calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Advertisements
Standard
Bengali, Life experience, Memory, Nostalgia

জলপাইগুড়ির দিনরাত্রি

সেই কবে তারাপদ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম এক জবরদস্ত অযোধ্যা সিং-এর রাম খাওয়ার গল্প, যার শেষের লাইনটা ছিল সেই অযোধ্যা আর নেই, আর সেই রামও আর নেই। নাঃ এটা পলিটিক্যাল লেখা নয়, রাম নিয়ে রসিকতা করার ধ্যাষ্টামো আমার নেই। সে রাম খালি হনুমানদের, আমি যে রামের কথা বলছি সেটা একান্তই এই হনুর। মাল গাঁজা সহযোগে বেলেল্লাপনার চরম উদাহরণ রেখে গেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার দিনরাত্রিতে। হঠাৎ করে সে বইয়ের কথা মনে পরে মনটা চলে গেলো ১৮-১৯য়ে, হ্যাঁ সে ছিল একটা সময় বটে। জলুতে তখন ফার্স্ট ইয়ার। সব পোনাদের উপদেশ মেনে লেখাপড়া ডকে, আরে বাপু ক্যাম্পাসিং এমনিও হয়না, ওমনিও হয়না, পড়ে আর কি ছিঁড়বি। কাজেই চালাও দেদার বিড়ি সিগ্রেট বাংলু। জলুর কথা মনে পড়ায় ভাবলাম, সুনীল সমরেশ সন্দীপনের কলকাতার দিনরাত্রির চেয়ে আমাদের জলুর দিনরাত্রিগুলো কম রঙিন ছিলোনা। রামের কথাই যখন উঠল তাহলে রাম দিয়েই শুরু করি। ফোর্থ ইয়ারের নামকরা মাতাল পোদুদা একদিন রাতে আমাদের হোস্টেল এ এসে আমাদের দুজনকে নাম ধরে খোঁজা শুরু করলো, কিবে তোর নাম হনু? হ্যাঁ দাদা। আর তুই খেঁচু। হ্যাঁ। শুনেছি তোরা নাকি হেভি মাল খাস? এই দেখ এক বোতল রাম, চল রুমে চল। আর বোতল মানে পাঁইট ফাঁইট নয়, পুরো খাম্বা। তবে আদ্ধেক আগেই সাঁটিয়ে এসেছিলো মহাপুরুষ। আহা সেই যে হল অফ ফেমে নাম ওঠার অনুভূতি হয়েছিল, জীবনে আর কখনো সেরম কৃতার্থ বোধ করিনি। পুরো চার বছরের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ উজাড় হয়ে যাবে, সেসব থেকে বেছে বেছে দুটো ঘটনাই শেয়ার করলাম। তখনকার বন্ধুবান্ধব সব এখন দায়িত্বশীল চল্লিশ ছুঁইছুঁই ধেড়ে মানুষ, কাজেই তাদের আর বিব্রত করলাম না আসল নামধাম বলে, পড়ে যাদের যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে যাবে, আর বাকিদের বলি আসল নাম দিয়ে কি ঘন্টা হবে হ্যাঁ?

দিন

সেটা ৯৭ সালের মে মাসের কথা। ফার্স্ট ইয়ার। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার ২ সপ্তা আগে অন্ডকোষ টাকে উঠে গেছে, তখন প্রমাদ গণছি কেন সারাটা বছর না ঘষে কাটিয়েছি, এবার হয়ত খেলাম ইয়ার ল্যাগ। এমন সময় টাউনে ব্যাপক বাওয়াল হয়ে কলেজ বন্ধ। সে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। এবার কি করা? বাড়ি যাবার বেশ ১০-১২ দিন দেরি আছে কিন্তু কলেজে কিচ্ছু করার নেই আর টাউনে যাওয়া বন্ধ ফের বাওয়ালির ভয়ে। এমন সময় একদিন সকল ৯টায় সবে দাঁত মাজছি এমন সময় হোস্টেলের করিডোরে দেখতে পেয়ে রামুদা হাঁক মারলো, হনু মদ খাবি চল। ভাবলাম খোরাক দিচ্ছে, উত্তর দিলাম দাঁড়াও ৫ মিনিটে আসছি। ৫ মিনিট পর দেখি কি কেলো, রামুদা এসে হাজির, আমাকে আর খেঁচুকে নিতে। ভাবলাম হোস্টেলে বসে বসে ছেঁড়ার চেয়ে খানিক মাল টেনেই দেখা যাক, সকালে কখনো খাইনি। সাড়ে ৯টা নাগাদ তিন মূর্তি গিয়ে হাজির হলাম কলেজ মোড়ে. পাতি দরমার দোকান, তাতে সকালে খিচুড়ি চা বিস্কুট এসব বাদ দিয়ে আড়ালে আবডালে বাংলাও পাওয়া যায়। চেনা লোকদের পেতে একটু সুবিধা বেশি। তা সে দোকানে গিয়ে গোটা কয় বাংলা নিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। সামনে NH 31 ফাঁকা বললেই চলে। গরম আসছে আসছে তবে তখন আজকালেরমতো পেছন ফাটানো গরম পড়তোনা। তাই গাছের ছায়ায় আরাম করে বসে আড্ডা জমলো চরম, সাথে বাংলার মৌতাত। তখন সিগারেট খাওয়া ছাড়িনি তাই মদ সিগারেট জুটি জমে গেলো। ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে বাংলার বোতলের সারিও জমতে লাগলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে কেএকজন এসে ক্যারমবোর্ড পেতে ফেললো, ব্যাস সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন কে পাল্লা দিয়ে কত বোতল মাল টানলো তার একটা কম্পিটিশন ছিল, তাই পরিষ্কার মনে আছে ৯টা সাড়ে নটা থেকে দুপুরে খাবার সময় অবধি পাঁচ বোতল বাংলা সাঁটানো হয়ে গেছে। দুপুরে গিয়ে অনেক্ষন ধরে চান করলাম যাতে ধুনকিটা কমে আসে। রাতে আবার গাঁজলুদার সাথে মাল খাবার প্ল্যান যাতে কেঁচে না যায়। ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে উইংসে ঢুকেছি তো ছানা ধরলো আমায়, মাল খেতে গেলাম ওকে বলিনি কেন। কি কান্ড, বললাম আবার চল তাহলে। আবার চললাম কলেজ মোড় সাইকেল চেপে। ছানা সবে মাল খাওয়া ধরেছে, খানিক ট্রেনিং দিয়ে দিলাম বাংলা কিভাবে খেতে হবে তার। এক দেড় বোতল খাবার পর কে একজন এসে জুটলো, খুব সম্ভব চামচিকে। ছানাকে এর মধ্যে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে বেশ গোটাকয় রসগোল্লা খাইয়ে দিয়েছি যাতে নেশাটা চড়া হয়। আবার একের পর এক বোতল জমতে লাগল। মনে আছে যে বেঞ্চিতে বসে মাল খাচ্ছিলাম আমাদের পাশে একটা ট্রাকওয়ালা ভাত খাচ্ছিলো। নেশার ঘোরে ছানাকে বললাম এই দ্যাখ, লোকটা না মাছভাজা খাচ্ছে। এই বলে দুজনে যা অট্টহাস্য লাগলাম, ট্রাকওয়ালা হাফ খাবার খেয়েই মানে মানে কেটে পড়লো। সময় প্রায় আড়াইটে তিনটে হঠাৎ মনে হলো যে না, এবার যথেষ্ট হয়েছে। নেশাটা বেশ চড়েছে, সাইকেল চালিয়ে ফিরতে আর পারবোনা। মনে হয় পাকেচক্রে আবার রামুদাকেই খুঁজে পেলাম রিক্সা করে হোস্টেল দিয়ে আসার জন্যে। ছানা তো তখন বেশ বুঁদ হয়ে আছে। মুখ বন্ধ পাছে জনতা খোরাক দেয়। এদিকে আমার ততক্ষনে ন বোতল বাংলা খাওয়া হয়ে গেছে। খেয়াল ছিল যে বমি করতে হতে পারে, তাই আমার বালতিখানা নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমার রুমমেটের খাটে। প্ল্যান হলো একটু ঘুমোনো।

