Bengal, calcutta, memories, Nostalgia

কুষ্টিয়ার কড়চা : দ্বিতীয় পর্ব ১৯৯২-২০০০

(যাঁরা ধৈর্য ধরে পুরো লেখাটা পড়বেন তাঁদের জানাই যে এখানে উল্লিখিত তথ্য প্রায় ২০-৩০ বছর আগের আর পুরোটাই স্মৃতিনির্ভর। হয়তো কিছু বিবরণের সময়সীমা ভুল হয়ে গেছে। সঠিক সময় / বিবরণ যদি দয়া করে জানান তাহলে সংশোধন করে নেব। আর এখানে পরিবেশিত ঘটনাগুলো যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভুলক্রমে কারও ভাবানুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।)

কথায় আছে একটা ছবি হাজারটা না-বলা কথা বলতে পারে। কুষ্টিয়া নিয়ে এই লেখাটা শুরু করার সময় মনে হচ্ছিলো যদি সংগ্রহে কিছু ছবি থাকতো তাহলে আরো অনেক কিছু যা লিখে উঠতে পারলামনা সেগুলো আরো সহজে সবার চোখের সামনে তুলে ধরা যেত। ছবি তোলা মানে তখন বিস্তর হুজ্জুতি। ক্যামেরায় ফিল্ম ভরতেই গোটা কয় ফিল্ম নষ্ট, তারপর ছবি তুলে সেগুলো স্টুডিওতে দিয়ে তার প্রিন্ট পেতে পকেট গড়ের মাঠ। তাই সবাইকে অনুরোধ প্রত্যেকের কাছেই নিশ্চই গোটা কয়েক হলেও পুরোনো ছবি আছে। সেগুলো সবাই যদি নেহাৎ মোবাইলে ছবি তুলে Kustia Pranksters গ্রূপে শেয়ার করে তাহলে পুরো কালেকশনটা আকারে বেশ বড়ই দাঁড়াবে। আপনি কি ভাবছেন?

১৯৯২-১৯৯৬

বোধকরি সব জায়গার সব মানুষের জীবনে একটা সময় আসে যে সময়টা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বয়ঃসন্ধির সেই চারটে বছর এত ঘটনাবহুল ছিল যে তার বিস্তার ধারাবিবরণী দেয়া মুশকিল। আমাদের বয়েসীদের কাছে এই সময়টা ছিল ছোটো থেকে বড় হবার প্রথম ধাপ। এক ধাপে পৃথিবীর চৌহদ্দিটা কুষ্টিয়া ছাড়িয়ে পৌছে গেল গড়িয়াহাট গোলপার্ক ভবানীপুরের সিনেমা পাড়া এসপ্ল্যানেড। পাড়া থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ছোঁক মেরে সিগারেট খেতে যাওয়া, এসপ্ল্যানেডে সোসাইটি বা রিগালে অ্যাডাল্ট ছবি দেখার নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ, ভিডিও দেখতে দেখতে গরম হয়ে যাওয়া বিয়ারের বোতলে প্রথম চুমুক মেরে মুখ বিকৃত করা, বা তপসিয়া গিয়ে বীফ রোল এগুলো দিয়েই শুরু হলো আমাদের যৌবনে পদক্ষেপ। কুমারদার পানের দোকানের বাঁধা খদ্দেরও বলতে গেলে তখন থেকে।

কোয়ার্টারে আবার এক তরফ রঙ হলো। আর বহু দিন ধরে বহু লোকজনের আপত্তির পর মেন গেট পেছনের দিকে থেকে সরিয়ে এলো সামনের দিকে, পিকনিক গার্ডেন রোডে। সবাই ভাবলো দারুন ব্যাপার প্রথম কয়েক সপ্তাহ তারপর দেখা গেল যে রিক্সা আসতে অসুবিধা নেই কিন্তু ব্যস্ত রাস্তা থেকে ওই ছোট্ট পরিধিতে গাড়ি ঘুরিয়ে কোয়ার্টারে ঢোকা বেশ কষ্টের। আগের ইঁটের রাস্তার বদলে তৈরী হলো পাকা রাস্তা পুকুরের পাশ দিয়ে এসে জুড়ল আগের পাকা রাস্তায় ক্লাবঘর আর নতুন কোয়ার্টারের মাঝে। মেন গেটের পাশে বেশ কিছুদিন ধরে তৈরী হলো মাদার ডেয়ারীর নতুন পাকা ডিপো। সকাল সন্ধ্যে গাড়ি এসে দুধের মেশিনে দুধ ভর্তি করে দিয়ে যেত, তারপর লোকজন যার যতটা দরকার ততটাই কিনতো, প্যাকেট বা বোতলের ধরাবাঁধা পরিমাপ আর রইলোনা। নতুন ডিপো হবার পরের আমাদের এল জির পাশের ডিপোটাও উঠে গেল, পড়ে রইলো খালি কাঠামোটা। কোয়ার্টারের চারপাশে ছোট বুক অবধি পাঁচিলটা বাড়িয়ে প্রায় আট ফুট উঁচু করা হলো, যাতে বাইরের থেকে লোকজন পাঁচিল ডিঙিয়ে না ঢুকতে পারে।

এত সব নতুন পরিবর্তনের সাথে আর একটা ব্যাপার ঘটছিল সেই সময় গোটা ভারত জুড়ে, যার প্রভাব আমাদের কুষ্টিয়াতেও এসে পড়ল। সেই নব্বইয়ের প্রথম থেকে পরের দিকের কুষ্টিয়ার যা স্মৃতি রয়েছে গত সময় জুড়েই সেই প্রভাব লক্ষ্যনীয় – সেটা ছিল বিশ্বায়নের প্রথম যুগ। সেই বিশ্বায়নের হাত ধরে কুষ্টিয়ায় প্রথম পা রাখল কেবল টিভি। রাসবাড়ির পেছনের দিকে পুকুর পাড়ে এক চিলতে ঘর ভাড়া করে শুরু হলো মাইতিদার ব্যবসা। ঠিক মনে পড়ছেনা ডিস অ্যান্টেনাগুলো কোথায় লাগিয়েছিলো রাসবাড়ির ছাদে খুব সম্ভব। প্রথম যখন কেবল টিভি আসে তেমন কোনো লোকজনই ঠিক জানতনা ব্যাপারটা কি। ফলে কানেকশান যারা প্রথম নিয়েছিল কোয়ার্টারে তাদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। তাছাড়া তখন অপসংস্কৃতির যুগ, যা কিছু অজানা, নতুন সংস্কৃতি তাকে অপসংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পরিত্যাগ করাটাই ছিল চল। উষা উত্থুপ হোক বা রুনা লাইলা বা বাপ্পী লাহিড়ী অনেকেই অপসংস্কৃতির কোপে পড়েছে। কেবল টিভিও সেই কোপ থেকে রেহাই পেলোনা। এইসব অগুন্তি কারণে আর তাছাড়া নব্বইয়ের প্রথম দিকে আবাসিকদের হাতে বাড়তি উপার্জনও তেমন না থাকায় কেবল টিভি তখনও শখের ব্যাপার হয়েই রয়ে গিয়েছিল। সেই প্রথম দিকে মাইতিদার সাথে কাজ করত শম্ভূ বাচ্চু ওদের সাথে আগে চেনাশোনা থাকার সুত্রে মাইতির অফিসে যাওয়া শুরু করলাম। তখন খুব বেশি চ্যানেল ছিলনা কিন্তু মাইতিদার একটা নিজের চ্যানেল ছিল আমরা কোনো সিনেমা দেখতে চাইলে মাইতিদাকে বললেই হয়ে যেতো। রাসবাড়ির পুকুরের পাশ দিয়ে ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে যে ওদের বাড়ির সামনের দিকে চলে যাওয়া যায় সেটা সেই প্রথম টের পেলাম। দূরদর্শনের একঘেয়ে অনুষ্ঠানের বাইরের জগতের সাথে সেই প্রথম পরিচয়। সেই সূত্রেই আমাদের মনের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ল বেভারলি হিলস, ওয়ান্ডার ইয়ার্স, রেসলিং, হলিউড, বে ওয়াচ ইত্যাদি। WWF রেসলিং এতটাই হিট হয়ে গেল যে পালা করে সবাই রেসলিং লড়তে শুরু করলাম বিল্ডিংয়ের ভেতরে আবার কখনো মাঠেও। সকাল দুপুর সন্ধ্যে হেরোদের মিটিং চলত যারা জেতে বারবার তাদের কোন প্যাঁচ মেরে হারানো যায়। আবার শনিবার কেবল চ্যানেলে অ্যাডাল্ট সিনেমা চালানো হত মাঝরাতের পর। সেই নিষিদ্ধ কৌতুহল নিয়ে মাঝরাতে ঘরের পোর্টেবল অ্যানালগ টিভির অ্যান্টেনা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে অনেক চেষ্টাই করেছি যদি সিগনাল পাওয়া যায়। প্রায় বছর দুয়েক চলার পর রেজ্জাক মোল্লার হস্তক্ষেপে সেটা বন্ধ হয়।

কেবল টিভির বাইরেও যে সংস্কৃতির একটা পরিবর্তন আসছে বাংলায়, সেটা টের পাওয়া গেল জীবনমুখী গানের সুত্রে। পাড়ায় পাড়ায় তখন সুমন-নচিকেতা-অঞ্জনের গানের বুলি ঘুরছে, সে বেলা বোস থেকে শুরু করে নীলাঞ্জনা, তোমাকে চাই অবধি। কে বড় গায়ক সে নিয়ে প্রবল জল্পনা-কল্পনা তর্ক-বিতর্ক। এরই মাঝে এসে গেল বাবা সায়গল। পাড়ার বাইরে বাপী একটা ক্যাসেটের দোকান দিল সেখানে এই সব নতুন সিনেমা ক্যাসেট এসব চলত।

৯২ থেকে পাড়ার মধ্যে আরো দুটো ব্যাপার চালু হলো। প্রথমটা হলো বাগান করার ধুম। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের দিকে আগে বাগান ছিল মোটে একটা, জয় জয়ন্তীর সামনেটায়। হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেল আরো অনেক বাগান, এল/এইচের সামনে রায়কাকুর বাগান, দুধের ডিপোর পাশে ভানুকাকুর বাগান আর আমাদের এল/জির পেছন দিকে হাজরা দাদুর বাগান। প্রচুর পরিশ্রম হয়েছিল কচুগাছ ঢাকা জমি পরিষ্কার করে বেড়া দিয়ে গাছগাছালি লাগলো, গরু তাড়ানো, গাছে নিয়ম করে জল দেয়া। তবে সেই বাগানের জন্যে এসে হাজির হলো কাতারে কাতারে মশা আর বর্ষাকালে সাপখোপ। বাগানগুলো বেশ কিছুদিন দেখভাল করার পর লোকজনের আর তেমন উৎসাহ রইলোনা আর বিনা তত্ত্বাবধানে আস্তে আস্তে গাছ মরে বেড়া ভেঙে আবার যে কে সেই। পুরনো কোয়ার্টারে বাগানগুলো করা হয়েছিল আরো আগে, আর তাদের নিয়মিত দেখাশোনা করা হত, তাই পুরনো কোয়ার্টারের বাগানগুলো বরং টিঁকে ছিল অনেক বেশি বছর। আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা চালু হলো সেটা ছিল রাতে পাহারা দেয়া। নব্বইয়ের দিকে আশেপাশে চুরি চামারির ধাত বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েক বার নাইট গার্ড দেয়া শুরু হয়েছিল, বাবাকেও যেতে হয়েছে প্রতিবারই। বিরাট ছ-সেলের টর্চ আর গোটাকয় মোটা পাকানো বাঁশের লাঠি আর হুইসল নিয়ে পাড়ায় টহল দেয়া হত। এরকমই এক দফায় রাতে পাহারা দেয়ার প্রথম দিনই ধরা পড়ল চোর। সে নাকি বিরাট জাঁদরেল চোর ছিল, দশাসই চেহারা, সাথে এনেছিল একটা পিস্তলও। কে ছিল মনে নেই তবে সে নাকি চোরকে তাড়া করে বড় মাঠের কোনে নিয়ে গেছে চোর ঘুরে দাঁড়িয়ে পিস্তল চালিয়ে দিল কিন্তু গুলি বেরোয়নি আর সেই পাহারাদার চোরের মুখে টর্চের বাড়ি মারে তাতে টর্চই বেঁকে যায়। অনেক দৌড়ঝাঁপের পর সামনের দাদুর বিড়ির দোকান থেকে যখন তাকে ধরে ক্লাবঘরে আনা হয়, ততক্ষণে বেদম মার শুরু হয়ে গেছে। আর পুলিশ আসার আগেই সে আগে যেখানে চুরি করেছিল সেখানকার লোকজন এসে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় ক্লাবঘরের সামনে থেকে। পুলিশ যতক্ষণে সেখানে পৌঁছয় লাঠি শাবল এসব দিয়ে মেরে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আজকের দিনে হয়ত এতটা বাড়াবাড়ি হতনা, তবে ঘটনাটার কথা ভাবলে এখনো মন খারাপই হয়ে যায় পেটের দায়ে চুরি করা একটা মানুষকে জলজ্যান্ত এভাবে মেরে ফেলায়। কদিন পর আবার ধরলাম এক চোর। এল/এর ছাদে দেখতে পেয়ে বিক্রম জিজ্ঞেস করলো কে রে তুই? চোর উত্তর দিলো বাচ্চা ছেলে। তাকে ধরে তারপর তিলজলা থানায় নিয়ে যাওয়া হলে ওসি আবার উল্টে আমাদের বললো কি কি চুরি করেছে থানায় নিয়ে আসবে? মাসের শেষ গাড়িতে তেল নেই। চুরি ডাকাতি বাড়ার সাথে সাথে অনেকে দরজায় ৭-৮-৯ লিভারের তালা বসিয়েছিলো। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের দিকে সবাই আরো একটা গেট লাগিয়ে নিলো সিঁড়ির পাশে। আর বারান্দায় বসতে লাগলো গ্রিল। অভিরুচির নস্করদের ছিল লোহার দোকান, বলাই বাহুল্য তাদের ব্যবসা বেড়ে গেলো এই সব সাপ্লাই করতে করতে। তবে চারতলায় এই গেটগুলো বসাতে আমাদের ছাদে ওঠার বেশ সুবিধা হয়েছিল। আগে মই ছাড়া ওঠা বেশ কষ্টকর ছিল।

আর তখন জলের অনেক টানাটানি ছিল। বড় পুকুরের পাশে নতুন পাম্পঘর বসলেও মাঝে মাঝেই সেই পাম্প অকেজো হয়ে যেত। জলের আকাল মেটাতে কর্পোরেশন গোটা তিন চার ট্যাপকলের ব্যবস্থা করে আর তা ছাড়াও ছিল গোটা তিন চার টিউকল। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে বাড়ির বাথরুমে জল চলে যাওয়ায় সব বন্ধুরা হইহুল্লোড় করে বালতি নিয়ে নিচে নেমে পড়েছি কলতলায় চান করে জল তুলে নিয়ে যাব বলে। আর কলতলায় লম্বা লাইন আমরা ছাড়াও পিসিমা কাকিমাদের। লোডশেডিং কমে এলেও জলের ঝামেলা পরেও লেগে ছিল। কোয়ার্টারের বাইরেটা যেমন পাল্টাচ্ছিল, তেমনি পাল্টাচ্ছিল বাড়ির ভেতরটাও। আগে লোডশেডিং হলে সারা পাড়া অন্ধকার হয়ে যেত, পাড়ায় নামলে দেখা যেত ঘরে ঘরে হ্যারিকেন মোমবাতির আলো। হাতে গোনা কয়েক বাড়িতে জ্বলতো এমার্জেন্সি লাইট। পরে অনেকের বাড়িতেই লাগানো হয় এমার্জেন্সি আলো। আর এই সময় আরো এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা যেত। আমাদের পুরো পাড়ার বিদ্যুৎ সাপ্লাই আসতো দুটো আলাদা জায়গা থেকে। কখনো কখনো লোডশেডিং হলে পুরোনো কোয়ার্টারে আলো চলে গেলেও নতুন কোয়ার্টারে আলো থাকতো। উল্টোটাও হতো কখনো কখনো। আমাদের আলো না গেলে অপেক্ষা করে থাকতাম কখন আমাদের আলো যাবে, যাতে নিচে নামা যায় আড্ডা মারতে। এমার্জেন্সি আলো ছাড়াও বাড়িতে বাড়িতে অনেক কিছু পাল্টে গেছে ততদিনে। রান্নাঘরের চুল্লি উনুন আর তখন কেউ ব্যবহার করতোনা। বেশির ভাগ বাড়িতেই সেই উনুন ভেঙে রান্নাঘর বড়ো করা হয়ে গেছে। সিমেন্টের রান্না করার স্ল্যাবটাও ততদিনে প্রায় ঝুরঝুরে, অনেকেই তখন সেসব ভেঙে নিজের মতো করে রান্নাঘর বানিয়ে নিচ্ছে। রান্নাঘরে বসছে এক্সস্ট ফ্যান, তার জন্যে অনেক ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের জানলার ওপরে গোল করে কাটা ঘুলঘুলি। উনুনের ধোঁয়া ছাড়ার যে পাইপগুলো লাগানো ছিল রান্নাঘরের দেয়াল বেয়ে সেগুলো আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে লাগলো। ভেঙে পরে গেলে সেগুলো আর পাল্টানো হতোনা পরের দিকে। আর ধীরে ধীরে এক-দু বাড়িতে বসানো হলো এসি। কারো কারো বাড়িতে ছোটো কুলার, অনেকে আবার দেয়াল কেটে বড়ো এসি।

বিশ্বায়নের যে হাওয়া কলকাতায় লেগেছিল তার ছোঁওয়া আমাদের কুষ্টিয়াতেও ভালমতই এসে পৌঁছেছিল। কেবল টিভি আর দূরদর্শনের এম টিভিই নয়, তার বাইরেও। মনে হয় এই চার বছর সময়টাকে ধরা যেতে পারে দুটো যুগের যুগান্তরের সীমানা। নতুন যুগের আধুনিকতার সাথে সাথে মানুষজন যে অল্প একটু ঘরকুনো হয়ে গেল, তার শুরু এই সময়তেই। আমরা তখন তেমন বড় নই, তখন শুনতাম আগে পাড়া কেমন গমগম করত। অত আগের ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী না হলেও ৮৫র পর থেকে দেখা সময়েই বদলে যাওয়া দিনের ছাপ কুষ্টিয়াতে পড়তে দেখেছি ধীরে ধীরে। আগের মত খেলাধুলো স্পোর্টস হলেও তাতে সেরকম স্ফূর্তি ছিলনা। আর আগে যেমন প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে হত সব অনুষ্ঠান তাতেও বেশ কিছুটা ঘাটতি পরে গেল। রবীন্দ্র জয়ন্তীর জায়গায় শুরু হলো রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল সন্ধ্যে। তাতে উৎসাহী লোকজন আগের মত ভিড় করে অংশ নেয়া বন্ধ করে দিল। ক্লাবের চাতালের ওপর সতরঞ্চি পেতেই নম নম করে সারা হয়ে যেত এই অনুষ্ঠানগুলো। খেলার ব্যাপারেও তাই। খেলাধুলার চল বজায় থাকলেও কোথায় যেন উৎসাহে একটা ভাঁটা পরে গিয়েছিল। বর্ষাকালে শনি-রবিবারগুলোয় বড় মাঠ ফাঁকাই পড়ে থাকত, সেখানে মাঝে মাঝে পালপাড়ার ছেলেরা এসে ফুটবল খেলত, আমাদের পাড়ার লোকজন খেলায় তেমন আগ্রহ দেখাতনা। ব্যাডমিন্টন খেলা পুরোপুরিই উঠে গেল। আর ক্রিকেটের মরশুমে ফুটবল খেলা এবড়োখেবড়ো জমিতে জল দিয়ে রোল করে সমান করতেই আদ্ধেক সিসন খতম। তবু টুর্নামেন্ট হত তখনও রীতিমত। চোখে লেগে আছে এখনো দেভেন্দর পাপ্পুর বলে বলে ছয় মারা। পাড়ার ক্রিকেট টিম তখনও বেশ ভালো, পুরনো প্লেয়াররা যেমন দীপদা শুভঙ্করদা উজ্জলদা এরা জায়গা করে দিচ্ছে আমাদের বয়েসীদের – বাপ্পা (গ্যাড্ডা), ডাকু, সোনাদা, ছোট পাপ্পু এদের। তখনও চুটিয়ে টপ ফর্মে খেলে যাচ্ছে তাতুদা বাবুয়াদারা। ক্লাবঘরের নতুন হলদে রঙের দেয়াল আর মেরুন রঙের কলামগুলোও আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর বড় মাঠের গোলপোস্টের পেছনের দিকের খাকি সবুজ জানলাটা ফুটবলের বাড়ি খেয়ে খেয়ে ভেঙেচুরে একসা। তবে ফুটবল মাঠে একটা নতুন ব্যাপার চালু হলো এই সময় – ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ম্যাচ। রেষারেষি চিরকালই ছিল সাপোর্টারদের মধ্যে, মারাদোনা বড় না পেলে সে নিয়ে তর্কেরও শেষ ছিলনা, এবার সেই দ্বন্ধ মাঠে মিটিয়ে নেবার সুযোগ চলে এলো দুপক্ষের কাছে। ব্রাজিলের এককাট্টা সমর্থক হলেও সেই ম্যাচগুলোতে খেলার চান্স কখনো মেলেনি, তার বদলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গেছি সমানে। বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলে বড় মাঠের পাশের মাঠটা জলে ভরে যেত, সেখানে চলত ফুটবল আর রাগবির মাঝামাঝি খেলা, ফুটবলের চেয়ে আছাড় খাওয়াতেই যেন বেশি আনন্দ ছিল। মনে রয়ে গেছে নিপুর ঘাড়ে চড়ে বসা ট্যাকল, রাজার ল্যাং খেয়ে খোকার গড়াগড়ি, বুকুদার বুক দিয়ে বল রিসিভ করা, আর ফুটবলের সাথে সাথে অমলদার লাফ। আর গোল করতে না পারলেই “কেষ্ট” বলে বকা। তারপর পুকুরে গিয়ে চান। চানের কোথায় মনে পড়ল একবার রায় বাবাইকে সাঁতার শেখাব বলে পুকুরের মাঝামাঝি অবধি গেছি হঠাৎ বাবাই তলায় পা না পেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে আমাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। মনাদা না কে একটা বাবাইকে সামলে পাড়ে না নিয়ে গেলে হয়ত দুজনেই ডুবতাম সেদিন।

