Bengal, Politics

যাত্রাপালা : রঙমেলান্তি, ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন ও জনমত

ভোট নিয়ে আগে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছি, সে জোড়া কুঠার (এ ম্যাওবাদী আসার অনেক আগের ব্যাপার বাপু, তখন তিনোমুল মানে মাঠেঘাটে ঘাসের মধ্যে ফুটে থাকা ফুলই জানতাম, কাজেই আমারে আবার ম্যাওবাদী বলে দেগে দেয়ার চ্যাষ্টা কইরেননা) হোক বা বেচারী বারে বারে জমানত বাজেয়াপ্ত হওয়া নেপালী বুড়ো (উঁহু, স্বাধীন গোর্খাল্যান্ডেও নেই)। ভোট মানে তখন লায়েক হয়েছি, আঙুলে কালি লেগে থাকল কদিন সেটাই বেশী আলোচনার বিষয়। তাপ্পর কলেজে তো সব অ্যাপল, রঙ আছে বললেই ক্যাল। তা সে ঠিকঠাকই ছিল, কলেজে রঙবাজি চালাতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে লাথালাথি খেয়োখেয়ি না হওয়াই ভালো। গোল বাঁধল তিন সাড়ে তিন বছর পর, দুজন ছাত্র ইয়ার ল্যাগ খাবার পর। কলেজ তো গাজোয়ারি করে সংশোধনের জায়গায় বর্জন পলিসি চালিয়ে বসে রইল, এদিকে খাল কেটে কুমীর ঢুকে পড়ল, অ্যাপল হয়ে গেল লাল। ম্যাজিক নাকি! আরে অ্যাপল তো লালই হয়, লাল না হলেও রঙ চড়িয়ে হলুদ সবুজ পাশগুলোও লাল করলে তবেই না বাজারে খাবে! ব্যাস, ইয়ার ল্যাগ যে কে সেই বহাল রইল, মধ্যে থেকে আশেপাশের কলেজে নির্বাচনের সময় চলে এল বাস ম্যাটাডোর, লোহার রড উইকেট ইঁটপাটকেল সহযোগে সুষ্ঠু ছাত্র নির্বাচন ঘটাতে। সব কলেজ তখন সাহায্য পেয়ে লাল। আমরাও। অ্যাপল-ট্যাপল আবার কী!

