Bengali culture, calcutta, Fremdsprache, Language, Travel

Ein Tag in Kalkutta

Of all the significant years in my life, 2008 must be the one of them, along with 1994, 2011 and 2014. 2008 was all about change. My life was about to take a new direction, and it certainly was a mad rush trying to get ready for an educational break, a busy job and spending all weekend learning German. 10 years on, my German is schlecht now, and there’s no time to start from where I left. Found this letter, supposed to be about a day out when I showed a few places in Calcutta to a German tourist couple. It was interesting finding out how much they knew about Calcutta (Didn’t know about the Lonely Planet guides then!). If you read German, you’ll see that I had only learnt up to past tense. It was a surprising find in one of my old notebooks…

Howrah bridge from the boat

Howrah bridge from the boat

Hallo Franka,

Wie geht es dir? Jetzt schreibe ich den ersten Brief zu dir. Nächstes mal musst du mir einen schreiben. Jetzt kann ich nicht einen Thema finden, deshalb schreibe ich über meinen Erfahrungen am letzten Samstag.

Da bin ich aufgeweckt um 5 Uhr, damit ich um 6 Uhr zum Flughafen fahren konnte. Ich hatte schon einen schlechten Kopfschmerzen. Ich hatte ein deutsches Paar getroffen, und schon eine Begegnung um 10:15 Uhr vor das indischen Museum fixiert habe. Aber alle schlechten Sachen fande zusammen Statt. Der Flugzeug kam 30 Minuten spät. Dann bin die Taxi von Calcutta Flughafen sehr langsam gefahren, und habe ich zum Haus punkt um 10 Uhr erreicht. Ich habe mich rasiert, habe mich angezogen und dann bin ich unter 10 Minuten hinausgegangen. Endlich hatte ich etwas Glück, weil ich schnell einen Taxi gefunden habe.

Also, war ich nicht so spät, außerdem sagte mir der Mann vorher, dass sie mir erwarten werden bis zum 10:30Uhr. Dort fande ich ihnen, unter den Eingang des Museums, beides Gesetzen auf einer Stühle. Wir haben uns vorgestellt und dann sagte ich ihnen “Wohin möchtet ihr gehen?” Du weißt, als hatte ich kaum Zeit, mochte ich sie um Victoria Memorial und Indisches Museum anzeigen. Aber erstaunlich sagte die Frau, dass sie mochte Kumartuli sehen. Da wurde ich total krank. Ich kaufte die Fahrscheinen bis zum Shovabazar. Das war eures ersten Erlebnis über Calcutta U-Bahn. Während unseres Trip diskutierten wir über verschiedenen Thema, Die Politik, Das Leben des Bengalens, Die bengalische Philosophie usw. Seit 25 Jahre wohne ich im Calcutta, aber war ich nie zum Kumartuli gegangen. Die Gasse waren kurz, aber die Häuser an Beides Seite sind alt und zu groß. Endlich erreichten wir das Studio eines Künstlers. Dort gab es viele großen Statuen der Durga. Fragtet ihr mir viele Fragen über die Religion und Gott. Ich wusste nicht viel aber konnte ihnen beantworten.

Dann sagte der Mann,”Wir möchten zum Fluss gehen”. Während liefen wir durch die kleine Gasse, sahen wir viele schönen und großen Häusern, die vorher einhundert Jahren gebaut wurden. An dem Ufer des Ganges sahen wir ein sehr großes sechsstöckiges Haus. Der Fluss sah aber sehr schmutzig aus, gab es Pflanze in dem Wasser, das total Gelb war. Nachdem gingen wir zum Shovabazar Fährhof. Wir standen auf der Kurzer Brucke, wenn Conny, die Frau sah ein Boot kommen. Sie möchten mir kaffeetrinken einzuladen, aber zu bootfahren auch. Da plante ich im Boot nach Howrah gehen und dann mit dem Bus zum Indian Coffee House fahren. Es war schon nachmittags. Und die Frau war krank vor 4 Tagen. Die Sonne war es nicht da, aber die Hitze war sehr ärgerlich. Trotzdem hatten wir viel genossen, ein Bootsfahrt zu machen. Es war schön, die zwei Ufern. Ich zog ihnen die “Ghats” an. Dann waren wir von Howrah Bahnhof mit einem Stadtbus nach College street gefahren, damit bei Indische Kaffee Haus zu besuchen. Sie waren erstaunt : so viele Bücher und so viele Geschäfte!

Aber da, fühlte ich mich nicht so wohl. Treffen einem deutsches Paar, für mich, war eine Gelegenheit, in Deutsch zu diskutieren. Ich spreche nicht so gut im Klass, da wünschte ich, wie schön wäre es, wenn ich wie ihnen deutsch sprechen könnte. Aber sie sprachen immer Englisch!!!Nur wenn Sie die Bedeutung nicht verstehen konnten, fragten sie mir in Deutsch!!! Dann sagte ich mich : da geht nicht mehr! Punkt wir waren wir in die Cafe eingegangen, sagte ich “vielleicht konnen wir in Deutsch sprechen, um uns etwas besserer kennenzulernen”. Dort gab es viele Leute, und der Platz war sehr laut, deshalb müssten wir auch laut sprechen. Wenn der Ober nie kommt schnell, hatten wir viele Sachen diskutiert. Wir aßen Tomatensuppe und tranken Kaffee mit Creme. Dort hatten wir gute Zeit verbrachten. Dann gingen wir nach Millennium Park. Die Frau fühlte sich unbequem, und sind wir schnell in die Park erreichten.

Dort hatten wir über zwei Stunden verbrachten. Wir hatten ein Platz gefunden, die vor dem Fluss stand. Es gab Luft, das macht uns etwas bequem. Wir diskutierten über die Religion, Calcutta, die Volkskultur, die Geschichte des Calcuttas, indische Wirtschaft, die Politik, Glauben des Inders und Deutsches, meine Gedanken über Zukunft, ihre Plan usw. Ich habe viele Tatsache über Deutschland gelernt, die ich sonst nicht wissen könnte. Plötzlich sah ich die Uhr an, und es war schon 16 Uhr. Schnell hatte ich mich entschuldigen und zum MMB führte.

Vielleicht ist der Brief zu lang, aber möchte ich alle Verbformen benutzen. Bitte korrigiere-mich schnell. Bis Samstag.