পাড়ার বাইরেটাও এই চার বছরে দুড়দাড় করে পাল্টে যেতে লাগলো। আমাদের এল/জির সামনের কলোনিটায় তিনতলা বাড়ি উঠে গেল চোখের সামনে। মেন গেটের বাইরে দুধের ডিপোর পাশে অরাদার নতুন রোলের দোকান খুললো অভিরুচির সাথে পাল্লা দিয়ে। বাসস্ট্যান্ডের পাশে খুলল আরো একটা তেলেভাজার দোকান। আর মোড় ঘুরে কুষ্টিয়া রোড যেখানে তপসিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে, সেদিকে খানিক এগিয়ে খুলল আরো একটা চপ কাটলেটের দোকান। আর তার পাশে ছিল একটা ভিডিও পার্লার। কম্পিউটার ইন্টারনেটের আগে সেটাই ছিল প্রযুক্তির সাথে প্রথম মোলাকাৎ। বিভিন্ন গেম খেলা যেত রঙিন পর্দায় তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল সুপার মারিও। অনেক বন্ধুবান্ধবই তখন ভিডিও গেমসের পেছনে অনেক পয়সা নষ্ট করেছে। কুষ্টিয়া পার্কের ধারে ছিল পেপসির কারখানা, সেখানে ২০ কি ২৫ পয়সায় পেপসি পাওয়া যেত, সেই কারখানার ইতিও ৯২-৯৩য়ের দিকে। মেন গেটের ডানদিকে রায়বস্তির ঢোকার মুখে চালু হলো আরেকটা শনি মন্দির। আগের মেন গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘোষপাড়ার দিকে যে শনি মন্দির ছিল সেখানে অনেকে যেতে পারতনা, এই নতুন মন্দির হওয়ায় অনেকে তখন সেখানেই যেতে শুরু করলো। ফলে প্রতি শনিবার বড় রাস্তায় জ্যাম বাড়তে শুরু হয়ে গেল। আর চালু হয়ে গেল অটো রিক্সা বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পিকনিক গার্ডেন অবধি। ৯৬য়ে এসবের মাঝে আড়ালে আড়ালে বেদিয়াডাঙা মসজিদ আর দোকানপাটের পেছনে কাজ শুরু হয়ে গেল বন্ডেল গেট উড়ালপুলের। আর কোয়ার্টারের পেছন দিকে শ্রীধর রায় রোডের দিকে তৈরী হতে লাগলো অনেক বাড়ি। ঘোষপাড়ার দিকে এতদিন ছিল সব ফাঁকা, হঠাৎ সবার কেনা জমিতে বাড়ি বানানোর হিড়িক পরে গেল। সরস্বতী পুজোর জন্যে বাঁশ চুরি করতে যেতাম, আর সে সুযোগ রইলোনা পরের দিকে।

যা বলে শুরু করেছিলাম, যে ৯২ থেকে ৯৬ ছিল আমাদের বাচ্চা থেকে হঠাৎ বড় হয়ে যাবার গল্প, সেখানে দুটো ব্যাপার না বললে আবাসনের পরিবর্তনের বর্ণনা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। প্রথমটা হলো মাধ্যমিক। ৯২ থেকে ৯৪ য়ের মধ্যে আমাদের গ্রুপের সবাই মাধ্যমিক দিয়ে ফেলল। আমার পালা এল ৯৪য়ে। মাধ্যমিকের আগে অবধি বেশির ভাগ ছেলেমেয়েরাই পড়ত একই স্কুলে, সাউথ পয়েন্টে যেত প্রায় সবাই, তাছাড়া ছিল মডার্ন, সেন্ট লরেন্স, পাঠ ভবন, কমলা গার্লস। মাধ্যমিক শেষ হওয়া যেন অনেকটা পালা ভাঙার পালা। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার জন্যে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। বুড়িরা চলে গেল অন্য কোথায় বাড়ি করে। কেউ কেউ আবার চলে গেল কলকাতারই বাইরে। পিনাকীরা নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেল কিছুদিন পর, আর অভি, সাদিক কাকুরা গেল সি এন রায় রোডে নতুন ফ্ল্যাটে। ওদের ফ্ল্যাটে এলো সানিরা। মাধ্যমিকের পর বিক্রম চলে এলো পাড়ায়। মনে আছে মাধ্যমিক শেষ হলো মোক্ষম সময়ে, এসে গেল ৯৪য়ের ওয়ার্ল্ড কাপ। রাত জেগে খেলা দেখে কখনো কখনো দল বেঁধে ভোর বেলা যেতাম ঢাকুরিয়া লেকে সাঁতার কাটতে। রেজাল্ট বেরোনোর পর অনেক ভাবনা চিন্তা করে শেষে মায়া কাটাতে না পেরে রয়ে গেলাম তিলজলা হাই স্কুলে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সময়টা অনেকটা ঘোরের মধ্যে দিয়েই কেটে গেল। পড়াশোনার চাপ বাড়ার সাথে সাথে সিনেমা, কেবল টিভি সে সবের নেশাও বাড়ল তার সাথে জুড়ল আড়ালে আবডালে সিগারেট খেতে যাওয়া। এমন করেই একদিন উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডীও কাটিয়ে ফেললাম। তারপর তো এলো বেরিয়ে পড়ার পালা উজানে গা ভাসিয়ে।

অন্য দিকে এই চারটে বছর আমাদের কাছে যেন ছিল নিজেদের বীরত্ব প্রমান করার সময়, যে আমরা এখন বড় হয়েছি। আর সেই সূত্রেই ঘটে গেল একের পর এক বাওয়াল। মাঝেমধ্যে হতো পাঞ্জা লড়াই। সেটা ছিল অনেকটা আমাদের বড়দেরকে চ্যালেঞ্জ করার একটা উপায়। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কোনো তিক্ততা বা রেষারেষি ছিলোনা, কিন্তু চাপা টেনশনটা টের পাওয়া যেত। আমাদের গ্ৰুপে চ্যাম্পিয়ন ছিল রাজা। ও অনেক বড়োদেরকেও হারিয়েছে, আবার অনেক সময় এমনও হয়েছে যে চ্যালেঞ্জ করে নিজেই গোহারান হেরেছে। মাঝে তারপর স্ট্যালোনের ওভার দ্য টপ বলে পাঞ্জা লড়াইয়ের সিনেমা দেখে সবাই বিভিন্ন রকম গ্রিপ প্রাকটিস করতাম। তাছাড়া কখনো আমাদের গ্রুপের কেউ কেউ ওপরের গ্রুপের ছেলেদের সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া, তো কেউ কখনো বাইরের লোকজনের সাথে। প্রথম ঝামেলা ছিল সেই ৯২য়ের শেষে বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে। যেদিন ঝামেলা শুরু হয় সেই রাতে তখন দক্ষিন আফ্রিকার সাথে ক্রিকেট খেলা দেখছি। দাঙ্গা তেমন বাধেনি, খালি তপসিয়ার লোকজন ভাঙচুর করতে এসেছিল বড় রাস্তা অবধি সবাই লাঠিসোটা নিয়ে আবার তাদের পেছনে তাড়া করে তপসিয়া পাঠিয়ে দিল। কার্ফু জারি হওয়ায় বাজার করার বেশ ঝামেলা দেখা দিল, মাঝখান থেকে যে সাইকেল করে মাছ বিক্রি করতে আসত তার বেশ জাঁকিয়ে ব্যবসা হয়ে গেল কয় দিন। আমরাও মহানন্দে স্কুল ছুটি তাই পাড়ায় আড্ডা মেরে কাটালাম। অনেকে আবার দাঙ্গার ভয়ে কামারশালা থেকে তলোয়ার বানিয়ে এনেছিল। এছাড়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাইরের লোকজন এসে একবার মাঠে নেমে গন্ডগোল পাকিয়ে দিল, ইঁট ছোঁড়াছুঁড়ি মাথা ফাটানো এসবের পরে ছানুকাকু টুর্নামেন্টই বন্ধ করে দিল। আর একবার টুর্নামেন্ট চলার সময় সি এন রায়ের চিন্টুকে প্রচুর আওয়াজ দিলাম আমরা, খেলা শেষে চিন্টু ডাকুর সাথে মারামারি বাধালো। ঝামেলা প্রায় থেমে এসেছে এমন সময় বিক্রম বেপাড়ার লোক মনে করে পাড়ারই এক দাদাকে এক লাথি মেরে দিল। ব্যাস সবাই মিলে তখন বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চিন্টু আর তার দল বিনা বাধায় ফিরে গেলো সি এন রায় হাউসিংয়ে। এছাড়া লেগেই থাকত পালপাড়ার সাথে। রেষারেষি ছুটকো ছাটকা ঝামেলা আগে লেগে থাকলেও ৯৫-৯৬ থেকেই সেটা আস্তে আস্তে তিক্ত হতে থাকে। খুব সম্ভব ৯৫য়ে বিশাল ঝামেলা লাগলো বেদিয়াডাঙায় সইফুলদার সাথে ঝামেলা বাধায় দোকানপাটের পেছনে বেআইনি মদের ঠেক ভাঙা নিয়ে। প্রথম দিন বেশ কিছু ঠেক ভাঙার পর স্থানীয় লোকজন তেড়ে আসে আমাদের মারতে। সেদিনই প্রথম আবিষ্কার করি যে প্রানের দায়ে আমি বেশ জোরেই দৌড়তে পারি। আর আরেকটা ব্যাপারও এই সব ঘটনা গুলো থেকে পরিস্কার হতে থাকে যে আগে যেমন লোকে ঝামেলা বাধিয়ে নিজে নিজেই মোকাবিলা করত সে দিন আর নেই। আগেকার পাড়ায় মস্তান বলে যে ব্যাপারটা ছিল সেটার চল আস্তে আস্তে উধাও হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। তখন কোনো গন্ডগোল হলেই “দাঁড়া অমুক পাড়া থেকে ছেলে নিয়ে আসছি” টাই ছিল আরো জবরদস্ত হুমকি। কে কত বাইরের লোকজনকে চেনে তার ওপর তার ঘ্যাম। একবার মনে আছে বুল্টুর ভাই বাবু ফোন করলো রাত্রি বেলা, ওকে নাকি কে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে গড়িয়াতে। সব তোড়জোড় করে এদিক ওদিকে থেকে লোকজন যোগাড় করে সবাই ট্যাক্সি নিয়ে গড়িয়ার দিকে রওনা দেব তখন খবর এলো যে না ও নাকি মজা করতে ফোন করেছিল। সব ঝামেলা যে অন্যদের সাথেই হত সেরকম নয়, ওই চার বছরে নিজেদের বন্ধুদের মধ্যেও কম ঝামেলা হয়নি। কিন্তু ঝামেলা যেমন হয়েছে, মিটেও গেছে সাথে সাথে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল উৎপলদা চিকু খোকন অজু বড়কা এদের ক্যারাটের ট্রেনিং দিত, সবাই তখন বীরপুরুষ হবার নেশায় বুঁদ। উৎপলদা একদিন বড়কাকে পিছিয়ে যেতে বলেছে, ও শুনলো এগিয়ে আসতে, ব্যাস লাঠি খেয়ে বেশ কদিন হাসপাতালে।

শেষ একটা তুলনা দিয়ে এই চার বছরের ব্যাখ্যান শেষ করব। যেমন আগে বলেছিলাম রাসমেলা আর দুর্গা পুজো দিয়ে বিচার করা যেত সময় কিভাবে পাল্টে যাচ্ছে, তার ছবিই এখানে খানিকটা তুলে ধরলাম। বড় রাস্তার কাঁচা নর্দমার ওপর কভার লাগানোতে বিভিন্ন ব্যাপারীর সোনায় সোহাগায দাঁড়ালো রাসমেলার সময়। কভারগুলো তাদের পসরা সাজানোর জায়গা হয়ে দাঁড়ালো। রাসবাড়ির মূল যে জমি জায়গা ছিল প্রথমের দিকে, সিইএসসি ট্রান্সফরমার বসানোয় সেই মাঠের অনেকটাই উধাও হয়ে গেল। এই কোনেই আগে যাত্রাপালা বসত। জায়গার অভাবে নাকি দর্শকের অভাবে, যাত্রাপালা উঠে গেল আস্তে আস্তে। রাসবাড়ির উল্টোদিকে আগে বসত কাঠের নাগরদোলা,তার জায়গায় এলো উঁচু ইলেকট্রিক নাগরদোলা। কিছুদিন পর বসলো এরোপ্লেন যেটা কোনাকুনি ঘুরত আর আর মনে আছে এরোপ্লেনের বৃত্তের এক প্রান্ত দেয়ালের বাইরে পুকুরের ওপর ঝুলে থাকত। রাসমেলা যতটা জায়গা জুড়ে বসত, পিকনিক গার্ডেন রোডের সেই অংশে একটু একটু করে নতুন বাড়ি দোকান ইত্যাদি গড়ে ওঠায় মেলার বিস্তৃতি অনেকটাই কমে আসে। সেটা পোষাতে আস্তে আস্তে মেলার চৌহদ্দি পূর্বে কুষ্টিয়া মোড় থেকে পশ্চিমে তিলজলা রোড ছাড়িয়ে প্রায় বন্ডেল বাজার অবধি। তবে দোকান বাড়লেও রাসমেলায় ভিড় তেমন আগের মত হতনা। আর বাজির জমকও আর তেমন আগের মত ছিলনা, আলোর বাজির সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় শুন্যে এসে থেকেছিল শেষের দিকে। অন্যদিকে দুর্গা পুজোয়ও একই রকম দৃশ্য। নতুন কোয়ার্টারের দিকে আমরা বরাবরই বলতাম যথেষ্ট পরিমান আলো দেয়া হয়না, কিন্তু নব্বইয়ের মাঝামাঝি দিকে আলোর পরিমান আরো কমে গেল। আগে ক্লাবঘরের চাতালের ওপর দুটো ভাগ করে একদিকে প্যান্ডেল অন্যপাশে স্টেজ বানানো হত, সেই স্টেজ সরে প্রথমে গেল আই/এর সামনে তারপর এল/এর সামনে বড় মাঠে। পুজোর বাজেট একটু একটু করে বাড়তে লাগলো সেই সাথে চাঁদাও।তবে তার বিনিময়ে প্যান্ডেলের একটু শ্রীবৃদ্ধি হলো। পুজোর আগে আগে বসে আঁকো হতো, আর যারা প্রাইজ পেতো তাদের আঁকাগুলো প্যান্ডেলে টাঙানো থাকতো পুজোর কদিন। আঁকার হাত অনেকেরই ভালো থাকলেও দুজনের নাম প্রথমেই মনে আসে এল/এইচের তোতন আর আই/এর বাবাই। বেশির ভাগ সময় ওদের গ্ৰুপের প্রাইজ ওরা দুজনই পেতো। আর তার উল্টোপিঠে ছিলাম আমি, অনেকটা পরীক্ষায় রচনা মুখস্থ করে যাবার মত দু তিনটে থিমের ওপর প্র্যাক্টিস করে যেতাম, সেগুলো এলে ভালো নাহলে পাতায় হিজিবিজি এঁকে চলে আসতাম। আমার আরেক বন্ধু ছিল আরো এক কাঠি ওপরে। স্কেল দিয়ে লাইন আঁকতো। প্রতিমা আসা শুরু হলো কুমোরটুলি থেকে। শুরু হলো ভোগ বিতরণ। আর পুজোর আগে পুজো নিয়ে পাড়া বেশ সরগরম হয়ে উঠত, কে বা করা কোনো বছর পুজো আয়োজন করবে। পুজোর সন্ধ্যেয় নাটক বন্ধ হয়ে গেল, তার জায়গায় কয়েক বছর পর আসবে অন্তাক্ষরি। আর তেমন কোনো পরিবর্তন মনে পড়ছেনা তেমন, তবে মনে হয় যে কোয়ার্টারের পুজো নিয়ে আবাসিকদের উৎসাহ খানিকটা কমেই এসেছিল। আমার বা আমাদের বয়েসীদের অবশ্য সেটা মনে হওয়া স্বাভাবিক কারণ আমরা তখন কোয়ার্টারের গন্ডী ছাড়িয়ে বাইরে বেরোতে ব্যস্ত। দুর্গাবাড়ি ম্যাডক্স স্কোয়ার এসব দিকেই নজর তখন আমাদের, পাড়ায় খালি রাত জেগে আড্ডা মারার চিন্তা। আর আগে ভাসানে যেতামনা আর বড়রা বারণ করত, সেসব আস্তে আস্তে উঠে গেল, আমরা বড় হওয়ার সাথে সাথে ভাসানে যেতে শুরু করলাম। শুধু তাই নয় কোন লরিতে যাব, কে লরির মাথায় বসবে সব কিছু নিয়ে চরম উত্তেজনা।

১৯৯৬-২০০০

আমাদের গ্রুপের বেশীরভাগ বন্ধুবান্ধবরাই ৯৬ সালে সাবালক হয়ে গেল। আঠারোয় পা দিয়ে হঠাত লাগামছাড়া হবার সব লক্ষনই তখন ছিল আমাদের। ৯৬য়ে আমি আর বিক্রম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেলাম জলপাইগুড়ি, তেমনি একে একে পাড়ার অনেকেই তখন কলেজ জয়েন করেছে। নতুন বন্ধুবান্ধব, নতুন কলেজ এসব নিয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, পাড়া রইলো পাড়ার মতই। আগের চার বছর যেমন ছিল আমাদের বড় হয়ে ওঠার গল্প, এই চার বছর তেমনি আমাদের পরের গ্রুপের। বুড়ো বাবাই বাবান রুবেন বুবলা সুর্য এরা সব হুট করে কেমন বড় হয়ে গেল চোখের সামনে। আর এই চার বছর পাড়ায় একটানা না থাকায় এই পরিবর্তনটা আরো বেশি করে চোখে পড়ত। এইসব কচিকাঁচারা যখন বড়ো হয়ে উঠছে আমাদের তখন সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক হবার উচ্ছাস। এতদিন যা সব নিষিদ্ধ ছিল হঠাৎ করে সেসব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্রথম প্রথম যেমন প্রচুর উৎসাহ ছিল জমে থাকা আশ মিটিয়ে নেবার, আস্তে আস্তে যেন সেই অত্যাগ্রহী দশাটা কেটেও গেলো সেই চার বছরে। এতদিন স্কুলের বন্ধুবান্ধব থাকলেও খেলাধুলো, আড্ডা সিনেমা সবই ছিল পাড়ার বন্ধুদের ঘিরে। কলেজ চাকরি এই সব শুরু হয়ে আস্তে আস্তে সেই পাড়া নির্ভরতাটা কেমন যেন ঢিমে হয়ে আসছিলো তখন। তবুও কম্পিউটার তখন সব সময় গ্রাস করে নেয়নি, মোবাইল ফোন দুর্লভ, ফেসবুক হোয়াটস্যাপ এসবের সৃষ্টিকর্তারাও তখন স্কুলপড়ুয়া। পাড়া ছিল তখনও জমজমাট, যদিও আগের দশকের সিকিভাগও না। স্পোর্টস প্রতি বছর হতোনা, শীতকালে ক্রিকেট টুর্নামেন্টও বন্ধ হয়ে গেলো বিভিন্ন ঝামেলাঝাঁটির জেরে। পাড়ায় বাইরের লোকজনের আনাগোনা একটু বেশিই চোখে পড়তো আগের চেয়ে। তবু তখন যারা আসতো বেশিরভাগই কোয়ার্টারের কারো না কারো বন্ধুত্বের সূত্রে।