এদিকে আমার তখন নিজেরও রঙ বাছার পালা। নেপালী বুড়ো হয়তো অতদিনে পটল তুলেছে। এ যেন ঘর রঙ করার টেনশন, সামনে ডুলাক্সের কালার চার্ট, কোনটা নি? তত্ত্ব-ফত্ত্ব জানিনা, ওই ইন-কিলাব-জিন্দা-বাদ শব্দকটাই রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত। তারপর আবার কিনা শিক্ষিত বাঙালির পার্টি, অন্য কিছু করলে হয় অশিক্ষিত না হয় সিদ্ধার্থ রায়ের গুন্ডা, তাছাড়া কমরেড কথাটা শুনতে মন্দ না, সৌমিত্রও করে…আম্মো লাল হয়ে গেলাম। মানে ঝান্ডা ঘাড়ে ব্রিগেডে যাবার দলে নয়, এই বেশ নন্দন-কফি হাউস-পার্টি ম্যানিফেস্টো-অস্ত্রোভস্কি এইসব আর কী, পেটে লবডঙ্কা, কিন্তু পাক্কা আঁতেলের ভাঁজ মারার ইচ্ছাটা ষোলআনা। দাড়ি মুখ আর ঝোলা কাঁধে প্রেসিডেন্সি না যাবার আফসোস এখনো মনে দাগা মারে। সেই তখন থেকে যত্তদিন ভোট দিয়েছি সব গেছে লালে। এদিকে আবার কী কান্ড! পিসি এর তার সাথে বাওয়াল দিয়ে নিজেই পাটি গড়ে বসল। প্রচুর উৎসাহ ভক্তদের মধ্যে। কিন্তু ততদিনে মাথায় হার্ডওয়্যার হয়ে গেছে এ পিসি সে পিসি যে কোথায় কোথায় ডক্টরেটের কাগজ কিনে, না হয় গায়ে কেরোসিন ঢেলে বিনোদনে খামতি রাখেনা কিন্তু ভোট জিততে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রচুর সন্দেহ। সেই আটানব্বই থেকে শুরু। আর পারছিনা গুরু। পরের তেরো বছর এ বলে আমায় দ্যাখ তো ও বলে আমায় দ্যাখ। তফাত হল গিয়ে ওই তিরিশ বছর ধরে যা চলেছে সেটা এখন হলমার্ক, সেই রেকর্ড ভাঙতেই হবে, এটাই টার্গেট। ভজহরি ফিল্ম কোম্পানির আমারো কি চান্সো মিলিবে না-র মত সব নিজের নিজের তামাশা দেখিয়ে আমাদের বেশ আনন্দ দিয়েছে অনেকদিন (কি! আনন্দ! পেয়াদা!)। তার ওপর আবার নতুন প্রজাতীর মহাবির্ভাব, বুদ্ধিজীবি। উরেববাস, তেনাদের মাথা এত বড়, তার ছায়ায় গোটা পচ্চিমবঙ্গো ঢেকে যায় যায়। এনাদের বচন শিরোধার্য, যা বললেন কইলেন জনগন হাপসে খেলো, পেট খালি তো কী বে! এর মধ্যে আবার আই ফোনের যুগে অচল নোকিয়ার মত সৌমিত্রদাদু চক্ষুলজ্জার বালাই না রেখে বলেই ফেল্লেন ভোটখানা বামফ্রন্টরেই দিয়েন। ফেলু মিত্তির বইয়ের পাতায় কতবার আছাড়িপিছাড়ি খেলেন সেই আহ্বান শুনে কে জানে। যাক এগারোর ভোটে গদি ওল্টালো, ভাবলাম এই শুরু হল পাগলের রাজপাট, ভাগ্যিস আমি আগে থেকে কাট মেরেছি। কলকাতা আর কলকাতা রইল না, মেছোবাজার হয়ে গেল্। নাহ, নিন্দুকে যাই বলুক, পিসি নিরাশ করেন নাই, কৌতুক নকশার ডবল ডাইজেস্ট সাপ্লাই দিয়ে গেছেন হরদম। উরেব্বাস রিম্পা-রুঙ্কা-ঝঙ্কা!!! আরে ওরা যে কল্লো চৌতিশ বছর সে বেলা? এ তো তৎকাল সার্ভিস, চৌত্রিশ কী চৌদ্দ বছরে ওদের রেকর্ড ভেঙে দেব। আর এদিকে জনগনের হাতে হ্যারিকেন। তবে জ্বালাতে হয়না, এতো শ্রীর ছড়াছড়ি, তাঁদের দ্যুতিতেই দশদিক আলোকময়। কিন্তু জনগন পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। ননস্টপ খিল্লি দিতে দিতে গাল ব্যথা হয়ে গেছে কিন্তু থামার চিহ্ন নেই। কি করা? আবার মানুষের জোট হয়েছে এবারে, এতদিন মানুষ গান্ডু ছিল, এবারে তারা মানুষ হয়েছে। এইব্বার যাবি কোথায়? কমলা সবুজ লাল মিলেমিশে একাকার। আরে ছাগলরা, লালের সাথে লাল ছাড়া আর যাই জুড়িসনা কেন, জানিসনা লাল টা খালি ফ্যাকাশেই হবে? তবে কিনা বেশিরেড বলে তো কিছু নেই, লালে অন্য রঙ মিশলে তবেই না রেড কমরেড! বিজেপি নিয়ে বেশী কিছু বলা মানে সময় নষ্ট, বালের পার্টি বললেই যথেষ্ট। তা বেশ হয়েছে লাল আর বাল একদিকে। আরে পালটা বাকী রইল যে! ও সে তো ব্যস্ত কেষ্টোনগরে ছেলে ঢোকাতে। ফুল হাউস। আর নীল সাদা? পিসির দলকে নিয়ে কিছু বলার ধ্যাস্টামো নাই বা কল্লাম। নেতাদের নিয়ে তো কিছু নাই বা বললাম, তো কারা এই নীল সাদার বেয়াদপি দেখেও ওয়াহ ওয়াহ করছে?  কেউ আজন্ম পিসিভক্ত, পিসিকে একাধিক নোবেল দেয়া হচ্ছেনা কেন বলে সওয়াল করতে ব্যস্ত। আর একদল পাল্টিপারপাস, যে বিরিয়ানির প্যাকেট দেবে তার দিকে পালটি খাবে। কেউ কেউ আবার চারিদিকে তাড়কার ছড়াছড়িতে আপ্লুত হয়ে আহা আহা করছে। কী! বলতিস কিনা শিক্ষিত বাঙালির পার্টি, এবার দ্যাখ সালারা তোদের তিরেই (এই কেলো করেছি, আনন্দর মত তির লিখে ফেল্লামজে) তোদের ঘায়েল কল্লাম। কত বুদ্ধি দেখাতে হবে বল আরো বুদ্ধিজীবি ভাড়া করে আনব, কোথায় গ্যালো তোদের দেরিদা আওড়ানো বুদ্ধুবাবু? কী! অ সেও অবসর থেকে ফিরে পোচার করতে লেগেছে? আর কত খেল দেখাবি বাপু। ছিল খালি আমাদের সুমন নিজের ফেলা থুতু চাটার জন্যে, সেখানেও তোদের প্রার্থী দিতে হবে? কি কম্পিটিটিভ রে বাবা। অতঃ কিম?

