময়দার লেচি বেলে খোল বানিয়ে তার মধ্যে নারকোল কোরা আর গুড়ের পুর ভরে অনেকটা মাকুর আকার দিয়ে। তারপর দুধ চিনি আর এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে তাতে পুলিগুলো দিয়ে আরো বেশ কিছুক্ষণ ফুটিয়ে দুধ বেশ খানিকটা মরে এলে দুধ পুলি তৈরী। শুনে মনে হয় এ আর এমন কী? পুলি কেমন দাঁড়াবে সেটা সবটাই নির্ভর করছে খোলের ওপর। ময়দার খোল বেশি মোটা হলে পুলিগুলো শক্ত শক্তই রয়ে যাবে, পুলি খেয়ে মনে হত যেন ময়দার তাল। আর খোল বেশি সরু হলে দুধ পুরো ঘন হবার আগেই পুলির খোল ভেঙ্গে পুরগুলো দুধে মিশে যাবে। দুধ পুলি করার অনেক চেষ্টা দেখেছি আমাদের বাড়ি বা আত্মীয়দের মধ্যে কিন্তু খুব কমই খেয়েছি যা খেয়ে মনে হয়েছে বাঃ দারুন। বেশির ভাগ সময়েই সেটা দাঁড়াত শক্ত ময়দার গোলা দাঁত ফোটানো যাচ্ছেনা অথবা চামচ ঠেকানোর আগেই পুলি ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে — এজাতীয় বিপর্যয়ে।

৬) চুষির পায়েস :  ছোটবেলা থেকেই দেখতাম বাড়িতে চুষি বানানোর চল। আমারও সেই দেখাদেখি চুষি বানানোর বায়নাক্কা দেখে বাবা মা আমার হাতে একটা ময়দার গোলা ধরিয়ে দিত।  খুব উৎসাহ নিয়ে শুরু করলেও যখন দেখতাম বাবা মার বানানো সমান আর সরু সরু চুষির পাশে আমার এবড়োখেবড়ো মোটা মোটা চুষিগুলো, সে দৃশ্য দেখে বেশ নিরুৎসাহীই হয়ে যেতাম। পৌষ পার্বনে চুষি করার জন্যে তোড়জোড় শুরু হত অনেক আগে থেকে। ময়দার লেচি পাকিয়ে তার একটা দিক টেনে সুতোর মত লম্বা করে সেটা হাতের চেটোতে ঘষে ঘষে চুষি বানানো হত। মনে হয় অন্যান্য সময়েও অনেক জায়গায় চুষির পায়েসের চল ছিল কারণ পায়েসের গোবিন্দভোগ চালের দাম চিরকাল খুব চড়া। চুষি তাই কমদামী বিকল্প। হয়ত এখন চেষ্টা করলে বানাতে পারব চুষি, কিন্তু সেই সব সমান সাইজের আর সরু সরু চুষি অসম্ভব। তো সেই বানানো চুষি তারপর রোদে দিয়ে শুকিয়ে নিলে আসল হুজ্জুতি শেষ। বাকিটা যেরকম পায়েস রান্নার পদ্ধতি তাই। ঠিক মনে পড়ছেনা শেষ কবে চুষির পায়েস খেয়েছি অন্তত পঁচিশ বছর তো হবেই, তাই ঠিক মনে পড়ছেনা চালের পায়েসের সাথে স্বাদের কি তফাত ছিল।