পাড়ার বাইরেটা এই সময় বদলায় পাড়ার ভেতরের চেয়ে ঢের তাড়াতাড়ি। ঘোষপাড়ার দিকটা আগেই যেমন জলাজঙ্গল আর বাঁশবাগানে ভর্তি ছিল সেগুলো সব ভোল পাল্টে বাড়িঘরে ছেয়ে গেলো। পাশে কুষ্টিয়া রোডেও জেঁকে বসলো গোটাকয় এসটিডি বুথ আর জেরক্স। বাসস্টপের কোনের বাড়িটা পাকা হয়ে গেলো, আর এসে গেলো আর এক নতুন মিষ্টির দোকান। আগে সুধীরদার দোকানে না গেলে মিষ্টি কিনতে যেতে হতো পালপাড়া পেরিয়ে। নতুন দোকান হয়ে সুধীরদার বাসি মিষ্টির চাহিদা আরো কমে গেলো। আর মেন্ রাস্তার ওপারে কাঁটাপুকুরের দিকেও একই অবস্থা। পুকুর জল জমি বুজিয়ে উঠতে লাগলো একের পর এক বাড়ি। আর আমাদের বাড়ির সামনের বস্তিতেও চালাঘর গুলো ভেঙে উঠতে লাগলো একের পর এক তিন চারতলা বাড়ি।প্রথম আসার পর যে দিগন্ত জোড়া আকাশ দেখা যেত বাড়ির জানলা থেকে, ২০০০ সালের দিকে সেসব প্রায় অনেকটাই ঢেকে গেছে নতুন বহুতল বাড়িতে। বন্ডেল গেট উড়ালপুলের কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের জমি বাড়ির চাহিদা হঠাৎই হু হু করে বেড়ে উঠলো। পাড়ার ভেতরেও তখন নতুন বিল্ডিঙের কাজ শুরু হচ্ছে আর কি। তাছাড়া আমাদের চৌহদ্দির যে দেয়াল, তাকে আবার নতুন করে বানানো হলো, আরও উঁচু করে। আগে যে কোনো দিক থেকেই পাঁচিল ডিঙিয়ে পাড়ায় আসা যেত কিন্তু পাঁচিল উঁচু হওয়ায় টপকানো প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে গেলো। পাড়ায় ঢোকার তখন খালি তিনটে রাস্তা – মেন্ গেট, পালপাড়া আর রাসবাড়ির পেছনদিকটা। আর ক্লাবঘরের পাশের তিনকোনা পার্কটাকে দেয়াল দিয়েএ ঘিরে ফেলা হলো। বাইরের পরিবর্তনের জোয়ার খানিকটা পাড়াকেও যে ছেয়ে ফেলেছিলো তা বলাই বাহুল্য।

আবার যদি রাসমেলার নিরীখে বিচার করি তাহলে দেখা যাবে যে সে সময় রাসমেলার সবচেয়ে পড়তি অবস্থা। রাসমেলার বেশিরভাগ জমিই তখন বিক্রি হয়ে গেছে, এমনকি রাজবাড়ীর খানিকটা অংশও। রাসমেলার সময় ভিড় তেমন আর জমতোনা। কিছু চেনা মুখ প্রতি বছরই ঘুরেফিরে আসতো – জিলিপি গজা ঝুরিভাজাওয়ালা, কার কত জোর মাপার মেশিন নিয়ে আসত এক বুড়ো যাতে ৫০০ টানতে পারলে পয়সা ফেরত, ঘুগনিয়ালা বসত মেলার মুখের দিকটায়, কাঠগোলার পাশে, আর শিবমন্দির পেরিয়ে যাবার পর শুধু বিভিন্ন ধরণের পুতুল খেলনার রকমারি পসরা। জায়গার অভাবে আগের মতো নাগরদোলা, চরকি ইত্যাদি আর বসতনা কিন্তু এরোপ্লেনটা তখনও বসত। কিন্তু রাসমেলা আসছে সেটা তখনও বোঝা যেত যখন দেখতাম মেলা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই বেশ কিছু দোকানি উনুন বাঁধছে, আর রাস্তার ধারে বেশ কিছু আখওয়ালা। সেদিক থেকে দুর্গাপুজো তখনও বেশ রমরমা করেই হচ্ছে। পুজোর সময়কার জমজমাট ভাবটা তখনও অক্ষুন্ন ছিল। প্রত্যেক বছর কোনো না কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে বাগবিতণ্ডা চলতই তবে আগে যেমন কি কি করা হবে না হবে এসব নিয়ে মতানৈক্য হতো, পরের দিকে সেটা গিয়ে দাঁড়ালো কে পুজো করবে তাই নিয়ে। আবাসনের ভেতর বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভাজন আগেও ছিল কিন্তু নিজেদের পারদর্শীতা দেখানোর জন্যে দুর্গাপুজোর মতো সুযোগ আর অন্য কখনও পাওয়া যেতোনা। এ বছর এই দাদারা তো পরের বছর ওই কাকুরা। এভাবেই দুর্গাপুজো চলে আসত বছর বছর। আগেই বাচ্চা ছেলে বলে সবাই দূরে সরিয়ে রাখতো, কিন্তু আঠেরো হবার পর থেকে আমরাও দুর্গাপুজোয় আরো বেশি করে যোগ দিতে লাগলাম। বিশেষ করে চাঁদা তোলা, ঠাকুর আনতে যাওয়া চতুর্থীর রাতে, ঠাকুর ভাসান, প্যান্ডেল পাহারা দেয়া। দুর্গাপুজোর বাজেটে ধীরে ধীরে ভাঁটার টান পড়লেও পুজোর অনুষ্ঠানের সময় তার ঘাটতি খুব বেশিমাত্রায় পড়েনি তখনও। যতদূর মনে পরে এই সময়ই প্রথম শুরু হলো অন্তাক্ষরী নবমীর সন্ধ্যেয়। আর প্রতি বছর আসতো মনীষাদির নাচের ট্রুপ। আর সাবালক হবার পর আমাদের ছাড়পত্র জুটলো দশমীর দিন সিদ্ধি খাবার। আগে কুলফিয়ালার কাছেই মিলতো কিন্তু আমাদের কেউ বিক্রি করতোনা বা আমরাও ধরা পড়ার ভয়ে কিনতে যাইনি। দশমীর সন্ধ্যেবেলা জয়দাদের ব্লকে সিদ্ধি তৈরী হতো। আমাদের ভাগ্যে জুটতো ছিটেফোঁটা, তবু সেটাই যেন ছিল বিরাট প্রাপ্তি, অনেকটা যেন বড়ো হয়ে যাবার স্বীকৃতি।

আমাদের নতুন কোয়ার্টারের সরস্বতী পুজোর ইতিও এই সময়েই। বেশির ভাগ বন্ধুরাই ছিলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে, তাছাড়া তখন কলেজ ইত্যাদি নিয়ে সঙ্গত কারণেই মাতামাতি বেশি ছিল। আর সরস্বতী পুজোটা ছিল অনেকটা আমাদের বয়েসীদের খানিকটা প্রতিবাদী অবস্থান। আমাদের অবর্তমানে আমাদের পরের গ্ৰুপ এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি তখন। তবু শুনেছি দর্পন নাকি কয়েক বছর নিজে খরচ করে সরস্বতী পুজো করেছিল। সে পুজোর নাকি জাঁকজমকই আলাদা ছিল, লোকে নাম দিয়েছিলো দর্পন শেঠের পুজো। সে পুজো চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তবে সরস্বতী পুজো নিয়ে যে আগ্রহ আর তেমন নেই সেটা প্রকটভাবে বোঝা যাচ্ছিলো। আর নতুন কোয়ার্টারের দিকে যেন একটা জেনারেশন গ্যাপ তৈরী হয়েছিল। আমাদের পরের দিকে বলতে গেলে খালি বুড়ো, বাবান, সানি, রুবেন আর বুবলা। মেয়েরাও বলতে গেলে হাতেগোনা, আর সবার নিজের নিজের বাড়ি সরস্বতী পুজো হওয়ায় তারাও তেমন গা করেনি কখনো। ক্লাবের পুজোও সারা হতো নমো নমো করে। পুজো করা শুরু করলো আই/এর বাবাই। আগে কে করতো জানা নেই, সরস্বতী পুজোর সময় আগে কখনো ক্লাবমুখো হইনি।

পুজো বাদ দিয়ে অন্য সময় পাড়া অনেকটাই খালি লাগতো। তবে পরের দিকের অবস্থা ভাবলে মনে হয় তখনও রাস্তায় নামলেই লোকজনের দেখা মিলতো তা সে ভোর ৫টাই হোক কি রাত ১১টা। কেবল টিভি তখনও সব ঘরে পৌঁছয়নি। খেলাধুলোর চল আগের মতো না হলেও যে মরশুমের যা খেলা অন্তত শনি রবিবারে লোকজন মাঠে নেমে পড়তো খেলতে না হয় খেলা দেখতে। আগে আমরা ক্রিকেট খেলতাম এল/এফের সামনের মাঠে। আর ফুটবল হতো এল/জের সামনে। যত বোরো হতে থাকলাম, তখন আর নতুন পুরোনো কোয়ার্টারের বিভাজনটা আর তেমন প্রকট ছিলোনা, ততদিনে সবাই একসাথে খেলতাম। ফুটবল চলে গেলো বড়ো মাঠে, আর ক্রিকেট শুরু হলো নতুন আর পুরোনো বিল্ডিঙের মাঝে রাস্তার ওপর। প্রথমদিকে ওভারহ্যান্ড শুরু হলেও আস্তে আস্তে সবাই রাস্তায় আন্ডারহ্যান্ড ক্রিকেটই খেলতো বেশি। আগের মতো লম্বা টুর্নামেন্ট আর হতোনা। তার এক কারণ বাজেট, আর দুই তখন লোকজনের সারা মরশুম ধরে টুর্নামেন্ট খেলার মানিসিকতা আস্তে আস্তে পাল্টাচ্ছিল। অনেকে খেপ খেলতে যেত ঠিকই কিন্তু জেতার অঙ্ক বেশি না হলে তাগিদ বেশি থাকতোনা। ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধ তখন, যদিও খেলার চল থামেনি সেই হারে। কোয়ার্টারে যারা খেলোয়াড় হিসেবে নাম ছিল, তারা আশেপাশের টুর্নামেন্ট থেকে ডাক পেতে লাগলো। অনেক একদিনের টুর্নামেন্ট চালু হয়ে গেলো আশেপাশে। তপসিয়া,ট্যাংরা,ঘোষপুকুর থেকে শুরু করে সোনারপুর অবধি লোকে যেত খেলতে। ফাইনাল হতো রাতে ফ্লাডলাইটে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ এর দিকে ক্লাবে তাস খেলার চল শুরু হলো পুরোদমে। আগেও তাস খেলা হতো কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে বা নব্বইয়ের শুরুতে আমাদের তাস খেলতে দেয়া হতোনা ক্লাবে। এই সময় সেই চলটা আস্তে আস্তে পাল্টে গেলো। একদিকে আমরা আর তখন বাচ্চা ছিলাম না, আর অন্যদিকে যারা এইসব খেলা না খেলার বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল তারাও তাদের অবস্থান পাল্টাতে খানিকটা বাধ্যই হয়েছিল ক্লাবে বেশি সদস্য আনার জন্যে। আর তাছাড়া দিন বদলানোর সাথে সাথে তাস পাশা সর্বনাশা ইত্যাদি পুরোনো রীতিনীতিগুলো আর তেমন লোকজন মানতোনা।

আমাদের কোয়ার্টারে ঢোকার রাস্তার মুখে হঠাৎ এক-দুটো রিকশা দাঁড়ানো শুরু করলো। এর আগে রিক্সাস্ট্যান্ড ছিল কুষ্টিয়া মোড়ে। সেখান থেকেই লোকে যেত কলোনি বাজার, বন্ডেল বাজার, কেউ কেউ কসবা বাজার। আগেভাগে খদ্দের জোগাড়ের ধান্ধায় প্রথম প্রথম ১-২জন রিকশাওয়ালা আসতো, কিন্তু আস্তে আস্তে বেশিরভাগ লোকই যখন আমাদের গেট থেকে রিক্সা ধরতে লাগলো, রিক্সার সংখ্যাও একে একে বাড়তে লাগলো। আর কুষ্টিয়া পার্ক তখন লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দেয়ায় রিক্সাস্ট্যান্ড সেখান থেকে উঠে রাস্তার উল্টোদিকের টেলিফোন অফিসের পাশের গলিতে চলে গেলো। পিকনিক গার্ডেন রোড ধরে আরো ২তো নতুন বাসরুট চালু হলে গেলো। ৩৯ এ/২ যেত কুষ্টিয়া রোড দিয়ে তপসিয়া হয়ে কলেজ স্ট্রীট হাওড়া। আর দেজ মেডিকেল মিনিবাস রুট দেজ মেডিকেল ছাড়িয়ে বেড়ে দাঁড়ালো ৩৯ বাসস্ট্যান্ড অবধি। ভিআইপি বাজার যেতে হলে এতদিন অটো ছাড়া উপায় ছিলোনা। ৩৯এ/২ চালু হয়ে লোকে তখন বাইপাস অবধি চলে যেতে পারতো সহজে। সল্টলেক রাজারহাট তখনও তেমন রমরমা হয়নি, চালু হয়নি তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে সমৃদ্ধ অফিসকাছারি। সল্টলেকে তখন সরকারি অফিসেই লোকজন যেত বেশি – বিদ্যুৎ ভবন, পূর্ত ভবন, সেচ ভবন এইসব। তবে ইস্টার্ন বাইপাস চালু হয়ে আমাদের সল্টলেক যাওয়া অনেকটাই সোজা হয়ে গেলো। ৩৯এ যেত সল্টলেক সারা দুনিয়া ঘুরে। বাইপাস ধরে রাজ্য সরকারের স্টেট্ বাস চলা শুরুর সাথে সাথে ৩৯এ বাসে চড়ে সল্টলেক যাবার লোকের সংখ্যা প্রায় ছিলোনা বললেই চলে। মাঝখানে খুব সম্ভব বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো ৩৯এ রুট, পরে আবার নতুন করে চালু হয় কয়েক বছর পর। এদিকে পাড়ায় রাজাদা একদিন কিনে ফেললো মিনিবাস। দেজ মেডিকেল রুটের। এতদিন পাড়ায় বাসের মালিক বলতে এক তাতুদা। তাতুদার বাস কিছুদিন চলে তারপর পরে ছিল আই/বির পাশে পুকুরপাড়ে। তারপর খানিক সরে বাস রাখা হলো জলের ট্যাঙ্কের উল্টোদিকে। সেখানেই সেই বাসের সমাধি। কাঠামোটা এখনো ওখানেই পড়ে আছে।

রাজনীতি নিয়ে বিশেষ কিছু লিখবোনা। তবু আঠেরোয় পা দেয়া মানেই ভোট। কপালজোরে তখন আর ব্রজনাথে যেতে হয়না ভোট দিতে,আমাদের ক্লাবঘরেই ভোটের সেন্টার পড়ে। ভোটের আগেই থেকে পাড়া সরগরম হয়ে উঠতো বিভিন্ন সভা সমাবেশে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা দরজায় দরজায় একটা ক্লিষ্ট হাসি হেসে ভোট চাইতেন। অনেকটা হ্যালির ধূমকেতুর মতো তাদের ৫ বছর পরপর দেখা মিলতো। তবে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহের কোনো খামতি ছিলোনা। মনে পড়েনা কখনো ভোট নিয়ে বড় ঝামেলা হতে দেখেছি কোয়ার্টারে। আমাদের ওয়ার্ডে নির্দল হিসেবে দাঁড়াতো একজন তার নাম নেপালি বুড়ো। নেহাত নামেই ফিদা হয়ে ভোট ও দিয়েছিলাম একবার। দেয়াল লিখনের এটাই শেষের দিক। এরপর সব দলই পোস্টার ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়াল লেখা ছেড়ে।

এই প্রসঙ্গটা আগেই উল্লেখ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি বিভিন্ন কারণে, তাই এখানেই বলি। প্রথম যখন আমরা কুষ্টিয়াতে আসি, আমাদের খবরের কাগজ দিতো নারুদা। তার আবার অন্য নাম ছিল শান্তিদা, যে যা ইচ্ছে তাই বলেই ডাকতো। কোয়ার্টারে আহার প্রথম দিকের স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটা যেমন ছিল প্রদীপদার নেট টাঙিয়ে বোলিং প্র্যাক্টিস, তেমন ছিল নারুদার সাইকেল L/A ব্লকের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে খবরের কাগজ বিলি করা। সকালে যারা মর্নিং ওয়াকে বেরোতো তারা খবরের কাগজ হাতে করে নিয়ে যেত নারুদার থেকে। আমাদের যখন কালেভদ্রে কাগজ বা পত্রিকা কেনার ইচ্ছা হতো, নারুদার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। বাড়তি কাগজ থাকলে বাড়িতে দিয়ে যেত। কেন জানিনা খুব মনে হচ্ছে যে প্রথম দিকে নারুদা ছাড়া অন্য একজনও কাগজ বিক্রি করতো, কিন্তু আস্তে আস্তে বেশির ভাগ লোকই নারুদার থেকে কাগজ নেয়া শুরু করায় অন্যজন কাগজ দেয়া বন্ধ করে দেয় পরের দিকে। এই তথ্যটা ভুলও হতে পারে, হলে ত্রুটি সংশোধন করে নেব। তবে নারুদার কাগজ বিলি করা ছিল এক দর্শনীয় ব্যাপার। পুরো চারতলা থেকে একতলা কাগজ দরজায় ঝুলিয়ে কড়া নেড়ে এক ব্লক সারতে নারুদা খুব সম্ভব সময় নিতো ৩০ সেকেন্ড। কারো যদি কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার থাকতো, নারুদাকে সিঁড়িতে ধরা প্রায় অসাধ্যসাধনের সমান। ব্যবসা বাড়ার সাথে সাথে নারুদার এক সাগরেদ জুটলো। তখন দুজন মিলে কাগজ বিলি করতো, যদিও অন্যজন নারুদার চেয়ে অনেক কম বয়েসী, নারুদার স্পীডের কাছে সে ছিল তুচ্ছ। আর সপ্তার পর সপ্তা, মাসের পর মাস যে কাগজ জুটতো বাড়ি বাড়ি, সেগুলো কিনে নিয়ে যেত খবরকাগজওয়ালা। তাদের সাথে দর কষাকষি ছিল আবশ্যিক। প্রথমে তাদের হাঁক মেরে ডাকা হতো দর জানার জন্যে, তারপর বিল্ডিংয়ে ডেকে চলতো আরও দরদাম। যাই হোক, ১৯৯৬ এর প্রসঙ্গে ফেরা যাক। নারুদা ওই সময় থেকে শুরু করে অন্যান্য বিল দেয়া। মানে বাড়ি ভাড়া দেয়া, CESCর বিল এইসব। পারিশ্রমিক নিতো বিল প্রতি ২টাকা। জানিনা সেটা চালু করেছিল ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে না খবরের কাগজ বেঁচে লাভ কমে যাওয়ায়। তবে নারুদার প্ল্যান যে সফল হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য, কোয়ার্টারের অনেকেই ঝামেলা এড়াতে আর সময় বাঁচাতে নারুদাকে দিয়েই বিল জমা করতো।

এই অধ্যায়টা শেষ করবো হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। আগেও যেমন বলেছি দিন পাল্টানোর সাথে সাথে কুষ্টিয়াতে আমরা যারা বড় হয়ে উঠছিলাম, এবার তাদের পালা চলে এলো স্বাবলম্বী হয়ে যাবার। আমাদের কাছাকাছি বয়েসের মানে কয়েক বছরের কমবেশি লোকজন সব তাদের নিজের নিজের সবে শুরু হওয়া জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। অনেকে বেরিয়ে পড়লো কুষ্টিয়ার গন্ডী পেরিয়ে। পড়াশোনা, কাজ, পরিবার। অনেকে আবার ততদিনে নিজেদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই চলে গেলো। সদ্য পাড়া ছাড়া বলে তখনও সবাই পাড়ার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাই মাঝেমাঝেই হাজির হতো রবিবার বা অন্য দিন সন্ধ্যেবেলা। আমরা যারা রয়ে গেলাম কোয়ার্টারে তাদের জীবনে তেমন তারতম্য আসেনি, তবু পরিবর্তনটা বোঝা যেত তখন থেকেই যে কোয়ার্টার লোকজনের মুখগুলো পাল্টে যাচ্ছে। তবে অনেক চেনা মানুষকে যেমন আর দেখা যেতোনা, তেমনি অনেক নতুন মুখ আসতে শুরু হলো কুষ্টিয়ায়। দিব্যেন্দুদা, ডাকুকাকু, আমাদের ব্লকে বুড়িদের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধ দম্পতি, শুভাশিস। এদের অনেকে সাথে সাথে মিশে গেলো আমাদের সাথে, অনেকের লেগে গেলো বহুদিন। তবে হারিয়ে যাবার বৃত্তান্ত শুধু যারা কুষ্টিয়া ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো তারাই নয়। ১৯৯৬র থেকে ২০০০ য়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো বেশ কিছু আবাসিক, আত্মীয়, বন্ধু, পরিজন। অনেকে অকালে, অনেকে বার্ধক্যের কারণে। আলাদা করে কারও নাম করলামনা বাকিদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে। সময়ের চাকা যে থামিয়ে রাখা যায়না সেই উপলব্ধিও সেই একই সময়ে। এই সময় যে মানুষগুলো হারিয়ে গিয়েছে আমাদের জীবন থেকে, এই স্মৃতিচারণ খানিকটা তাদের সময়ের কুষ্টিয়াকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের এক আপাত-নিষ্ফল প্রচেষ্টা।

