Bengal, Politics

যাত্রাপালা : রঙমেলান্তি, ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন ও জনমত

ভোট নিয়ে আগে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছি, সে জোড়া কুঠার (এ ম্যাওবাদী আসার অনেক আগের ব্যাপার বাপু, তখন তিনোমুল মানে মাঠেঘাটে ঘাসের মধ্যে ফুটে থাকা ফুলই জানতাম, কাজেই আমারে আবার ম্যাওবাদী বলে দেগে দেয়ার চ্যাষ্টা কইরেননা) হোক বা বেচারী বারে বারে জমানত বাজেয়াপ্ত হওয়া নেপালী বুড়ো (উঁহু, স্বাধীন গোর্খাল্যান্ডেও নেই)। ভোট মানে তখন লায়েক হয়েছি, আঙুলে কালি লেগে থাকল কদিন সেটাই বেশী আলোচনার বিষয়। তাপ্পর কলেজে তো সব অ্যাপল, রঙ আছে বললেই ক্যাল। তা সে ঠিকঠাকই ছিল, কলেজে রঙবাজি চালাতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে লাথালাথি খেয়োখেয়ি না হওয়াই ভালো। গোল বাঁধল তিন সাড়ে তিন বছর পর, দুজন ছাত্র ইয়ার ল্যাগ খাবার পর। কলেজ তো গাজোয়ারি করে সংশোধনের জায়গায় বর্জন পলিসি চালিয়ে বসে রইল, এদিকে খাল কেটে কুমীর ঢুকে পড়ল, অ্যাপল হয়ে গেল লাল। ম্যাজিক নাকি! আরে অ্যাপল তো লালই হয়, লাল না হলেও রঙ চড়িয়ে হলুদ সবুজ পাশগুলোও লাল করলে তবেই না বাজারে খাবে! ব্যাস, ইয়ার ল্যাগ যে কে সেই বহাল রইল, মধ্যে থেকে আশেপাশের কলেজে নির্বাচনের সময় চলে এল বাস ম্যাটাডোর, লোহার রড উইকেট ইঁটপাটকেল সহযোগে সুষ্ঠু ছাত্র নির্বাচন ঘটাতে। সব কলেজ তখন সাহায্য পেয়ে লাল। আমরাও। অ্যাপল-ট্যাপল আবার কী!

এদিকে আমার তখন নিজেরও রঙ বাছার পালা। নেপালী বুড়ো হয়তো অতদিনে পটল তুলেছে। এ যেন ঘর রঙ করার টেনশন, সামনে ডুলাক্সের কালার চার্ট, কোনটা নি? তত্ত্ব-ফত্ত্ব জানিনা, ওই ইন-কিলাব-জিন্দা-বাদ শব্দকটাই রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত। তারপর আবার কিনা শিক্ষিত বাঙালির পার্টি, অন্য কিছু করলে হয় অশিক্ষিত না হয় সিদ্ধার্থ রায়ের গুন্ডা, তাছাড়া কমরেড কথাটা শুনতে মন্দ না, সৌমিত্রও করে…আম্মো লাল হয়ে গেলাম। মানে ঝান্ডা ঘাড়ে ব্রিগেডে যাবার দলে নয়, এই বেশ নন্দন-কফি হাউস-পার্টি ম্যানিফেস্টো-অস্ত্রোভস্কি এইসব আর কী, পেটে লবডঙ্কা, কিন্তু পাক্কা আঁতেলের ভাঁজ মারার ইচ্ছাটা ষোলআনা। দাড়ি মুখ আর ঝোলা কাঁধে প্রেসিডেন্সি না যাবার আফসোস এখনো মনে দাগা মারে। সেই তখন থেকে যত্তদিন ভোট দিয়েছি সব গেছে লালে। এদিকে আবার কী কান্ড! পিসি এর তার সাথে বাওয়াল দিয়ে নিজেই পাটি গড়ে বসল। প্রচুর উৎসাহ ভক্তদের মধ্যে। কিন্তু ততদিনে মাথায় হার্ডওয়্যার হয়ে গেছে এ পিসি সে পিসি যে কোথায় কোথায় ডক্টরেটের কাগজ কিনে, না হয় গায়ে কেরোসিন ঢেলে বিনোদনে খামতি রাখেনা কিন্তু ভোট জিততে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রচুর সন্দেহ। সেই আটানব্বই থেকে শুরু। আর পারছিনা গুরু। পরের তেরো বছর এ বলে আমায় দ্যাখ তো ও বলে আমায় দ্যাখ। তফাত হল গিয়ে ওই তিরিশ বছর ধরে যা চলেছে সেটা এখন হলমার্ক, সেই রেকর্ড ভাঙতেই হবে, এটাই টার্গেট। ভজহরি ফিল্ম কোম্পানির আমারো কি চান্সো মিলিবে না-র মত সব নিজের নিজের তামাশা দেখিয়ে আমাদের বেশ আনন্দ দিয়েছে অনেকদিন (কি! আনন্দ! পেয়াদা!)