৭) সরা পিঠে : যতদুর মনে পড়ছে এটার চাটগাঁর নাম ছিল আস্কে পিঠে। অনেকে ভারা পিঠেও বলে। সরা পিঠে বানানোর উপকরন খুব বেশি না হলেও বানানোর ঝক্কি অনেক। তবে কারো যদি বাড়িতে ইডলি তৈরির ডিস থাকে তাহলে সরা পিঠের জন্যে সেটা যথেষ্ট। এমনকি সরা পিঠে খেতেও অনেকটা ইডলিরই মত। চাল গুঁড়ো করে তাতে নারকোল কোরা মিশিয়ে খুব সম্ভব অল্প জল দিয়ে মিশ্রণটাকে সামান্য ভেজাভেজা করা হত যাতে ঝুরঝুরে হয়ে পিঠে ভেঙ্গে না যায়। তারপর তালু ভর্তি সেই চালগুঁড়ো নিয়ে ইডলির আকারে বানিয়ে হয় ইডলি ডিসে বা হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে তার ওপরে দিয়ে জল ফোটার বাস্প দিয়ে পিঠে তৈরী হত। তারপর সেই গরম গরম পিঠে পরিবেশন করা হত খেজুরের গুড়ের হাঁড়ির ওপরে জমে থাকা স্বচ্ছ গুড় দিয়ে, যাতে নিচের দিকের দানাদানা গুড় না থাকে। আস্কে পিঠে একবারই খেয়েছিলাম ঠাকুমা বানিয়ে খাইয়েছিল যখন প্রথম দেখা করতে যাই, নিজেদের জমির ধান আর গুড় দিয়ে তৈরী, তা ছাড়া বার কয়েক সরা পিঠে খেয়েছি কিন্তু সেগুলো লোকে এলেম কুড়োনোর জন্যে বানিয়েছিল খেতে অখাদ্য না হলেও সেরকম সুস্বাদু ছিলনা।

৮) তিল পিঠে : এটাও খুব রেয়ার বাঙালি বাড়িতে, যদিও আসামে তিল পিঠের চল প্রচুর।  আমার বার দুয়েক খাবার সৌভাগ্য হয়েছে। রেসিপি পাটিসাপটার মতই খালি পুরের জন্য নারকেল কোরা না দিয়ে সাদা কালো মেশানো তিল আর গুড় ব্যবহার করা হয়।

পিঠের পুরের জন্য যেমন লিখেছি আখের গুড় ব্যবহার করা হত সেটা সব সময় ঠিক না। খেজুরের গুড়ই প্রধানত ব্যবহার করার কথা কিন্তু অনেক সময়ই বাজারে খেজুর গুড় আসত অনেক পর, তাই সেটা না পাওয়া গেলে পাটালি না হয় আখের গুড়ই ভরসা ছিল। ইদানীং কালে খোয়া ক্ষীর দিয়ে বানানোর বেশ চল, খেতে যে খারাপ তা নয় তবে খোয়া চালু হবার মুল কারন হয়ত শর্টকাটে কাজ সারা, নারকেল কোরানো, গুড় দিয়ে জ্বাল দেয়া সেসব ঝুটঝামেলা থেকে নিস্কৃতি। আর চাল যে কি ধরনের নেয়া হত সেটা মনে আসছেনা। নবান্ন উৎসব যখন মনে হয় নতুন চাল মানে আমন ধানের চালই ব্যবহার করা হত। এখন দেখি ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা চাল আলাদা পাওয়া যায় কিন্তু আমার মনে আছে দেখতাম পৌষ পার্বনের আগের দিন বাড়িতে চালের স্তুপ শিল নোড়া দিয়ে বাটার কাজ চলছে।

এসব বহুপ্রচলিত পিঠের বাইরেও যে কত রকমের পিঠে আছে তার ইয়ত্তা নেই। মকর সংক্রান্তি মনে হয় গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে পালন করা হয় বিভিন্ন ভাবে, কিন্তু পিঠে যতদুর জানি মূলত পূর্ব ভারতেই সীমাবদ্ধ —উড়িষ্যা, বিহার, এপার ওপার বাংলা অসম ত্রিপুরা অনেকটা জুড়েই। বিভিন্ন জেলা গ্রাম ভিত্তিতে পিঠেরও তাই প্রচুর প্রকারভেদ।