(চলবে )
Advertisements
Standard
Bengal, calcutta, memories, Nostalgia

কুষ্টিয়ার কড়চা : প্রথম পর্ব ১৯৮৫-১৯৯২

(যাঁরা ধৈর্য ধরে পুরো লেখাটা পড়বেন তাঁদের জানাই যে এখানে উল্লিখিত তথ্য প্রায় ২০-৩০ বছর আগের আর পুরোটাই স্মৃতিনির্ভর। হয়তো কিছু বিবরণের সময়সীমা ভুল হয়ে গেছে। সঠিক সময় / বিবরণ যদি দয়া করে জানান তাহলে সংশোধন করে নেব। আর এখানে পরিবেশিত ঘটনাগুলো যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভুলক্রমে কারও ভাবানুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।)

আমার বরাবরের ইচ্ছে ছিল কলকাতার স্মৃতিগুলো নিয়ে কিছু লেখার। তাই আগের লেখাগুলো পড়ে যখন রাজা বলল কুষ্টিয়া নিয়ে কিছু লিখতে, তখন ভাবলাম নয় কেন? তবে ফরমায়েশ মত ছোটবেলার বদমায়শিগুলোর বয়ান এ যাত্রা লিখলাম না, সেটা লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে আর জানিনা কে বা কারা পড়বে এই লেখা তারপর কার কি গোপন কথা ফাঁস করে দেব। তবে সময়মত লিখব তা নিয়েও কিন্তু রেখেঢেকে। এখনো যারা ভাবছে কুষ্টিয়াটা কি তাদের জন্য বলি কুষ্টিয়া হাউজিং তিলজলার এক সরকারি আবাসন যেখানে আমার জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময় কেটেছে। কুষ্টিয়াতে কাটানো পঁচিশ বছর আশির দশক থেকে শুরু করে মিলেনিয়াম ছাড়িয়ে একুশ শতকের কলকাতার বদলানো সময়ের প্রতিচ্ছবি। প্রথম দিকের সেই দিনগুলোর সাথে সাম্প্রতিক কালের ছবিগুলো মেলানোর চেষ্টা করলে দেখতে পাই যে মানুষের জীবন কী পরিমান বদলেছে এই পঁচিশ বছরে। এখানে সেই পুরো সময়টার মানচিত্রই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম যাতে এই ঘটনা বা স্মৃতিগুলোর সাথে যারা সম্পর্ক খুঁজে পায় তাদেরকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই পুরনো সময়ের নস্টালজিয়ায় হাবুডুবু খাইয়ে আনা যায়।

কুষ্টিয়ার পুরো ইতিহাস আমার জানা নেই। দেশভাগের পর কলকাতা যখন নাগরিকদের থাকার জায়গা যোগাতে নাজেহাল ঠিক সেই সময় সরকারি প্রচেষ্টায় কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে তখনকার সময়ের শহরতলিতে তৈরী করা হয় বহু চারতলা ফ্ল্যাট, বাসস্থানের স্বল্পতম চাহিদাটুকু মেটানোর জন্যে। Lower Income Group বা LIG নামের এই ফ্ল্যাটগুলো সাধারণত বরাদ্দ করা হয় সরকারের হাউজিং বিভাগে আবেদনের ক্রমানুসারে। কুষ্টিয়া এরকমই এক LIG ফ্ল্যাটবাড়ির কলোনি, পূর্ব কলকাতায় তিলজলা এলাকায়। ষোলটা ফ্ল্যাটবাড়িতে ৩১৬টা ফ্ল্যাট এই ছিল কুষ্টিয়ার সমষ্টি। ১৬টার মধ্যে ১২টা তৈরী হয় সত্তর দশকের শেষের দিকে আর আবাসিকরা আসা শুরু করে খুব সম্ভব ১৯৭৭ সালে। বাকি চারটে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরী হয় পরে, খুব সম্ভব সেখানে লোকে থাকা শুরু করে আশির দশকের গোড়ায়। এই নতুন আর পুরনো কোয়ার্টারদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ রেষারেষি প্রথম থেকেই ছিল, সেটা এখনো চলে আসছে তবে সদ্য তৈরী ফ্ল্যাটে সাত বছর আগে পরের মধ্যে যা তফাত সেটা তিরিশ বছর পর আর তেমন প্রকট নয়, তবে সে প্রসঙ্গে পরে আসব। পূর্ব কলকাতা তখন জলাজমিতে ভর্তি, বালিগঞ্জের সমৃদ্ধ এলাকার প্রান্তে শিয়ালদা সাউথ সেকশনের রেললাইন পেরিয়ে এঁদো রাস্তার দুপাশে খাটাল মাঠ ঘাট পেরিয়ে খোঁজ পাওয়া যাবে কুষ্টিয়ার। অনুমান করা যায় প্রথম দিকে আসা আবাসিকদের কথা, হঠাৎ এই জনমানুষহীন প্রান্তরে গড়ে ওঠা সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে আসা কম কথা নয়। চারপাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা নতুন তৈরী বহুতল বাড়িতে কুষ্টিয়া চারপাশের পরিবেশের মাঝে মরুদ্যানের মত ছিল। কুষ্টিয়া তৈরী হয় কলকাতার বাড়ন্ত বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে, এখানকার বেশিরভাগ আবাসিক ছিল সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর আর প্রতি ব্লকে ১ নম্বর ফ্ল্যাট বরাদ্দ ছিল ভিআইপি লোকদের জন্যে, তাই আবাসনে মন্ত্রী আমলা অফিসার কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের বড় সমাবেশ ছিল।

তারিখটা ঠিকঠিক মনে নেই তবে খুব সম্ভব ১৯৮৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী আমরা প্রথম এলাম কুষ্টিয়ায় যখন বাবা কলকাতায় বদলি হলো কৃষ্ণনগর থেকে। বাবা আগে আসবাবপত্র সব এনে রেখেছিল, আমি আর মা এলাম মামার বাড়ি থেকে, সময়টাও মনে আছে, বিকেল বেলা। আমার বয়েস তখন সাড়ে ছয়। কুষ্টিয়ার সেই প্রথম ছবিগুলো মনের মধ্যে এখনো গেঁথে আছে যা হয়ত কখনও ভুলবনা। গাড়ি তখন খুব কমই আসতো তবে কোয়ার্টারের মেন গেট ছিল পেছনের দিকে, কুষ্টিয়া রোড দিয়ে ঘুরে ঘুরে আসতে হতো। সেই রাস্তার ডানদিকে পুরনো কোয়ার্টার আর বাঁদিকে বড় মাঠ, ক্লাব ঘর আর মাঠ পেরিয়ে চারখানা নুতন কোয়ার্টার। গাড়ি ঢোকার জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলেও বাসরাস্তা থেকে আসা ছিল খুব সোজা। কুষ্টিয়া বাসস্টপ থেকে মেন রাস্তা ধরে একটু পিছনে হেঁটে এসে ছোট গেট যা আসলে দুটো ইঁটের দেয়াল। সেই ছোট গেটের পাশে PWD কোয়ার্টারের মেন্টেনেন্সের জন্য সেখানে এক কেয়ারটেকার ছিল, আর ছিল যত যন্ত্রপাতি, মায় একটা রোডরোলার অবধি। ছোট গেট থেকে ইঁটের ফুটপাথ বাঁদিকে দেয়াল তারপর রায়বস্তি আর ডানদিকে ছিল দুটো ডোবা। সেই ফুটপাথ বাঁদিকে বেঁকে ক্লাবঘরের সামনে দিয়ে পুরনো কোয়ার্টারের দিকে চলে গেছে, আর নতুনের দিকে একটা পায়ে চলা রাস্তা ঘাস ভরা মাঠের মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে মেন রাস্তা কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে যেখানে দুভাগে ভাগ হয়ে একটা পুরনো আর একটা নতুন বিল্ডিংয়ের দিকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পুরনো বিল্ডিংগুলোর দিকে দেখলে ডানদিকে এল আর বাম দিকে আই নাম্বারের ব্লক। নতুন গুলো সবই এল নাম্বার, আমরা এলাম এলজি তে, নতুন বাড়িগুলোর মধ্যে একদম প্রান্তে। আমরা যখন এলাম এলজিতে একতলায় মিলিটারী দাদু, রিজুরা, দাসকাকু আর জয়জয়ন্তী দোতলায় বুড়িরা, টাবু পিসি, হাজরাদাদু আর চক্রবর্তীরা, তিনতলায় আমরা গাঙ্গুলি জেঠুরা মিষ্টুরা আর পাল জেঠু চারতলায় পুনাম, মামনদিরা রিনিদিরা আর মানসকাকুরা। আমাদের বিল্ডিংয়ের পর পাঁচিল সেখানে দুধের ডিপো আর মাছ বিক্রির বাক্স। রোজ সকালে এই জায়গা ঘিরে ব্যাপক ব্যস্ততা, হরিণঘাটার দুধের গাড়ি এসে থামল কি সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল লাইনে হাতে তিন রঙয়ের কার্ড তিন রকম দুধের জন্যে। পাশে মাছের বাক্সে একজন মাছ বিক্রি করত বিভিন্ন রকম, সেটা সরকারি স্কিমে কিনা জানা নেই। ছোট গেটের পাশে পুকুরপাড়ে গোটা আবাসনের সব জঞ্জাল ফেলা হত। পুকুর দুটো ভরাট করে নতুন বাড়ি তৈরিই ছিল সরকারের মূল উদ্দেশ্য। গোটা কোয়ার্টারের ভেতরটা তখন বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলেও গেট দিয়ে ঢুকেই সেই নারকীয় দৃশ্য হয়তো এড়ানো যেত কিন্তু কর্তৃপক্ষ তেমন মাথা ঘামায়নি তা নিয়ে। ফ্ল্যাটের ভেতর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি প্রথম থেকে এখন অবধি খালি রান্নাঘরে ছাড়া। রান্নাঘরে লম্বালম্বি ছিল একটা সিমেন্টের রান্না করার জায়গা, যার নিচে গ্যাস সিলিন্ডার রাখারও ব্যবস্থা ছিল। সেই টেবিলের পর বাসন মাজার জায়গা আর অন্য কোণে ছিল একটা কংক্রিটের উনুন যেটার চুল্লি উনুন থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ির দেয়ালে পাইপ দিয়ে ছাদের ওপরে অবধি যেত। আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার ছিল ভেতরের ঘর আর বাইরের ঘরের মধ্যের করিডোরের ওপর জিনিসপত্র রাখার জায়গা।

৮৫তে যখন এলাম কোয়ার্টারের বাইরের পরিবেশটাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট গেট দিয়ে মেন রাস্তায় পড়লে রাস্তার উল্টোদিকে কুমারের সিগারেটের দোকান তার পাশে দাদুর দোকান। কুমারের দোকান থেকে বাসস্ট্যান্ড অবধি তখন ছিল সুনীলদার মুদির দোকান আর সুবীরদার মিষ্টির দোকান, মাঝখানে কাঁটাপুকুর যাবার রাস্তা। তারপর ছোটুদের লোহার দোকান আর তার পাশে চুল কাটার সেলুন, নামে উত্তম সেলুন হলেও চুল কাটত দুই ভাই, তাদের কারো নামই উত্তম ছিলনা। বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে টেলিফোনের বড় বাড়ি। আর রাস্তার উল্টোদিকে তখন কিছুই ছিলনা। কুষ্টিয়া মোড়ে খালি একটা বাঁশ বাখারী বিক্রির দোকান ছিল। আর তার পাশে ছোলা মুড়ি বাদাম ভাজার দোকান। আমাদের এলজি ব্লকের পেছন দিকে ছিল খাটাল। তিনতলার দক্ষিনমুখী বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যেত খাটাল বড় রাস্তা কাঁটাপুকুর ছাড়িয়ে আরো অনেক দূর। বিজন সেতু আর টালিগঞ্জের টিভি টাওয়ার। ছোট গেটের ডানদিকে দুটো মুদির দোকান আর একটা তেলেভাজার দোকান তারপর দেখা যেত ঢাউস রায়বাড়ি তাদের বিরাট বড় বাগান, রাস্তা থেকে লোহার প্যাটার্নের রেলিং। রাস্তার উল্টোদিকে দাদুর বিড়ির দোকান পেরিয়ে কয়লার গোলা আর গুটুর চায়ের দোকান অশ্বত্থ গাছের গায়ে। তারপর ছিল খালি জমি সবই রায়দের। পাঁচিল ঘোরা সেই জমিতে তাল তাল গোবর জমা করত লোকে খাটাল থেকে তারপর সেগুলো দিয়ে ঘুঁটে তৈরি হতো। অন্যদিকে বড় গেটের বাইরে ছিল ডাক্তারবাড়ি আর থাকত টুয়ারা। টুয়াদের বাড়ির পাশে একটা চারতলা বাড়ি তৈরী হতে হতেও হয়নি খালি বাড়ির খাঁচাটা খাড়া হয়ে ছিল বছরের পর বছর। বড় মাঠের কোনে ছিল অমলদাদের কলোনি। এইসবের বাইরে তখন ছিল শুধু ডোবা পুকুর আর বাঁশবাগান। ৩৯ আর ৪২এ বাস চলে যেত পিকনিক গার্ডেনের দিকে, আর ছিল পিকনিক গার্ডেন হাওড়া মিনি। যাতায়াতের এই সম্বল। আর হ্যাঁ আর একটা ব্যাপারও চোখে পড়ত তখন যে পাড়ার বাইরে বেরোলেই দুদিকে কাঁচা নর্দমা। আশেপাশে যত খাটাল ছিল তাদের আবর্জনা এসে পড়ত এই ড্রেনগুলোয়। আর সকাল বেলায় দেখা যেত সারি সারি বাচ্চারা এই ড্রেনের ধারে বসে সকালের কাজ সারছে ছোট বড় দুরকম বাইরেই। খানিক বৃষ্টি হলেই গরু মোষ মানুষের গু ভর্তি নর্দমা উপচে পড়ত বড় রাস্তায় যার থেকে কোনো নিস্তার ছিলনা। বাতাসে ভেসে আসত চার নম্বর ব্রিজের নিচের ট্যানারীর পচা গন্ধ আর ক্যালকাটা কেমিকেলের রাসায়নিকের গন্ধ — ফিনাইল, সাবান। সকাল দুপুর রাতে শিফট বদলের সময় ভোঁ বাজত, তখন আর ঘড়ি লাগতনা কটা বাজল জানতে। চারিদিক এতো নিরিবিলি ছিল যে বন্ডেল গেটের ট্রেন যাবার শব্দও শোনা যেত। আর একটা ব্যাপার না বললে তখনকার সময়ে আমাদের এলাকার নামডাক কেমন ছিল সেটা বোঝানো যাবেনা। কোনো জায়গা থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ফিরতে হলে কুষ্টিয়া বললে ড্রাইভাররা চিনতনা কিন্তু তিলজলা বললেই বেশীরভাগ ড্রাইভার তেল নেই, বাড়ি যাচ্ছি এই জাতীয় অজুহাত দেখিয়ে ভেগে পড়ত। হাতে গোনা সৎ কিছু ড্রাইভার স্বীকার করত এদিকে আসবেনা গোলমেলে এলাকা বলে।

তখনকার কুষ্টিয়ায় বিকেলের দিকে সারা পাড়াটা ভরে যেত বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েতে। নতুন কোয়ার্টারের ছেলেরা খেলত চারটে বাড়ির মাঝে। ক্রিকেট হত এল/এফ আর এল/জের মাঝে কিম্বা এল/জের সামনের দিকে। ফুটবল খেলা হত এল/জের সামনের মাঠে কিম্বা এল/জি আর এল/এইচের মাঝে। বড়রা ফুটবল ক্রিকেট খেলত মাঝের বড় মাঠে। পুরনো কোয়ার্টারের ছেলেরা খেলত আই/এর সামনের তেকোনা মাঠে। আমি নিচে নামতামনা তেমন কিন্তু রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখতাম সবকিছু। মেয়েরা খেলতে নামত অন্যান্য মেয়েদের সাথে। সেরকমই দেখতে পেতাম পাড়ার কাকীমা জেঠিমারাও নিচে নামত গল্প করতে, হাঁটতে। সব মিলিয়ে তখনকার কুষ্টিয়ায় এক দারুন প্রাণবন্ততা ছিল। রবিবার হলেই দলে দলে বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েরা আসতো আমাদের ব্লকের একতলায় জয়জয়ন্তীতে গানবাজনা শিখতে। গীটার, তবলা, সেটার, তানপুরা, সরোদ, গানের রেয়াজ সারাটা দিন মুখর হয়ে থাকত। তারপর ১০টা -১১টার দিকে খেলাধুলো শুরু হতো, ১ টায় সব বাড়ি। এখন ফিরে দেখলে মনে হয় যে তখন শুধুমাত্র আমাদের বয়েসের বা একটু বেশি বয়েসের ছেলেমেয়েরা যে পাড়ায় বেরোত তা নয়, আমাদের বাবা-মা বা তাদের কাছাকাছি বয়েসের মানুষটাও তখন অনেক তরুণ ছিল, তাই পাড়াটাও তখন অন্তত ছুটির দিনে গমগম করত। ৮৫-৮৬য়ের দিকে তারপর শুরু হলো কিশোর বাহিনী, তাতে খানিকটা স্বেচ্ছায় খানিকটা চাপে পড়েই ভর্তি হয়ে গেল কোয়ার্টারের বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীরা। তাদের কুচকাওয়াজ ইত্যাদিতে বিকেলবেলাটা বেশ সরগরম হয়ে থাকত। তাছাড়া চলতেই থাকত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্পোর্টস ইত্যাদি। শীত বসন্তের সময়টায় প্রথমে শুরু হত বসে আঁকো প্রতিযোগিতা তাতে সারা দিন ধরে সব বয়েসের ছেলেমেয়েরা যোগ দিত। তার কয়েক সপ্তা পর হত স্পোর্টস। আগের দিন সারাদিন ধরে চুন দিয়ে লাইন টানা, বিরাট বড় স্পোর্টস জাজদের ক্যাম্প, চোঙ লাগানো মাইক সবই থাকত। সকাল থেকেই মাইকে অ্যানাউন্স শুরু হয়ে যেত “যে সব প্রতিযোগী এখনো চেস্ট নাম্বার নেয়নি তাদেরকে অনুরোধ করা হচ্ছে যেন এখান থেকে নাম্বার নিয়ে যায়” অথবা “অমুক ইভেন্টে এখনো নাম নেয়া হচ্ছে” ইত্যাদি। সারাদিন বিভিন্ন রকমের প্রতিযোগিতার পর স্পোর্টস শেষ হত মহিলাদের মিউজিক্যাল চেয়ার আর পুরুষদের হাঁড়িভাঙা দিয়ে। তারপর সন্ধ্যাবেলা শুরু হত Go As You Like বা যেমন খুশি তেমন সাজো। নতুন বনাম পুরনো কোয়ার্টার কে কত বিভাগে জিতলো তার তেমন রেশারেশি ছিলনা কিন্তু এল বনাম আই একটা তুলনা সব সময় চলত। স্পোর্টস ছাড়াও বছর জুড়ে লেগে থাকত ফুটবল টুর্নামেন্ট ছোটদের বড়দের, তারপর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ফুটবল লীগ বিভিন্ন পাড়ায় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এছাড়া চলত ভলিবল ব্যাডমিন্টন তাস ক্যারম দাবা একটা না একটা কিছু। আর ছিল রাজনীতি। তখনকার দিনে পাড়ায় রাজনীতি বলতে সিপিএম, দু চারজন অন্যান্য বামপন্থী দলের সমর্থক থাকলেও খুব কম। বিপক্ষে কংগ্রেস সমর্থক ছিল হাতে গোনা। মাসে অন্তত একদিন কোনো না কোনো মিটিং মিছিল লেগেই থাকত তার বেশির ভাগই লাল ঝান্ডা কাঁধে নিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলতে বলতে কোয়ার্টারে চক্কর মেরে চলে যেত মেন গেট দিয়ে বাইরে। ভোটের দিন সাজসাজ ব্যাপার কিন্তু প্রথমের দিকে ভোটের সিট পড়ত ব্রজনাথে পরের দিকে কোয়ার্টারে ক্লাবঘরে ভোট নেয়া শুরু হয়ে অনেকেরই সুবিধা হয়েছিল।

আর একটা ব্যাপার যেটা না বললে আমাদের আশেপাশের পরিবর্তনটাকে বলে বোঝানো যাবেনা সেটা হলো রাসমেলা। আমাদের পাশের রায়বাড়ি খুব সম্ভব বৈষ্ণব, তারা প্রতি বছর রাসমেলার আয়োজন করত রাস পূর্নিমার সময়। এমনিতে এক সপ্তাহের জন্য চলত মেলা কিন্তু প্রথম যে বছর এলাম মেলা দেখে তাক লেগে গিয়েছিল। রায়বাড়ির জমিজায়গা তখন বেচাকেনা শুরু হয়নি, তাই বাড়ির পুরো চৌহদ্দিটাই মেলার দোকান পাটে ভরে যেত। আমাদের কুষ্টিয়া বাসস্টপ থেকে শুরু করে মেলার দোকান ছড়িয়ে থাকত প্রায় বন্ডেল গেট অবধি। রায়বাড়ির ভেতরে সাজানো হত রাধা কৃষ্ণের মূর্তি আর বিভিন্ন মডেল অনেকটা ঝুলন যাত্রার মত। বাড়ির বাইরে সামনের মাঠে বসত রাশি রাশি দোকান আর কোনে যাত্রার তাঁবু। রাস্তার উল্টোদিকের জমিগুলো বছরের বাকি সময় পাঁচিলে ঘেরা থাকত গরু মোষ চড়ানোর জন্যে কিন্তু রাসমেলার সময় সেই পাঁচিল ভেঙ্গে বসত বিভিন্ন দোকান আর নাগরদোলা। রাসমেলা শুরু প্রথম চারদিন রাত ১০টার দিকে পোড়ানো হত বিচিত্র সব বাজি বেশির ভাগই আলোর বাজি এখনকার দিনের মত, শব্দবাজি ছিলনা বললেই চলে। তখনকার দিনে ওই বাজি যোগাড় করতে কত যে খরচ হত কে জানে। তবে আমরা বাড়ির জানলা দিয়ে পুরো সময়টা দারুন এনজয় করতাম। শেষের দিনে স্পেশাল থাকত গাছবাজি। সেই আশির মাঝামাঝি রাসমেলার কাছাকাছি সময়ে প্রথম যেটা চোখে পড়ত সেটা হলো রাশি রাশি আখ। আর প্রচুর দোকান খালি জিলিপি নিমকি কাঠি আর বাদামভাজার। সেই তখন থেকে পরের ২৫ বছরে রাসমেলা কিভাবে পাল্টেছে তার বর্ণনা পরে করব।