তা সে গুড়ে বালি, জনগণ মাতাল পেলেই উল্লাসে ফেটে পরে খোরাক দেখার জন্যে। সেদিন আমি ছিলাম পুরো ঠিকঠাক, বুঝতে পারছিলাম নেশা বেশি হয়ে গেছে কিন্তু একটু ঘুমিয়ে নিলেই কেটে যাবে। এদিকে জনগন বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্যে রুম ভর্তি করে ফেলেছে। আমার রুমমেট পড়েছে চরম বিপদে। বমি করলে ওর বিছানা নষ্ট, এদিকে আমাকে সরাতেও পারছেনা। চেষ্টা করলো খানিক তেঁতুলজল কোথা থেকে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতে। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও যখন মুখে গ্লাস গুঁজে দিলো, তখন ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। মুখ ভর্তি তেঁতুলজল পাশ ফিরে ওর খাটের পাশ দিয়ে ফেলে দিলাম। অবস্থা বেগড়বাঁই দেখে রুমমেট হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে ওর খাটেই ঘুমোতে দিলো।

এদিকে নেশার ঘোরে থাকায় ছানার খোরাক মিস করে গেলাম। ছানা ছিল খুব অধ্যবসায়ী ছেলে। শরীরচর্চা করতো, নিয়ম মেনে চলতো। মদ খেয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল চলে গেছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা। রুমে ফিরে ছানা নাকি তাই গোটা পঞ্চাশ ডনবৈঠক দিয়ে দিলো, তার পরও কিছু হচ্ছেনা দেখে আমাদের কাঠের আলমারিতে নাকি দুমদাম ঘুঁষি মারতে শুরু করলো। আমাদের তাপস পাল ছিল পালোয়ান, ছানার রুমমেট, সেও ছানার সেই ফর্ম দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছিলো কি করে ফেলে সেই ভয়ে।

খোঁয়ারি যখন ভাঙলো, দেখি সন্ধ্যে নটা। যতদূর মনে পড়ছে স্পেশাল খাবার ছিল সেদিন। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে গেলাম গাঁজলুদাকে ধরতে আবার রাতের রাউন্ড শুরু করার জন্যে, কিন্তু সব কীর্তিকলাপ শুনে সেদিন আর গাঁজলুদা নিয়ে গেলোনা সাথে। ওই দিনের আগে পরে বেশ কিছু বার সারা দিন ধরে বেলেল্লাপনা করেছি কিন্তু ন বোতল বাঙলার রেকর্ড সেই একবারই।

রাত

দিনের বেলা মাতলামির গল্প মনে করা সহজ কারণ খুব বেশিদিন সারাদিন ধরে ড্রিংক করা হয়ে ওঠেনি। রাতের বেলার গল্প আলাদা। এতো রাশি রাশি গল্প মনে আসে রাতের যে তার ফিরিস্তি একসাথে দেয়া মুশকিল। গোলমালের ব্যাপার হলো যে তার অনেক গল্পেই বাকি সবাই খোরাকের অংশীদার আমি ছাড়া, আমিই ছিলাম খোরাকের কারণ। সে দিনগুলোর কথা আর নাই বা বললাম, তবে ইয়ারমেটদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমাকে সামলে রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। ফার্স্ট ইয়ারের কথাই বলি, কারণ সেকেন্ড ইয়ার থেকে আমরা খানিকটা হলেও সিনিয়র হয়ে গেলাম। তাই প্রথম বছর উইংসে বাইরে থেকে মদ কিনে সদলবলে খাওয়ার আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

এমনি এক দিন দিনু মানে দিনবাজার থেকে এক বোতল হুইস্কি কেনা হয়েছে, গোটা ৭-৮ জন খাবো বলে। আমাদের ৭ নম্বর রুম ছিল তাস, সিগারেট আর মালের ঠেক, তাই আমাদের রুমেই সব এসে জুটলো। সবে পেগ বানিয়ে দু চুমুক দিয়েছি দেখি দরজা দিয়ে কে উঁকি মারছে। পানুপন্ডিত। পানু ছিল আমাদের পাশের রুমে। সিধেসাধা ছেলে, আমাদের ইয়ারের এক মেয়ের ওপর তার প্রচুর ব্যথা তখন। সবে দিন দুই আগে উইংসের সবাই ওকে পরামর্শ দিয়েছে যে সেই মেয়ের মন জিততে হলে গান গাইতে হবে। সেই দু দিন ধরে পানুর রুমমেটরা আমাদের গালি পাড়ছিলো যে সারাদিন পানু তাদের বেসুরো গলায় গান শোনাতে চাইছে। ভাবলাম বেশ তো সুযোগ। পানু আমাদের জিজ্ঞেস করলো, তোরা কি মদ খাচ্ছিস? – হ্যাঁ তুই খাবি? ভেবেছিলাম বলবে না, দেখি ঝপ করে রুমে চলে এসে আমাদের মাঝে বসে পড়লো। – বড় বড় গায়করা স্টেজে গান গাইতে ওঠার আগেই মদ খায়। আমিও খাই, গলাটা ভালো হবে। পানুর যুক্তি শুনে আমরা হাঁ। খোরাক দেখার জন্যে আমরা পানুকে বড় বড় পেগ বানিয়ে দিলাম। সেই তার প্রথম মাল ধরা, কিন্তু টপাটপ বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে ফেললো। আমরাও মজা দেখার জন্যে ওকে আরো বড় পেগ বানিয়ে খাওয়ালাম। নেশাটা যাতে চড়ে আরো, তাই খানিক চিনি, গ্লুকন ডি এই সব ও খাওয়ালাম যখন ও বললো যে মাথা ঝিমঝিম করছে। ওকে বলা হলো যে সুগার কমে গেছে, বেশি করে চিনি খেতে হবে। এখনো জানিনা চিনি খেলে নেশা বাড়ে কিনা কিন্তু তখন সেটা সবাই বিশ্বাস করতাম। হুইস্কির বোতল আর হাফ কৌটো গ্লুকন ডি শেষ করার পর ঠিক করলাম এবার হোস্টেলের বাইরে যাওয়া যাক।