Viel Grüsse

Subhadeep

Advertisements
Standard
Bengali, Cuisine

ফিশ কবিরাজি আর মিষ্টি দই হ্যাক

এবার দুটো চটজলদি রান্নার পদ্ধতি লিখছি। প্রথমটা আমার আবিষ্কার, দ্বিতীয়টি আমার কলেজের এক বন্ধুর, আমি টুকে শেয়ার করছি।

ফিশ কবিরাজি

ফিশ কবিরাজির অনেক রেসিপি ইন্টারনেট ঘাঁটলে পাওয়া যাবে। সেগুলো আমার এই কবিরাজির চেয়ে ঢের ঢের ভালোও হবে আশা করা যায়। তবু এই পদটা শেয়ার করলাম কারণ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এটা রান্না করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগবে। এতো তাড়াতাড়ি আর কোনো হাঙ্গামা ছাড়া কবিরাজি রেসিপি হয়তো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ফেসবুকের দৌলতে অনেক নতুন ব্যাপার-স্যাপার ই চোখে পড়ে, সেরকমই কলকাতার এক গ্রুপ আছে যেখানে রকমারি বাঙালি ও অবাঙালি খাবারের খোঁজ পাওয়া যায়। বিদেশে আসার পর থেকে অনেক খাবারের জন্যই হাপিত্যেশ করতাম কিন্তু আস্তে আস্তে বেশিরভাগ খাবারই দেখলাম কিনতে পাওয়া যায় অথবা হুবহু এক না হলেও অন্য দেশের খাবার পাওয়া যায় যা আমাদের খাবারের মতোই। যেমন মোমো খাবার ইচ্ছে করলো তো পোলিশ দোকানে গিয়ে কিনে নিলাম পিয়েরোগি, ভাজলে ফ্রাইড মোমোর মতন স্বাদ। যাহোক, তা নিয়ে অন্য একদিন লেখা যাবেখন। দু-তিনটে খাবার তবে পাওয়া দুষ্কর আর তাদের জন্যে সেইজন্য হাপিত্যেশও বেশি। সে সব খাবারের মধ্যে এক হলো ফিশ বা চিকেন কবিরাজি। এছাড়াও আছে ঢাকাই পরোটা, ইলিশ মাছের ডিম্, ইলিশ শুঁটকি ইত্যাদি।

যাক ফিশ কবিরাজিতে ফেরা যাক। হ্যাঁ, রান্নার উপায় পড়ে আমাকে গালি দিতে শুরু করবেননা যেন, আগেই বলেছি এটা শর্টকাট রান্না। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্যে। টাটকা ভেটকি মাছের ফিলে দরকার নেই এই কবিরাজির জন্যে। বাজার থেকে কিনুন Breaded Fish যেগুলো সাধারণত ওভেনে বেক করতে হয়। Basa , Hake, Haddock অনেক প্রকারের মাছই পাওয়া যায়। মাছ গুলোকে ওভেনে বেক করে নিন বা তাওয়াতে অল্প তেল দিয়ে ভেজে নিন। প্যাকেটে যতক্ষণ রান্না করতে বলা আছে তার চেয়ে ৫ মিনিট কম রান্না করুন, কারণ কবিরাজি বানানোর সময় আর একবার ভাজা হবে। এবার খানিক লেবুর রস, কাঁচালঙ্কা আর রসুন বাটা-র একটা কাই তৈরী করে মাছের অল্প ভাজা টুকরোগুলোর ওপর আলতো করে মাখিয়ে নিন। এবার একটা চওড়া পাত্রে বেশ কিছু ডিম্ ফেটিয়ে নিন। তাতে অল্প নুন, গুঁড়ো মরিচ দিতে পারেন। এবার কড়াই বা ফ্রাইং প্যানে অনেকটা তেল দিয়ে ফেটানো ডিম্ অল্প অল্প করে ছিটিয়ে দিতে হবে। একসাথে অনেকটা দিলে কবিরাজির জায়গায় ওমলেট হয়ে যাবে, তাই খেয়াল রাখতে হবে খুব ছোটো ছোট ফোঁটার আকারে দিতে। whisk ব্যবহার করতে পারেন, নাহলে হাত ডিমের মিশ্রনে ডুবিয়ে কড়াইতে হাতটা ঝেড়ে নিন। তেল বেশ গরম হওয়া দরকার। এবারে বেশ কিছুটা ডিম্ দেয়ার পর আস্তে আস্তে খাস্তা হয়ে ভেজে ওঠা ডিমগুলো যখন একসাথে জুড়ে জুড়ে একটা bedding তৈরী করেছে তখন তার ওপর একটা মাছের টুকরো দিয়ে দিন। তারপর আবার এক প্রস্থ ডিম্ ছড়িয়ে দিন মাছের টুকরোর ওপর। সাথে সাথে না উল্টে প্রথমে হাতায় করে গরম তেল ডিমের ওপরে দিয়ে দিন যাতে ওল্টানোর আগেই ডিমের ঝুরি তৈরী হয়ে যায়। এবার উল্টে আর এক-দেড় মিনিট রেখে তুলে নিন। সাথে কাঁচা পেয়াঁজ, শসা আর সর্ষের কাসুন্দি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ফিশ কবিরাজি সাথে কাসুন্দি আর শসাকুচি

ফিশ কবিরাজি সাথে কাসুন্দি আর শসাকুচি

আর চিকেন কবিরাজি? মাছের বদলে কিনে আনুন চিকেন বা টার্কি escalope। বাকিটা কপি পেস্ট।

মিষ্টি দই

আমি যে সময় বড় হয়েছি তখন ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিলোনা। গরমকালে তাই মিষ্টির দোকান থেকে কিনে আনা ঠান্ডা মিষ্টি দইয়ের মাহাত্ম্যই ছিল আলাদা। সেই মিষ্টি দইয়ের পাশাপাশি আর একটা প্রথারও চল ছিল খুব, ঘরে পাতা দই। দইয়ের ভাঁড়ে থেকে এক চিলতে দই তুলে নিয়ে তাতে হালকা গরম দুধ দিয়ে সারা রাত রেখে দিলেই হয়ে যেত এই ঘরে পাতা দই। তারপর আবার সেই দইয়ের থেকে খানিকটা সাজা তুলে রেখে আবার পরের দিনের দই পাতা হতো। এভাবে চলতো বেশ কয় দিন, তারপর দইটা কেমন জল জল হয়ে আসতো আর স্বাদটাও হয়ে যেত কেমন ঝাঁঝালো। কলকাতার বাইরে মিষ্টি দই পাইনি, তাই তেমন খাওয়াও হয়নি এতদিন। এখানে সুপারমার্কেটে একটা বস্তু পাওয়া যায়, Creme Caramel. খেলে মনে হবে যেন লাল দই খাচ্ছি। আর এখানে yogurt বলে যেটা পাওয়া যায় তা আমাদের টক দইয়ের সমান। তাও আবার বেশ জোলো।