আমার সেই প্রথম কয়েক বছর কুষ্টিয়ার স্মৃতিতে পুজোর সময়গুলো তেমন মনে নেই ভালো করে। বর্ষার মাঝামাঝি একটা পুজো কমিটি বসত তাতে সবাই ঠিক করত কি কি করা হবে, কত চাঁদা নেয়া হবে ইত্যাদি। পাড়ার দুর্গাপুজো তখন নমো নমো করেই সারা হত। বিজ্ঞাপন তেমন কিছু আসতনা, বাজেটও ছিল সীমিত। ক্লাবের চাতালটা জুড়ে প্যান্ডেল করা হত প্রতিমা আসতো বাড়ির কাছাকাছি কোথাও থেকে, আলো মাইক সাপ্লাই দিত পাড়ার সাপ্লায়ার তাতে নীল সবুজ টিউবলাইট আর হলুদ রঙের বাল্বের চেন আর গোটাকয় হ্যালোজেন এই সম্বল। পুজোর কয়দিন আগে বিলি করা হতো পুজোর ম্যাগাজিন যেখানে থাকত সম্পাদকীয়, পুজো নির্ঘন্ট আর বাঁধাধরা গোটাকয় বিজ্ঞাপন। কিন্তু পুজোটা সেই সময় উপভোগ করত সবাই, পুজোর জন্যে নাটকের মহড়া চালু হত কয়েক মাস বাকি থাকতেই। ক্লাবঘরের পাশে তালগাছে চোঙা বেঁধে চলত গান, পুজোর নির্ঘন্ট বলা। সেই প্রথম আসা থেকেই শুনে আসছি শিবদার গলা, এই এতো বছর ধরে এতো পরিবর্তনের মাঝে শিবদার অ্যানাউন্সমেন্ট পাল্টায়নি কখনও। বড় রাস্তার দিকে পুকুরপাড়টা ঘিরে দেয়া হত কাপড় দিয়ে যাতে জঞ্জাল দেখা না যায়। সন্ধ্যেবেলা পাড়ার প্রায় সব লোকই নামত নিচে, বিচিত্রানুষ্ঠান হাতে গোনা হলেও বেশ আকর্ষক ছিল। লক্ষ্মীপুজো ক্লাবে হত বলে মনে পড়েনা হলেও একদমই বিনা আড়ম্বরে। কালী পুজোর বাজেটও হাতে গোনা, তবে কালী পুজোর তখনকার আসল আকর্ষণ ছিল বাজি, কার বোমের শব্দ কত বেশি। আলু বোম চকলেট বোম বেচা দোদমা ধানী পটকা কালী পটকা কত রকমের পটকা যে ছিল তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের লোকাল বিখ্যাত বোম ছিল বেচা, যেটা বিক্রি করত বেচাদা, ব্রজনাথের দিকে কোনো এক গলিতে। তার আওয়াজ বুড়িমার ব্র্যান্ডেড বোমের আওয়াজকে আরামসে টেক্কা দিয়ে দিত। কেউ কেউ বাজি বানাত বাড়িতেই। আর অনেকে যেত নুঙ্গিতে কম দামে নিত্যনতুন বাজি জোগাড় করতে। প্রায় সব বাড়িতেই চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হত আর যারা ইলেকট্রিক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালবাসত তারা জ্বালাত নিজেদের বানাত টুনি লাইটের চেন। কালী পুজোর পর লম্বা অপেক্ষা নতুন ক্লাসে উঠে সরস্বতী পুজোর। ক্লাবে একটা পুজো হত ঠিকই কিন্তু আরো বেশ কয়েকটা সরস্বতী পুজো হত একটা আমাদের নতুন কোয়ার্টারে, পুরনো কোয়ার্টারে আরো তিন চারটে। পুজোর দিন লোকজন তাদের নিজেদের ব্লকের পাশের পুজোতেই যোগ দিত বেশি, সেই নিয়ে ক্লাবের লোকজনের সাথে পরের দিকে কম গন্ডগোল হয়নি।

প্রথম তিন বছরে কুষ্টিয়ার স্মৃতি তেমন নেই বললেই চলে। এই কয় বছর আমি একদম ঘরকুনো হয়ে ছিলাম, স্কুল বাড়ি আর আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ছাড়া তেমন কারো সাথেই মিশতাম না। কিছু কিছু ঘটনা মনে আছে এই সময়ের যেমন একদিন বাড়ি ফিরছি বাড়ির সামনে সবাই ক্রিকেট খেলছে দর্পণ আমায় খেলতে ডাকলো, হাতে ব্যাট ধরিয়ে। ছটা বল খেলে তিনবার বোল্ড হয়ে খেলবনা বলে বাড়ি চলে গেলাম। ৮৫-৮৬ সালের দিকে নতুন কোয়ার্টারের দিকে গাছ গাছালি লাগানো শুরু হয়, প্রধানত হাজরা দাদুর উদ্যোগে। ছোট ছোট গাছ লাগিয়ে তাদের বাড়ার অপেক্ষা, প্রথমে কঞ্চি বা বাখারির বেড়া তারপর গাছ বড় হলে ইঁটের ঘেরাটোপ। সকালে বাবা সাইকেল চালাতে দিত, সেই সাইকেল চালানোর সুত্রে আর বাড়ি ভাড়া জমা দেয়ার জন্যে যেতাম পুরনো কোয়ার্টারের দিকে, তখন পাম্পঘর তৈরী হয়নি, বাড়িতে জল আসে মেরিনদের ফ্ল্যাটের সামনের জলের ট্যাঙ্ক থেকে। ১৯৮৬ সালে কুষ্টিয়া হাউজিং নাম পাল্টে হলো অবন্তিকা আবাসন, ক্লাবঘরের দেয়ালের পাশে এক চিলতে টিনের ফলক, তার উদ্বোধন করে গেলেন খুব সম্ভব প্রশান্ত সুর, তখনকার এমপি। আর একটা ঘটনা আবছা মনে আছে ক্লাবের চত্বরে একটা তথ্যচিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল ড্রাগের কুফল নিয়ে। একজন মাইমও অভিনয় করেছিল সেই সাথে। মূকাভিনয়ের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা। ৮৬তে চালু হল ৩৯এ বাস সল্টলেক অবধি। বাবা সাইকেল ছেড়ে সেই বাসে অফিস যাওয়া শুরু করল বিদ্যুৎ ভবনে। উত্তম সেলুনে নতুন মালিক এলো তার নাম সত্যিসত্যিই উত্তমদা।

প্রথম কয়েক বছরে কুষ্টিয়া কেমন দেখতে ছিল সেই বর্ণনার থেকে সরে এসে যদি দেখা যায় দিনকালের সাথে আমাদের কোয়ার্টার কেমন আর কতখানি বদলেছে, সেই তুলনার জন্য পরের কুড়ি বছরকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে নিলাম। এতে বিভিন্ন ঘটনা গুলোর ঠিকঠাক সন তারিখ না দিয়েও একটা ধারনা দেয়া যায় কোন বছরে সেটা ঘটেছিল।পরবর্তী অংশগুলোতে সেই ভাগগুলোরই বিবরণ রইলো।

কুষ্টিয়ায় তোলা এটাই আমার প্রথম ছবি। সাল খুব সম্ভব ১৯৮৬। পেছনে এল/জি ব্লক আর দুই ব্লকের মাঝের সেপটিক ট্যাঙ্ক। ছবি তোলার জন্য আদর্শ প্রেক্ষাপট।

১৯৮৮-১৯৯২

এই বছরগুলোয় প্রথম পাড়ায় বন্ধুত্ব পাতানো শুরু করি। বিকেলের দিকে নিচটা এত লোকের এত রকমের কার্যকলাপে গমগম করত যে ভয় পেতাম কাউকে চিনিনা কি করব নিচে গিয়ে। প্রথম বন্ধুত্ব হয় বুল্টুর সাথে, কমিকস আদান প্রদানের মাধ্যমে। তার আগে বাড়ির জানলায় বসে বসে ববিদা টিঙ্কু ভাস্করের সাথে আলাপ হয়েছে কিন্তু ওই অবধিই। আর ব্রজনাথে পড়ার সুত্রে চিনতাম ছোট রাজাকে। ও আসত ওর মার সাথে আমাদের বাড়ি, আমার পছন্দের তোতনের জায়গায় নাড়ু ডাকনামটা পাড়ায় ছড়ানোর দায় ছোট রাজারই। প্রথম প্রথম পাড়ায় নেমে কি করব বুঝে পেতাম না, বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন বয়েসের ছেলেমেয়েরা খেলছে, ঠিক কাদের সাথে ভিড়ব কোনো ধারনাই ছিলনা। শেষে গিয়ে জুটলাম পাকা রাস্তায় ক্রিকেট খেলা বাবুনদা, বাবলাদা, শোভনদা এদের দলে, উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতাম বল কুড়িয়ে এনে দেব বলে। তারপর কয়েকদিন খেললাম আমাদের ওপরের গ্রুপটায় পান্টুদা টুটুনদা এদের সাথে ক্রিকেট খেলে। তারপর আস্তে আস্তে আলাপ হলো আমাদের বয়েসী ছেলেদের সাথে, তখন আমাদের গ্রুপটা ছিল অনেক বড়, তাই খেলার সময় বেশির ভাগ সময় কাটত পাশে বসে। আমিও তাতে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করে খেলা দেখতে আর শিখতে লাগলাম। তারপর কিছুদিন বাদে এক্সট্রা গোলকীপার, বা ৫ মিনিট ব্যাকে খেলা এভাবেই খেলাধুলো আর তার সাথে পাড়ার বন্ধুরা দুটোর সাথেই পরিচয় হলো। সেই সময় খেলার জন্যে প্রচুর ভিড় হত, আগে আগে নেমে মাঠে না দাঁড়ালে টিমে ঠাঁই পাওয়া মুশকিল। আমাদের ব্লকে তখন খালি আমি, বাবাইদের ব্লকে বাবাই লম্বা বুম্বা তোতন, বুল্টুদের ব্লকে বুল্টু ববিদা টিঙ্কু টুনাদা ভাস্কর আর ডাকুদের ব্লকে দর্পণ চন্দন পিম্পু রাজা ডাকু বাপ্পা সোনাদা অভি। বাইরে থেকে আসত টুয়া, আর রাজু খেলতে আসত আমাদের সাথে যদিও ও থাকত পুরনো কোয়ার্টারে। ৮৮তে মনে আছে বিরাট বড় করে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হলো। প্রতি রবিবার করে বিভিন্ন দলের ম্যাচ, একটা বড়দের একটা ছোটদের টুর্নামেন্ট। বোধহয় সেই প্রথম পুরনো কোয়ার্টারে আমাদের বয়েসী ছেলেদের নাম জানতে পারলাম – ছোট পাপ্পু, বড় পাপ্পু, নিপু, ছুটকি, রাজা সেন, বুম্বা, ট্যারা বাবাই, মেরিন, খোকন। বড়দের টুর্নামেন্টে তখন প্রচুর রেষারেষি। একটা ম্যাচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছি তাতুদা আর দেবুদার খুব ঝগড়া লাগলো, তাতুদা কি একটা ফোড়ন কেটেছিল দেবুদা বলে দুম করে এক লাথি মারলো দুটো বাচ্ছা মেয়ে খেলা দেখছিল ঠিক তাদের দুটো মাথার মাঝখানে বল লাগলো, দুজন দুদিকে ছিটকে পড়ে গেল। ঝগড়া ওখানেই শেষ। আর একবার মনে পড়ে স্পোর্টসের দিনে শেষ বড় ইভেন্ট শটপুট আমরা বলতাম বাংলা গোলা। লাইন কেটে লোকজনকে তার ভেতরে না আসতে বললেও লোকজনের প্রচুর উৎসাহ, মাথাটা একটু বাড়িয়ে যদি একটু বেশি দেখা যায়। দীপদা ছুঁড়লো বলটা, সেটা গিয়ে পড়ল একটা অতি উৎসাহী লোকের ঘাড়ে। সে সেখানেই অজ্ঞান, তারপর হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স অনেক কিছু অবধি গড়ালো।

কুষ্টিয়ায় তখন খেলাপ্রেমী মানুষের সংখ্যা আর উদ্যোগ কোনটারই কমতি ছিলনা। ফুটবল ছাড়াও ক্রিকেটের মরসুমে প্রথম থেকে শুরু হত পিচ রোল করা, ক্রিজ বানানো তারপর শুরু হত প্র্যাকটিস। আর মনে পড়ে শীতের শুরু থেকেই নেট টাঙিয়ে বোলিং প্র্যাকটিস করত প্রদীপদা (নামটা ঠিকই লিখলাম মনে হয়), তা সে যতই শীত পড়ুক বা যতই কুয়াশা থাকুক। বাঁহাতে বোলিং করলেও আমরা বলতাম আড়ালে আড়ালে কপিলদেব। তখন অতশত খতিয়ে না ভাবলেও অধ্যবসায় শব্দটার মানে এখনও সেই কপিলদেবের সকল পাঁচটা থেকে এক নাগাড়ে বল করে যাওয়ার ছবি। ৮৮র দিকে ক্লাবঘরের চালচিত্রটাও বেশ বদলে গেল। ভাবতাম ক্লাবঘর মানেই বড়দের জায়গা আমাদের যাওয়া বারণ। কিন্তু সেই সময় ক্লাবঘরের খোলনলচে পাল্টে গেল। ছোটদের খেলাধুলায় উৎসাহ যোগানোর জন্যে সবাইকে ক্লাবের মেম্বার করে নেয়া হলো, ইচ্ছা অনিচ্ছার ধার না ধরেই। চাঁদা মাসে ২ টাকা। আমাদের বয়েসীদের খেলার সময় ধার্য করে দেয়া থাকত, তখন বড়রা কেউ আমাদের জিনিস নিয়ে খেলতে পারবেনা। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ করে সবার দাবা খেলার প্রচুর ঝোঁক শুরু হলো। বুল্টু আর আমি প্রায় পুরো ধার্য সময়টাতেই দাবা খেলে কাটাতাম, তখন সবাই দিব্যেন্দু বড়ুয়া আনন্দ বা কাসপারভ। আমাদের একতলার মিলিটারি দাদুর সাথেও অনেক দাবা খেলেছি সেই সময়, তবে তখন আমাদের সাথে দাবা খেলত বুম্বা, যার পোষাকি নাম রক্তিম ব্যানার্জী, নামকরা দাবাড়ু হয় পরে। পাড়ার পুরনো পাকা দাবা খেলুড়ে মাস্টারদা সুব্রতদা মিলিটারি দাদু সবার সাথে বুম্বার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে ভিড় জমে যেত। তাছাড়া ছিল ক্যারম আর লুডোও তবে ক্যারমে চান্স পাওয়া যেতনা এত ভিড় হত।

আশির শেষের দিকে কোয়ার্টারে খুব লোডশেডিং হত সন্ধ্যেবেলা। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়িতে বসে না থেকে অনেকেই নিচে নেমে পড়ত। তখন আমাদের সাথে সাথে আমাদের ওপরের গ্রুপটারও বয়েস তেমন হয়নি, তাই বাজে গুলতানি তেমন মারা হতনা, অন্ধকারে শুরু হত কুইজ, ধাঁধা গানের লড়াই ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে জমত যেটা সেটা হলো আইসপ্রাইস। আইসপ্রাইস আমরা আগেও খেলতাম বিকেলে খেলাধুলার পর বাড়ি যাবার আগে কিন্তু অন্ধকারে সে খেলার মজাই ছিল আলাদা। তখন লুকোবার জায়গার অভাব ছিলনা, অনেকে লুকোত দুধের ডিপোয়, ডাকু চিরকালই ডানপিটে, ও পাইপ বেয়ে সানশেডের ওপর লুকোত। আমাদের ক্রিকেট খেলার জায়গাটাও পাল্টে গেল এই সময়, নতুন পিচ হলো বুল্টুদের বাড়ির সামনে। ওদের বাড়ির সামনের ইঁটের রাস্তা ছিল আন্ডারহ্যান্ডের ক্রিজ আর মাঝে মধ্যে ওভারহ্যান্ড হলে তখন আরেকটু পেছন থেকে। ৮৯য়ে খেলতে গিয়ে হাত ভাঙলাম বাপ্পার শট আটকাতে গিয়ে। অমলদাকে বললাম হাত মনে হয় ভেঙ্গেছে অমলদা দুস পাগল কিচ্ছু হয়নি বলে সেই ভাঙ্গা হাত খানিকক্ষণ ঝাঁকিয়ে দিল। আর কয়েক বছর পর শুরু হলো ফুটবল খেলে পুরনো কোয়ার্টারের পুকুরে চান করতে যাওয়া। আমাদের খেলাধুলায় তখন প্রচুর বাধা দেয়ার লোক। রিজু অভি পাপানদের সাথে এলজির সামনে খেললে ওয়াটার কোম্পানি (আসল নাম বললামনা ) জানলা থেকে গামলা গামলা জল ঢালত মাঠে যাতে আছাড় খেয়ে পড়ে যাই, রায়কাকু বারণ করত তবে দোতলায় বল গেলে, মিলিটারি দাদুর বারান্দা ছিল গোল তাই ক্ষণেক্ষণেই বল লাগত গ্রিলে। ক্রিকেট খেলার সময় বুল্টুদের ব্লকে ছিল মিহির জেঠু, ওদের বাড়ি বল গেলে আর সেটা ফেরত পাওয়া যেতনা, বঁটি দিয়ে বল কেটে ফেরত দিয়েছিল একবার মনে আছে। ববিদার মা খুব চেঁচামেচি হলে চুপ করতে বলত কিন্তু ওই অবধি।

খেলাধুলোর বাইরে আর যে ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের প্রচুর উৎসাহ ছিল তা হলো সরস্বতী পুজো। বাড়ি বাড়ি পুজো ছাড়াও তখন পাড়ায় নয় নয় করে পাঁচ ছটা পুজো। আমাদের নতুন কোয়ার্টারের ছোটদের করা পুজোটা আমাদের মতে ছিল সবচেয়ে ভালো আর বড়, ঠিক ভুল এখন সেটা আর যাচাই করা যাবেনা। জানুয়ারী মাস থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত কি বাজেট কোথা থেকে ঠাকুর আসবে এই সব। বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলতে যেতাম অনেক রকম প্রতিশ্রুতি নিয়ে – বিল্ডিংয়ে আলো লাগানো হবে, প্রসাদ দেয়া হবে, খালি বাংলা গান চালানো হবে সিনেমার গান না আরো কত কি। পুরনো কোয়ার্টারেও যেতাম তবে শুধু চেনা লোকদের বাড়ি। এই চাঁদা তোলার মাধ্যমেই পাড়ার আশপাশটা আরো ভালো করে জানতে পারলাম। পুজোর প্যান্ডেলের জন্যে বাঁশ না কিনে কোথায় কার বাগানে চুরি করা যায় সেই সন্ধানে চলে যেতাম ঘোষপাড়া হয়ে ব্রজনাথ স্কুল অবধি। ধরা পড়লে ঠ্যাঙানি কিন্তু কখনও সেটা হয়নি, বরং এক বাড়িতে বাঁশ চুরি করে ধরা পড়ে সেই বাঁশ ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়ে পাঁচ টাকা চাঁদাও পেয়েছিলাম। পুজোর দুদিন আগে কেনা হত বাখারী বাসস্ট্যান্ডের কোনের দোকান থেকে। আর লাইট মাইক ভাড়া নিতাম কাঁটাপুকুরের শম্ভুর থেকে। পুজোর দুদিন আগের সন্ধেবেলা অমলদা আসত প্যান্ডেলের মূল কাঠামো কেমন হবে সে সব ঠিক করে দিতে। তার পরদিন শুরু হত শেষ করার কাজ, প্রথমে খবরের কাগজ তারপর মার্বেল পেপার বা অন্যান্য প্যাটার্ন। পুজোর দিন সকালে ঝটপট উঠে প্যান্ডেলের বাকি কাজ শেষ করে অঞ্জলি দিয়ে তারপর আমাদের পুজো শুরু। ভানুকাকুই বরাবর পুজো করে এসেছে অনেক জেরাজেরী করেও ৫০ টাকাই ছিল দক্ষিনা। তারপর সারাদিন খুব গর্ব করে বসে থাকতাম প্যান্ডেলের পাশে, তাছাড়া পাহারা দেয়াও জরুরি ছিল কেউ এসে যাতে প্যান্ডেল নষ্ট করে না দিয়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও চলত সিনেমার গান, ভানু আর উত্তম দাসের কৌতুক নকশা। পরের দিকে ভোগ দেয়াও শুরু করেছিলাম সেটা খালি আমাদের পুজোয়ই চালু হয়েছিল, ববিদাদের বাড়ি রান্না হত ভোগ আর লাবড়া। ক্লাবের পুজোয় মাছি ভনভন করত তাই আমরা ছিলাম অনেকেরই চক্ষুশুল। ক্লাব থেকে অনেকবারই পুজো বন্ধ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমরা চালিয়ে গেছিলাম সবার সমর্থনে। আর পুজো মানেই ছিল ব্রেক ড্যান্স। আশির শেষ নব্বইয়ের শুরু তখন মাইকেল জ্যাকসন খ্যাতির চুড়ায়। তাই সন্ধ্যে হলেই মাইকে মাইকেল জ্যাকসন, বনি এম আরো সব নাম না জানা পশ্চিমী সুর আর বাপ্পা আর রাজুর ব্রেক ড্যান্স, আমরা ভিড় করে দেখতাম। আরেকটু বড় হলে তখন আস্ত ভিডিও সারা রাত ধরে বুল্টুদের বাড়ি না হয় ববিদাদের বাড়ি, রকি রেম্বো শোয়ারজেনেগারদের সাথে সাক্ষাত সেই প্রথম। ভিডিও দেখার বাজেট আলাদা, চাঁদার টাকা থেকে আসতনা তবে দেখি বা না দেখি ভিডিওর চাঁদা দিতেই হত। পুজোর শেষে সব বাঁশগুলো আবার চলে যেত পাম্পঘরের মাথায় সামনের বছরের জন্যে।