রাতের সেই সবে শুরু। পানুকে বললাম তুই যদি সেই মেয়ের মন জয় করতে চাস তাহলে চল বাইরে লেডিস হোস্টেলে। বাইরে হাওয়া খেলে নেশাও কমবে আর সুস্থ বোধ করলে তাকে একটা গানও শোনাতে পারবি। পানুপন্ডিত টোপ খেয়ে গেলো। দলবল মিলে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেলের বাইরে। দু চারটে সিনিয়র দাদারা কমন রুম থেকে আমাদের সাবধান করে দিলো। ১ নম্বর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সব হাঁটা মারলাম কলেজের দিকে। প্ল্যান ছিল একে একে সব লুকিয়ে পড়বে, তারপর পানুকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করবে আর খোরাক নেবে। সাইকেল ভাড়া নেয়ার দোকান অবধি গিয়ে পানু বসে পড়লো বেঞ্চিতে। ওর নাকি বেদম মাথা ঝিমঝিম করছে। আমরা ওকে লেডিস হোস্টেলের রাস্তা দেখিয়ে বললাম চল হোস্টেলে ফিরে চল। খোঁয়াড়ি অনেকটা হলেও পানু ঠিকই ধরে ফেলল ওকে কোথায় যেতে বলছি। এদিকে পানু বলছে ও হোস্টেলে ফিরবে, আর আমরা মজা লোটার জন্যে বলছি আমরা এখন হাওয়া খেতে বেড়িয়েছি, এক্ষুনি ফিরবোনা, ওর ইচ্ছে হলে ও একা ফিরতে পারে। আমরা গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে আর পানু এদিকে ২-৩ বার হোস্টেল যাওয়ার চেষ্টা করে গোটা ৫০ গজ গিয়ে আবার ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে পড়লো। এখনো মনে আছে পানুর দুলে দুলে খানিক দুর হেঁটে আবার ফিরে আসা।

সেই বসে থাকা অবস্থায় পানুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো যে মদ খাওয়া অতীব খারাপ কাজ আর আমি আর খেঁচু হলাম গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাকি আমরাই খারাপ করে দিয়েছি। ভাবো কান্ড কুড়ি বছরের ধেড়ে খোকা যেচে রুমে এসে হাফ বোতল ফাঁক করে দিয়ে গেলো, আর আমরা হলাম গিয়ে দোষী। যাক সেসব গায়ে না মেখে সবাই বসে রইলাম কি করে তা দেখার জন্যে। অবশেষে আমাদের হোস্টেলের থার্ড ইয়ারের গোটা দু-তিন দাদারা বাইরে থেকে মাল খেয়ে ফিরছিলো, পানু তাদের দেখে ধরলো। দাদা আমাকে একটু হোস্টেল পৌঁছে দেবে আমি আজকে মদ খেয়েছি খুব মাথা ঝিমঝিম করছে। তা সে দয়ালু দাদারা নিজেরা খোরাক নেয়ার জন্যে পানুকে সাইকেলে চাপিয়ে হোস্টেলে নিয়ে গেলো।

ব্যাপারটা সেখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু দুটো ভিন্ন ধরনের ঘটনা বললাম কারণ সব সময় সব কিছু অনাবিল ফুর্তি আর খোরাক দিয়ে শেষ হয়নি তাই। হোস্টেলে চুলকানোর লোকের অভাব ছিলোনা। সেরকমই একজন আমাদের ইয়ারমেট দেখলো বেশ মজার ব্যাপার পানুপন্ডিত আমাদের মানে আমার আর খেঁচুর ওপর খেরে আছে। ও পানুকে প্রচুর পিন মারলো যে আমরা একদম বাজে ছেলে, পানুর উচিত আমাদেরকে বাওয়াল দেয়া। ও আমাদের ক্যালালে আমরা নাকি পালাবার পথ পাবোনা। আর পানুর ব্যথা পানুর হিরোগিরির খবর শুনে নিশ্চয় ওর ওপর ফিদা হয়ে যাবে। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে পরদিন চান করার সময় অন্য উইংসের আরেক পানু আমাদের পানুর প্যান্ট গামছা সব লুকিয়ে দিলো। পিন খেয়ে পানু ভাবলো সেটাও আমাদের কীর্তি। সন্ধ্যে বেলা পানু ধরলো খেঁচুকে, গালাগাল ধাক্কাধাক্কি পানুর নাক ভাঙলো, আমাদের দুজনের আবার ragging শুরু হলো, পানুর বাবার বন্ধু প্রফেসর আমাদের দুজনকে সাসপেন্ড করার হুমকি দিলো – মানে সব মিলে ঘেঁটে ঘ। মোটের ওপর খোরাকটা মনে হয় আমাদের ওপর দিয়েই গেলো, পানুকে রোজ রোজ নাক দেখাতে টাউনে নিয়ে যাওয়া আসা করতে করতে। তবে হ্যাঁ, অত সবের পর শিক্ষা একটা হয়েছিল তবু, যে পাঁড় মাতাল ছাড়া কারো সাথে মদ খেতে বসার অনেক ঝঞ্ঝাট। সে ঘটনার পর থেকে পেঁচো মাতালদের সাথেই ঠেক হতো বেশি।

জলু গিয়েছি প্রথম বার তা সে নয় নয় করে হয়ে গেছে একুশ বছর প্রায়। এখন স্বাধীনতা প্রচুর, লুকিয়ে চুরিয়ে ব্ল্যাকে মদ কিনতে হয়না। ঘরেই খাওয়া যায়। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার, ফাইনাল, চাকরি – যত বয়েস বেড়েছে, মাল খাবার সুযোগও বেড়েছে, আর সেটা যত সহজলভ্য হয়েছে, নেশাভাঙের যে থ্রিলটা ১৩-১৪ তে ছিল, ২৩-২৪এ তার অনেকটাই চলে গেছে। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার যে রোমাঞ্চ সেটা চলে যাবার পর মদ খাওয়াটা তেমন আর উপভোগ্য রইলোনা। দারু খেতে বসে মদের চেয়ে খাওয়ার অর্ডার হতো বেশি। শেষ যে কবে মাল খেয়ে আউট হয়ে গেছি মনেই পড়েনা। ৭ বছর আগে পুজোয় বাড়ি গিয়ে, সেটাই বোধহয় শেষ বার।

তাই জলুর রঙবেরঙের দিনরাত্রির কথাগুলো মনে পড়লে মন চলে যায় কুড়ি বছর পেছনে। বিছানার পাশে বালতি। খোরাকের থেকে বাঁচতে ছাদের ট্যাঙ্কের ওপর শোয়া দালাল। অ্যানিভার্সারীর বাংলা মেশানো রসনা। সিদ্ধিতে মেশানো মাকড়সার জাল। ফাঁকা বোতল ভেঙে নেশার ঘোরে তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়া। হাইওয়ের ধারে বাংলা আর ক্যারম। কলেজে প্রথম দিন ফাইনাল ইয়ারের ছেলের জল বলে দেয়া বাংলা। পোদুদার কাছে ব্যাপ্টিজম। Holy Water এর বদলে রাম। নস্টালজিয়া। কোথায় আজ সেই রাম, কোথায় সেই অযোধ্যা, থুড়ি জলু। হেথা নয় বন্ধু অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। নাকি জলু আছে সেই জলুতেই, খালি চরিত্রগুলো পাল্টে গেছে?
Standard
Bengali culture, Cuisine, Nostalgia