এখন যদি প্রশ্ন করা যায় এই তুঘলকী ক্যাওড়ামোর জন্য কে দায়ী তা সে হলাম গিয়ে আমি আর আপনি। আমরাই চৌত্রিশ বছর জুলুমবাজি দেখেও কোনো যোগ্য বিকল্প নেই এই অজুহাতে একটা সরকারকে ক্ষমতায় রেখে এসেছি। আমরা মুখে বলি কম্যুনিস্ট, জনগনই সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সর্বহারার মুখপত্র। অন্যদিকে সংগঠন চালানোর সময় চুড়ান্ত শ্রেনীবৈষম্য, শহরে আওড়ালাম নেরুদা-দেরিদা আর গ্রামে পুষলাম হার্মাদ, এতে সংগঠন রইল কিন্তু শহরের বাইরে প্রান্তিক মানুষের ঠিক তেমন কোন সার্বিক উন্নয়ন আর হলনা। বরং আজ যা অবস্থা তাতে বলা যেতেই পারে যে যদি কম্যুনিস্ট সরকার চান তো সিপিএমকে দয়া করে ভোট দেবেননা। ২০১১য় কিন্তু পিসির গদীতে বসার কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষের লালের ওপর থেকে ভরসা একদম চলে যাওয়ায়। সেদিক থেকে দেখলে, ১১তে সর্বহারার পার্টি কিন্তু তৃনমূলই। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আনতে গিয়ে ছিপেম তখন জোতদারের প্রতিভূ। কিন্তু শহুরে মানুষের ভোটে তো সরকার পাল্টায়না, পাল্টায় গ্রামে। তাঁরা এখন কোথায় যাবেন? আগে যারা লালের হয়ে ঝান্ডা আর ডান্ডা বইত, হাওয়া বদলাতে তারা এখন নীলে। যে পুষবে তারা তাদের। কাল বিজেপি পরশু হয়তো আইসিস। তারা আগে ধমকাত লালে ছাপ না মারলে, এখন নীলে না মারলে। কোথায় দেবেন? যদি মনে করেন সব প্রার্থী ভুষিমাল তবে সবার নিচে চুপচাপ অপেক্ষা করা নোটা তো রয়েছে আপনার পুষে রাখা বঞ্চনা হেনস্থা সবকিছুর বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য। সবাই জানুক যে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনযোগ্য দল নেই কোন। যাত্রাপালা দেখিয়ে ভোট টানা আর যাচ্ছেনা তেমন। ক্ষমতা চলে যাবার ভয়ে সবাই গলবস্ত্র। তাই এ বলে নারদ সত্যি হলে টিকিট দিতামনা তো ও বলে হাত কেটে নেয়াটা একটু অন্যায় হয়েছিল বটে। তবে নোটা যে তেমন জনপ্রিয় হবেনা বলাই বাহুল্য। শহরে প্রচুর অ্যাক্টিভিস্ট তারা দুনিয়া পাল্টানোর স্বপ্নটপ্ন দেখে, নোটায় তারা ছাপ মারতেই পারে, কিন্তু দুশ পরিবারের গ্রামে নোটায় বোতাম টিপে পার্টির চক্ষুশুল হলে তখন এমার্জেন্সিতে হাসপাতালে বেড জোগাড় করে দেবে কে? সাধের বানানো বাড়িতে আগুন লাগানো রুখবে কে? ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবার সময় তাদের নিরাপত্তা দেবে কে? সেখানে তো আলিমুদ্দিনেরও জোর খাটেনা, হরিশ মুখার্জিরও না। জোর হল লোকাল লিডারের আর তার বাইক বাহিনীর। তাহলে বিকল্প কী বা কে? চোখে পড়ার মত একমাত্র বিকল্প বলতে গেলে তো দিল্লিতে আপ সরকার। তারা নিতান্তই শহরকেন্দ্রিক, কলকাতা আলাদা রাজ্য হলে বলতাম আপ-এর মডেলে সরকার গড়তে। অঞ্চল, রাজ্য, ভাষা সংস্কৃতির গণ্ডি পেরোনোর মত রাজনৈতিক মডেল আপ-এর নেই। গ্রামের গা জোয়ারি রাজনীতিতে সে মডেল চলেনা। অগত্যা? নোটা ছাড়া তো কোনো গতি দেখা যাচ্ছেনা। এদিকে শহরে সিট অনেক, সেগুলো নোটায় খুইয়ে বসলেও গ্রামে যে জিতবে সরকার তো গড়বে তারাই। গোটা রাজ্য নোটায় ভোট না দিলে শঠে শাঠ্যং হবার কোনো উপায় নেই। তবে হ্যাঁ কালসাপ বিজেপি থেকে দুরেই থাকবেন, তাদের পয়সা দেয়ার লোকের অভাব নেই, খানিক পা রাখতে দিলে তখন দু দলই লোপাট হয়ে যেতে বেশি দিন লাগবেনা।  তখন দেখবেন কেমন মজা। আদ্ধেক রিফিউজিদের ডান্ডা মেরে পাড়া থুড়ি দেশছাড়া করার মতলব তো নরেন মুদি রাখঢাক না করেই বলে দিয়েছে। তবে তাদেরকে আর আলাদা করে সাম্প্রদায়িক বলা যাবেনা, ভোটের লোভে সবাই সাম্প্রদায়িক।