চটজলদি দই বানানোর এই পদ্ধতির কৃতীত্ব আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক সহপাঠিনীর। সংসার, ছেলেপুলে, ডক্টরেট এসব সামলেও বিভিন্ন জিনিস রান্না এবং তৈরির চেষ্টা করে। তার দইয়ের রেসিপি দেখে বিশ্বাসই হয়নি ব্যাপারটা এতো সহজ। অনেকটা আর্কিমিডিসের ইউরেকা বলার মতো, ছাগল এরকম একটা সহজ ব্যাপার এতদিন Zানতি পারনির মতো। এখানে বিলকুল কপি মারলাম রান্নাটা। তবে শেষে একটা সংযোজন রইলো যেটা আমার নিজের, খানিকটা ভুলক্রমেই আবিষ্কৃত।

যাক, মিষ্টি দই বানানোর জন্যে লাগবে খানিক Plain Yogurt আর কনডেন্সড মিল্ক। দুটোই সহজলভ্য, যেকোনো সুপারমার্কেটে পাওয়া যায়। এবার একটা মাইক্রোওয়েভ প্রুফ পাত্রে সমান পরিমান Yogurt আর কনডেন্সড মিল্ক নিতে হবে। মিষ্টি যদি একটু কম পছন্দ করেন তাহলে সামান্য কম কনডেন্সড মিল্ক, মোটামুটি ৬:৪ অনুপাতে মেশাতে হবে। হাতা বা চামচ দিয়ে পুরো মিশ্রণটাকে আলতো করে বেশ খানিকক্ষণ মিশিয়ে নিন। এরপর পুরো পাত্রটা মাইক্রোওভেয়ে দিয়ে, Medium পাওয়ারে কিছুক্ষন গরম করতে হবে। (আমার মাইক্রোওয়েভ ৭৫০W, আমি ৩০০ এ বেক করেছি) । কতক্ষন রান্না করতে হবে সেটা পরিমানের ওপর নির্ভর করছে। এক ছোট বাটি করতে ১ মিনিট, ১ কেজি করতে প্রায় ১৫ মিনিট কিন্তু এক বারে ২ মিনিটের বেশি রাখবেননা। ওভেন থেকে বার করলে মিশ্রণটা তখনও একটা নরম থাকা দরকার, অনেকটা জেলির মতো, নাহলে দই জমাট হয়ে যাবে। ব্যাস, খানিকক্ষণ ঠান্ডা হতে দিয়ে সোজা পেটে চালান করে দিন, নাহয় ফ্রিজে রেখে খান ঠান্ডা মিষ্টি দই। গ্যারান্টি দিলাম দোকানের Yogurt বা Creme Caramel এর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদ পাবেন।

তাছাড়া অন্যান্য স্বাদও চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। যেমন কনডেন্সড মিল্ক পরিমানের আদ্ধেক দিয়ে, বাকিটা দিন mango pulp, আম দই হয়ে যাবে। আমি নলেন গুড় দিয়েও চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পরিমান ঠিক হয়নি, তাই দইটা কেটে গিয়েছিল।

মিষ্টি দই মাইক্রোওয়েভ থেকে বার করার পর

মাইক্রোওয়েভে মিষ্টি দই বানানোর পদ্ধতি। ভিডিওতে দেখুন।
(সূত্র: ঈশান টিউব )

এ তো গেলো চোথা মারা পার্ট। শেষটুকু ও বলে দি। বেশ খাচ্ছিলাম দই বাটি বাটি তৈরী করে, হঠাৎ শখ হলো এক গামলা দই বানাবো। ৫০০গ্রাম Yogurt আর ৩৯০গ্রাম কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে দই বানাতে গিয়ে এতক্ষন লাগলো যে শেষে দইটা একদম জমাট বেঁধে গেলো। সেই মিষ্টির দোকানের হালকা নরম, চামচ চালালেই পরত পরত উঠে আসবে সেই ভাবটা আর নেই। কিন্তু খেতে গিয়ে মনে হলো আরে এ তো অনেকটা শ্রীখণ্ড। তাই বলি, যদি শ্রীখণ্ড বানাতে যান এই উপায়ে, একটু বেশিক্ষন মাইক্রোওভেয়ে রাখবেন আর শেষের ২ মিনিট ফুল পাওয়ারে। শ্রীখণ্ড বানানোর সময় এলাচ, জাফরান, পেস্তা কুচি এসবও অল্প দিয়ে দেবেন। তারপর ফ্রিজে রেখে দিন। জমে যাবে। পাক্কা।
Standard
Bengali, east bengal, Sourav Ganguly

দাদাগিরি এবং ঘটি বাঙালের রেষারেষি

দাদাগিরি ১৯শে আগস্টের শো। সম্পূর্ণ এপিসোড।
(সূত্র: BDUpload )

আমি ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক একদম ছোটবেলা থেকেই। উদ্বাস্তু পরিবারে জন্ম, বাঙাল আচার বিচার জীবনধারায় বড় হয়েছি, তাই ইস্টবেঙ্গল ছাড়া যে অন্য কাউকে সমর্থন করা যায় সেকথা কখনও মাথায়ই আসেনি। তারপর যত বড় হয়েছি যুক্তি তথ্য ইত্যাদি দিয়ে নিজের সব পছন্দ অপছন্দ গুলোকে আবার ঝালিয়ে নিতে হয়েছে। সেই নিক্তিতে পছন্দ অপছন্দের লিস্টিটারও অনেক অদলবদল হয়েছে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের থেকে সমর্থন তুলে নেবার কথা কখনও মাথায়ই আসেনি, যতই সে ইপিএল বুন্দেসলিগা ইউএফা কাপের তাবড় তাবড় খেলুড়েরা টিভির পর্দায় কেত মারুক না কেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব হলো ঘুরে দাঁড়ানোর নাম। ইস্টবেঙ্গলের সাথে জুড়ে আছে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের লড়াই করার ইতিহাস। যদিও এখন যুগের ধর্ম মেনে আদ্ধেক খেলোয়াড়ই বিদেশী, তার মানেই যে দলের আদর্শ পাল্টে গেছে তা তো নয়। তার ওপর বন্ধুর দাদু ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের ডাকসাইটে খেলোয়াড়, পাড়ার আরেক বন্ধুও খেলেছে ইস্টবেঙ্গলে, সেই সূত্রে ইস্টবেঙ্গলের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছিলো অনেক দিনের। এখন বহুদিন মাঠে গিয়ে খেলা দেখিনা, তবু মোহনবাগানের ইস্টবেঙ্গলের সাথে খেলা থাকলেই আবার ফিরে যাই কুড়ি পঁচিশ বছর আগে। তা কদিন আগেই দেখলাম দাদাগিরি নামের অনুষ্ঠানে নাকি কেউ একজন বাঙালদের নিয়ে অনেক কুরুচিকর মন্তব্য করেছে আর সৌরভ গাঙ্গুলী তাতে বাধা না দিয়ে আরো হাসাহাসি করেছে। এই নিয়ে ইস্টবেঙ্গলের ফেসবুক তোলপাড়। কেউ দাদার মুণ্ডপাত করছে তো কেউ সেসব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের যারা ওই শোতে উপস্থিত ছিল। তোলপাড় হচ্ছে ইন্টারনেট, হওয়াটা দরকার, কিন্তু এপার বাঙলা ওপার বাঙলার রেষারেষির ভূমিকাটা জানা প্রয়োজন।