পৌষ পার্বন পুলি পিঠে আর বিশ্বায়ন

আজ মকর সংক্রান্তি। জানতাম না, মনে থাকার কথাও নয় তবু সকাল বেলা ফেসবুকে দেখি পাড়ার পুরনো বন্ধু মেরিন বেজায় চটে লিখেছে মকর কেমন দেখতে হয় জানা আছে? যুক্তিটা ফেলার নয় আর এই সোশাল আদিখ্যেতা দেখে আমারো একই রকম পিত্তি জ্বলে গেল। হয়ত আর কিছুদিন পর অমাবস্যা পূর্ণিমা অম্বুবাচী ঘেঁটুপুজো কোনো কিছুই বাকী থাকবেনা। আমাদের পূর্বজ বাম লিডাররা যেকোনো পরিবর্তনকে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র বলে চালানোর চেষ্টা করতো, তবে একটু খতিয়ে দেখলে মনে হতেই পারে যে এই সব লোকাচার কেমন ভাবে বিশ্বায়নের গ্রাসে চলে যাচ্ছে। একদিকে সময় আর সামাজিক যোগাযোগের কমতিতে এসব মকর সংক্রান্তি-টান্তি শিকেয় উঠেছে, আবার সেরকমই বাজার অর্থনীতির হাত ধরে এসব হারিয়ে যাওয়া আচারবিচার থেকে মুনাফা তুলতে হাজির পুরনো আচার আচরনের ধুয়ো তোলা সংস্থারা। যেমন ঘরোয়া খাবার নিয়ে উপস্থিত ভজহরি মান্না, তেরো পার্বন, ৬ বালিগঞ্জ প্লেস। প্রথমে বিশ্বায়ন মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডালের বদলে কেএফসি ডোমিনোস ইত্যাদি খাওয়া শিখিয়ে তারপর নস্টালজিয়ার খোঁচা মেরে সেই মাছের মাথার ডাল ঘরে ২৫/- টাকার বদলে ২০০/- টাকা দিয়ে কেনাচ্ছে। সেভাবেই হয়ত অদুর ভবিষ্যতে আমরা পেয়ে যাবো পৌষ পার্বনে পুলি পিঠের হোম ডেলিভারি। তারপর মুখে গোটাকয় পিঠে ঠেসে সেলফি— ব্যাস ষোল আনা বাঙালিয়ানা ফলানো হয়ে গেল।

সব প্রজন্মই মনে হয় ভাবে যে তাদের জীবনকালটাই সবচেয়ে সেরা, নতুন পুরনো দুইয়ের নিপুন সম্মিলন। আমারো সেরকমই মনে হল আজ যে অন্তত আমাদের আশির দশকে বড় হওয়া প্রজন্ম এসব প্রচলিত প্রথাগুলোর সাথে বহুল পরিচিত ছিল। সেই ভাবনা থেকেই ইচ্ছে হল বিশ্বায়নকে তুলোধোনা বা ফেসবুকে মাকড় সংক্রান্তি জাহির না করে খানিক পৌষ পার্বনের আসল উৎকর্ষ নিয়েই খতিয়ে দেখা যাক। হ্যাঁ পিঠে পায়েস এইসব।

মকর সংক্রান্তি খালি নামেই ছিল, আমরা চিরকাল জেনে এসেছি যে এটা পৌষ পার্বন, পিঠে খাওয়ার দিন। ধর্মীয় আচার-টাচার হয়তো কিছু আছে কিন্তু সেসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি চোখের সামনে রসে টইটম্বুর পিঠের ছবি ভেসে ওঠায়। আর আগে খাওয়া মানে যে শুধু নিজের মাইক্রো পরিবার তা তো ছিলনা, আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী এমনকী কিছু দুরে থাকা আত্মীয়স্বজন সবাইকেই দিয়েথুয়ে তারপর যা পড়ে থাকতো তা দিয়েই পরের তিন দিন টানা পিঠে খাওয়া চলত। বাবার অফিস, আমার স্কুল সবেতেই টিফিন পিঠে তারপর খেলতে যাবার আগে গোটাকয় আর সন্ধ্যাবেলা টিফিনে আবার সেই পিঠে। এখানে সেই পিঠেরই একটা পাঁচালি লেখার চেষ্টা করলাম। যদি কেউ আর কিছু মনে করতে পারেন লিখে পাঠালে বাধিত রইব।

পিঠের লিস্টি

১) পাটিসাপটা : পৌষ পার্বনের ন্যুনতম লেভেল। আর কিছু না হলেও খানকতক পাটিসাপটা ঠিকই হত বাড়ি বাড়ি। আর বানানোর কিছু কিছু ট্রিক মনে আছে। চালগোলা চাটুতে দিয়ে তারপর আস্ত তেজপাতা দিয়ে মিশ্রনটাকে ছড়িয়ে দিতে হত। পরে বিদেশে প্যানকেক বা ক্রেপ বানানোর পদ্ধতি দেখে সেই পাটিসাপটাই মনে পড়ে যেত। আর পুর বানানোরও বিশাল সরঞ্জাম আগের রাত থেকে নিরামিষ বঁটির মাথায় নারকেল কোরার যন্ত্র। তারপর গুড় দিয়ে কড়াইতে মেশানো। জল মরে গিয়ে গুড় আর নারকেল মিশে গেলে পুর তৈরী হয়ে গেল। কেউ কেউ গুড়ের জায়গায় চিনি দিয়েও বানাতো পুর। খোয়ার পুর এলো বেশ কিছুদিন পর।

২) মালপোয়া : ভানুর সেই মাসিমা মালপো খামুর মালপোয়া ছিল দ্বিতীয় কমন পিঠে। মালপোয়ায় পুরও লাগেনা তাই বানানো সবচেয়ে সোজা। নিতান্ত আনাড়ি রাঁধুনি যে আর কোন পিঠে পারেনা, সে অবধি মালপোয়া বানাতে পারদর্শী। পিটুলি গোলা বা ময়দার গোলা তৈরি করে গরম তেলে ভেজে তারপর চিনির শিরায় ডুবিয়ে নিলেই মালপোয়া রেডি। মালপোয়ার গোলায় খানিক মৌরি মিশিয়ে দিলে বেশ স্বাদ হয়। কতখানি পিটুলিগোলা কিভাবে কড়ায় দেয়া হল মালপোয়ার আকার আর স্বাদ তার ওপর নির্ভর করে। অল্প জায়গা জুড়ে বানালে ভেতরটা বেশ নরম থাকে। আর বেশী জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে দিলে মালপোয়া হয় বেশ মুচমুচে। বানানো এত সোজা বলে পৌষ পার্বন ছাড়াও অন্যান্য সময় পাড়ার মিষ্টির দোকানে বা লুচি কচুরির দোকানেও মালপোয়া বিক্রি শুরু হয়ে যায় দস্তুরমত।

৩) গোকুল পিঠে : গোকুল পিঠে বানানো তেমন কঠিন না হলেও খুব যে চল ছিল তেমন নয়। যতদুর মনে পড়ে, পাটিসাপটার যে পুর সেটা দিয়েই গোকুল পিঠের পুর বানানো যেত। নারকেল কোরা আর গুড়ের পুর চেপ্টে অনেকটা আলুর চপের পুরের আকারে বানিয়ে পিটুলি গোলায় ডুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে নিলে বড়া তৈরী। তারপর বড়াগুলো চিনির শিরায় ডুবিয়ে নরম হয়ে এলে গোকুল পিঠে রেডি।