খেলাধুলার বাইরে সোশাল জীবনেও যে আস্তেআস্তে ছেলেবেলা কাটিয়ে কৈশোরে পা দিচ্ছি সেটা বোঝা যেত। প্রথমদিকে খেলতাম মেয়েদের সাথেও, সবসময় না কখনো কখনো, পরের দিকে ছেলেরা মেয়েরা আলাদা আলাদা যে যার মত গ্রুপে কাটাত। আমাদের আলোচনায় আসতে আসতে ঢুকতে শুরু করলো মেয়েরা এবং তাদের অ্যানাটমি। দু চারজন বন্ধু এরই মধ্যে সিগারেট ধরেছে, নিয়মিত না হলেও সিনেমায় গেলে বা পুজোয় বেরোলে তখন দু একটা টান মেরে হাতে হাতে ঘুরত। ৯১য়ে বুল্টু আর বাপ্পা পাপাইদাদের গ্রুপের সাথে চিড়িয়াখানায় যাবে বলে ঠিক করেছিল, শেষে রান্নাবান্নার ঝামেলা হওয়ায় আমাকে আর ভাস্করকে যোগ করলো সেই দলে, যদি আমরা লুচি বানিয়ে নিয়ে যাই। সেই প্রথম বেড়াতে যাওয়া বড়দের সাথে। পুজো ছাড়াও কখনো সখনো ভিডিও আনা হত, সব বন্ধুরা সন্ধ্যেুবেলা আসলেও রাতের দিকে হাতে গোনা কয়েকজন থাকতাম, সেখানে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল অ্যাডাল্ট ছবি। পাড়ায় খেলতে নেমে বাড়ি ফেরার সময় পাল্টাতে পাল্টাতে ৬টা – ৭টা -৮টা হয়ে গেল, আমাদের বয়েসী তেমন কেউই থাকতনা, যারা থাকত তাদের নাম মার্কা পড়ে গেল বখাটে বলে।

আমরা কুষ্টিয়ায় আসার পর ৯০-৯১ য়ের দিকে প্রথম দেখলাম বাড়িগুলোর রিপেয়ার শুরু হয়েছে। প্রথমে পুরনো কোয়ার্টার তারপর নতুন গুলো, সবের ওপর নতুন ফ্যাকাশে হলুদ রঙের আস্তরণ পড়ল। একতলা থেকে ছাদ অবধি বাঁশের ম্যারাপ বেঁধে বিরাট কর্মকান্ড, তখন কনট্র্যাক্টরদের কাজ পাইয়ে দেবার জন্যে একবার কাজ শুরু হলো তো শেষ হবার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ততদিনে বেশির ভাগ বাড়িতেই গ্যাস বা কেরোসিনের স্টোভে রান্না হয়, তাই আগের উনুনের জন্যে লাগানো চুল্লিগুলোর আর তেমন দরকার রইলোনা, সেগুলো যেমনকার তেমনই রয়ে গেল। তখনও সিঁড়ি ধোয়ার চল চালু ছিল। আমাদের জমাদার পরমেশ্বর আসত প্রতি দু সপ্তায় প্রতি ফ্ল্যাট থেকে এক বা দু বালতি জল ঢেলে দেয়া হত সিঁড়িতে, কয়েক ঘন্টা গেলেই সিঁড়ি আবার ঝকঝকে। আর মনে আছে হাজরা দাদু পরমেশ্বরকে সব নর্দমাগুলো পরিস্কার করাতো আর বারান্দা থেকে নজর রাখতো পাছে ফাঁকি না মারে।

৮০র শেষের দিকের সেই সময়ে আরেকটা ব্যাপারের বেশ চল ছিল। খাঁচা ভ্যান। কোয়ার্টারের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই পড়তো সাউথ পয়েন্ট না হয় পাঠ ভবনে। আমাদের কুষ্টিয়া থেকে সেটা কম দূর না। আগে সবাই বাবা-মার হাত ধরে স্কুলে যেত কিন্তু খাঁচা ভ্যান আসার পর থেকে লোকে খাঁচা ভ্যান করেই যাতায়াত করতো স্কুলে। খাঁচা ভ্যান হলো তিন চাকা রিকশা ভ্যান যা মোট বওয়ার জন্যে ব্যবহার হয়, শুধু এখানে পাটাতনের বদলে টিনের খাঁচা। দুদিকে দুটো কাঠের তক্তা দিয়ে বসার জায়গা। তখন গ্রীষ্মকাল এখনকার মতো গরম হতোনা, তবু ওই খটখটে রোদ্দুরে চারদিক ঢাকা টিনের খাঁচায় যাতায়াত যে খুব একটা সুখকর ছিলোনা সেটা অনুমান করাই যায়। খাঁচা ভ্যান চালাতো অমলদা। তাই ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো সংশয় ছিলোনা। অমলদার সাথে তাদের সম্পর্ক বাড়ির লোকের মতোই ছিল। পরে খাঁচা ভ্যান কেন বন্ধ হয়ে গেলো তা জানা নেই। হয়তো বন্ডেল গেটের জ্যামে এত সময় নষ্ট হতো যে পরের দিকে লোকজন হেঁটেই আগে পৌঁছে যেত। আর তাছাড়া বালিগঞ্জ ফাঁড়ি অব্দি অটো চালু হবার পর খুব অল্প সময়েই সাউথ পয়েন্ট বা পাঠ ভবনে চলে যাওয়া যেত।

কোয়ার্টারে পরিবর্তনের সাথে সাথে তখন বাইরেটাও পাল্টে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। আমাদের বাড়ির সামনে বস্তিতে একদিন তালগাছ দুটো কেটে ফেলা হলো চোখের সামনে। সেখানে দু তিনটে বাড়ি তৈরী হলো ভাড়া দেয়ার জন্যে। পুরসভায় তখন সবে নিয়ম পাশ হচ্ছে সব খাটালকে শহরের বাইরে নিয়ে যাবার জন্যে। সেই নিয়ম মেনে বাড়ির সামনের খাটালটাও উধাও হয়ে গেল একদিন। কুমারের সিগারেটের দোকানের বিক্রিবাটা বাড়তে শুরু করলো আমাদের বন্ধুবান্ধব আর আমাদের ওপরের পাপাইদাদের গ্রুপ তখন একটু বড় হয়ে যাওয়ায়। কুমারের দোকানের পাশে চালু হলো নতুন এক মনিহারী দোকান, তার মালিককে আমরা ডাকতাম আঙ্কেল। ৯১-৯২ য়ের দিকে সেখানে এলো হুইস্কি রাম জিন ইত্যাদি স্বাদের লজেন্স। আর কাঁটাপুকুর যাবার রাস্তার পরে নস্করদের বিরাট বাড়ির সামনের দিকে চালু হলো অভিরুচি, আমাদের প্রথম রেস্টুরেন্ট। চপ কাটলেট মোগলাই সেসবের সেই শুরু। বড় রাস্তার দুপাশে এতদিন যে কাঁচা নর্দমা ছিল তার ওপরে বড় বড় কংক্রিটের চাঁই বসল। এতদিন রাস্তায় হাঁটাচলা করতে খুব অসুবিধা হত, প্রান হাতে করে গাড়ি চলা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হত। বর্ষার সময় রাস্তা ডুবে গেলে আরো দুর্দশা, রাস্তার মাঝের দিকে গেলে গাড়িচাপা পড়ার ভয় আবার বেশি ধারের দিকে গেলে ঝপ করে নর্দমায় গিয়ে পড়তে হবে। সেই কভার বসে এতদিন চলে আসা সমস্যার একটা সুরাহা হল। কিন্তু কদিন পরই সেই কভার দখল হয়ে গেল অরার রোলের দোকান, হাটকার চায়ের দোকান এর তার রিক্সা ঠ্যালাগাড়ি সব মিলে আবার পূনর্মুষিকো ভবঃ।

এই সময়ই প্রথম কোয়ার্টারের বাইরের লোকজনের সাথে প্রথম আলাপ হওয়া শুরু। অজু বড়কা বাপি পলাশ টিয়া এদের সাথে সেই প্রথম পরিচয়। তারপর এত দিন ধরে বিভিন্ন টানাপোড়েনের শেষে কেউ কেউ রয়ে গেছে বন্ধু, কারো সাথে কোনো দেখা সাক্ষাত নেই বহুকাল। পাড়া থেকে লোকজন বেরোনোও শুরু করে নব্বইয়ের প্রথম দিকেই। টুনাদা গেল শান্তিনিকেতন, ভাস্কর চলে গেল উত্তর কলকাতায়, বিক্রম নরেন্দ্রপুর। তখনও পুরনো কোয়ার্টারের দিকে খুব বেশি জনকে চিনিনা তাই সেভাবে নাম ধরে বলা মুশকিল কে ঠিক কখন কোয়ার্টার ছেড়েছিল।

(চলবে )
Standard
Bengali culture, calcutta, Fremdsprache, Language, Travel

Ein Tag in Kalkutta

Of all the significant years in my life, 2008 must be the one of them, along with 1994, 2011 and 2014. 2008 was all about change. My life was about to take a new direction, and it certainly was a mad rush trying to get ready for an educational break, a busy job and spending all weekend learning German. 10 years on, my German is schlecht now, and there’s no time to start from where I left. Found this letter, supposed to be about a day out when I showed a few places in Calcutta to a German tourist couple. It was interesting finding out how much they knew about Calcutta (Didn’t know about the Lonely Planet guides then!). If you read German, you’ll see that I had only learnt up to past tense. It was a surprising find in one of my old notebooks…

Howrah bridge from the boat

Howrah bridge from the boat

Hallo Franka,

Wie geht es dir? Jetzt schreibe ich den ersten Brief zu dir. Nächstes mal musst du mir einen schreiben. Jetzt kann ich nicht einen Thema finden, deshalb schreibe ich über meinen Erfahrungen am letzten Samstag.

Da bin ich aufgeweckt um 5 Uhr, damit ich um 6 Uhr zum Flughafen fahren konnte. Ich hatte schon einen schlechten Kopfschmerzen. Ich hatte ein deutsches Paar getroffen, und schon eine Begegnung um 10:15 Uhr vor das indischen Museum fixiert habe. Aber alle schlechten Sachen fande zusammen Statt. Der Flugzeug kam 30 Minuten spät. Dann bin die Taxi von Calcutta Flughafen sehr langsam gefahren, und habe ich zum Haus punkt um 10 Uhr erreicht. Ich habe mich rasiert, habe mich angezogen und dann bin ich unter 10 Minuten hinausgegangen. Endlich hatte ich etwas Glück, weil ich schnell einen Taxi gefunden habe.

Also, war ich nicht so spät, außerdem sagte mir der Mann vorher, dass sie mir erwarten werden bis zum 10:30Uhr. Dort fande ich ihnen, unter den Eingang des Museums, beides Gesetzen auf einer Stühle. Wir haben uns vorgestellt und dann sagte ich ihnen “Wohin möchtet ihr gehen?” Du weißt, als hatte ich kaum Zeit, mochte ich sie um Victoria Memorial und Indisches Museum anzeigen. Aber erstaunlich sagte die Frau, dass sie mochte Kumartuli sehen. Da wurde ich total krank. Ich kaufte die Fahrscheinen bis zum Shovabazar. Das war eures ersten Erlebnis über Calcutta U-Bahn. Während unseres Trip diskutierten wir über verschiedenen Thema, Die Politik, Das Leben des Bengalens, Die bengalische Philosophie usw. Seit 25 Jahre wohne ich im Calcutta, aber war ich nie zum Kumartuli gegangen. Die Gasse waren kurz, aber die Häuser an Beides Seite sind alt und zu groß. Endlich erreichten wir das Studio eines Künstlers. Dort gab es viele großen Statuen der Durga. Fragtet ihr mir viele Fragen über die Religion und Gott. Ich wusste nicht viel aber konnte ihnen beantworten.

Dann sagte der Mann,”Wir möchten zum Fluss gehen”. Während liefen wir durch die kleine Gasse, sahen wir viele schönen und großen Häusern, die vorher einhundert Jahren gebaut wurden. An dem Ufer des Ganges sahen wir ein sehr großes sechsstöckiges Haus. Der Fluss sah aber sehr schmutzig aus, gab es Pflanze in dem Wasser, das total Gelb war. Nachdem gingen wir zum Shovabazar Fährhof. Wir standen auf der Kurzer Brucke, wenn Conny, die Frau sah ein Boot kommen. Sie möchten mir kaffeetrinken einzuladen, aber zu bootfahren auch. Da plante ich im Boot nach Howrah gehen und dann mit dem Bus zum Indian Coffee House fahren. Es war schon nachmittags. Und die Frau war krank vor 4 Tagen. Die Sonne war es nicht da, aber die Hitze war sehr ärgerlich. Trotzdem hatten wir viel genossen, ein Bootsfahrt zu machen. Es war schön, die zwei Ufern. Ich zog ihnen die “Ghats” an. Dann waren wir von Howrah Bahnhof mit einem Stadtbus nach College street gefahren, damit bei Indische Kaffee Haus zu besuchen. Sie waren erstaunt : so viele Bücher und so viele Geschäfte!

Aber da, fühlte ich mich nicht so wohl. Treffen einem deutsches Paar, für mich, war eine Gelegenheit, in Deutsch zu diskutieren. Ich spreche nicht so gut im Klass, da wünschte ich, wie schön wäre es, wenn ich wie ihnen deutsch sprechen könnte. Aber sie sprachen immer Englisch!!!Nur wenn Sie die Bedeutung nicht verstehen konnten, fragten sie mir in Deutsch!!! Dann sagte ich mich : da geht nicht mehr! Punkt wir waren wir in die Cafe eingegangen, sagte ich “vielleicht konnen wir in Deutsch sprechen, um uns etwas besserer kennenzulernen”. Dort gab es viele Leute, und der Platz war sehr laut, deshalb müssten wir auch laut sprechen. Wenn der Ober nie kommt schnell, hatten wir viele Sachen diskutiert. Wir aßen Tomatensuppe und tranken Kaffee mit Creme. Dort hatten wir gute Zeit verbrachten. Dann gingen wir nach Millennium Park. Die Frau fühlte sich unbequem, und sind wir schnell in die Park erreichten.

Dort hatten wir über zwei Stunden verbrachten. Wir hatten ein Platz gefunden, die vor dem Fluss stand. Es gab Luft, das macht uns etwas bequem. Wir diskutierten über die Religion, Calcutta, die Volkskultur, die Geschichte des Calcuttas, indische Wirtschaft, die Politik, Glauben des Inders und Deutsches, meine Gedanken über Zukunft, ihre Plan usw. Ich habe viele Tatsache über Deutschland gelernt, die ich sonst nicht wissen könnte. Plötzlich sah ich die Uhr an, und es war schon 16 Uhr. Schnell hatte ich mich entschuldigen und zum MMB führte.

Vielleicht ist der Brief zu lang, aber möchte ich alle Verbformen benutzen. Bitte korrigiere-mich schnell. Bis Samstag.

Bengali, Cuisine

ফিশ কবিরাজি আর মিষ্টি দই হ্যাক

এবার দুটো চটজলদি রান্নার পদ্ধতি লিখছি। প্রথমটা আমার আবিষ্কার, দ্বিতীয়টি আমার কলেজের এক বন্ধুর, আমি টুকে শেয়ার করছি।

ফিশ কবিরাজি

ফিশ কবিরাজির অনেক রেসিপি ইন্টারনেট ঘাঁটলে পাওয়া যাবে। সেগুলো আমার এই কবিরাজির চেয়ে ঢের ঢের ভালোও হবে আশা করা যায়। তবু এই পদটা শেয়ার করলাম কারণ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এটা রান্না করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগবে। এতো তাড়াতাড়ি আর কোনো হাঙ্গামা ছাড়া কবিরাজি রেসিপি হয়তো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ফেসবুকের দৌলতে অনেক নতুন ব্যাপার-স্যাপার ই চোখে পড়ে, সেরকমই কলকাতার এক গ্রুপ আছে যেখানে রকমারি বাঙালি ও অবাঙালি খাবারের খোঁজ পাওয়া যায়। বিদেশে আসার পর থেকে অনেক খাবারের জন্যই হাপিত্যেশ করতাম কিন্তু আস্তে আস্তে বেশিরভাগ খাবারই দেখলাম কিনতে পাওয়া যায় অথবা হুবহু এক না হলেও অন্য দেশের খাবার পাওয়া যায় যা আমাদের খাবারের মতোই। যেমন মোমো খাবার ইচ্ছে করলো তো পোলিশ দোকানে গিয়ে কিনে নিলাম পিয়েরোগি, ভাজলে ফ্রাইড মোমোর মতন স্বাদ। যাহোক, তা নিয়ে অন্য একদিন লেখা যাবেখন। দু-তিনটে খাবার তবে পাওয়া দুষ্কর আর তাদের জন্যে সেইজন্য হাপিত্যেশও বেশি। সে সব খাবারের মধ্যে এক হলো ফিশ বা চিকেন কবিরাজি। এছাড়াও আছে ঢাকাই পরোটা, ইলিশ মাছের ডিম্, ইলিশ শুঁটকি ইত্যাদি।

যাক ফিশ কবিরাজিতে ফেরা যাক। হ্যাঁ, রান্নার উপায় পড়ে আমাকে গালি দিতে শুরু করবেননা যেন, আগেই বলেছি এটা শর্টকাট রান্না। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্যে। টাটকা ভেটকি মাছের ফিলে দরকার নেই এই কবিরাজির জন্যে। বাজার থেকে কিনুন Breaded Fish যেগুলো সাধারণত ওভেনে বেক করতে হয়। Basa , Hake, Haddock অনেক প্রকারের মাছই পাওয়া যায়। মাছ গুলোকে ওভেনে বেক করে নিন বা তাওয়াতে অল্প তেল দিয়ে ভেজে নিন। প্যাকেটে যতক্ষণ রান্না করতে বলা আছে তার চেয়ে ৫ মিনিট কম রান্না করুন, কারণ কবিরাজি বানানোর সময় আর একবার ভাজা হবে। এবার খানিক লেবুর রস, কাঁচালঙ্কা আর রসুন বাটা-র একটা কাই তৈরী করে মাছের অল্প ভাজা টুকরোগুলোর ওপর আলতো করে মাখিয়ে নিন। এবার একটা চওড়া পাত্রে বেশ কিছু ডিম্ ফেটিয়ে নিন। তাতে অল্প নুন, গুঁড়ো মরিচ দিতে পারেন। এবার কড়াই বা ফ্রাইং প্যানে অনেকটা তেল দিয়ে ফেটানো ডিম্ অল্প অল্প করে ছিটিয়ে দিতে হবে। একসাথে অনেকটা দিলে কবিরাজির জায়গায় ওমলেট হয়ে যাবে, তাই খেয়াল রাখতে হবে খুব ছোটো ছোট ফোঁটার আকারে দিতে। whisk ব্যবহার করতে পারেন, নাহলে হাত ডিমের মিশ্রনে ডুবিয়ে কড়াইতে হাতটা ঝেড়ে নিন। তেল বেশ গরম হওয়া দরকার। এবারে বেশ কিছুটা ডিম্ দেয়ার পর আস্তে আস্তে খাস্তা হয়ে ভেজে ওঠা ডিমগুলো যখন একসাথে জুড়ে জুড়ে একটা bedding তৈরী করেছে তখন তার ওপর একটা মাছের টুকরো দিয়ে দিন। তারপর আবার এক প্রস্থ ডিম্ ছড়িয়ে দিন মাছের টুকরোর ওপর। সাথে সাথে না উল্টে প্রথমে হাতায় করে গরম তেল ডিমের ওপরে দিয়ে দিন যাতে ওল্টানোর আগেই ডিমের ঝুরি তৈরী হয়ে যায়। এবার উল্টে আর এক-দেড় মিনিট রেখে তুলে নিন। সাথে কাঁচা পেয়াঁজ, শসা আর সর্ষের কাসুন্দি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ফিশ কবিরাজি সাথে কাসুন্দি আর শসাকুচি