উপায় কি নেই? নাকি আসলে জনগনই বেশি চালু, লিডারদের বাঁদরনাচ নাচিয়ে তারাই রক্ষা করছে গণতন্ত্র? সারদার মত বড় মাপের কেলেঙ্কারী (তবে সারদা একা নয়, চিটফান্ড কোন সময় থেকে শুরু হয়েছে তা খুঁজতে গেলে কিন্তু আবার সেই গত চৌত্রিশ বছরের দিকেও আঙ্গুল উঠবে) না ঘটলে সরকার কে গড়ল তাতে সাধারণ মানুষের কি তেমন কিছু ছেঁড়া যায়? দশ-বিশ হাজার টাকা ঘুষ দেয়াটা তো জলভাত কোনো কাজ করিয়ে নেয়ার জন্যে। সে যে পার্টিই ক্ষমতায় থাকুক সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলে আসছে, আসবেও। তাই হয় নোটায় ভোট মারুন, নাহলে নিজেদের মধ্যে যোগসাজস করে এমন ভাবে ভোট দিন যাতে যেই জিতুক পাল্লা যেন প্রায় মাঝামাঝি থাকে। তাহলে তিন দলই কাজ করে দেবে, কম পয়সায়। এদের হাতে যত ক্ষমতা দেবেন, ছিনেজোঁকের দল শুষে নেবে আরো বেশি বেশি। নেতাদের তটস্থ রাখুন যাতে তারা মানুষকে সমঝে চলে, উল্টোটা নয়। কাজেই বলি কী, বাইরে যে পার্টি যা রঙই হোক না কেন ভেতরে সব্বাই কালো– নিটোল মাকাল ফল। কাজেই ধড়াম করে দুই কী পাঁচ কী সাত না খুঁজে সবার শেষে পড়ে থাকা নোটা-টা নিয়েও একবার ভাববেন, আপনার পরিবত্তোন আপনিই আনতে পারেন, অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে “যত্ত গাড়োলের দল, এ পার্টিকে কে ক্ষমতায় আনলো” জাতীয় তত্ত্ব চায়ের দোকানের বাইরে কেউ খাবেনা। অ্যাপল হয়ে যান সব, বলুন লাল নীল সবুজ গেরুয়া কারুক্কে চাইনা। আমি ভোট দিলে এবার আর লালে নীলে না, সিধে নোটায় মারতাম। আপনি কোথায় দেবেন?/span>

Advertisements
Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — অন্তিম পর্ব ১৯০০-১৯৮০

লেখাটা শুরু করেছিলাম কলকাতা নিয়ে আমার যা যা স্মৃতি আছে সেগুলো বয়ান করার জন্য। দেখতে দেখতে সেই লেখা হয়ে দাঁড়ালো কলকাতার তিনশ বছরের ইতিহাসে। ইতিহাসে কোনো আগ্রহ স্কুলে থাকার সময় একদম ছিলনা, পরে ইতিহাস জানার ইচ্ছে হলেও দেখলাম ইতিহাস আসলে হলো যে যেরকম করে বলতে চায় তার বলা গল্প। আগের দুটো পরিচ্ছদে কলকাতা নিয়ে যা লিখলাম সেটা আমার ভার্সন বলা যেতেই পারে, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর তথ্যের সঙ্কলন। যা শুরু করেছি তা শেষ অবধি চালিয়ে যাব বলেই মনস্থির করলাম, তাই এই লেখাটা কলকাতার আধুনিক যুগ নিয়ে, তবে রেঞ্জটা ১৯৮০ তেই শেষ করব।  বাকি অংশটা অন্য আরেক লেখায় লিখব, আমার নিজের স্মৃতি থেকে, বেদের মত চর্বিতচর্বন করে নয়।  

বিংশ শতকের গোড়ার কলকাতা বলতে গেলে অতীতের কঙ্কাল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতাকে ঘিরে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য তখন শেষের দিকে। আঠার শতকের সেই লন্ডনকে টেক্কা দেয়া বিত্ত বৈভব তখন প্রায় লুপ্ত, উত্তর কলকাতার বাবুসমাজও তখন অবক্ষয়ের পথে।  কোম্পানিকে ভর করে সঞ্চিত সম্পদ অপব্যয় করে তাদের অবস্থা পড়তির দিকে। বরং সমাজে চালকের জায়গা করে নিয়েছে উচ্চবংশের উচ্চশিক্ষিত মানুষজন, তবে আগের দুই শতকে যা খুব কম দেখা গেছে সেই সাধারণ ঘরের অতি মেধাবী মানুষেরাও তখন একাসনে অবস্থান করে নিয়েছে। ১৮৮৫ সালে গড়ে ওঠা কংগ্রেসের হাত ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও শুরু হয় উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ঠিক করলেন বাংলার এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার উত্থান বন্ধ করার জন্যে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা কে দুই ভাগে ভাগ করা হবে।  সারা ভারত তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল, যার প্রধান বিরোধিতা হলো কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। বহু প্রতিবাদ বিরোধ জনআন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে।  কিন্তু সেই Divide  and Rule এর যে বিষ ছড়িয়ে দিয়ে গেল ব্রিটিশ সরকার সেই ছ বছরে, তার জের এখনো হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান পরিবার ভোগ করে চলেছে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার সাথে সাথে ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেল দিল্লিতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁচ যাতে সরকারের গায়ে না লাগে।  দুশ বছরেরও বেশিকাল ধরে যে কলকাতাকে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বানিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, বাংলা বিহার উড়িষ্যা অসমের কাঁচামাল হরণের পর তার প্রয়োজন তখন ফুরিয়েছে, আর কলকাতার সেই তিলোত্তমা রূপও তখন আর নেই – কলকাতা মানে তখন এক পূতিগন্ধময় অস্বাস্থ্যকর Black Hole।