৪) রস বড়া : পিঠেদের মধ্যে এটা বানানো বেশ কঠিন। বিউলির ডাল আগের রাতে ভিজিয়ে ডাল মিহি করে বেটে ছোট ছোট গোল্লা বানিয়ে ডুবো তেলে প্রথমে ভাজা হতো। বড়াগুলো বেশ লালচে হয়ে এলে নামিয়ে চিনির শিরায় ডুবিয়ে রেখে দিয়ে গোল্লাগুলো নরম হয়ে গেলে রস বড়া তৈরী। তবে, কঠিন পার্টটা হলো ডালবাটা কতটা ঘন হবে সেটা। খুব ঘন হলে বড়ার ভেতরটা রান্না হবেনা, ডাল কাঁচা কাঁচা রয়ে যাবে। আর অন্যদিকে ডালবাটা বেশি পাতলা হলে তেলে ছাড়ামাত্র ডালগুলো আলাদা হয়ে যাবে। বড়া কতখানি ভাজা হবে সেটাও জরুরি। কম ভাজা হলে ডাল ভেতরে কাঁচা থেকে যাবে, যা খেতে অখাদ্য। আর ভাজা বেশি হলে বাইরেটা কড়া হয়ে যাবে, রসে ডোবালে বড়াগুলো তেমন রস শুষতে পারবেনা। প্রত্যেক বছর পৌষ পার্বনে বাবা খুব উৎসাহ নিয়ে রসবড়া বানানোর চেষ্টা করলেও কোনো না কোনো দুর্যোগে পারফেক্ট রসবড়া কখনো খাওয়া হয়নি।

৫) দুধ পুলি : দুধ পুলি ছিল পৌষ পার্বনের ম্যাগনাম ওপাস। খেতে অসাধারণ কিন্ত ঠিকঠাক বানানো প্রায় দুঃসাধ্য। পুলিগুলো বানানো হত ময়দার লেচি বেলে খোল বানিয়ে তার মধ্যে নারকোল কোরা আর গুড়ের পুর ভরে অনেকটা মাকুর আকার দিয়ে। তারপর দুধ চিনি আর এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে তাতে পুলিগুলো দিয়ে আরো বেশ কিছুক্ষণ ফুটিয়ে দুধ বেশ খানিকটা মরে এলে দুধ পুলি তৈরী। শুনে মনে হয় এ আর এমন কী? পুলি কেমন দাঁড়াবে সেটা সবটাই নির্ভর করছে খোলের ওপর। ময়দার খোল বেশি মোটা হলে পুলিগুলো শক্ত শক্তই রয়ে যাবে, পুলি খেয়ে মনে হত যেন ময়দার তাল। আর খোল বেশি সরু হলে দুধ পুরো ঘন হবার আগেই পুলির খোল ভেঙ্গে পুরগুলো দুধে মিশে যাবে। দুধ পুলি করার অনেক চেষ্টা দেখেছি আমাদের বাড়ি বা আত্মীয়দের মধ্যে কিন্তু খুব কমই খেয়েছি যা খেয়ে মনে হয়েছে বাঃ দারুন। বেশির ভাগ সময়েই সেটা দাঁড়াত শক্ত ময়দার গোলা দাঁত ফোটানো যাচ্ছেনা অথবা চামচ ঠেকানোর আগেই পুলি ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে — এজাতীয় বিপর্যয়ে।

৬) চুষির পায়েস :  ছোটবেলা থেকেই দেখতাম বাড়িতে চুষি বানানোর চল। আমারও সেই দেখাদেখি চুষি বানানোর বায়নাক্কা দেখে বাবা মা আমার হাতে একটা ময়দার গোলা ধরিয়ে দিত।  খুব উৎসাহ নিয়ে শুরু করলেও যখন দেখতাম বাবা মার বানানো সমান আর সরু সরু চুষির পাশে আমার এবড়োখেবড়ো মোটা মোটা চুষিগুলো, সে দৃশ্য দেখে বেশ নিরুৎসাহীই হয়ে যেতাম। পৌষ পার্বনে চুষি করার জন্যে তোড়জোড় শুরু হত অনেক আগে থেকে। ময়দার লেচি পাকিয়ে তার একটা দিক টেনে সুতোর মত লম্বা করে সেটা হাতের চেটোতে ঘষে ঘষে চুষি বানানো হত। মনে হয় অন্যান্য সময়েও অনেক জায়গায় চুষির পায়েসের চল ছিল কারণ পায়েসের গোবিন্দভোগ চালের দাম চিরকাল খুব চড়া। চুষি তাই কমদামী বিকল্প। হয়ত এখন চেষ্টা করলে বানাতে পারব চুষি, কিন্তু সেই সব সমান সাইজের আর সরু সরু চুষি অসম্ভব। তো সেই বানানো চুষি তারপর রোদে দিয়ে শুকিয়ে নিলে আসল হুজ্জুতি শেষ। বাকিটা যেরকম পায়েস রান্নার পদ্ধতি তাই। ঠিক মনে পড়ছেনা শেষ কবে চুষির পায়েস খেয়েছি অন্তত পঁচিশ বছর তো হবেই, তাই ঠিক মনে পড়ছেনা চালের পায়েসের সাথে স্বাদের কি তফাত ছিল।

৭) সরা পিঠে : যতদুর মনে পড়ছে এটার চাটগাঁর নাম ছিল আস্কে পিঠে। অনেকে ভারা পিঠেও বলে। সরা পিঠে বানানোর উপকরন খুব বেশি না হলেও বানানোর ঝক্কি অনেক। তবে কারো যদি বাড়িতে ইডলি তৈরির ডিস থাকে তাহলে সরা পিঠের জন্যে সেটা যথেষ্ট। এমনকি সরা পিঠে খেতেও অনেকটা ইডলিরই মত। চাল গুঁড়ো করে তাতে নারকোল কোরা মিশিয়ে খুব সম্ভব অল্প জল দিয়ে মিশ্রণটাকে সামান্য ভেজাভেজা করা হত যাতে ঝুরঝুরে হয়ে পিঠে ভেঙ্গে না যায়। তারপর তালু ভর্তি সেই চালগুঁড়ো নিয়ে ইডলির আকারে বানিয়ে হয় ইডলি ডিসে বা হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে তার ওপরে দিয়ে জল ফোটার বাস্প দিয়ে পিঠে তৈরী হত। তারপর সেই গরম গরম পিঠে পরিবেশন করা হত খেজুরের গুড়ের হাঁড়ির ওপরে জমে থাকা স্বচ্ছ গুড় দিয়ে, যাতে নিচের দিকের দানাদানা গুড় না থাকে। আস্কে পিঠে একবারই খেয়েছিলাম ঠাকুমা বানিয়ে খাইয়েছিল যখন প্রথম দেখা করতে যাই, নিজেদের জমির ধান আর গুড় দিয়ে তৈরী, তা ছাড়া বার কয়েক সরা পিঠে খেয়েছি কিন্তু সেগুলো লোকে এলেম কুড়োনোর জন্যে বানিয়েছিল খেতে অখাদ্য না হলেও সেরকম সুস্বাদু ছিলনা।

৮) তিল পিঠে : এটাও খুব রেয়ার বাঙালি বাড়িতে, যদিও আসামে তিল পিঠের চল প্রচুর।  আমার বার দুয়েক খাবার সৌভাগ্য হয়েছে। রেসিপি পাটিসাপটার মতই খালি পুরের জন্য নারকেল কোরা না দিয়ে সাদা কালো মেশানো তিল আর গুড় ব্যবহার করা হয়।