পিঠের বিষয়ে পিঠের বাইরে গিয়ে এক ঝলক দেখে নিলে উপলব্ধি করা যাবে যে আমাদের জীবন এই ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরে কতখানি বদলেছে। গড়িয়াহাটের রাস্তার ষ্টলে বসা ঘুগনি আর আলুর দম উঠে গেছে সেই অপারেশন সানশাইন থেকে, এখনো ইচ্ছে করে খাই সেই জিবে লেগে থাকা ঘুগনি আর পোড়া পোড়া আলুর দম সাথে খানিক তেঁতুলের জল কিন্তু সানশাইনের সেই ঝকঝকে কলকাতায় তা এখন দুস্প্রাপ্য। তবে আধুনিকতা জীবনের অঙ্গ। তাকে অস্বীকার করে উত্তরের থেকে পিঠ করে যদি নস্টালজিয়ায় ভুগে অতীতের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি তাহলে আমাদের ভবিষ্যত ঝরঝরে। পুরনোকে যক্ষের ধনের মত আগলে না রেখে নতুনকে জায়গা করে দেয়া আমাদের কর্তব্য, সেটা না থাকলে আমাদের অগ্রগতি বন্ধ। খাবার দাবারের চল দেখলেও সেটাই প্রকট। বাজার আমাদের শেখায় প্রতি মুহুর্তে নতুন কিছু করতে, গতানুগতিকের একঘেয়েমির থেকে বাইরে বেরোতে। আমাদের দায়িত্ব হলো নতুন পুরনো দুইকেই সমান সুযোগ দেয়া। ভাল মাল চলবে আর ওঁচা মাল লোপাট হবে, বাজার অর্থনীতির সেটাই মূল মন্ত্র। যেটা নেই সেটা হলো নিয়ন্ত্রণ, যার অভাবে যার টাকা আছে সে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যে তার পন্যই সেরা। সেই জন্য ফান্টা টিকে গেছে গোল্ড স্পট উধাও, যদিও বিন্দুমাত্র পক্ষপাতী না হয়ে বলছি গোল্ড স্পট ফান্টার চেয়ে স্বাদে অনেক গুন ভালো ছিল। আগের সেই জোর যার মুলুক তার এখন এসে দাঁড়িয়েছে পয়সা যার মুলুক তার। আর আমরাও ছুটছি সেই পয়সার পেছনে ইঁদুর দৌড়ে, তাই আজ আমাদের জীবনেও আর অঢেল সময় নেই এসব পিঠে পুলি বানানোর বা ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেয়ার। নতুন পুরনো, দেশী বিদেশী, স্বধর্মী বিধর্মী এসব বাছবিচার থেকে বাইরে বেরিয়ে যদি সবকিছুকে চল আর অচলের নিরিখে বিবেচনা করি তাহলে দুইয়েরই ভালোটা আমরা রাখতে পারব আর খারাপটা ছুঁড়ে ফেলতে। সম্পূর্ণ নির্মোহ পক্ষপাতমুক্ত হয়ে যদি সেটা করতে পারি তবেই নতুন পুরনো প্রকৃত মেলবন্ধন সম্ভব। সেটা যতদিন না হবে ততদিন পাড়ায় ফেরিওয়ালার থেকে টাকায় চারটে ডালপুরির জায়গায় রেস্তোরাঁয় গিয়ে ৫০/- টাকা দিয়ে দুখানা ডালপুরি খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

শেষ করছি পিঠে নিয়ে লেখা সেই অতিপরিচিত লাইন দুটো দিয়ে:
পেটে খেলে পিঠে সয়।
পিঠে খেলে পেটে সয়না॥

পরিশেষ: নিচে গোটাকয় লিংক রইলো আরো অন্যান্য পিঠে নিয়ে জানার জন্যে –

pithe

Standard
cricket, West Indies

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট: এক ঝরা সময়ের ছবি

ছোটবেলার কথা মনে পড়লে খেলাধুলোর কথা যখন ভাবি প্রথমে ফুটবলের কথাই মনে আসে। আটের দশকে কলকাতা ফুটবলের রমরমা তখনো জারি। খবরের কাগজ, রেডিয়ো খুললেই ফুটবলের আলোচনা, রিলে ছাড়া কথা নেই। কৃশানু বিকাশ শিশির সুব্রত ছাড়াও নতুন আমদানি চিমা, তাছাড়া বারপুজো, দলবদল এসব নিয়েই বাজার গরম। ক্রিকেটের সাথে তখনো তেমন পরিচয় হয়নি, যদিও ভারত ততদিনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। কখনো সখনও ব্যাটবল খেলা (জানতাম না সেটাকেই ক্রিকেট বলে) আর গাভাসকর কপিলদেব অমরনাথ এইকটা নাম, এগুলোই ছিল ক্রিকেটজ্ঞান। এছাড়া ইডেনে খেলা পড়লে কলকাতা ক’য়ে রিলে “রান হয়ে গেছে নয় নয় করে…” বা “বল পাঠিয়ে দিলেন পত্রপাঠ সীমানার বাইরে” বাক্যগুলো প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে। তবে আর একটা ব্যাপার জানতাম যা ছাড়া তখন ক্রিকেট ভাবা যেতো না সেটা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 