কলকাতার গল্প তো এখানেই শেষ হতে পারত, অতীতের সেই সোনার দিনগুলো পেরিয়ে সে তখন কাতারে কাতারে মানুষের ভারে ন্যুব্জ এক শহর, যার তুলনা হতে পারতো মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন বা উর। না, কলকাতা সেখানে থেমে যায়নি, বরং রাজধানী খেতাব থেকে মুক্তি পেয়ে বোধহয় আপন খেয়ালে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে।  তার প্রধান কারণ অবশ্যই যে ব্রিটিশ রাজধানী হবার সূত্রে যে পরিকাঠামো গত দুই শতকে তৈরী হয়ে ছিল, তার প্রভাব বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয়নি, অন্তত রাজধানী বদলের সাথে সাথে তো নয়ই।  কলকাতা তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী, তাই তার রাজনৈতিক প্রভাব বা তাৎপর্য ব্রিটিশদের কাছে তখনও অশেষ। তার সাথে যোগ হবে কলকাতার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাফল্যের তুঙ্গে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ আশুতোষ জগদীশচন্দ্র প্রফুল্লচন্দ্র সি ভি রমন বিবেকানন্দ প্রমুখ মানুষের  অবদানের পথ ধরে কলকাতার উনিশ শতক থেকে কুড়ির শতকে পা রাখা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে প্রফুল্লচন্দ্র গড়লেন বেঙ্গল কেমিকেল যা এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে।  ১৯০৮ অলিম্পিক এ শোভাবাজার এর নর্মান প্রিচার্ড  সোনা পেলেন, ১৯১৩য় রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রথম এশীয় নোবেল। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইতিহাস সৃষ্টি করলো প্রথম ভারতীয় ফুটবল দল যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।  এসব তথ্য এখন হয়ত কেবলই পরিসংখ্যান অথবা কুইজের প্রশ্ন কিন্তু সেই সময়ে ফিরে গেলে কলকাতার যে আমূল পরিবর্তন ঘটছিল দুশ বছর পুরনো এক ঔপনিবেশিক সত্ত্বার প্রভাব কাটিয়ে দেশীয় স্বাধীন চিন্তা এবং মেধার উন্মেষে তা এককথায় অভূতপূর্ব আর বিস্ময়কর। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারত স্বাধীন হওয়া অবধি কলকাতার ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভিত্তি করে।  ক্ষুদিরাম প্রাফুল্ল চাকি থেকে শুরু করে সেই বিপ্লবী প্রতিবাদ জারি রয়ে গেল বারীন ঘোষ, চিত্তরঞ্জন, অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষ যতীন দাস বিনয় বাদল দীনেশ এঁদের মধ্যে। গোটা ভারতের মত কলকাতাও সেই জ্বালাময়ী সময়ের সাক্ষী বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে সারা বাংলা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সবার দান অশেষ আর প্রত্যেকের অবদান নিয়েই এক একটা গোটা অধ্যায় লিখে ফেলা যায় কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলনের ভূমিকা কলকাতার পরবর্তীকালের ইতিহাসের পক্ষে অপরিসীম হলেও সে বিষয়ে আর গভীর আলোচনায় জড়ালাম না।

এরই মাঝে মাঝে কিছু বিক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা আজকের কলকাতার উত্থানের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে সেগুলো তুলে ধরলাম। ১৯২৪ সালে কলকাতা অবশেষে পেল সেই অপূর্ব মর্মর সৌধ যার ভিত্তিপ্রস্তর ইংলন্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ করে গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে – ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কলকাতায় এখনো কেউ আসলে যদি জিগ্গেস করে কি কি দ্রষ্টব্য ছাড়া চলবেনা, ভিক্টোরিয়া সেই তালিকায় একদম প্রথমে থাকবে। প্রায় একশ বছর পেরিয়েও এই সৌন্দর্য আর লাবন্যে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। এই ১৯২৪ সালেই কলকাতা কর্পোরেসানের প্রথম মেয়র হলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।  এর কিছুদিন পরেই এসে উপস্থিত হলেন এক যুগোস্লাভিয় সেবিকা, যাঁর নাম এখন কলকাতার পরিচয়ের সাথে সমার্থক। সুদুর লাতিন আমেরিকার, দূর প্রাচ্যের ক্যাথোলিক দেশগুলিতেও কলকাতার নাম ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে এই মহিয়সী মহিলার আত্মদান অনস্বীকার্য —  মাদার টেরেসা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে গঙ্গার দুকুল বাঁধা পড়ল কারিগরী বিদ্যার এক অসাধারণ উদাহরণে। হাওড়া ব্রিজ আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় কোন নাটবল্টু ছাড়া কেবলমাত্র রিভেট দিয়ে গড়া এই সেতু কেমন করে আজও এই বিপুল পরিমান যানবাহন বহন করে চলেছে। এই সময়ের কলকাতা যেমন দেখেছে প্রগতি আর সাফল্য তেমনই ক্ষণেক্ষণে ঢেকে গিয়েছে দুঃশঙ্কার মেঘে। বিদেশীদের divide and rule নীতির কবলে পরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে বিভেদের বিষ ছড়িয়ে গেল, তার সাক্ষ্য বহন করবে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার বলি হলো সবচেয়ে বেশি মানুষ। কলকাতার পুরনো কিছু ছবিতে দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা লাশ হিংস্র ধর্মান্ধতার আর সাম্রাজ্যবাদের শিকার। বিশ্বযুদ্ধের সময় গোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের উপহার কলকাতার মন্বন্তর যেখানে লাখে লাখে মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায় খাদ্যের যোগান থাকা সত্তেও। ১৯৪১ এ ২২শে শ্রাবণ চলে গেলেন কবিগুরু, কলকাতা তথা বাংলার সাহিত্য জগতে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি করে।  আর কিছু বছর পর, ১৯৪৫ য়ে জাপান যাবার পথে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন ভারতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতাহী সুভাষ যাঁর অন্তর্ধান আজও এক রহস্য।  এই সব টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৭ সালে এল সেই দিন, যার জন্যে সারা ভারতের মাতা কলকাতাও অপেক্ষা করে ছিল অনন্ত কাল, নতুন ভারতের পটভূমিতে সূচনা হল কলকাতার নতুন রূপান্তরের।  ঔপনিবেশিক অতীতকে ভিত্তি করে, এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের উদ্দেশ্যে সেই রূপান্তর।