পিঠের পুরের জন্য যেমন লিখেছি আখের গুড় ব্যবহার করা হত সেটা সব সময় ঠিক না। খেজুরের গুড়ই প্রধানত ব্যবহার করার কথা কিন্তু অনেক সময়ই বাজারে খেজুর গুড় আসত অনেক পর, তাই সেটা না পাওয়া গেলে পাটালি না হয় আখের গুড়ই ভরসা ছিল। ইদানীং কালে খোয়া ক্ষীর দিয়ে বানানোর বেশ চল, খেতে যে খারাপ তা নয় তবে খোয়া চালু হবার মুল কারন হয়ত শর্টকাটে কাজ সারা, নারকেল কোরানো, গুড় দিয়ে জ্বাল দেয়া সেসব ঝুটঝামেলা থেকে নিস্কৃতি। আর চাল যে কি ধরনের নেয়া হত সেটা মনে আসছেনা। নবান্ন উৎসব যখন মনে হয় নতুন চাল মানে আমন ধানের চালই ব্যবহার করা হত। এখন দেখি ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা চাল আলাদা পাওয়া যায় কিন্তু আমার মনে আছে দেখতাম পৌষ পার্বনের আগের দিন বাড়িতে চালের স্তুপ শিল নোড়া দিয়ে বাটার কাজ চলছে।

এসব বহুপ্রচলিত পিঠের বাইরেও যে কত রকমের পিঠে আছে তার ইয়ত্তা নেই। মকর সংক্রান্তি মনে হয় গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে পালন করা হয় বিভিন্ন ভাবে, কিন্তু পিঠে যতদুর জানি মূলত পূর্ব ভারতেই সীমাবদ্ধ —উড়িষ্যা, বিহার, এপার ওপার বাংলা অসম ত্রিপুরা অনেকটা জুড়েই। বিভিন্ন জেলা গ্রাম ভিত্তিতে পিঠেরও তাই প্রচুর প্রকারভেদ।

পিঠের বিষয়ে পিঠের বাইরে গিয়ে এক ঝলক দেখে নিলে উপলব্ধি করা যাবে যে আমাদের জীবন এই ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরে কতখানি বদলেছে। গড়িয়াহাটের রাস্তার ষ্টলে বসা ঘুগনি আর আলুর দম উঠে গেছে সেই অপারেশন সানশাইন থেকে, এখনো ইচ্ছে করে খাই সেই জিবে লেগে থাকা ঘুগনি আর পোড়া পোড়া আলুর দম সাথে খানিক তেঁতুলের জল কিন্তু সানশাইনের সেই ঝকঝকে কলকাতায় তা এখন দুস্প্রাপ্য। তবে আধুনিকতা জীবনের অঙ্গ। তাকে অস্বীকার করে উত্তরের থেকে পিঠ করে যদি নস্টালজিয়ায় ভুগে অতীতের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি তাহলে আমাদের ভবিষ্যত ঝরঝরে। পুরনোকে যক্ষের ধনের মত আগলে না রেখে নতুনকে জায়গা করে দেয়া আমাদের কর্তব্য, সেটা না থাকলে আমাদের অগ্রগতি বন্ধ। খাবার দাবারের চল দেখলেও সেটাই প্রকট। বাজার আমাদের শেখায় প্রতি মুহুর্তে নতুন কিছু করতে, গতানুগতিকের একঘেয়েমির থেকে বাইরে বেরোতে। আমাদের দায়িত্ব হলো নতুন পুরনো দুইকেই সমান সুযোগ দেয়া। ভাল মাল চলবে আর ওঁচা মাল লোপাট হবে, বাজার অর্থনীতির সেটাই মূল মন্ত্র। যেটা নেই সেটা হলো নিয়ন্ত্রণ, যার অভাবে যার টাকা আছে সে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যে তার পন্যই সেরা। সেই জন্য ফান্টা টিকে গেছে গোল্ড স্পট উধাও, যদিও বিন্দুমাত্র পক্ষপাতী না হয়ে বলছি গোল্ড স্পট ফান্টার চেয়ে স্বাদে অনেক গুন ভালো ছিল। আগের সেই জোর যার মুলুক তার এখন এসে দাঁড়িয়েছে পয়সা যার মুলুক তার। আর আমরাও ছুটছি সেই পয়সার পেছনে ইঁদুর দৌড়ে, তাই আজ আমাদের জীবনেও আর অঢেল সময় নেই এসব পিঠে পুলি বানানোর বা ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেয়ার। নতুন পুরনো, দেশী বিদেশী, স্বধর্মী বিধর্মী এসব বাছবিচার থেকে বাইরে বেরিয়ে যদি সবকিছুকে চল আর অচলের নিরিখে বিবেচনা করি তাহলে দুইয়েরই ভালোটা আমরা রাখতে পারব আর খারাপটা ছুঁড়ে ফেলতে। সম্পূর্ণ নির্মোহ পক্ষপাতমুক্ত হয়ে যদি সেটা করতে পারি তবেই নতুন পুরনো প্রকৃত মেলবন্ধন সম্ভব। সেটা যতদিন না হবে ততদিন পাড়ায় ফেরিওয়ালার থেকে টাকায় চারটে ডালপুরির জায়গায় রেস্তোরাঁয় গিয়ে ৫০/- টাকা দিয়ে দুখানা ডালপুরি খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

শেষ করছি পিঠে নিয়ে লেখা সেই অতিপরিচিত লাইন দুটো দিয়ে:
পেটে খেলে পিঠে সয়।
পিঠে খেলে পেটে সয়না॥

পরিশেষ: নিচে গোটাকয় লিংক রইলো আরো অন্যান্য পিঠে নিয়ে জানার জন্যে –

pithe

Standard
cricket, West Indies

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট: এক ঝরা সময়ের ছবি

ছোটবেলার কথা মনে পড়লে খেলাধুলোর কথা যখন ভাবি প্রথমে ফুটবলের কথাই মনে আসে। আটের দশকে কলকাতা ফুটবলের রমরমা তখনো জারি। খবরের কাগজ, রেডিয়ো খুললেই ফুটবলের আলোচনা, রিলে ছাড়া কথা নেই। কৃশানু বিকাশ শিশির সুব্রত ছাড়াও নতুন আমদানি চিমা, তাছাড়া বারপুজো, দলবদল এসব নিয়েই বাজার গরম। ক্রিকেটের সাথে তখনো তেমন পরিচয় হয়নি, যদিও ভারত ততদিনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। কখনো সখনও ব্যাটবল খেলা (জানতাম না সেটাকেই ক্রিকেট বলে) আর গাভাসকর কপিলদেব অমরনাথ এইকটা নাম, এগুলোই ছিল ক্রিকেটজ্ঞান। এছাড়া ইডেনে খেলা পড়লে কলকাতা ক’য়ে রিলে “রান হয়ে গেছে নয় নয় করে…” বা “বল পাঠিয়ে দিলেন পত্রপাঠ সীমানার বাইরে” বাক্যগুলো প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে। তবে আর একটা ব্যাপার জানতাম যা ছাড়া তখন ক্রিকেট ভাবা যেতো না সেটা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 