। তার ওপর আবার নতুন প্রজাতীর মহাবির্ভাব, বুদ্ধিজীবি। উরেববাস, তেনাদের মাথা এত বড়, তার ছায়ায় গোটা পচ্চিমবঙ্গো ঢেকে যায় যায়। এনাদের বচন শিরোধার্য, যা বললেন কইলেন জনগন হাপসে খেলো, পেট খালি তো কী বে! এর মধ্যে আবার আই ফোনের যুগে অচল নোকিয়ার মত সৌমিত্রদাদু চক্ষুলজ্জার বালাই না রেখে বলেই ফেল্লেন ভোটখানা বামফ্রন্টরেই দিয়েন। ফেলু মিত্তির বইয়ের পাতায় কতবার আছাড়িপিছাড়ি খেলেন সেই আহ্বান শুনে কে জানে। যাক এগারোর ভোটে গদি ওল্টালো, ভাবলাম এই শুরু হল পাগলের রাজপাট, ভাগ্যিস আমি আগে থেকে কাট মেরেছি। কলকাতা আর কলকাতা রইল না, মেছোবাজার হয়ে গেল্। নাহ, নিন্দুকে যাই বলুক, পিসি নিরাশ করেন নাই, কৌতুক নকশার ডবল ডাইজেস্ট সাপ্লাই দিয়ে গেছেন হরদম। উরেব্বাস রিম্পা-রুঙ্কা-ঝঙ্কা!!! আরে ওরা যে কল্লো চৌতিশ বছর সে বেলা? এ তো তৎকাল সার্ভিস, চৌত্রিশ কী চৌদ্দ বছরে ওদের রেকর্ড ভেঙে দেব। আর এদিকে জনগনের হাতে হ্যারিকেন। তবে জ্বালাতে হয়না, এতো শ্রীর ছড়াছড়ি, তাঁদের দ্যুতিতেই দশদিক আলোকময়। কিন্তু জনগন পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। ননস্টপ খিল্লি দিতে দিতে গাল ব্যথা হয়ে গেছে কিন্তু থামার চিহ্ন নেই। কি করা? আবার মানুষের জোট হয়েছে এবারে, এতদিন মানুষ গান্ডু ছিল, এবারে তারা মানুষ হয়েছে। এইব্বার যাবি কোথায়? কমলা সবুজ লাল মিলেমিশে একাকার। আরে ছাগলরা, লালের সাথে লাল ছাড়া আর যাই জুড়িসনা কেন, জানিসনা লাল টা খালি ফ্যাকাশেই হবে? তবে কিনা বেশিরেড বলে তো কিছু নেই, লালে অন্য রঙ মিশলে তবেই না রেড কমরেড! বিজেপি নিয়ে বেশী কিছু বলা মানে সময় নষ্ট, বালের পার্টি বললেই যথেষ্ট। তা বেশ হয়েছে লাল আর বাল একদিকে। আরে পালটা বাকী রইল যে! ও সে তো ব্যস্ত কেষ্টোনগরে ছেলে ঢোকাতে। ফুল হাউস। আর নীল সাদা? পিসির দলকে নিয়ে কিছু বলার ধ্যাস্টামো নাই বা কল্লাম। নেতাদের নিয়ে তো কিছু নাই বা বললাম, তো কারা এই নীল সাদার বেয়াদপি দেখেও ওয়াহ ওয়াহ করছে?  কেউ আজন্ম পিসিভক্ত, পিসিকে একাধিক নোবেল দেয়া হচ্ছেনা কেন বলে সওয়াল করতে ব্যস্ত। আর একদল পাল্টিপারপাস, যে বিরিয়ানির প্যাকেট দেবে তার দিকে পালটি খাবে। কেউ কেউ আবার চারিদিকে তাড়কার ছড়াছড়িতে আপ্লুত হয়ে আহা আহা করছে। কী! বলতিস কিনা শিক্ষিত বাঙালির পার্টি, এবার দ্যাখ সালারা তোদের তিরেই (এই কেলো করেছি, আনন্দর মত তির লিখে ফেল্লামজে) তোদের ঘায়েল কল্লাম। কত বুদ্ধি দেখাতে হবে বল আরো বুদ্ধিজীবি ভাড়া করে আনব, কোথায় গ্যালো তোদের দেরিদা আওড়ানো বুদ্ধুবাবু? কী! অ সেও অবসর থেকে ফিরে পোচার করতে লেগেছে? আর কত খেল দেখাবি বাপু। ছিল খালি আমাদের সুমন নিজের ফেলা থুতু চাটার জন্যে, সেখানেও তোদের প্রার্থী দিতে হবে? কি কম্পিটিটিভ রে বাবা। অতঃ কিম?