স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতা যে রাতারাতি এক সম্পূর্ণ পরিবর্তীত মহানগরে পরিনত  হবে সেই আশা কেউই করেনি। তখনকার কলকাতা প্রাণে ভারতীয় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি কার্যকলাপে তখনও বিদেশী, ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেলেও অধিকাংশ শিল্প বানিজ্য প্রতিষ্ঠান তখনও চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। এছাড়া স্বাধীনতার পরে দেশভাগের সাথে সাথে কাতারে কাতারে হিন্দু পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে, আর স্বভাবতই রোজগারের আশায় বেশির ভাগই হাজির হয় কলকাতায়। কলকাতার তখনকার নগর পরিকাঠামো এই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জন্যে বিন্দুমাত্রও প্রস্তুত ছিলনা, কিন্তু তখনকার কলকাতায় সম্প্রসারণের জায়গা ছিল প্রচুর। হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের ঠাঁই হলো কলকাতার দক্ষিনে যোধপুর যাদবপুর টালিগঞ্জ বেহালা বেলেঘাটা ইত্যাদি এলাকায়। এই বিপুল পরিমান মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা করে দেয়ার জন্যে সরকার অনেক ফ্ল্যাট তৈরির কাজে হাত লাগলেও, বেশির ভাগই তৈরী করে নিল নিজেদের আশ্রয় জমি দখল করে বস্তি বানিয়ে। তুলনামূলক ভাবে অবস্থাপন্ন বাঙালরা গেল আর একটু উত্তরে, বালিগঞ্জ কালিঘাট ভবানীপুরের দিকে, প্রধানত এপার বাংলার মানুষদের এলাকার সীমানায়। পূর্বের বাঙাল আর পশ্চিমের ঘটি এই দুই বিপরীত সংস্কৃতির মানুষের এই প্রথম বিপুল হারে সংমিশ্রন। ভাষা আচার জীবনযাপনের যে চরম বৈষম্য ছিল প্রথমের দিকে, সেটা সম্পূর্ণ দূর হতে লেগেছে আরো কয়েক দশক, কিন্তু এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রনে কলকাতার বাঙালি সমাজ এক নতুন এবং অনন্য মাত্রা পেল।  স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া এবং আরো বেশ কিছু বছর পর অবধি আরো প্রচুর মানুষ প্রানের ভয়ে বা জীবিকার সন্ধানে পূর্ব বাংলা থেকে বাসা গুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে কলকাতায়, আর এই শহর তাদের গ্রহণ করেছে সানন্দে। নিউ ইয়র্ককে লোকে বলে big apple কিন্তু কলকাতা যে পরিমান মানুষের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের উপায় করে দিয়েছে সে হিসেব খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তার পরিবর্তে এই শহর পেয়েছে তার অনন্য পরিচয়। এ শহর ঘটির নয়, বাঙালের নয়, দেশ স্বাধীনের পর রয়ে যাওয়া হাজার হাজার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের নয়, চিনে দর্জি, ইহুদি পারসী আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের নয় নয় জীবিকার খোঁজে আশা বিহারী ঠেলাওয়ালা উড়ে ঠাকুর মারোয়ারী ব্যবসায়ীর — এ শহর এদের সবার সম্মেলনে গড়ে ওঠা এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো নয় কিন্তু ভাষা ধর্ম জাতির বৈচিত্রে কলকাতার সমগোত্রের মহানগরী ভারতে কেন সারা পৃথিবীতে বিরল। 