ফিশ কবিরাজি সাথে কাসুন্দি আর শসাকুচি

আর চিকেন কবিরাজি? মাছের বদলে কিনে আনুন চিকেন বা টার্কি escalope। বাকিটা কপি পেস্ট।

মিষ্টি দই

আমি যে সময় বড় হয়েছি তখন ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিলোনা। গরমকালে তাই মিষ্টির দোকান থেকে কিনে আনা ঠান্ডা মিষ্টি দইয়ের মাহাত্ম্যই ছিল আলাদা। সেই মিষ্টি দইয়ের পাশাপাশি আর একটা প্রথারও চল ছিল খুব, ঘরে পাতা দই। দইয়ের ভাঁড়ে থেকে এক চিলতে দই তুলে নিয়ে তাতে হালকা গরম দুধ দিয়ে সারা রাত রেখে দিলেই হয়ে যেত এই ঘরে পাতা দই। তারপর আবার সেই দইয়ের থেকে খানিকটা সাজা তুলে রেখে আবার পরের দিনের দই পাতা হতো। এভাবে চলতো বেশ কয় দিন, তারপর দইটা কেমন জল জল হয়ে আসতো আর স্বাদটাও হয়ে যেত কেমন ঝাঁঝালো। কলকাতার বাইরে মিষ্টি দই পাইনি, তাই তেমন খাওয়াও হয়নি এতদিন। এখানে সুপারমার্কেটে একটা বস্তু পাওয়া যায়, Creme Caramel. খেলে মনে হবে যেন লাল দই খাচ্ছি। আর এখানে yogurt বলে যেটা পাওয়া যায় তা আমাদের টক দইয়ের সমান। তাও আবার বেশ জোলো।

চটজলদি দই বানানোর এই পদ্ধতির কৃতীত্ব আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক সহপাঠিনীর। সংসার, ছেলেপুলে, ডক্টরেট এসব সামলেও বিভিন্ন জিনিস রান্না এবং তৈরির চেষ্টা করে। তার দইয়ের রেসিপি দেখে বিশ্বাসই হয়নি ব্যাপারটা এতো সহজ। অনেকটা আর্কিমিডিসের ইউরেকা বলার মতো, ছাগল এরকম একটা সহজ ব্যাপার এতদিন Zানতি পারনির মতো। এখানে বিলকুল কপি মারলাম রান্নাটা। তবে শেষে একটা সংযোজন রইলো যেটা আমার নিজের, খানিকটা ভুলক্রমেই আবিষ্কৃত।

যাক, মিষ্টি দই বানানোর জন্যে লাগবে খানিক Plain Yogurt আর কনডেন্সড মিল্ক। দুটোই সহজলভ্য, যেকোনো সুপারমার্কেটে পাওয়া যায়। এবার একটা মাইক্রোওয়েভ প্রুফ পাত্রে সমান পরিমান Yogurt আর কনডেন্সড মিল্ক নিতে হবে। মিষ্টি যদি একটু কম পছন্দ করেন তাহলে সামান্য কম কনডেন্সড মিল্ক, মোটামুটি ৬:৪ অনুপাতে মেশাতে হবে। হাতা বা চামচ দিয়ে পুরো মিশ্রণটাকে আলতো করে বেশ খানিকক্ষণ মিশিয়ে নিন। এরপর পুরো পাত্রটা মাইক্রোওভেয়ে দিয়ে, Medium পাওয়ারে কিছুক্ষন গরম করতে হবে। (আমার মাইক্রোওয়েভ ৭৫০W, আমি ৩০০ এ বেক করেছি) । কতক্ষন রান্না করতে হবে সেটা পরিমানের ওপর নির্ভর করছে। এক ছোট বাটি করতে ১ মিনিট, ১ কেজি করতে প্রায় ১৫ মিনিট কিন্তু এক বারে ২ মিনিটের বেশি রাখবেননা। ওভেন থেকে বার করলে মিশ্রণটা তখনও একটা নরম থাকা দরকার, অনেকটা জেলির মতো, নাহলে দই জমাট হয়ে যাবে। ব্যাস, খানিকক্ষণ ঠান্ডা হতে দিয়ে সোজা পেটে চালান করে দিন, নাহয় ফ্রিজে রেখে খান ঠান্ডা মিষ্টি দই। গ্যারান্টি দিলাম দোকানের Yogurt বা Creme Caramel এর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদ পাবেন।

তাছাড়া অন্যান্য স্বাদও চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। যেমন কনডেন্সড মিল্ক পরিমানের আদ্ধেক দিয়ে, বাকিটা দিন mango pulp, আম দই হয়ে যাবে। আমি নলেন গুড় দিয়েও চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পরিমান ঠিক হয়নি, তাই দইটা কেটে গিয়েছিল।

মিষ্টি দই মাইক্রোওয়েভ থেকে বার করার পর

মাইক্রোওয়েভে মিষ্টি দই বানানোর পদ্ধতি। ভিডিওতে দেখুন।
(সূত্র: ঈশান টিউব )

এ তো গেলো চোথা মারা পার্ট। শেষটুকু ও বলে দি। বেশ খাচ্ছিলাম দই বাটি বাটি তৈরী করে, হঠাৎ শখ হলো এক গামলা দই বানাবো। ৫০০গ্রাম Yogurt আর ৩৯০গ্রাম কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে দই বানাতে গিয়ে এতক্ষন লাগলো যে শেষে দইটা একদম জমাট বেঁধে গেলো। সেই মিষ্টির দোকানের হালকা নরম, চামচ চালালেই পরত পরত উঠে আসবে সেই ভাবটা আর নেই। কিন্তু খেতে গিয়ে মনে হলো আরে এ তো অনেকটা শ্রীখণ্ড। তাই বলি, যদি শ্রীখণ্ড বানাতে যান এই উপায়ে, একটু বেশিক্ষন মাইক্রোওভেয়ে রাখবেন আর শেষের ২ মিনিট ফুল পাওয়ারে। শ্রীখণ্ড বানানোর সময় এলাচ, জাফরান, পেস্তা কুচি এসবও অল্প দিয়ে দেবেন। তারপর ফ্রিজে রেখে দিন। জমে যাবে। পাক্কা।
Standard
Bengali, east bengal, Sourav Ganguly

দাদাগিরি এবং ঘটি বাঙালের রেষারেষি

দাদাগিরি ১৯শে আগস্টের শো। সম্পূর্ণ এপিসোড।
(সূত্র: BDUpload )

আমি ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক একদম ছোটবেলা থেকেই। উদ্বাস্তু পরিবারে জন্ম, বাঙাল আচার বিচার জীবনধারায় বড় হয়েছি, তাই ইস্টবেঙ্গল ছাড়া যে অন্য কাউকে সমর্থন করা যায় সেকথা কখনও মাথায়ই আসেনি। তারপর যত বড় হয়েছি যুক্তি তথ্য ইত্যাদি দিয়ে নিজের সব পছন্দ অপছন্দ গুলোকে আবার ঝালিয়ে নিতে হয়েছে। সেই নিক্তিতে পছন্দ অপছন্দের লিস্টিটারও অনেক অদলবদল হয়েছে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের থেকে সমর্থন তুলে নেবার কথা কখনও মাথায়ই আসেনি, যতই সে ইপিএল বুন্দেসলিগা ইউএফা কাপের তাবড় তাবড় খেলুড়েরা টিভির পর্দায় কেত মারুক না কেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব হলো ঘুরে দাঁড়ানোর নাম। ইস্টবেঙ্গলের সাথে জুড়ে আছে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের লড়াই করার ইতিহাস। যদিও এখন যুগের ধর্ম মেনে আদ্ধেক খেলোয়াড়ই বিদেশী, তার মানেই যে দলের আদর্শ পাল্টে গেছে তা তো নয়। তার ওপর বন্ধুর দাদু ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের ডাকসাইটে খেলোয়াড়, পাড়ার আরেক বন্ধুও খেলেছে ইস্টবেঙ্গলে, সেই সূত্রে ইস্টবেঙ্গলের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছিলো অনেক দিনের। এখন বহুদিন মাঠে গিয়ে খেলা দেখিনা, তবু মোহনবাগানের ইস্টবেঙ্গলের সাথে খেলা থাকলেই আবার ফিরে যাই কুড়ি পঁচিশ বছর আগে। তা কদিন আগেই দেখলাম দাদাগিরি নামের অনুষ্ঠানে নাকি কেউ একজন বাঙালদের নিয়ে অনেক কুরুচিকর মন্তব্য করেছে আর সৌরভ গাঙ্গুলী তাতে বাধা না দিয়ে আরো হাসাহাসি করেছে। এই নিয়ে ইস্টবেঙ্গলের ফেসবুক তোলপাড়। কেউ দাদার মুণ্ডপাত করছে তো কেউ সেসব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের যারা ওই শোতে উপস্থিত ছিল। তোলপাড় হচ্ছে ইন্টারনেট, হওয়াটা দরকার, কিন্তু এপার বাঙলা ওপার বাঙলার রেষারেষির ভূমিকাটা জানা প্রয়োজন।

একশ বছর আগে বাঙালদের প্রতি বিদ্বেষমূলক ব্যবহার ছিল হয়তো দৈনন্দিন ঘটনা। আর সেভাবেই সৃষ্টি ইস্টবেঙ্গল দলের। ১৯২০ সাল থেকেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ তাই ঘটি বাঙালের দ্বন্দ্ব হয়ে দাঁড়ালো। আওয়াজ টিটকারি ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসবের লক্ষ্য ছিল বাঙালরা। দেশভাগের পর ভিটেমাটিছাড়া মানুষরা যখন পশ্চিমবঙ্গে এলো, তখন তাদের বেশিরভাগেরই এসেছে খালি হাতে। সরকার থেকে পুনর্বাসন মেলে কলকাতার শহরতলিতে যেখানে তখন জলাজমি ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। এক চিলতে জমি, সেখানে রোদ ঝড় জল মাথায় করে, দিন আনি দিন খাই করে শুরু হয়েছিল সেই মানুষগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। কোনোদিন কেউ কিছু পাইয়ে দেয়নি তাদের। নিজের সামর্থ্য আর একরাশ স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই সহায় ছিলোনা তাদের। বাকিটা ইতিহাস। বাঙাল মানেই টিঁকে থাকার লড়াই, উদ্যম অধ্যবসায়, পায়ের তলায় জমি খুঁজে নেয়ার উদগ্র প্রচেষ্টা।

কিন্তু সেই অসম্ভব একরোখা মনোভাবের মানুষেরা যখন পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা শুরু করলো, তখন প্রথম প্রথম সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায় হলেও এপার বাঙলার মানুষরা মেনে নিয়েছে বাঙালদের। আস্তে আস্তে ঘটি হেঁশেলঘরেও ঢুকে পড়েছে কচুর লতি, পুইঁশাক আবার তেমনি বাঙালরাও রান্নায় জুড়তে শিখেছে খানিক চিনি। ঘটি বাঙাল বাড়ির মধ্যে বিয়েও আজ হামেশাই হয়, কেউ সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা। ইস্টবেঙ্গলে ঘটি খেলোয়াড় খেলে যেমন মোহনবাগানে খেলে বাঙাল প্লেয়ার। নিমরাজি হয়েও, খানিক চাঁদ সদাগরের মনসা পুজোর মতো ঘটিরা জায়গা করে দিয়েছে বাঙালদের তাদের দৈনন্দিন জীবনে। উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষগুলোর ওপর তারা চড়াও হয়নি রাজাকারদের মতো। আমার আগের প্রজন্ম দুই তরফেই বাঙাল, তাদের জীবনে প্রথম স্থায়িত্ব আসে পশ্চিমবঙ্গে আসার পর। তাদের বাকি জীবন পশ্চিমবঙ্গে নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় কাটাতে পারার জন্যে এই ঘটিদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কৃতিত্ব তৎকালীন সরকারের অবশ্যই, কিন্তু যার যতটুকু যোগ্য কৃতজ্ঞতা সেটা স্বীকার করাটাই যথার্থ।

তাই এই রেষারেষি, ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেয়া ঘটি বড় না বাঙাল, এ সবই খানিকটা খুনসুটি। ঘটিরা সেটা যেমন উপভোগ করে, বাঙালরাও তাই। ওদের গেঁড়িগুগলি তো আমাদের কচু ঘেঁচু , ওদের নুচি নেবু নঙ্কা তো আমাদের বেঙ আর ভ্যাক। ওরা বলে ওরে লোটা, আমরা ডাকি ওরে মাচা। আমাদের পূর্ব প্রজন্ম যারা প্রথম এখানে বসবাস করা শুরু করে তাদের লড়াই আজ শেষ। তাদের একমাত্র আশা ছিল “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। দুধে ভাতে না থাকলেও, প্রতিদিন প্রাণের ভয় আজ আর নেই। আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে ঘটি বাঙালের মিলমিশে। কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে গেলে বাঙাল পরিচয়টা আপনা থেকেই চলে আসে। আমাদের সেটুকু দায়বদ্ধতা রয়ে গেছে আগের প্রজন্মের প্রতি। তাই শুঁটকি খাই বললে লোকে যখন নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করে কোথাকার বাঙাল, বুক ফুলিয়ে বলতে পারি চাটগাঁ। ছোটবেলায় পিসি জোর করে নিয়ে যেত চট্টগ্রাম পরিষদের অনুষ্ঠানে। তখন মনে হতো এসব কিম্ভূত ব্যাপারে আবার কেন, কোথায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেব না এখানে হ্যাজাচ্ছি। কিন্তু আজ ভাবলে মনে হয় সেটা আসলে ছিল অনেকটা রীলে দৌড়ের মতো, আগের প্রজন্মের হাত থেকে আমাদের হাতে মশালটা ধরিয়ে দেয়া।

তাই ঘটি আর বাঙাল যে ভাই ভাই এক ঠাইঁ তা নয় এখনো। খেলার মাঠে গালিগালাজ ইঁট পাটকেল এখনো পড়ে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান এখন আর ঘটি বাঙালদের যুদ্ধ নয়। অনেক বাঙালই মোহনবাগানকে সমর্থন করে, আবার অনেক ঘটি ইস্টবেঙ্গলকে। আর সেই লড়াইটা এখন খানিকটা প্রতীকী। তবু অনেক সময় অতি উৎসাহে মাত্রা ছাড়িয়ে যায় শালীনতা। অনেক সময়ই ঘটি বাঙাল বাগবিতণ্ডায় গা জ্বলে উঠেছে অপমানে, যোগ্য জবাব দিয়ে তবেই মন হয়েছে শান্ত। তারপর মাথা ঠান্ডা হলে ভেবে দেখছি যে গোটা ব্যাপারটাই কি অপ্রয়োজনীয়। আর ঠিক সেই অনুভূতিই হলো যখন দাদাগিরির খবরটা পেলাম।

প্রথমে ফেসবুকে পড়ে কিছুই বোঝা গেলোনা কি হয়েছে। আস্তে আস্তে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারে বোঝা গেলো যে শোতে গোটা বাঙালদের অপমান করা হয়েছে। অনেক খুঁজেপেতে ইউটিউবে একটা ছোট ক্লিপ পেলাম যেখানে দাদা বলছে (বাঙালরা) পাঁচিল টপকে টপকে এসেছে? আর বৈদ্যুতিন মাধ্যমে চলেছে রাগ দুঃখ অভিমানের পালা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম একটা সম্পূর্ণ ক্লিপ গোটা অনুষ্ঠানটার। অবশেষে দেখলাম কি সেই অতি কুরুচিকর প্রোগ্র্যাম।

কিন্তু যা দেখলাম তা তো যা পড়লাম বিভিন্ন জায়গায় তার সাথে খুব একটা মিললনা! হ্যাঁ ওই সৌগত ঘোষ লোকটা খুব গা জ্বালানো ভঙ্গিতে বাঙালদের নিয়ে কটূক্তি করেছে বটে, কিন্তু তার সাথে সৌরভকে টানার খুব একটা যুক্তি চোখে পড়লোনা। বরং দেখলাম অনুষ্ঠানের শুরুতেই দাদা বলছে ইস্টবেঙ্গল ঢুকলো ভালোভাবে কিন্তু মোহনবাগান হোঁচট খেলো কেন? আর ওই পাঁচিল টপকে এসেছে মুহূর্তটায় গিয়ে দেখলেও চোখে পড়বে যে ইস্টবেঙ্গলের অনিন্দ্যবাবু যথার্থ জবাবই দিয়েছেন। গোটা অনুষ্ঠানে তিনি দারুন টেম্পেরামেন্ট দেখিয়েছেন, নিচু রুচির খেউড় করে লোক হাসানোর চেষ্টা করেননি। মোহনবাগানকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকার জন্যে ধন্যবাদ দিয়েছেন, তেমনি মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে ১৯১১ সালের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারানো দলের সাত জনই বাঙাল ছিল। পাঁচিল টপকে আসার কমেন্টে সৌরভ মোহনবাগান প্রার্থীর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসেছে ঠিকই কিন্তু সেটাকে সব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা যেভাবে বাঙালদের অপমান করার সমর্থন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, ব্যাপারটা আদপে সেরকম কিছুই নয়। সৌরভকে ক্ষমা চাইবার দাবি তো যথাযথ নয় একদমই। সৌরভ গাঙ্গুলী যথেষ্ট দক্ষ ভাবে গোটা অনুষ্ঠানটা সঞ্চালন করেছে। আর বাঙালরা হার না মানার আরেক নাম। এই সব ঠুনকো সমালোচনাতে যদি গায়ে ফোস্কা পড়ে এখন, তাহলে বলতেই হয় সেটা খুব একটা বাঙাল সুলভ আচরণ নয়। নানা অজুহাতে কাঁদুনি গায় তো মোহনবাগান। আমরা ওদের দলে কবে থেকে ভিড়লাম?

তবে যদি ধরে নেন এ লেখা পরে যে সৌরভের অন্ধ ভক্ত আমি, তাই তার সাতখুন মাফ, সেটা বিন্দুমাত্রও সত্যি না। খেলোয়াড় সৌরভকে যথেষ্টই ভালো লাগতো, কিন্তু তার সাথে মানুষ সৌরভের যে অনেকটাই ফারাক সেটা বহুদিন আগে থেকেই খেয়াল করেছি। সৌরভ যে আদপে ক্ষমতার দাস সেটা বিগত কয়েক বছরে মাঠের বাইরে সৌরভের কীর্তিকলাপ দেখলেই নজরে পড়ে। পুরসভা নির্বাচন, সিএবি সচিব নির্বাচন, ডালমিয়াকে সরানো, আবার তার ছেলের হাত ধরেই সিএবিতে ফেরা, ক্রিকেট একাডেমির জমি, পার্ক স্ট্রিটে রেস্তোরাঁ – অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য আর ক্ষমতার অলিন্দের হাতছানি যে সৌরভকে চিরকাল প্রভাবিত করে এসেছে তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। খেলোয়াড় এবং ভারতের অধিনায়ক সৌরভ যতটাই অনুপ্রেরণা জাগায়, মাঠের বাইরের সৌরভের এই অন্যরূপ দেখে মনে হয় যে সেই অন্য সৌরভের ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্রও এই মানুষটার মধ্যে নেই। তাই পাঁচিল টপকে আসার বিষয়ে সৌরভকে অকারণে সমর্থন করার কোনো কারণ আমার নেই।

আমার বক্তব্য হলো ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান স্পেশাল এপিসোডে দু পক্ষই যে একে উভয়কে নিয়ে কিছু না কিছু বলবে সেটাই প্রত্যাশিত। ক্ষমা যদি চাইতেই হয়, সেটা চাইবার কথা যে ওই মন্তব্য করেছে সেই সৌগত ঘোষের। অনিন্দ্যবাবু শালীন ভাবে জবাব দিয়েছেন যে সীমান্তে পাঁচিল কোনোকালে ছিলোনা যে পাঁচিল টপকে আসতে হবে। বাঙালরা এসেছে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে। সৌরভকে কাঠগড়ায় তোলার মতো অপরাধ হয়নি কিছু। তার মানে কি জবাব নেই বাঙালদের খোঁচা মারা টিপ্পনীর? আছে বৈকি। কিন্তু সে জবাব হবে মাঠে। তার চেয়ে বড় জবাব আর কিছু হয়না। কারন যতবার ডার্বি, মাচা তোরা হারবি। এ তো কথায়ই আছে।

পুনঃশ্চ: এই লেখাটা কিন্তু ঘটি বাঙাল নির্বিশেষে লেখা। ইস্টবেঙ্গল মানে আর ওপার বাংলা নয়, যেমন মোহনবাগানও আর কেবল ঘটিদের ক্লাব নয়। এই গোটা ঘটনাটার সূত্রপাত বাঙালদের নিয়ে। তাই লেখার মূল উদ্দেশ্য কিছু বাঙাল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকের সৌরভকে লক্ষ্য করে মুন্ডপাতের দাবির যথার্থতা নিয়ে। অনেক জোগাড়যন্ত্র করে ভিডিওটা জোগাড় করেছি। লিঙ্কটা দেয়া রইলো, অনুগ্রহ করে দেখুন, আর তারপর বিচার করুন সৌরভ অনুষ্ঠানে মোহনবাগানের হয়ে পক্ষপাতিত্ত্ব করেছে কিনা।
Standard
calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Standard
Bengali, Life experience, Memory, Nostalgia

জলপাইগুড়ির দিনরাত্রি

সেই কবে তারাপদ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম এক জবরদস্ত অযোধ্যা সিং-এর রাম খাওয়ার গল্প, যার শেষের লাইনটা ছিল সেই অযোধ্যা আর নেই, আর সেই রামও আর নেই। নাঃ এটা পলিটিক্যাল লেখা নয়, রাম নিয়ে রসিকতা করার ধ্যাষ্টামো আমার নেই। সে রাম খালি হনুমানদের, আমি যে রামের কথা বলছি সেটা একান্তই এই হনুর। মাল গাঁজা সহযোগে বেলেল্লাপনার চরম উদাহরণ রেখে গেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার দিনরাত্রিতে। হঠাৎ করে সে বইয়ের কথা মনে পরে মনটা চলে গেলো ১৮-১৯য়ে, হ্যাঁ সে ছিল একটা সময় বটে। জলুতে তখন ফার্স্ট ইয়ার। সব পোনাদের উপদেশ মেনে লেখাপড়া ডকে, আরে বাপু ক্যাম্পাসিং এমনিও হয়না, ওমনিও হয়না, পড়ে আর কি ছিঁড়বি। কাজেই চালাও দেদার বিড়ি সিগ্রেট বাংলু। জলুর কথা মনে পড়ায় ভাবলাম, সুনীল সমরেশ সন্দীপনের কলকাতার দিনরাত্রির চেয়ে আমাদের জলুর দিনরাত্রিগুলো কম রঙিন ছিলোনা। রামের কথাই যখন উঠল তাহলে রাম দিয়েই শুরু করি। ফোর্থ ইয়ারের নামকরা মাতাল পোদুদা একদিন রাতে আমাদের হোস্টেল এ এসে আমাদের দুজনকে নাম ধরে খোঁজা শুরু করলো, কিবে তোর নাম হনু? হ্যাঁ দাদা। আর তুই খেঁচু। হ্যাঁ। শুনেছি তোরা নাকি হেভি মাল খাস? এই দেখ এক বোতল রাম, চল রুমে চল। আর বোতল মানে পাঁইট ফাঁইট নয়, পুরো খাম্বা। তবে আদ্ধেক আগেই সাঁটিয়ে এসেছিলো মহাপুরুষ। আহা সেই যে হল অফ ফেমে নাম ওঠার অনুভূতি হয়েছিল, জীবনে আর কখনো সেরম কৃতার্থ বোধ করিনি। পুরো চার বছরের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ উজাড় হয়ে যাবে, সেসব থেকে বেছে বেছে দুটো ঘটনাই শেয়ার করলাম। তখনকার বন্ধুবান্ধব সব এখন দায়িত্বশীল চল্লিশ ছুঁইছুঁই ধেড়ে মানুষ, কাজেই তাদের আর বিব্রত করলাম না আসল নামধাম বলে, পড়ে যাদের যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে যাবে, আর বাকিদের বলি আসল নাম দিয়ে কি ঘন্টা হবে হ্যাঁ?