এখন মনস্তাত্বিকরা মনে করে যে আমাদের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভাল লাগার পেছনে জুড়ে আছে ঔপনিবেশিক সত্তা, সাদা চামড়ার দেশগুলোর ওপর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কালো মানুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে নিজেদের ঔপনিবেশিক বঞ্চনার পরোক্ষ বদলা মনে করা। আমার ঐ বয়সে অত গুরুগম্ভীর ভাবনাচিন্তা করার বিষয় সেটা ছিলনা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখনকার লাইনআপ আর ফর্ম দেখেই মনে সম্ভ্রম জাগা স্বাভাবিক। ইনিংস শুরু করছে গর্ডন গ্রিনিজ আর ডেসমন্ড হেনস, ওপেনিং জুটিতে যাদের রেকর্ড অবসরের বহুদিন পরেও অটুট ছিল। তারপরে চার নম্বরে আইজ্যাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডস, চুয়িং দাম চিবুতে চিবুতে একমুখ হাসি নিয়ে বিপক্ষের বোলিংকে তছনছ করে দিতে খুব কম ব্যাটসম্যানই পেরেছে সমগ্র ক্রিকেটের ইতিহাসে। ছিল গাস লোগির মত জাঁদরেল ফিল্ডার আর সবার ওপরে ছিল এক খতরনাক পেস ব্যাটারী, অ্যামব্রোস, মার্শাল, ওয়ালশ যারা গার্নার, হোল্ডিংয়ের বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলিংয়ের পরম্পরা সার্থকভাবেই বজায় রেখেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা মানেই ছিল একটা কী হয় কী হয় ভাব, আজ কে অন্য টিমকে দুরমুশ করবে সেটা জানার অপেক্ষা। 

এই সময়ের ঠিক পর পরই ক্রিকেটের ক্ষমতার কেন্দ্রটা বদলানো শুরু হয়ে গেল। একদিকে আবির্ভাব হল ক্রিকেটের রাজপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারার, অন্যদিকে সব বাঘা বাঘা খেলোয়াড়দের অবসরের সময় ঘনিয়ে এল, গ্রিনিজ, হেনস, রিচার্ডস, মার্শাল একে একে সবাই বিদায় নিল নব্বইয়ের দশকে। ক্যারিবিয়ান ক্যালিপ্সো ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায় বর্তাল তরুণ লারা, রিচি রিচার্ডসন, হুপার ওয়ালশদের হাতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনো এক শক্তিশালী দল, লারা একাই বহু ম্যাচ জিতিয়ে গেছে, কিন্তু তারা সেই দুর্বার দল নয়, বরং অ্যালান বর্ডারের অসিরা উঠে এসেছে পয়লা নম্বরে যেই আধিপত্য চলবে স্টিভ ওয়া, রিকি পন্টিংয়ের হাত ঘুরে প্রায় বিশ বছর জুড়ে। 

ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতা দখল ছাড়াও আরো বেশ কিছু ঘটনা সেই একই সময়কালে ঘটছিল যা শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ না, গোটা বিশ্ব ক্রিকেটকেই চিরতরে বদলে দিয়েছিল। সত্তরের কেরী প্যাকার সিরিজ দিয়ে যে একদিনের ক্রিকেটের শুরু, নব্বইয়ের দশকে টেস্ট ক্রিকেটের থেকে মনোরঞ্জনের তালিকায় বিজয়ীর স্থানে চলে এসেছে সেই ওয়ান ডে। সমগ্র বিশ্বে সেই সময়ে যে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটছিল যেমন সোভিয়েত জমানার পতন, দুই জার্মানির পুনর্যুক্তি, ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ, এবং এই বদলগুলোর সাথে বিশ্ব অর্থনীতির প্রসার সাধারন মানুষের জীবনেও এক স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ফলে পাঁচ দিন ধরে সারাদিন ক্রিকেট দেখা বা রিলে শোনার মত সময় আর ধৈর্য্য কোনটাই খেটে খাওয়া মানুষের ছিলনা, যেখানে একদিনের ক্রিকেটের মত স্বল্পস্থায়ী বিনোদন বর্তমান। ফলে আস্তে আস্তে যোগ হতে লাগল রঙিন পোশাক, দিন-রাতের ম্যাচ ইত্যাদি। ব্যবসায় একটা কথা খুব প্রচলিত যে ক্রেতাই ঈশ্বর, যা ক্রিকেটে হল দর্শক, তাই যে পরিবর্তনগুলো আসছিল সবই ক্রিকেটকে আরো জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দর্শকদের কাছে। 

এই আমূল পরিবর্তনের সময়ে যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা উঠে এসেছে প্রথম সারিতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেই সময়ে পিছলে যাচ্ছিল প্রধান থেকে সাধারন থেকে নিম্নমানের দলে। বদলে যাওয়া সময়ের সাথে নিজেদের বদলাবার জায়গায় খেলোয়াড় কর্মকর্তা সবাই জড়িয়ে পড়ল অন্তর্কলহে। যদিও জানতাম যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসলে ক্যারিবিয়ান সাগরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দ্বীপরাষ্ট্রের এক যৌথ দল, এটা জানতাম না যে উত্তরে জামাইকা থেকে দক্ষিণে গায়ানা অবধি দ্বীপগুলোর বিস্তৃতি দু-তিন হাজার কিলোমিটার। ভৌগোলিক এই বিশাল ব্যবধান বিচার করলে এটাই পরম আশ্চর্যের যে বিগত চার-পাঁচ দশক ধরে বিশ্ব ক্রিকেটের আঙিনায় এদের আধিপত্যের কী ব্যাখ্যা? প্র্যাকটিস করত কীভাবে, টিম সিলেকশন হত কীভাবে? ক্যারিবিয়ান দেশগুলির অর্থনীতি তেমন সবল নয়, পর্যটন ছাড়া মূল আয় প্রধানত কৃষিকাজ, সেখানে ক্রিকেট টিম স্থাপন আর চালানো এই বিশাল কর্মকান্ডের দায় কীভাবে বিভিন্ন দেশগুলো ভাগাভাগি করে নিত সেটা ভাবলেই অবাক লাগে। এই পরিকাঠামো বিচার করলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে যে অন্তর্দ্বন্ধ দেখা দিয়েছিল নয়ের দশকে, সেটা একসময় দেখা দিতই, দলের ফর্ম পড়ে যাওয়া এই বিবাদকে শুধু চাগিয়ে দিয়েছিল। 

নয়ের দশকে যে অবক্ষয়ের শুরু, নতুন মিলেনিয়ামে সেই চিড় ফাটলের আকার নিল। এই সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ পরিনত হয়েছিল হাতে গোনা কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় সমৃদ্ধ এক অতি সাধারন দলে। চন্দ্রপল, সারওয়ান, ক্রিস গেইল ছাড়াও ছিল পড়তি সময়ের লারা। একুশ শতকের প্রথম দশ বছরে নতুন আমদানি হল ২০-২০ ক্রিকেট আর ক্লাবভিত্তিক আন্তর্জাতিক খেলা যেমন T20 বিশ্বকাপ, আইপিএল, সুপার কাপ ইত্যাদি। টেস্ট ক্রিকেটের গরিমা হয়তো ক্ষুন্ন হয়নি কিন্তু সাধারন দর্শকদের কাছে এ ছিল আরো একটা সহজলভ্য বিনোদন, তিন ঘন্টায় খেল খতম, আর বেশীরভাগ খেলাই দিন-রাতের তাই কাজেও তেমন ফাঁকি পড়বেনা। এই সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট লক্ষ্য করলে দেখা যাবে খেলোয়াড়দের বিবাদ, একজন স্থায়ী ক্যাপ্টেনের খামতি, ক্রিকেট বোর্ডের খেলোয়াড়দের মাইনে দিতে অস্বীকার এবং তার ফলস্বরূপ বেশ কিছু প্লেয়ারদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে না খেলে ক্লাব দলের হয়ে খেলা। 