এই বিপুল সংখ্যক জনগণ কলকাতায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে আরো একটা ঘটনা ঘটছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে তার হার অনেকগুণ বেড়ে গেল। ভারতবর্ষে কম্যুনিস্ট মার্ক্সবাদী দর্শন এবং রাজনীতির পথিকৃৎ বলতে গেলে মানবেন্দ্রনাথ রায়।  জমিদার সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার দাবি করার প্রস্তাব বিশেষ করে ভারতবর্ষের মত বৈষম্যমূলক দেশে সাধারণ মানুষের কাছে প্রবল সমর্থন পেতে লাগলো। বিশেষ করে দেশভাগের পর যখন ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে কংগ্রেস ছাড়া আর কারো নাম করা যায়না আর কংগ্রেস তখন কুলীন জনগনের পার্টি আম জনতার নয়।  এই পটভূমিতে কলকাতায় বামপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় স্বাধীনতার পর পরই যার চূড়ান্ত পরিনতি হলো বামপন্থী দলের ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসীন হওয়া। ষাটের দশকে গোটা বিশ্বের বামপন্থী আন্দোলনের হাওয়া কলকাতাতেও চরম ভাবে প্রতিফলিত হয় যার হাত ধরে এলো কলকাতার দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁস ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। সাহিত্যে সুনীল সমরেশ শীর্ষেন্দু শক্তি চলচ্চিত্রে সত্যজিত ঋত্ত্বিক মৃনাল সেন অভিনয়ে উত্তম সুচিত্রা সৌমিত্র উৎপল দত্ত সঙ্গীতে মান্না দে সলিল চৌধুরী এঁদের হাত ধরে বাঙালির যে চরম বুদ্ধিগত উত্তরণ ঘটে এই সময় তার মূলে ছিল বামপন্থী আন্দোলন এবং উদারিকরনের আহ্বান। সেই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক বিস্তারে কলকাতার অবদান অনস্বীকার্য। ধর্মতলা কলেজ স্ট্রীট পার্ক স্ট্রীট এককথায় সমগ্র মধ্য এবং দক্ষিন কলকাতা এই নতুন সীমানাহীন জীবনের হাতছানিকে বাস্তবে রুপান্তরের অভিযানের কেন্দ্রে।

বামপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কলকাতার তরুণ প্রতিভারা নেতৃত্বে থাকলেও আসল লড়াইটা চলছিল সমস্ত বাংলায়, কৃষক শ্রমিক মজুরদের হাত ধরে।  একই ভাবে কলকাতার শহরতলীতেও সেই প্রতিবাদী বামপন্থী আন্দোলনের কৃতিত্ত্ব লেখক শিল্পীদের সাথে সাথে সেই অগুন্তি অদৃশ্য মানুষদের যাদের এতদিন কোনো ভাষা ছিলনা।  মিছিল ধর্মঘট অবস্থান ঘেরাও সব বিভাগে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের যে জোয়ার কলকাতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ষাটের দশকে সেখানে বড় ভূমিকা ছিল কলকাতার সেই উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গীয় সম্প্রদায়ের।  যাদবপুর বিজয়্গড় লেক গার্ডেন্স টালিগঞ্জ বালিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষদের কলোনিগুলো হয়ে উঠলো সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা এই মানুষরা ভারতে এসেছিল সবকিছু খুইয়ে, কলকাতায় তাদের আশ্রয় বলতে অস্বাস্থ্যকর একচালা ঘর, জীবনধারনের জন্য প্রত্যেকদিন লড়াই।  এই অবস্থায় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্যবাদ এই মানুষদের আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল বৈষম্যমুক্ত এক সমাজের। 

এই ছবিটা আমূল পাল্টে গেল সত্তরের দশকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বাধ্য করলো লাখে লাখে হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসতে। সবাই যে আসতে পেরেছিল তা নয়, তবু কলকাতার জনসংখ্যা এই সময় যেমন হঠাত এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেল, তেমনি বিশ্বজুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের নুতন ভাঙাগড়ার প্রভাব এসে পৌছালো কলকাতার অলিগলিতেও। এক শ্রেণী চাইছিল সশস্ত্র সংগ্রাম বলশেভিক বিপ্লবের মত বা মাওয়ের পথ অনুসরণ করে।  অন্য দল ছিল তখনও রাশিয়াবাদী, তাত্ত্বিক বামপন্থাকে প্রশ্ন করা মানেই প্রতিক্রিয়াশীল ছাপ পড়ে যাওয়া। এই টানাপোড়েনের মাঝে শুরু হলো নকশালবাড়ি আন্দোলন, যার আঁচ কলকাতাকেও গ্রাস করে নিল সাথে সাথে। শুরু হয়ে গেল প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্ধ, ছেচল্লিশয়ের দাঙ্গার পর আবার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭২ সালে মুখ্যমন্ত্রী হলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।  নকশাল বিপ্লব দমন করতে তিনি তাদের চেয়েও ক্রুর ভূমিকা নিলেন যেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কিনা জানা নেই। শুরু হয়ে গেল পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক হত্যা, গুপ্ত হত্যা, নকশালদের হাতে পুলিশ আর সিপিএম খুন, সিপিএমের হাতে নকশাল খুন, কংগ্রেস আর পুলিশের হাতে নকশাল আর সিপিএম খুন। অবশেষে এসবের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৭ সালে সেই প্রায় কুড়ি বছরের আন্দোলনের ফল হিসেবে সিপিএম এলো ক্ষমতায় — তবে নকশাল পিরিয়ড চলেছিল আরও অনেক বছর ধরে, সিপিএম ক্ষমতায় আসার পরেও।