একশ বছর আগে বাঙালদের প্রতি বিদ্বেষমূলক ব্যবহার ছিল হয়তো দৈনন্দিন ঘটনা। আর সেভাবেই সৃষ্টি ইস্টবেঙ্গল দলের। ১৯২০ সাল থেকেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ তাই ঘটি বাঙালের দ্বন্দ্ব হয়ে দাঁড়ালো। আওয়াজ টিটকারি ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসবের লক্ষ্য ছিল বাঙালরা। দেশভাগের পর ভিটেমাটিছাড়া মানুষরা যখন পশ্চিমবঙ্গে এলো, তখন তাদের বেশিরভাগেরই এসেছে খালি হাতে। সরকার থেকে পুনর্বাসন মেলে কলকাতার শহরতলিতে যেখানে তখন জলাজমি ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। এক চিলতে জমি, সেখানে রোদ ঝড় জল মাথায় করে, দিন আনি দিন খাই করে শুরু হয়েছিল সেই মানুষগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। কোনোদিন কেউ কিছু পাইয়ে দেয়নি তাদের। নিজের সামর্থ্য আর একরাশ স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই সহায় ছিলোনা তাদের। বাকিটা ইতিহাস। বাঙাল মানেই টিঁকে থাকার লড়াই, উদ্যম অধ্যবসায়, পায়ের তলায় জমি খুঁজে নেয়ার উদগ্র প্রচেষ্টা।

কিন্তু সেই অসম্ভব একরোখা মনোভাবের মানুষেরা যখন পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা শুরু করলো, তখন প্রথম প্রথম সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায় হলেও এপার বাঙলার মানুষরা মেনে নিয়েছে বাঙালদের। আস্তে আস্তে ঘটি হেঁশেলঘরেও ঢুকে পড়েছে কচুর লতি, পুইঁশাক আবার তেমনি বাঙালরাও রান্নায় জুড়তে শিখেছে খানিক চিনি। ঘটি বাঙাল বাড়ির মধ্যে বিয়েও আজ হামেশাই হয়, কেউ সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা। ইস্টবেঙ্গলে ঘটি খেলোয়াড় খেলে যেমন মোহনবাগানে খেলে বাঙাল প্লেয়ার। নিমরাজি হয়েও, খানিক চাঁদ সদাগরের মনসা পুজোর মতো ঘটিরা জায়গা করে দিয়েছে বাঙালদের তাদের দৈনন্দিন জীবনে। উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষগুলোর ওপর তারা চড়াও হয়নি রাজাকারদের মতো। আমার আগের প্রজন্ম দুই তরফেই বাঙাল, তাদের জীবনে প্রথম স্থায়িত্ব আসে পশ্চিমবঙ্গে আসার পর। তাদের বাকি জীবন পশ্চিমবঙ্গে নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় কাটাতে পারার জন্যে এই ঘটিদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কৃতিত্ব তৎকালীন সরকারের অবশ্যই, কিন্তু যার যতটুকু যোগ্য কৃতজ্ঞতা সেটা স্বীকার করাটাই যথার্থ।

তাই এই রেষারেষি, ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেয়া ঘটি বড় না বাঙাল, এ সবই খানিকটা খুনসুটি। ঘটিরা সেটা যেমন উপভোগ করে, বাঙালরাও তাই। ওদের গেঁড়িগুগলি তো আমাদের কচু ঘেঁচু , ওদের নুচি নেবু নঙ্কা তো আমাদের বেঙ আর ভ্যাক। ওরা বলে ওরে লোটা, আমরা ডাকি ওরে মাচা। আমাদের পূর্ব প্রজন্ম যারা প্রথম এখানে বসবাস করা শুরু করে তাদের লড়াই আজ শেষ। তাদের একমাত্র আশা ছিল “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। দুধে ভাতে না থাকলেও, প্রতিদিন প্রাণের ভয় আজ আর নেই। আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে ঘটি বাঙালের মিলমিশে। কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে গেলে বাঙাল পরিচয়টা আপনা থেকেই চলে আসে। আমাদের সেটুকু দায়বদ্ধতা রয়ে গেছে আগের প্রজন্মের প্রতি। তাই শুঁটকি খাই বললে লোকে যখন নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করে কোথাকার বাঙাল, বুক ফুলিয়ে বলতে পারি চাটগাঁ। ছোটবেলায় পিসি জোর করে নিয়ে যেত চট্টগ্রাম পরিষদের অনুষ্ঠানে। তখন মনে হতো এসব কিম্ভূত ব্যাপারে আবার কেন, কোথায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেব না এখানে হ্যাজাচ্ছি। কিন্তু আজ ভাবলে মনে হয় সেটা আসলে ছিল অনেকটা রীলে দৌড়ের মতো, আগের প্রজন্মের হাত থেকে আমাদের হাতে মশালটা ধরিয়ে দেয়া।