শেষের কারণটা ক্রিকেটের পক্ষে চরম দুর্ভাগ্যের। নতুন শতকে ক্রিকেটের এই দশা সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিম্বাবয়ে এই দেশগুলোর, যেখানে আর্থিক অনটন আর বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। এই দশ বছরে আইসিসি পর্যবসিত হয়েছিল রেভিনিউ কামানোর ইঁদুরদৌড়ে সামিল এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য কিন্তু বোর্ড নিজেদের অস্তিত্বের মূল কারন যা হল বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের প্রসার এবং খেলার মান আর উৎকর্ষতা বাড়ানো- সেটা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কেবল উপার্জনের ওপর সব গুরুত্ব দিয়েছিল। সংস্থার দখল চলে গেল ক্রিকেটারদের থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে শুরু হয় বিস্তর কারচুপি, বিসিসিআই এর মত শক্তিশালী বোর্ডগুলোর নিজেদের সুবিধামত পেশী আস্ফালন, খেলার নিয়মকানুনের বদল যার উদ্দেশ্য খেলার মান বাড়ান নয় বরং আমানতকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির বানিজ্যিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা। নব্বইয়ের সময়ে ওয়ান ডে খেলার রমরমা দেখে যারা কু গেয়েছিল যে আইসিসি ক্রিকেটকে বেসবলে পরিনত করার চেষ্টা করছে, আজকের ২০-২০ ক্রিকেটের বাড়তি দেখে হয় তাঁরা মুচকি হাসছেন নাহয় জিভের তলায় সরবিট্রেট রাখছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নতুন শতকের এই সমীকরণে সফল হওয়া নিতান্তই অসম্ভব হয়ে পড়ল, বিশেষ করে যখন আয়োজক মাঠের আয়ের অধিকাংশই যাবে আইসিসির কোষে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলির মধ্যে একমাত্র জামাইকা ছাড়া অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আর কারওই তেমন নেই তাই ক্রিকেট বোর্ডগুলোর মধ্যে বিবাদ-মতানৈক্য এসবের মূলে যে টাকাপয়সা জড়িয়ে, তা সন্দেহের ঊর্দ্ধে। ক্রিকেটের উৎকর্ষ বৃদ্ধির যূপকাষ্ঠে বলি হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিম্বাবয়ে এই দলগুলো যাদের শুধু খেলায় অংশগ্রহন করতেই অশেষ প্রতিকুলতার মোকাবিলা করতে হয়। আজকের দিনে এরা নিছকই কোল্যাটেরাল ড্যামেজ। 

বিগত দশ বছরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের অধোগতির জন্য যে খেলোয়াড়দের দায়ী করা যায় তা নয়। হয়তো আশির দশকের বুক কাঁপানো ড্রিম টিম নয় কিন্তু এখনকার টিমে যে প্রতিভার ঘাটতি আছে তা নয়, যেটা অনুপস্থিত তা হল আত্মবিশ্বাস আর দলীয় সংহতি। তাছাড়া টিম এখন পুরোপুরি ক্রিস গেইল ভিত্তিক, গেইল ব্যর্থ তবু ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম সারির দলগুলোর সাথে জিতেছে সেই ঘটনা বিরল। একটা দলকে সঠিক পথে চালান করার জন্য শুধু পনের জনের একটা টিমই যথেষ্ট না আজকের দিনে। টিম ম্যানেজমেন্টও সমান গুরুত্বপূর্ণ ফিজিও কোচ থেকে শুরু করে অ্যানালিস্টরা পর্যন্ত, সেটা যদি বোর্ড সুষ্ঠুভাবে না চালাতে পারে তবে দলের সাফল্যে তার প্রভাব পড়বেই। 

এ তো গেল তত্বের কচকচি যা হয়তো উইকি ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু তার বাইরে আমার একটা যুক্তি আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আজকের দুর্দশার পেছনে, খুব বিজ্ঞানসম্মত নয় তবু বলার প্রয়োজন মনে করলাম। সমগ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ হল খুশী মানুষের দেশ, এখানে হাওয়ায় ছড়িয়ে আছে ক্যালিপ্সো, সোকা, রেগে। পেটে টান থাকলেও এখানে ঘাটতি নেই সুর্যের আলোর, নেই সোনালী বালির সমুদ্রতটের। এই পরিবেশে ক্রিকেট খেলাটা ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এভাবেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেয়েছে সোবার্স, লয়েড, রিচার্ডস, লারাদের – এদের ক্রিকেট জুড়ে রয়েছে বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই ক্যালিপ্সোর ছন্দ। এই আবহাওয়ায় বড় হয়ে যখন খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দৃঢ় সত্যের সামনে দাঁড়ায় আর বাধ্য হয় তার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেবার, তার ফল হয় অত্যন্ত হতাশাজনক। মানুষ বদলে তৈরী হয় রোবোট, তার ভেতর থেকে সব ছন্দ যায় হারিয়ে। ঠিক যেমনটা হয়েছে ব্রাজিলের ফুটবলে, তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের সিস্টেমের বশ, এদের মধ্যে সাম্বার কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। আর ঠিক তেমনভাবেই হারিয়ে গেছে ক্যালিপ্সো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট থেকে, যদি টাকার পেছনেই ছুটতে হয় তবে তো আছেই বেসবল, বাস্কেটবল আমেরিকায় খেলার হাতছানি। সেখানে নেই সেই চোখ ধাঁধানো রোদ্দুর, সোনালী বীচ বা ঢেউয়ের গর্জন, রেগের ঢিমেতাল লয় বদলে যায় চিয়ারলিডারদের উদ্দাম টিনসেলের ঝলকানিতে, যেটা যদিও এখন জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট মাঠেও।

তবে সময়ের সাথে বদলায় সব কিছুই, অতীতকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে চলা যায়না। ধ্রুপদী ক্রিকেটের স্থান এক সময় মানুষের কাছে ছিল, আজ সেটা বিরল। পৃথিবীতে কোন খেলাই আজ কেবলমাত্র ভাল লাগার জন্য খেলা হয় না, কেউই আর অ্যামেচার নয়, খেলার সাথে জুড়ে গেছে আর্থিক সামাজিক বানিজ্যিক রাজনৈতিক স্বার্থ। অতীতের চোখ দিয়ে বর্তমান আর ভবিষ্যতকে দেখতে গেলে হতাশা তো হবেই। পেশাদারিত্বের এই যুগে যেখানে এসেছে আরো অনেক প্রযুক্তি, সেখানে খেলার বা প্রতিযোগীতার গুণগত মান অনেক উঁচু হয়েছে খেলোয়াড়দের নিজস্বতার বিসর্জনে, আর খেলার আঙিনা এখন টিঁকে থাকার লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্র। এ যেন লামার্কের প্রতিপাদ্যের নির্মম উদাহরণ – হয় অভিযোজন নয় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া। 

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট পুরনো সেই সোনালী যুগের পুনরাবৃত্তি করতে পারে কিনা সেটা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে। কিন্তু সেই ষাট থেকে আশির দশকের দুর্বার দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে উইজডেন, আর কিছু ধুলিধুসরিত স্মৃতি যারা সেই সময়কে প্রত্যক্ষ করেছিল, আর সেইসব প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণায়। তাদের মহাকাব্যিক বিবরণে তখনও দাপিয়ে বেড়াবে সোবার্স গার্নার মার্শাল রিচার্ডস লারারা, যদিওবা হয়তো সেই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট থাকবে সেই আগুনে বছরগুলি থেকে এক আলোকবর্ষ বিপ্রতীপে। 
Standard