এখন মনস্তাত্বিকরা মনে করে যে আমাদের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভাল লাগার পেছনে জুড়ে আছে ঔপনিবেশিক সত্তা, সাদা চামড়ার দেশগুলোর ওপর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কালো মানুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে নিজেদের ঔপনিবেশিক বঞ্চনার পরোক্ষ বদলা মনে করা। আমার ঐ বয়সে অত গুরুগম্ভীর ভাবনাচিন্তা করার বিষয় সেটা ছিলনা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখনকার লাইনআপ আর ফর্ম দেখেই মনে সম্ভ্রম জাগা স্বাভাবিক। ইনিংস শুরু করছে গর্ডন গ্রিনিজ আর ডেসমন্ড হেনস, ওপেনিং জুটিতে যাদের রেকর্ড অবসরের বহুদিন পরেও অটুট ছিল। তারপরে চার নম্বরে আইজ্যাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডস, চুয়িং দাম চিবুতে চিবুতে একমুখ হাসি নিয়ে বিপক্ষের বোলিংকে তছনছ করে দিতে খুব কম ব্যাটসম্যানই পেরেছে সমগ্র ক্রিকেটের ইতিহাসে। ছিল গাস লোগির মত জাঁদরেল ফিল্ডার আর সবার ওপরে ছিল এক খতরনাক পেস ব্যাটারী, অ্যামব্রোস, মার্শাল, ওয়ালশ যারা গার্নার, হোল্ডিংয়ের বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলিংয়ের পরম্পরা সার্থকভাবেই বজায় রেখেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা মানেই ছিল একটা কী হয় কী হয় ভাব, আজ কে অন্য টিমকে দুরমুশ করবে সেটা জানার অপেক্ষা। 

এই সময়ের ঠিক পর পরই ক্রিকেটের ক্ষমতার কেন্দ্রটা বদলানো শুরু হয়ে গেল। একদিকে আবির্ভাব হল ক্রিকেটের রাজপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারার, অন্যদিকে সব বাঘা বাঘা খেলোয়াড়দের অবসরের সময় ঘনিয়ে এল, গ্রিনিজ, হেনস, রিচার্ডস, মার্শাল একে একে সবাই বিদায় নিল নব্বইয়ের দশকে। ক্যারিবিয়ান ক্যালিপ্সো ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায় বর্তাল তরুণ লারা, রিচি রিচার্ডসন, হুপার ওয়ালশদের হাতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনো এক শক্তিশালী দল, লারা একাই বহু ম্যাচ জিতিয়ে গেছে, কিন্তু তারা সেই দুর্বার দল নয়, বরং অ্যালান বর্ডারের অসিরা উঠে এসেছে পয়লা নম্বরে যেই আধিপত্য চলবে স্টিভ ওয়া, রিকি পন্টিংয়ের হাত ঘুরে প্রায় বিশ বছর জুড়ে। 

ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতা দখল ছাড়াও আরো বেশ কিছু ঘটনা সেই একই সময়কালে ঘটছিল যা শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ না, গোটা বিশ্ব ক্রিকেটকেই চিরতরে বদলে দিয়েছিল। সত্তরের কেরী প্যাকার সিরিজ দিয়ে যে একদিনের ক্রিকেটের শুরু, নব্বইয়ের দশকে টেস্ট ক্রিকেটের থেকে মনোরঞ্জনের তালিকায় বিজয়ীর স্থানে চলে এসেছে সেই ওয়ান ডে। সমগ্র বিশ্বে সেই সময়ে যে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটছিল যেমন সোভিয়েত জমানার পতন, দুই জার্মানির পুনর্যুক্তি, ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ, এবং এই বদলগুলোর সাথে বিশ্ব অর্থনীতির প্রসার সাধারন মানুষের জীবনেও এক স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ফলে পাঁচ দিন ধরে সারাদিন ক্রিকেট দেখা বা রিলে শোনার মত সময় আর ধৈর্য্য কোনটাই খেটে খাওয়া মানুষের ছিলনা, যেখানে একদিনের ক্রিকেটের মত স্বল্পস্থায়ী বিনোদন বর্তমান। ফলে আস্তে আস্তে যোগ হতে লাগল রঙিন পোশাক, দিন-রাতের ম্যাচ ইত্যাদি। ব্যবসায় একটা কথা খুব প্রচলিত যে ক্রেতাই ঈশ্বর, যা ক্রিকেটে হল দর্শক, তাই যে পরিবর্তনগুলো আসছিল সবই ক্রিকেটকে আরো জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দর্শকদের কাছে। 

এই আমূল পরিবর্তনের সময়ে যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা উঠে এসেছে প্রথম সারিতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেই সময়ে পিছলে যাচ্ছিল প্রধান থেকে সাধারন থেকে নিম্নমানের দলে। বদলে যাওয়া সময়ের সাথে নিজেদের বদলাবার জায়গায় খেলোয়াড় কর্মকর্তা সবাই জড়িয়ে পড়ল অন্তর্কলহে। যদিও জানতাম যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসলে ক্যারিবিয়ান সাগরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দ্বীপরাষ্ট্রের এক যৌথ দল, এটা জানতাম না যে উত্তরে জামাইকা থেকে দক্ষিণে গায়ানা অবধি দ্বীপগুলোর বিস্তৃতি দু-তিন হাজার কিলোমিটার। ভৌগোলিক এই বিশাল ব্যবধান বিচার করলে এটাই পরম আশ্চর্যের যে বিগত চার-পাঁচ দশক ধরে বিশ্ব ক্রিকেটের আঙিনায় এদের আধিপত্যের কী ব্যাখ্যা? প্র্যাকটিস করত কীভাবে, টিম সিলেকশন হত কীভাবে? ক্যারিবিয়ান দেশগুলির অর্থনীতি তেমন সবল নয়, পর্যটন ছাড়া মূল আয় প্রধানত কৃষিকাজ, সেখানে ক্রিকেট টিম স্থাপন আর চালানো এই বিশাল কর্মকান্ডের দায় কীভাবে বিভিন্ন দেশগুলো ভাগাভাগি করে নিত সেটা ভাবলেই অবাক লাগে। এই পরিকাঠামো বিচার করলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে যে অন্তর্দ্বন্ধ দেখা দিয়েছিল নয়ের দশকে, সেটা একসময় দেখা দিতই, দলের ফর্ম পড়ে যাওয়া এই বিবাদকে শুধু চাগিয়ে দিয়েছিল। 

নয়ের দশকে যে অবক্ষয়ের শুরু, নতুন মিলেনিয়ামে সেই চিড় ফাটলের আকার নিল। এই সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ পরিনত হয়েছিল হাতে গোনা কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় সমৃদ্ধ এক অতি সাধারন দলে। চন্দ্রপল, সারওয়ান, ক্রিস গেইল ছাড়াও ছিল পড়তি সময়ের লারা। একুশ শতকের প্রথম দশ বছরে নতুন আমদানি হল ২০-২০ ক্রিকেট আর ক্লাবভিত্তিক আন্তর্জাতিক খেলা যেমন T20 বিশ্বকাপ, আইপিএল, সুপার কাপ ইত্যাদি। টেস্ট ক্রিকেটের গরিমা হয়তো ক্ষুন্ন হয়নি কিন্তু সাধারন দর্শকদের কাছে এ ছিল আরো একটা সহজলভ্য বিনোদন, তিন ঘন্টায় খেল খতম, আর বেশীরভাগ খেলাই দিন-রাতের তাই কাজেও তেমন ফাঁকি পড়বেনা। এই সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট লক্ষ্য করলে দেখা যাবে খেলোয়াড়দের বিবাদ, একজন স্থায়ী ক্যাপ্টেনের খামতি, ক্রিকেট বোর্ডের খেলোয়াড়দের মাইনে দিতে অস্বীকার এবং তার ফলস্বরূপ বেশ কিছু প্লেয়ারদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে না খেলে ক্লাব দলের হয়ে খেলা। 