তাই ঘটি আর বাঙাল যে ভাই ভাই এক ঠাইঁ তা নয় এখনো। খেলার মাঠে গালিগালাজ ইঁট পাটকেল এখনো পড়ে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান এখন আর ঘটি বাঙালদের যুদ্ধ নয়। অনেক বাঙালই মোহনবাগানকে সমর্থন করে, আবার অনেক ঘটি ইস্টবেঙ্গলকে। আর সেই লড়াইটা এখন খানিকটা প্রতীকী। তবু অনেক সময় অতি উৎসাহে মাত্রা ছাড়িয়ে যায় শালীনতা। অনেক সময়ই ঘটি বাঙাল বাগবিতণ্ডায় গা জ্বলে উঠেছে অপমানে, যোগ্য জবাব দিয়ে তবেই মন হয়েছে শান্ত। তারপর মাথা ঠান্ডা হলে ভেবে দেখছি যে গোটা ব্যাপারটাই কি অপ্রয়োজনীয়। আর ঠিক সেই অনুভূতিই হলো যখন দাদাগিরির খবরটা পেলাম।

প্রথমে ফেসবুকে পড়ে কিছুই বোঝা গেলোনা কি হয়েছে। আস্তে আস্তে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারে বোঝা গেলো যে শোতে গোটা বাঙালদের অপমান করা হয়েছে। অনেক খুঁজেপেতে ইউটিউবে একটা ছোট ক্লিপ পেলাম যেখানে দাদা বলছে (বাঙালরা) পাঁচিল টপকে টপকে এসেছে? আর বৈদ্যুতিন মাধ্যমে চলেছে রাগ দুঃখ অভিমানের পালা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম একটা সম্পূর্ণ ক্লিপ গোটা অনুষ্ঠানটার। অবশেষে দেখলাম কি সেই অতি কুরুচিকর প্রোগ্র্যাম।

কিন্তু যা দেখলাম তা তো যা পড়লাম বিভিন্ন জায়গায় তার সাথে খুব একটা মিললনা! হ্যাঁ ওই সৌগত ঘোষ লোকটা খুব গা জ্বালানো ভঙ্গিতে বাঙালদের নিয়ে কটূক্তি করেছে বটে, কিন্তু তার সাথে সৌরভকে টানার খুব একটা যুক্তি চোখে পড়লোনা। বরং দেখলাম অনুষ্ঠানের শুরুতেই দাদা বলছে ইস্টবেঙ্গল ঢুকলো ভালোভাবে কিন্তু মোহনবাগান হোঁচট খেলো কেন? আর ওই পাঁচিল টপকে এসেছে মুহূর্তটায় গিয়ে দেখলেও চোখে পড়বে যে ইস্টবেঙ্গলের অনিন্দ্যবাবু যথার্থ জবাবই দিয়েছেন। গোটা অনুষ্ঠানে তিনি দারুন টেম্পেরামেন্ট দেখিয়েছেন, নিচু রুচির খেউড় করে লোক হাসানোর চেষ্টা করেননি। মোহনবাগানকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকার জন্যে ধন্যবাদ দিয়েছেন, তেমনি মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে ১৯১১ সালের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারানো দলের সাত জনই বাঙাল ছিল। পাঁচিল টপকে আসার কমেন্টে সৌরভ মোহনবাগান প্রার্থীর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসেছে ঠিকই কিন্তু সেটাকে সব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা যেভাবে বাঙালদের অপমান করার সমর্থন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, ব্যাপারটা আদপে সেরকম কিছুই নয়। সৌরভকে ক্ষমা চাইবার দাবি তো যথাযথ নয় একদমই। সৌরভ গাঙ্গুলী যথেষ্ট দক্ষ ভাবে গোটা অনুষ্ঠানটা সঞ্চালন করেছে। আর বাঙালরা হার না মানার আরেক নাম। এই সব ঠুনকো সমালোচনাতে যদি গায়ে ফোস্কা পড়ে এখন, তাহলে বলতেই হয় সেটা খুব একটা বাঙাল সুলভ আচরণ নয়। নানা অজুহাতে কাঁদুনি গায় তো মোহনবাগান। আমরা ওদের দলে কবে থেকে ভিড়লাম?

তবে যদি ধরে নেন এ লেখা পরে যে সৌরভের অন্ধ ভক্ত আমি, তাই তার সাতখুন মাফ, সেটা বিন্দুমাত্রও সত্যি না। খেলোয়াড় সৌরভকে যথেষ্টই ভালো লাগতো, কিন্তু তার সাথে মানুষ সৌরভের যে অনেকটাই ফারাক সেটা বহুদিন আগে থেকেই খেয়াল করেছি। সৌরভ যে আদপে ক্ষমতার দাস সেটা বিগত কয়েক বছরে মাঠের বাইরে সৌরভের কীর্তিকলাপ দেখলেই নজরে পড়ে। পুরসভা নির্বাচন, সিএবি সচিব নির্বাচন, ডালমিয়াকে সরানো, আবার তার ছেলের হাত ধরেই সিএবিতে ফেরা, ক্রিকেট একাডেমির জমি, পার্ক স্ট্রিটে রেস্তোরাঁ – অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য আর ক্ষমতার অলিন্দের হাতছানি যে সৌরভকে চিরকাল প্রভাবিত করে এসেছে তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। খেলোয়াড় এবং ভারতের অধিনায়ক সৌরভ যতটাই অনুপ্রেরণা জাগায়, মাঠের বাইরের সৌরভের এই অন্যরূপ দেখে মনে হয় যে সেই অন্য সৌরভের ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্রও এই মানুষটার মধ্যে নেই। তাই পাঁচিল টপকে আসার বিষয়ে সৌরভকে অকারণে সমর্থন করার কোনো কারণ আমার নেই।

আমার বক্তব্য হলো ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান স্পেশাল এপিসোডে দু পক্ষই যে একে উভয়কে নিয়ে কিছু না কিছু বলবে সেটাই প্রত্যাশিত। ক্ষমা যদি চাইতেই হয়, সেটা চাইবার কথা যে ওই মন্তব্য করেছে সেই সৌগত ঘোষের। অনিন্দ্যবাবু শালীন ভাবে জবাব দিয়েছেন যে সীমান্তে পাঁচিল কোনোকালে ছিলোনা যে পাঁচিল টপকে আসতে হবে। বাঙালরা এসেছে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে। সৌরভকে কাঠগড়ায় তোলার মতো অপরাধ হয়নি কিছু। তার মানে কি জবাব নেই বাঙালদের খোঁচা মারা টিপ্পনীর? আছে বৈকি। কিন্তু সে জবাব হবে মাঠে। তার চেয়ে বড় জবাব আর কিছু হয়না। কারন যতবার ডার্বি, মাচা তোরা হারবি। এ তো কথায়ই আছে।