এখন যদি প্রশ্ন করা যায় এই তুঘলকী ক্যাওড়ামোর জন্য কে দায়ী তা সে হলাম গিয়ে আমি আর আপনি। আমরাই চৌত্রিশ বছর জুলুমবাজি দেখেও কোনো যোগ্য বিকল্প নেই এই অজুহাতে একটা সরকারকে ক্ষমতায় রেখে এসেছি। আমরা মুখে বলি কম্যুনিস্ট, জনগনই সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সর্বহারার মুখপত্র। অন্যদিকে সংগঠন চালানোর সময় চুড়ান্ত শ্রেনীবৈষম্য, শহরে আওড়ালাম নেরুদা-দেরিদা আর গ্রামে পুষলাম হার্মাদ, এতে সংগঠন রইল কিন্তু শহরের বাইরে প্রান্তিক মানুষের ঠিক তেমন কোন সার্বিক উন্নয়ন আর হলনা। বরং আজ যা অবস্থা তাতে বলা যেতেই পারে যে যদি কম্যুনিস্ট সরকার চান তো সিপিএমকে দয়া করে ভোট দেবেননা। ২০১১য় কিন্তু পিসির গদীতে বসার কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষের লালের ওপর থেকে ভরসা একদম চলে যাওয়ায়। সেদিক থেকে দেখলে, ১১তে সর্বহারার পার্টি কিন্তু তৃনমূলই। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আনতে গিয়ে ছিপেম তখন জোতদারের প্রতিভূ। কিন্তু শহুরে মানুষের ভোটে তো সরকার পাল্টায়না, পাল্টায় গ্রামে। তাঁরা এখন কোথায় যাবেন? আগে যারা লালের হয়ে ঝান্ডা আর ডান্ডা বইত, হাওয়া বদলাতে তারা এখন নীলে। যে পুষবে তারা তাদের। কাল বিজেপি পরশু হয়তো আইসিস। তারা আগে ধমকাত লালে ছাপ না মারলে, এখন নীলে না মারলে। কোথায় দেবেন? যদি মনে করেন সব প্রার্থী ভুষিমাল তবে সবার নিচে চুপচাপ অপেক্ষা করা নোটা তো রয়েছে আপনার পুষে রাখা বঞ্চনা হেনস্থা সবকিছুর বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য। সবাই জানুক যে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনযোগ্য দল নেই কোন। যাত্রাপালা দেখিয়ে ভোট টানা আর যাচ্ছেনা তেমন। ক্ষমতা চলে যাবার ভয়ে সবাই গলবস্ত্র। তাই এ বলে নারদ সত্যি হলে টিকিট দিতামনা তো ও বলে হাত কেটে নেয়াটা একটু অন্যায় হয়েছিল বটে। তবে নোটা যে তেমন জনপ্রিয় হবেনা বলাই বাহুল্য। শহরে প্রচুর অ্যাক্টিভিস্ট তারা দুনিয়া পাল্টানোর স্বপ্নটপ্ন দেখে, নোটায় তারা ছাপ মারতেই পারে, কিন্তু দুশ পরিবারের গ্রামে নোটায় বোতাম টিপে পার্টির চক্ষুশুল হলে তখন এমার্জেন্সিতে হাসপাতালে বেড জোগাড় করে দেবে কে? সাধের বানানো বাড়িতে আগুন লাগানো রুখবে কে? ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবার সময় তাদের নিরাপত্তা দেবে কে? সেখানে তো আলিমুদ্দিনেরও জোর খাটেনা, হরিশ মুখার্জিরও না। জোর হল লোকাল লিডারের আর তার বাইক বাহিনীর। তাহলে বিকল্প কী বা কে? চোখে পড়ার মত একমাত্র বিকল্প বলতে গেলে তো দিল্লিতে আপ সরকার। তারা নিতান্তই শহরকেন্দ্রিক, কলকাতা আলাদা রাজ্য হলে বলতাম আপ-এর মডেলে সরকার গড়তে। অঞ্চল, রাজ্য, ভাষা সংস্কৃতির গণ্ডি পেরোনোর মত রাজনৈতিক মডেল আপ-এর নেই। গ্রামের গা জোয়ারি রাজনীতিতে সে মডেল চলেনা। অগত্যা? নোটা ছাড়া তো কোনো গতি দেখা যাচ্ছেনা। এদিকে শহরে সিট অনেক, সেগুলো নোটায় খুইয়ে বসলেও গ্রামে যে জিতবে সরকার তো গড়বে তারাই। গোটা রাজ্য নোটায় ভোট না দিলে শঠে শাঠ্যং হবার কোনো উপায় নেই। তবে হ্যাঁ কালসাপ বিজেপি থেকে দুরেই থাকবেন, তাদের পয়সা দেয়ার লোকের অভাব নেই, খানিক পা রাখতে দিলে তখন দু দলই লোপাট হয়ে যেতে বেশি দিন লাগবেনা।  তখন দেখবেন কেমন মজা। আদ্ধেক রিফিউজিদের ডান্ডা মেরে পাড়া থুড়ি দেশছাড়া করার মতলব তো নরেন মুদি রাখঢাক না করেই বলে দিয়েছে। তবে তাদেরকে আর আলাদা করে সাম্প্রদায়িক বলা যাবেনা, ভোটের লোভে সবাই সাম্প্রদায়িক।

উপায় কি নেই? নাকি আসলে জনগনই বেশি চালু, লিডারদের বাঁদরনাচ নাচিয়ে তারাই রক্ষা করছে গণতন্ত্র? সারদার মত বড় মাপের কেলেঙ্কারী (তবে সারদা একা নয়, চিটফান্ড কোন সময় থেকে শুরু হয়েছে তা খুঁজতে গেলে কিন্তু আবার সেই গত চৌত্রিশ বছরের দিকেও আঙ্গুল উঠবে) না ঘটলে সরকার কে গড়ল তাতে সাধারণ মানুষের কি তেমন কিছু ছেঁড়া যায়? দশ-বিশ হাজার টাকা ঘুষ দেয়াটা তো জলভাত কোনো কাজ করিয়ে নেয়ার জন্যে। সে যে পার্টিই ক্ষমতায় থাকুক সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলে আসছে, আসবেও। তাই হয় নোটায় ভোট মারুন, নাহলে নিজেদের মধ্যে যোগসাজস করে এমন ভাবে ভোট দিন যাতে যেই জিতুক পাল্লা যেন প্রায় মাঝামাঝি থাকে। তাহলে তিন দলই কাজ করে দেবে, কম পয়সায়। এদের হাতে যত ক্ষমতা দেবেন, ছিনেজোঁকের দল শুষে নেবে আরো বেশি বেশি। নেতাদের তটস্থ রাখুন যাতে তারা মানুষকে সমঝে চলে, উল্টোটা নয়। কাজেই বলি কী, বাইরে যে পার্টি যা রঙই হোক না কেন ভেতরে সব্বাই কালো– নিটোল মাকাল ফল। কাজেই ধড়াম করে দুই কী পাঁচ কী সাত না খুঁজে সবার শেষে পড়ে থাকা নোটা-টা নিয়েও একবার ভাববেন, আপনার পরিবত্তোন আপনিই আনতে পারেন, অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে “যত্ত গাড়োলের দল, এ পার্টিকে কে ক্ষমতায় আনলো” জাতীয় তত্ত্ব চায়ের দোকানের বাইরে কেউ খাবেনা। অ্যাপল হয়ে যান সব, বলুন লাল নীল সবুজ গেরুয়া কারুক্কে চাইনা। আমি ভোট দিলে এবার আর লালে নীলে না, সিধে নোটায় মারতাম। আপনি কোথায় দেবেন?/span>

Advertisements
Standard