শেষের কারণটা ক্রিকেটের পক্ষে চরম দুর্ভাগ্যের। নতুন শতকে ক্রিকেটের এই দশা সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিম্বাবয়ে এই দেশগুলোর, যেখানে আর্থিক অনটন আর বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। এই দশ বছরে আইসিসি পর্যবসিত হয়েছিল রেভিনিউ কামানোর ইঁদুরদৌড়ে সামিল এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য কিন্তু বোর্ড নিজেদের অস্তিত্বের মূল কারন যা হল বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের প্রসার এবং খেলার মান আর উৎকর্ষতা বাড়ানো- সেটা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কেবল উপার্জনের ওপর সব গুরুত্ব দিয়েছিল। সংস্থার দখল চলে গেল ক্রিকেটারদের থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে শুরু হয় বিস্তর কারচুপি, বিসিসিআই এর মত শক্তিশালী বোর্ডগুলোর নিজেদের সুবিধামত পেশী আস্ফালন, খেলার নিয়মকানুনের বদল যার উদ্দেশ্য খেলার মান বাড়ান নয় বরং আমানতকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির বানিজ্যিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা। নব্বইয়ের সময়ে ওয়ান ডে খেলার রমরমা দেখে যারা কু গেয়েছিল যে আইসিসি ক্রিকেটকে বেসবলে পরিনত করার চেষ্টা করছে, আজকের ২০-২০ ক্রিকেটের বাড়তি দেখে হয় তাঁরা মুচকি হাসছেন নাহয় জিভের তলায় সরবিট্রেট রাখছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নতুন শতকের এই সমীকরণে সফল হওয়া নিতান্তই অসম্ভব হয়ে পড়ল, বিশেষ করে যখন আয়োজক মাঠের আয়ের অধিকাংশই যাবে আইসিসির কোষে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলির মধ্যে একমাত্র জামাইকা ছাড়া অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আর কারওই তেমন নেই তাই ক্রিকেট বোর্ডগুলোর মধ্যে বিবাদ-মতানৈক্য এসবের মূলে যে টাকাপয়সা জড়িয়ে, তা সন্দেহের ঊর্দ্ধে। ক্রিকেটের উৎকর্ষ বৃদ্ধির যূপকাষ্ঠে বলি হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিম্বাবয়ে এই দলগুলো যাদের শুধু খেলায় অংশগ্রহন করতেই অশেষ প্রতিকুলতার মোকাবিলা করতে হয়। আজকের দিনে এরা নিছকই কোল্যাটেরাল ড্যামেজ। 

বিগত দশ বছরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের অধোগতির জন্য যে খেলোয়াড়দের দায়ী করা যায় তা নয়। হয়তো আশির দশকের বুক কাঁপানো ড্রিম টিম নয় কিন্তু এখনকার টিমে যে প্রতিভার ঘাটতি আছে তা নয়, যেটা অনুপস্থিত তা হল আত্মবিশ্বাস আর দলীয় সংহতি। তাছাড়া টিম এখন পুরোপুরি ক্রিস গেইল ভিত্তিক, গেইল ব্যর্থ তবু ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম সারির দলগুলোর সাথে জিতেছে সেই ঘটনা বিরল। একটা দলকে সঠিক পথে চালান করার জন্য শুধু পনের জনের একটা টিমই যথেষ্ট না আজকের দিনে। টিম ম্যানেজমেন্টও সমান গুরুত্বপূর্ণ ফিজিও কোচ থেকে শুরু করে অ্যানালিস্টরা পর্যন্ত, সেটা যদি বোর্ড সুষ্ঠুভাবে না চালাতে পারে তবে দলের সাফল্যে তার প্রভাব পড়বেই। 