পুনঃশ্চ: এই লেখাটা কিন্তু ঘটি বাঙাল নির্বিশেষে লেখা। ইস্টবেঙ্গল মানে আর ওপার বাংলা নয়, যেমন মোহনবাগানও আর কেবল ঘটিদের ক্লাব নয়। এই গোটা ঘটনাটার সূত্রপাত বাঙালদের নিয়ে। তাই লেখার মূল উদ্দেশ্য কিছু বাঙাল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকের সৌরভকে লক্ষ্য করে মুন্ডপাতের দাবির যথার্থতা নিয়ে। অনেক জোগাড়যন্ত্র করে ভিডিওটা জোগাড় করেছি। লিঙ্কটা দেয়া রইলো, অনুগ্রহ করে দেখুন, আর তারপর বিচার করুন সৌরভ অনুষ্ঠানে মোহনবাগানের হয়ে পক্ষপাতিত্ত্ব করেছে কিনা।
Standard
calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Standard
Bengali, Life experience, Memory, Nostalgia

জলপাইগুড়ির দিনরাত্রি

সেই কবে তারাপদ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম এক জবরদস্ত অযোধ্যা সিং-এর রাম খাওয়ার গল্প, যার শেষের লাইনটা ছিল সেই অযোধ্যা আর নেই, আর সেই রামও আর নেই। নাঃ এটা পলিটিক্যাল লেখা নয়, রাম নিয়ে রসিকতা করার ধ্যাষ্টামো আমার নেই। সে রাম খালি হনুমানদের, আমি যে রামের কথা বলছি সেটা একান্তই এই হনুর। মাল গাঁজা সহযোগে বেলেল্লাপনার চরম উদাহরণ রেখে গেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার দিনরাত্রিতে। হঠাৎ করে সে বইয়ের কথা মনে পরে মনটা চলে গেলো ১৮-১৯য়ে, হ্যাঁ সে ছিল একটা সময় বটে। জলুতে তখন ফার্স্ট ইয়ার। সব পোনাদের উপদেশ মেনে লেখাপড়া ডকে, আরে বাপু ক্যাম্পাসিং এমনিও হয়না, ওমনিও হয়না, পড়ে আর কি ছিঁড়বি। কাজেই চালাও দেদার বিড়ি সিগ্রেট বাংলু। জলুর কথা মনে পড়ায় ভাবলাম, সুনীল সমরেশ সন্দীপনের কলকাতার দিনরাত্রির চেয়ে আমাদের জলুর দিনরাত্রিগুলো কম রঙিন ছিলোনা। রামের কথাই যখন উঠল তাহলে রাম দিয়েই শুরু করি। ফোর্থ ইয়ারের নামকরা মাতাল পোদুদা একদিন রাতে আমাদের হোস্টেল এ এসে আমাদের দুজনকে নাম ধরে খোঁজা শুরু করলো, কিবে তোর নাম হনু? হ্যাঁ দাদা। আর তুই খেঁচু। হ্যাঁ। শুনেছি তোরা নাকি হেভি মাল খাস? এই দেখ এক বোতল রাম, চল রুমে চল। আর বোতল মানে পাঁইট ফাঁইট নয়, পুরো খাম্বা। তবে আদ্ধেক আগেই সাঁটিয়ে এসেছিলো মহাপুরুষ। আহা সেই যে হল অফ ফেমে নাম ওঠার অনুভূতি হয়েছিল, জীবনে আর কখনো সেরম কৃতার্থ বোধ করিনি। পুরো চার বছরের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ উজাড় হয়ে যাবে, সেসব থেকে বেছে বেছে দুটো ঘটনাই শেয়ার করলাম। তখনকার বন্ধুবান্ধব সব এখন দায়িত্বশীল চল্লিশ ছুঁইছুঁই ধেড়ে মানুষ, কাজেই তাদের আর বিব্রত করলাম না আসল নামধাম বলে, পড়ে যাদের যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে যাবে, আর বাকিদের বলি আসল নাম দিয়ে কি ঘন্টা হবে হ্যাঁ?