দিন

সেটা ৯৭ সালের মে মাসের কথা। ফার্স্ট ইয়ার। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার ২ সপ্তা আগে অন্ডকোষ টাকে উঠে গেছে, তখন প্রমাদ গণছি কেন সারাটা বছর না ঘষে কাটিয়েছি, এবার হয়ত খেলাম ইয়ার ল্যাগ। এমন সময় টাউনে ব্যাপক বাওয়াল হয়ে কলেজ বন্ধ। সে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। এবার কি করা? বাড়ি যাবার বেশ ১০-১২ দিন দেরি আছে কিন্তু কলেজে কিচ্ছু করার নেই আর টাউনে যাওয়া বন্ধ ফের বাওয়ালির ভয়ে। এমন সময় একদিন সকল ৯টায় সবে দাঁত মাজছি এমন সময় হোস্টেলের করিডোরে দেখতে পেয়ে রামুদা হাঁক মারলো, হনু মদ খাবি চল। ভাবলাম খোরাক দিচ্ছে, উত্তর দিলাম দাঁড়াও ৫ মিনিটে আসছি। ৫ মিনিট পর দেখি কি কেলো, রামুদা এসে হাজির, আমাকে আর খেঁচুকে নিতে। ভাবলাম হোস্টেলে বসে বসে ছেঁড়ার চেয়ে খানিক মাল টেনেই দেখা যাক, সকালে কখনো খাইনি। সাড়ে ৯টা নাগাদ তিন মূর্তি গিয়ে হাজির হলাম কলেজ মোড়ে. পাতি দরমার দোকান, তাতে সকালে খিচুড়ি চা বিস্কুট এসব বাদ দিয়ে আড়ালে আবডালে বাংলাও পাওয়া যায়। চেনা লোকদের পেতে একটু সুবিধা বেশি। তা সে দোকানে গিয়ে গোটা কয় বাংলা নিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। সামনে NH 31 ফাঁকা বললেই চলে। গরম আসছে আসছে তবে তখন আজকালেরমতো পেছন ফাটানো গরম পড়তোনা। তাই গাছের ছায়ায় আরাম করে বসে আড্ডা জমলো চরম, সাথে বাংলার মৌতাত। তখন সিগারেট খাওয়া ছাড়িনি তাই মদ সিগারেট জুটি জমে গেলো। ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে বাংলার বোতলের সারিও জমতে লাগলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে কেএকজন এসে ক্যারমবোর্ড পেতে ফেললো, ব্যাস সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন কে পাল্লা দিয়ে কত বোতল মাল টানলো তার একটা কম্পিটিশন ছিল, তাই পরিষ্কার মনে আছে ৯টা সাড়ে নটা থেকে দুপুরে খাবার সময় অবধি পাঁচ বোতল বাংলা সাঁটানো হয়ে গেছে। দুপুরে গিয়ে অনেক্ষন ধরে চান করলাম যাতে ধুনকিটা কমে আসে। রাতে আবার গাঁজলুদার সাথে মাল খাবার প্ল্যান যাতে কেঁচে না যায়। ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে উইংসে ঢুকেছি তো ছানা ধরলো আমায়, মাল খেতে গেলাম ওকে বলিনি কেন। কি কান্ড, বললাম আবার চল তাহলে। আবার চললাম কলেজ মোড় সাইকেল চেপে। ছানা সবে মাল খাওয়া ধরেছে, খানিক ট্রেনিং দিয়ে দিলাম বাংলা কিভাবে খেতে হবে তার। এক দেড় বোতল খাবার পর কে একজন এসে জুটলো, খুব সম্ভব চামচিকে। ছানাকে এর মধ্যে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে বেশ গোটাকয় রসগোল্লা খাইয়ে দিয়েছি যাতে নেশাটা চড়া হয়। আবার একের পর এক বোতল জমতে লাগল। মনে আছে যে বেঞ্চিতে বসে মাল খাচ্ছিলাম আমাদের পাশে একটা ট্রাকওয়ালা ভাত খাচ্ছিলো। নেশার ঘোরে ছানাকে বললাম এই দ্যাখ, লোকটা না মাছভাজা খাচ্ছে। এই বলে দুজনে যা অট্টহাস্য লাগলাম, ট্রাকওয়ালা হাফ খাবার খেয়েই মানে মানে কেটে পড়লো। সময় প্রায় আড়াইটে তিনটে হঠাৎ মনে হলো যে না, এবার যথেষ্ট হয়েছে। নেশাটা বেশ চড়েছে, সাইকেল চালিয়ে ফিরতে আর পারবোনা। মনে হয় পাকেচক্রে আবার রামুদাকেই খুঁজে পেলাম রিক্সা করে হোস্টেল দিয়ে আসার জন্যে। ছানা তো তখন বেশ বুঁদ হয়ে আছে। মুখ বন্ধ পাছে জনতা খোরাক দেয়। এদিকে আমার ততক্ষনে ন বোতল বাংলা খাওয়া হয়ে গেছে। খেয়াল ছিল যে বমি করতে হতে পারে, তাই আমার বালতিখানা নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমার রুমমেটের খাটে। প্ল্যান হলো একটু ঘুমোনো।

তা সে গুড়ে বালি, জনগণ মাতাল পেলেই উল্লাসে ফেটে পরে খোরাক দেখার জন্যে। সেদিন আমি ছিলাম পুরো ঠিকঠাক, বুঝতে পারছিলাম নেশা বেশি হয়ে গেছে কিন্তু একটু ঘুমিয়ে নিলেই কেটে যাবে। এদিকে জনগন বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্যে রুম ভর্তি করে ফেলেছে। আমার রুমমেট পড়েছে চরম বিপদে। বমি করলে ওর বিছানা নষ্ট, এদিকে আমাকে সরাতেও পারছেনা। চেষ্টা করলো খানিক তেঁতুলজল কোথা থেকে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতে। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও যখন মুখে গ্লাস গুঁজে দিলো, তখন ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। মুখ ভর্তি তেঁতুলজল পাশ ফিরে ওর খাটের পাশ দিয়ে ফেলে দিলাম। অবস্থা বেগড়বাঁই দেখে রুমমেট হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে ওর খাটেই ঘুমোতে দিলো।

এদিকে নেশার ঘোরে থাকায় ছানার খোরাক মিস করে গেলাম। ছানা ছিল খুব অধ্যবসায়ী ছেলে। শরীরচর্চা করতো, নিয়ম মেনে চলতো। মদ খেয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল চলে গেছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা। রুমে ফিরে ছানা নাকি তাই গোটা পঞ্চাশ ডনবৈঠক দিয়ে দিলো, তার পরও কিছু হচ্ছেনা দেখে আমাদের কাঠের আলমারিতে নাকি দুমদাম ঘুঁষি মারতে শুরু করলো। আমাদের তাপস পাল ছিল পালোয়ান, ছানার রুমমেট, সেও ছানার সেই ফর্ম দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছিলো কি করে ফেলে সেই ভয়ে।

খোঁয়ারি যখন ভাঙলো, দেখি সন্ধ্যে নটা। যতদূর মনে পড়ছে স্পেশাল খাবার ছিল সেদিন। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে গেলাম গাঁজলুদাকে ধরতে আবার রাতের রাউন্ড শুরু করার জন্যে, কিন্তু সব কীর্তিকলাপ শুনে সেদিন আর গাঁজলুদা নিয়ে গেলোনা সাথে। ওই দিনের আগে পরে বেশ কিছু বার সারা দিন ধরে বেলেল্লাপনা করেছি কিন্তু ন বোতল বাঙলার রেকর্ড সেই একবারই।

রাত

দিনের বেলা মাতলামির গল্প মনে করা সহজ কারণ খুব বেশিদিন সারাদিন ধরে ড্রিংক করা হয়ে ওঠেনি। রাতের বেলার গল্প আলাদা। এতো রাশি রাশি গল্প মনে আসে রাতের যে তার ফিরিস্তি একসাথে দেয়া মুশকিল। গোলমালের ব্যাপার হলো যে তার অনেক গল্পেই বাকি সবাই খোরাকের অংশীদার আমি ছাড়া, আমিই ছিলাম খোরাকের কারণ। সে দিনগুলোর কথা আর নাই বা বললাম, তবে ইয়ারমেটদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমাকে সামলে রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। ফার্স্ট ইয়ারের কথাই বলি, কারণ সেকেন্ড ইয়ার থেকে আমরা খানিকটা হলেও সিনিয়র হয়ে গেলাম। তাই প্রথম বছর উইংসে বাইরে থেকে মদ কিনে সদলবলে খাওয়ার আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

এমনি এক দিন দিনু মানে দিনবাজার থেকে এক বোতল হুইস্কি কেনা হয়েছে, গোটা ৭-৮ জন খাবো বলে। আমাদের ৭ নম্বর রুম ছিল তাস, সিগারেট আর মালের ঠেক, তাই আমাদের রুমেই সব এসে জুটলো। সবে পেগ বানিয়ে দু চুমুক দিয়েছি দেখি দরজা দিয়ে কে উঁকি মারছে। পানুপন্ডিত। পানু ছিল আমাদের পাশের রুমে। সিধেসাধা ছেলে, আমাদের ইয়ারের এক মেয়ের ওপর তার প্রচুর ব্যথা তখন। সবে দিন দুই আগে উইংসের সবাই ওকে পরামর্শ দিয়েছে যে সেই মেয়ের মন জিততে হলে গান গাইতে হবে। সেই দু দিন ধরে পানুর রুমমেটরা আমাদের গালি পাড়ছিলো যে সারাদিন পানু তাদের বেসুরো গলায় গান শোনাতে চাইছে। ভাবলাম বেশ তো সুযোগ। পানু আমাদের জিজ্ঞেস করলো, তোরা কি মদ খাচ্ছিস? – হ্যাঁ তুই খাবি? ভেবেছিলাম বলবে না, দেখি ঝপ করে রুমে চলে এসে আমাদের মাঝে বসে পড়লো। – বড় বড় গায়করা স্টেজে গান গাইতে ওঠার আগেই মদ খায়। আমিও খাই, গলাটা ভালো হবে। পানুর যুক্তি শুনে আমরা হাঁ। খোরাক দেখার জন্যে আমরা পানুকে বড় বড় পেগ বানিয়ে দিলাম। সেই তার প্রথম মাল ধরা, কিন্তু টপাটপ বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে ফেললো। আমরাও মজা দেখার জন্যে ওকে আরো বড় পেগ বানিয়ে খাওয়ালাম। নেশাটা যাতে চড়ে আরো, তাই খানিক চিনি, গ্লুকন ডি এই সব ও খাওয়ালাম যখন ও বললো যে মাথা ঝিমঝিম করছে। ওকে বলা হলো যে সুগার কমে গেছে, বেশি করে চিনি খেতে হবে। এখনো জানিনা চিনি খেলে নেশা বাড়ে কিনা কিন্তু তখন সেটা সবাই বিশ্বাস করতাম। হুইস্কির বোতল আর হাফ কৌটো গ্লুকন ডি শেষ করার পর ঠিক করলাম এবার হোস্টেলের বাইরে যাওয়া যাক।

রাতের সেই সবে শুরু। পানুকে বললাম তুই যদি সেই মেয়ের মন জয় করতে চাস তাহলে চল বাইরে লেডিস হোস্টেলে। বাইরে হাওয়া খেলে নেশাও কমবে আর সুস্থ বোধ করলে তাকে একটা গানও শোনাতে পারবি। পানুপন্ডিত টোপ খেয়ে গেলো। দলবল মিলে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেলের বাইরে। দু চারটে সিনিয়র দাদারা কমন রুম থেকে আমাদের সাবধান করে দিলো। ১ নম্বর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সব হাঁটা মারলাম কলেজের দিকে। প্ল্যান ছিল একে একে সব লুকিয়ে পড়বে, তারপর পানুকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করবে আর খোরাক নেবে। সাইকেল ভাড়া নেয়ার দোকান অবধি গিয়ে পানু বসে পড়লো বেঞ্চিতে। ওর নাকি বেদম মাথা ঝিমঝিম করছে। আমরা ওকে লেডিস হোস্টেলের রাস্তা দেখিয়ে বললাম চল হোস্টেলে ফিরে চল। খোঁয়াড়ি অনেকটা হলেও পানু ঠিকই ধরে ফেলল ওকে কোথায় যেতে বলছি। এদিকে পানু বলছে ও হোস্টেলে ফিরবে, আর আমরা মজা লোটার জন্যে বলছি আমরা এখন হাওয়া খেতে বেড়িয়েছি, এক্ষুনি ফিরবোনা, ওর ইচ্ছে হলে ও একা ফিরতে পারে। আমরা গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে আর পানু এদিকে ২-৩ বার হোস্টেল যাওয়ার চেষ্টা করে গোটা ৫০ গজ গিয়ে আবার ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে পড়লো। এখনো মনে আছে পানুর দুলে দুলে খানিক দুর হেঁটে আবার ফিরে আসা।

সেই বসে থাকা অবস্থায় পানুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো যে মদ খাওয়া অতীব খারাপ কাজ আর আমি আর খেঁচু হলাম গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাকি আমরাই খারাপ করে দিয়েছি। ভাবো কান্ড কুড়ি বছরের ধেড়ে খোকা যেচে রুমে এসে হাফ বোতল ফাঁক করে দিয়ে গেলো, আর আমরা হলাম গিয়ে দোষী। যাক সেসব গায়ে না মেখে সবাই বসে রইলাম কি করে তা দেখার জন্যে। অবশেষে আমাদের হোস্টেলের থার্ড ইয়ারের গোটা দু-তিন দাদারা বাইরে থেকে মাল খেয়ে ফিরছিলো, পানু তাদের দেখে ধরলো। দাদা আমাকে একটু হোস্টেল পৌঁছে দেবে আমি আজকে মদ খেয়েছি খুব মাথা ঝিমঝিম করছে। তা সে দয়ালু দাদারা নিজেরা খোরাক নেয়ার জন্যে পানুকে সাইকেলে চাপিয়ে হোস্টেলে নিয়ে গেলো।

ব্যাপারটা সেখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু দুটো ভিন্ন ধরনের ঘটনা বললাম কারণ সব সময় সব কিছু অনাবিল ফুর্তি আর খোরাক দিয়ে শেষ হয়নি তাই। হোস্টেলে চুলকানোর লোকের অভাব ছিলোনা। সেরকমই একজন আমাদের ইয়ারমেট দেখলো বেশ মজার ব্যাপার পানুপন্ডিত আমাদের মানে আমার আর খেঁচুর ওপর খেরে আছে। ও পানুকে প্রচুর পিন মারলো যে আমরা একদম বাজে ছেলে, পানুর উচিত আমাদেরকে বাওয়াল দেয়া। ও আমাদের ক্যালালে আমরা নাকি পালাবার পথ পাবোনা। আর পানুর ব্যথা পানুর হিরোগিরির খবর শুনে নিশ্চয় ওর ওপর ফিদা হয়ে যাবে। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে পরদিন চান করার সময় অন্য উইংসের আরেক পানু আমাদের পানুর প্যান্ট গামছা সব লুকিয়ে দিলো। পিন খেয়ে পানু ভাবলো সেটাও আমাদের কীর্তি। সন্ধ্যে বেলা পানু ধরলো খেঁচুকে, গালাগাল ধাক্কাধাক্কি পানুর নাক ভাঙলো, আমাদের দুজনের আবার ragging শুরু হলো, পানুর বাবার বন্ধু প্রফেসর আমাদের দুজনকে সাসপেন্ড করার হুমকি দিলো – মানে সব মিলে ঘেঁটে ঘ। মোটের ওপর খোরাকটা মনে হয় আমাদের ওপর দিয়েই গেলো, পানুকে রোজ রোজ নাক দেখাতে টাউনে নিয়ে যাওয়া আসা করতে করতে। তবে হ্যাঁ, অত সবের পর শিক্ষা একটা হয়েছিল তবু, যে পাঁড় মাতাল ছাড়া কারো সাথে মদ খেতে বসার অনেক ঝঞ্ঝাট। সে ঘটনার পর থেকে পেঁচো মাতালদের সাথেই ঠেক হতো বেশি।

জলু গিয়েছি প্রথম বার তা সে নয় নয় করে হয়ে গেছে একুশ বছর প্রায়। এখন স্বাধীনতা প্রচুর, লুকিয়ে চুরিয়ে ব্ল্যাকে মদ কিনতে হয়না। ঘরেই খাওয়া যায়। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার, ফাইনাল, চাকরি – যত বয়েস বেড়েছে, মাল খাবার সুযোগও বেড়েছে, আর সেটা যত সহজলভ্য হয়েছে, নেশাভাঙের যে থ্রিলটা ১৩-১৪ তে ছিল, ২৩-২৪এ তার অনেকটাই চলে গেছে। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার যে রোমাঞ্চ সেটা চলে যাবার পর মদ খাওয়াটা তেমন আর উপভোগ্য রইলোনা। দারু খেতে বসে মদের চেয়ে খাওয়ার অর্ডার হতো বেশি। শেষ যে কবে মাল খেয়ে আউট হয়ে গেছি মনেই পড়েনা। ৭ বছর আগে পুজোয় বাড়ি গিয়ে, সেটাই বোধহয় শেষ বার।

তাই জলুর রঙবেরঙের দিনরাত্রির কথাগুলো মনে পড়লে মন চলে যায় কুড়ি বছর পেছনে। বিছানার পাশে বালতি। খোরাকের থেকে বাঁচতে ছাদের ট্যাঙ্কের ওপর শোয়া দালাল। অ্যানিভার্সারীর বাংলা মেশানো রসনা। সিদ্ধিতে মেশানো মাকড়সার জাল। ফাঁকা বোতল ভেঙে নেশার ঘোরে তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়া। হাইওয়ের ধারে বাংলা আর ক্যারম। কলেজে প্রথম দিন ফাইনাল ইয়ারের ছেলের জল বলে দেয়া বাংলা। পোদুদার কাছে ব্যাপ্টিজম। Holy Water এর বদলে রাম। নস্টালজিয়া। কোথায় আজ সেই রাম, কোথায় সেই অযোধ্যা, থুড়ি জলু। হেথা নয় বন্ধু অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। নাকি জলু আছে সেই জলুতেই, খালি চরিত্রগুলো পাল্টে গেছে?
Standard