এ তো গেল তত্বের কচকচি যা হয়তো উইকি ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু তার বাইরে আমার একটা যুক্তি আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আজকের দুর্দশার পেছনে, খুব বিজ্ঞানসম্মত নয় তবু বলার প্রয়োজন মনে করলাম। সমগ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ হল খুশী মানুষের দেশ, এখানে হাওয়ায় ছড়িয়ে আছে ক্যালিপ্সো, সোকা, রেগে। পেটে টান থাকলেও এখানে ঘাটতি নেই সুর্যের আলোর, নেই সোনালী বালির সমুদ্রতটের। এই পরিবেশে ক্রিকেট খেলাটা ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এভাবেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেয়েছে সোবার্স, লয়েড, রিচার্ডস, লারাদের – এদের ক্রিকেট জুড়ে রয়েছে বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই ক্যালিপ্সোর ছন্দ। এই আবহাওয়ায় বড় হয়ে যখন খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দৃঢ় সত্যের সামনে দাঁড়ায় আর বাধ্য হয় তার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেবার, তার ফল হয় অত্যন্ত হতাশাজনক। মানুষ বদলে তৈরী হয় রোবোট, তার ভেতর থেকে সব ছন্দ যায় হারিয়ে। ঠিক যেমনটা হয়েছে ব্রাজিলের ফুটবলে, তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের সিস্টেমের বশ, এদের মধ্যে সাম্বার কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। আর ঠিক তেমনভাবেই হারিয়ে গেছে ক্যালিপ্সো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট থেকে, যদি টাকার পেছনেই ছুটতে হয় তবে তো আছেই বেসবল, বাস্কেটবল আমেরিকায় খেলার হাতছানি। সেখানে নেই সেই চোখ ধাঁধানো রোদ্দুর, সোনালী বীচ বা ঢেউয়ের গর্জন, রেগের ঢিমেতাল লয় বদলে যায় চিয়ারলিডারদের উদ্দাম টিনসেলের ঝলকানিতে, যেটা যদিও এখন জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট মাঠেও।

তবে সময়ের সাথে বদলায় সব কিছুই, অতীতকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে চলা যায়না। ধ্রুপদী ক্রিকেটের স্থান এক সময় মানুষের কাছে ছিল, আজ সেটা বিরল। পৃথিবীতে কোন খেলাই আজ কেবলমাত্র ভাল লাগার জন্য খেলা হয় না, কেউই আর অ্যামেচার নয়, খেলার সাথে জুড়ে গেছে আর্থিক সামাজিক বানিজ্যিক রাজনৈতিক স্বার্থ। অতীতের চোখ দিয়ে বর্তমান আর ভবিষ্যতকে দেখতে গেলে হতাশা তো হবেই। পেশাদারিত্বের এই যুগে যেখানে এসেছে আরো অনেক প্রযুক্তি, সেখানে খেলার বা প্রতিযোগীতার গুণগত মান অনেক উঁচু হয়েছে খেলোয়াড়দের নিজস্বতার বিসর্জনে, আর খেলার আঙিনা এখন টিঁকে থাকার লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্র। এ যেন লামার্কের প্রতিপাদ্যের নির্মম উদাহরণ – হয় অভিযোজন নয় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া। 

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট পুরনো সেই সোনালী যুগের পুনরাবৃত্তি করতে পারে কিনা সেটা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে। কিন্তু সেই ষাট থেকে আশির দশকের দুর্বার দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে উইজডেন, আর কিছু ধুলিধুসরিত স্মৃতি যারা সেই সময়কে প্রত্যক্ষ করেছিল, আর সেইসব প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণায়। তাদের মহাকাব্যিক বিবরণে তখনও দাপিয়ে বেড়াবে সোবার্স গার্নার মার্শাল রিচার্ডস লারারা, যদিওবা হয়তো সেই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট থাকবে সেই আগুনে বছরগুলি থেকে এক আলোকবর্ষ বিপ্রতীপে। 
Standard