দিন

সেটা ৯৭ সালের মে মাসের কথা। ফার্স্ট ইয়ার। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার ২ সপ্তা আগে অন্ডকোষ টাকে উঠে গেছে, তখন প্রমাদ গণছি কেন সারাটা বছর না ঘষে কাটিয়েছি, এবার হয়ত খেলাম ইয়ার ল্যাগ। এমন সময় টাউনে ব্যাপক বাওয়াল হয়ে কলেজ বন্ধ। সে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। এবার কি করা? বাড়ি যাবার বেশ ১০-১২ দিন দেরি আছে কিন্তু কলেজে কিচ্ছু করার নেই আর টাউনে যাওয়া বন্ধ ফের বাওয়ালির ভয়ে। এমন সময় একদিন সকল ৯টায় সবে দাঁত মাজছি এমন সময় হোস্টেলের করিডোরে দেখতে পেয়ে রামুদা হাঁক মারলো, হনু মদ খাবি চল। ভাবলাম খোরাক দিচ্ছে, উত্তর দিলাম দাঁড়াও ৫ মিনিটে আসছি। ৫ মিনিট পর দেখি কি কেলো, রামুদা এসে হাজির, আমাকে আর খেঁচুকে নিতে। ভাবলাম হোস্টেলে বসে বসে ছেঁড়ার চেয়ে খানিক মাল টেনেই দেখা যাক, সকালে কখনো খাইনি। সাড়ে ৯টা নাগাদ তিন মূর্তি গিয়ে হাজির হলাম কলেজ মোড়ে. পাতি দরমার দোকান, তাতে সকালে খিচুড়ি চা বিস্কুট এসব বাদ দিয়ে আড়ালে আবডালে বাংলাও পাওয়া যায়। চেনা লোকদের পেতে একটু সুবিধা বেশি। তা সে দোকানে গিয়ে গোটা কয় বাংলা নিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। সামনে NH 31 ফাঁকা বললেই চলে। গরম আসছে আসছে তবে তখন আজকালেরমতো পেছন ফাটানো গরম পড়তোনা। তাই গাছের ছায়ায় আরাম করে বসে আড্ডা জমলো চরম, সাথে বাংলার মৌতাত। তখন সিগারেট খাওয়া ছাড়িনি তাই মদ সিগারেট জুটি জমে গেলো। ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে বাংলার বোতলের সারিও জমতে লাগলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে কেএকজন এসে ক্যারমবোর্ড পেতে ফেললো, ব্যাস সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন কে পাল্লা দিয়ে কত বোতল মাল টানলো তার একটা কম্পিটিশন ছিল, তাই পরিষ্কার মনে আছে ৯টা সাড়ে নটা থেকে দুপুরে খাবার সময় অবধি পাঁচ বোতল বাংলা সাঁটানো হয়ে গেছে। দুপুরে গিয়ে অনেক্ষন ধরে চান করলাম যাতে ধুনকিটা কমে আসে। রাতে আবার গাঁজলুদার সাথে মাল খাবার প্ল্যান যাতে কেঁচে না যায়। ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে উইংসে ঢুকেছি তো ছানা ধরলো আমায়, মাল খেতে গেলাম ওকে বলিনি কেন। কি কান্ড, বললাম আবার চল তাহলে। আবার চললাম কলেজ মোড় সাইকেল চেপে। ছানা সবে মাল খাওয়া ধরেছে, খানিক ট্রেনিং দিয়ে দিলাম বাংলা কিভাবে খেতে হবে তার। এক দেড় বোতল খাবার পর কে একজন এসে জুটলো, খুব সম্ভব চামচিকে। ছানাকে এর মধ্যে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে বেশ গোটাকয় রসগোল্লা খাইয়ে দিয়েছি যাতে নেশাটা চড়া হয়। আবার একের পর এক বোতল জমতে লাগল। মনে আছে যে বেঞ্চিতে বসে মাল খাচ্ছিলাম আমাদের পাশে একটা ট্রাকওয়ালা ভাত খাচ্ছিলো। নেশার ঘোরে ছানাকে বললাম এই দ্যাখ, লোকটা না মাছভাজা খাচ্ছে। এই বলে দুজনে যা অট্টহাস্য লাগলাম, ট্রাকওয়ালা হাফ খাবার খেয়েই মানে মানে কেটে পড়লো। সময় প্রায় আড়াইটে তিনটে হঠাৎ মনে হলো যে না, এবার যথেষ্ট হয়েছে। নেশাটা বেশ চড়েছে, সাইকেল চালিয়ে ফিরতে আর পারবোনা। মনে হয় পাকেচক্রে আবার রামুদাকেই খুঁজে পেলাম রিক্সা করে হোস্টেল দিয়ে আসার জন্যে। ছানা তো তখন বেশ বুঁদ হয়ে আছে। মুখ বন্ধ পাছে জনতা খোরাক দেয়। এদিকে আমার ততক্ষনে ন বোতল বাংলা খাওয়া হয়ে গেছে। খেয়াল ছিল যে বমি করতে হতে পারে, তাই আমার বালতিখানা নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমার রুমমেটের খাটে। প্ল্যান হলো একটু ঘুমোনো।

তা সে গুড়ে বালি, জনগণ মাতাল পেলেই উল্লাসে ফেটে পরে খোরাক দেখার জন্যে। সেদিন আমি ছিলাম পুরো ঠিকঠাক, বুঝতে পারছিলাম নেশা বেশি হয়ে গেছে কিন্তু একটু ঘুমিয়ে নিলেই কেটে যাবে। এদিকে জনগন বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্যে রুম ভর্তি করে ফেলেছে। আমার রুমমেট পড়েছে চরম বিপদে। বমি করলে ওর বিছানা নষ্ট, এদিকে আমাকে সরাতেও পারছেনা। চেষ্টা করলো খানিক তেঁতুলজল কোথা থেকে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতে। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও যখন মুখে গ্লাস গুঁজে দিলো, তখন ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। মুখ ভর্তি তেঁতুলজল পাশ ফিরে ওর খাটের পাশ দিয়ে ফেলে দিলাম। অবস্থা বেগড়বাঁই দেখে রুমমেট হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে ওর খাটেই ঘুমোতে দিলো।

এদিকে নেশার ঘোরে থাকায় ছানার খোরাক মিস করে গেলাম। ছানা ছিল খুব অধ্যবসায়ী ছেলে। শরীরচর্চা করতো, নিয়ম মেনে চলতো। মদ খেয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল চলে গেছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা। রুমে ফিরে ছানা নাকি তাই গোটা পঞ্চাশ ডনবৈঠক দিয়ে দিলো, তার পরও কিছু হচ্ছেনা দেখে আমাদের কাঠের আলমারিতে নাকি দুমদাম ঘুঁষি মারতে শুরু করলো। আমাদের তাপস পাল ছিল পালোয়ান, ছানার রুমমেট, সেও ছানার সেই ফর্ম দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছিলো কি করে ফেলে সেই ভয়ে।

খোঁয়ারি যখন ভাঙলো, দেখি সন্ধ্যে নটা। যতদূর মনে পড়ছে স্পেশাল খাবার ছিল সেদিন। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে গেলাম গাঁজলুদাকে ধরতে আবার রাতের রাউন্ড শুরু করার জন্যে, কিন্তু সব কীর্তিকলাপ শুনে সেদিন আর গাঁজলুদা নিয়ে গেলোনা সাথে। ওই দিনের আগে পরে বেশ কিছু বার সারা দিন ধরে বেলেল্লাপনা করেছি কিন্তু ন বোতল বাঙলার রেকর্ড সেই একবারই।

রাত

দিনের বেলা মাতলামির গল্প মনে করা সহজ কারণ খুব বেশিদিন সারাদিন ধরে ড্রিংক করা হয়ে ওঠেনি। রাতের বেলার গল্প আলাদা। এতো রাশি রাশি গল্প মনে আসে রাতের যে তার ফিরিস্তি একসাথে দেয়া মুশকিল। গোলমালের ব্যাপার হলো যে তার অনেক গল্পেই বাকি সবাই খোরাকের অংশীদার আমি ছাড়া, আমিই ছিলাম খোরাকের কারণ। সে দিনগুলোর কথা আর নাই বা বললাম, তবে ইয়ারমেটদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমাকে সামলে রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। ফার্স্ট ইয়ারের কথাই বলি, কারণ সেকেন্ড ইয়ার থেকে আমরা খানিকটা হলেও সিনিয়র হয়ে গেলাম। তাই প্রথম বছর উইংসে বাইরে থেকে মদ কিনে সদলবলে খাওয়ার আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