কলকাতার স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেটা দাঁড়াল রাজনৈতিক ইতিহাসে কিন্তু কলকাতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে রাজনীতি তাই এর চেয়ে সহজভাবে এই তিরিশ বছরের  ঘটনাবলী লেখা যেতনা। রাজনীতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কলকাতার গতিবিধি নজর করে নেয়া যাক এক ঝলকে। স্বাধীনতার পর থেকে বিপুল পরিমান মানুষের সমাগম কলকাতার নগর পরিকাঠামোর উপর অসীম চাপ সৃষ্টি করে।  বিধান রায়ের স্বপ্নের প্রকল্প সল্টলেক এলাকায় নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জলাজমি ভরিয়ে গড়ে ওঠা সেই উপনগরিতে তখন মানুষ যাবার কোন আগ্রহই দেখায়নি, তবু দুই দশক পরে যখন কলকাতার পথব্যবস্থা প্রায় অচল, প্রচুর পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা এই উপনগরী তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু যারা সল্টলেকে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত মানুষ জমি এবং বাড়ি তৈরির মূলধন তাদের তখন ছিল।  তবে সল্টলেকে সরকারি কিছু ফ্ল্যাটও তৈরী হয় সাধারন নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য। একইভাবে বলা যেতে পারে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তৃতি। বালিগঞ্জ ছাড়িয়ে গোলপার্ক ঢাকুরিয়া যাদবপুর সেই সময়ে প্রচুর সম্প্রসারিত হয়, বিশেষ করে রিফিউজি মানুষদের সংস্থানের জন্য। একের পর এক গড়ে ওঠে সরকারি চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি ন্যুনতম ভাড়ায়। আরেক দিকে কলকাতা বেড়ে উঠছিল দক্ষিন পশ্চিমে বেহালায় যা স্বাধীনতার আগে ছিল মূলত জলাঞ্জলি আর শিল্পাঞ্চল। কলকাতার পরিবহন পরিষেবা গড়ে ওঠে ষাটের দশকের গোড়ায় মূলত সরকারি CSTC বাস দিয়ে, তার পর একে একে যুক্ত হয় প্রাইভেট বাস মিনিবাস ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে তৈরী হয় মেট্রো রেলের মাস্টার প্ল্যান যার পরিনতি ১৯৮৪ সালে ভারতবর্ষের প্রথম ভূতল পরিবহম ব্যবস্থা যা আজও কলকাতার গর্ব। ষাটের দশকে গড়ে ওঠে রবীন্দ্র সদন।  জীবনযাত্রার দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলকাতা তখন শিক্ষা সংস্কৃতি পান্ডিত্যে ভারত সেরা যার নমুনা চলচ্চিত্রে সংগীতে লেখায় শিল্পে অগুন্তি।  মানুষ বামপন্থী আন্দোলনের আবেগে অনুপ্রানিত হয়ে প্রতিবাদী চিন্তাধারার প্রতিভূ যেখানে expressionয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কলকাতায় তখন পাড়ায় পাড়ায় গান নাচ আবৃত্তি আঁকা ইত্যাদির ছড়াছড়ি। সেখানে খেলার স্থান তবে শুন্য। কলকাতার তিন প্রধান ছাড়াও প্রথম ডিভিসন ফুটবল লিগের দলগুলো অসাধারণ ফর্মে থাকলেও, কলকাতা থেকে খুব কম ফুটবলারই উঠে এসেছে সেই সময়। তবু তখনো ভারতে ফুটবল মানেই কলকাতা। 

আশির দিকে কলকাতায় এলেন ফরাসী লেখক দমিনিক লাপিয়ের। শহর তাঁর মন জয় করে নিল, কলকাতাকে তিনি বললেন City of Joy. এ শহরে দারিদ্র্য প্রবল, পরিকাঠামো অচল তবু মানুষের মুখে হাসি আছে, আছে জীবনকে উপভোগ করার আত্মবিশ্বাস। একাধারে কলকাতা যেখানে যাত্রা শুরু করেছিল কুড়ির শতকের গোড়ায়, সেই একই প্রগতি বজায় থেকেছিল আশির দশকের গোড়া অবধি। আশির পরের কলকাতায় প্রগতি থেমে যায়নি বরং বেড়েছে, শুধু পরবর্তী সময়কালের লেখাটা নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা করে লিখব বলেই আশিতে এই লেখা থামানোর পরিকল্পনা। কলকাতা এই সময় অবধিও ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসে কলকাতার যে হার না মেনে নেয়ার ক্ষমতা দেখা গেছে, সেখান থেকেই বলা যেতে পারে যে কলকাতা এখনো মৃতনগরী নয়, কলকাতা আছে কলকাতাতেই। আমার শহর আমার গর্ব আমার City of Joy.

Standard