এমনি এক দিন দিনু মানে দিনবাজার থেকে এক বোতল হুইস্কি কেনা হয়েছে, গোটা ৭-৮ জন খাবো বলে। আমাদের ৭ নম্বর রুম ছিল তাস, সিগারেট আর মালের ঠেক, তাই আমাদের রুমেই সব এসে জুটলো। সবে পেগ বানিয়ে দু চুমুক দিয়েছি দেখি দরজা দিয়ে কে উঁকি মারছে। পানুপন্ডিত। পানু ছিল আমাদের পাশের রুমে। সিধেসাধা ছেলে, আমাদের ইয়ারের এক মেয়ের ওপর তার প্রচুর ব্যথা তখন। সবে দিন দুই আগে উইংসের সবাই ওকে পরামর্শ দিয়েছে যে সেই মেয়ের মন জিততে হলে গান গাইতে হবে। সেই দু দিন ধরে পানুর রুমমেটরা আমাদের গালি পাড়ছিলো যে সারাদিন পানু তাদের বেসুরো গলায় গান শোনাতে চাইছে। ভাবলাম বেশ তো সুযোগ। পানু আমাদের জিজ্ঞেস করলো, তোরা কি মদ খাচ্ছিস? – হ্যাঁ তুই খাবি? ভেবেছিলাম বলবে না, দেখি ঝপ করে রুমে চলে এসে আমাদের মাঝে বসে পড়লো। – বড় বড় গায়করা স্টেজে গান গাইতে ওঠার আগেই মদ খায়। আমিও খাই, গলাটা ভালো হবে। পানুর যুক্তি শুনে আমরা হাঁ। খোরাক দেখার জন্যে আমরা পানুকে বড় বড় পেগ বানিয়ে দিলাম। সেই তার প্রথম মাল ধরা, কিন্তু টপাটপ বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে ফেললো। আমরাও মজা দেখার জন্যে ওকে আরো বড় পেগ বানিয়ে খাওয়ালাম। নেশাটা যাতে চড়ে আরো, তাই খানিক চিনি, গ্লুকন ডি এই সব ও খাওয়ালাম যখন ও বললো যে মাথা ঝিমঝিম করছে। ওকে বলা হলো যে সুগার কমে গেছে, বেশি করে চিনি খেতে হবে। এখনো জানিনা চিনি খেলে নেশা বাড়ে কিনা কিন্তু তখন সেটা সবাই বিশ্বাস করতাম। হুইস্কির বোতল আর হাফ কৌটো গ্লুকন ডি শেষ করার পর ঠিক করলাম এবার হোস্টেলের বাইরে যাওয়া যাক।

রাতের সেই সবে শুরু। পানুকে বললাম তুই যদি সেই মেয়ের মন জয় করতে চাস তাহলে চল বাইরে লেডিস হোস্টেলে। বাইরে হাওয়া খেলে নেশাও কমবে আর সুস্থ বোধ করলে তাকে একটা গানও শোনাতে পারবি। পানুপন্ডিত টোপ খেয়ে গেলো। দলবল মিলে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেলের বাইরে। দু চারটে সিনিয়র দাদারা কমন রুম থেকে আমাদের সাবধান করে দিলো। ১ নম্বর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সব হাঁটা মারলাম কলেজের দিকে। প্ল্যান ছিল একে একে সব লুকিয়ে পড়বে, তারপর পানুকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করবে আর খোরাক নেবে। সাইকেল ভাড়া নেয়ার দোকান অবধি গিয়ে পানু বসে পড়লো বেঞ্চিতে। ওর নাকি বেদম মাথা ঝিমঝিম করছে। আমরা ওকে লেডিস হোস্টেলের রাস্তা দেখিয়ে বললাম চল হোস্টেলে ফিরে চল। খোঁয়াড়ি অনেকটা হলেও পানু ঠিকই ধরে ফেলল ওকে কোথায় যেতে বলছি। এদিকে পানু বলছে ও হোস্টেলে ফিরবে, আর আমরা মজা লোটার জন্যে বলছি আমরা এখন হাওয়া খেতে বেড়িয়েছি, এক্ষুনি ফিরবোনা, ওর ইচ্ছে হলে ও একা ফিরতে পারে। আমরা গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে আর পানু এদিকে ২-৩ বার হোস্টেল যাওয়ার চেষ্টা করে গোটা ৫০ গজ গিয়ে আবার ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে পড়লো। এখনো মনে আছে পানুর দুলে দুলে খানিক দুর হেঁটে আবার ফিরে আসা।

সেই বসে থাকা অবস্থায় পানুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো যে মদ খাওয়া অতীব খারাপ কাজ আর আমি আর খেঁচু হলাম গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাকি আমরাই খারাপ করে দিয়েছি। ভাবো কান্ড কুড়ি বছরের ধেড়ে খোকা যেচে রুমে এসে হাফ বোতল ফাঁক করে দিয়ে গেলো, আর আমরা হলাম গিয়ে দোষী। যাক সেসব গায়ে না মেখে সবাই বসে রইলাম কি করে তা দেখার জন্যে। অবশেষে আমাদের হোস্টেলের থার্ড ইয়ারের গোটা দু-তিন দাদারা বাইরে থেকে মাল খেয়ে ফিরছিলো, পানু তাদের দেখে ধরলো। দাদা আমাকে একটু হোস্টেল পৌঁছে দেবে আমি আজকে মদ খেয়েছি খুব মাথা ঝিমঝিম করছে। তা সে দয়ালু দাদারা নিজেরা খোরাক নেয়ার জন্যে পানুকে সাইকেলে চাপিয়ে হোস্টেলে নিয়ে গেলো।

ব্যাপারটা সেখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু দুটো ভিন্ন ধরনের ঘটনা বললাম কারণ সব সময় সব কিছু অনাবিল ফুর্তি আর খোরাক দিয়ে শেষ হয়নি তাই। হোস্টেলে চুলকানোর লোকের অভাব ছিলোনা। সেরকমই একজন আমাদের ইয়ারমেট দেখলো বেশ মজার ব্যাপার পানুপন্ডিত আমাদের মানে আমার আর খেঁচুর ওপর খেরে আছে। ও পানুকে প্রচুর পিন মারলো যে আমরা একদম বাজে ছেলে, পানুর উচিত আমাদেরকে বাওয়াল দেয়া। ও আমাদের ক্যালালে আমরা নাকি পালাবার পথ পাবোনা। আর পানুর ব্যথা পানুর হিরোগিরির খবর শুনে নিশ্চয় ওর ওপর ফিদা হয়ে যাবে। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে পরদিন চান করার সময় অন্য উইংসের আরেক পানু আমাদের পানুর প্যান্ট গামছা সব লুকিয়ে দিলো। পিন খেয়ে পানু ভাবলো সেটাও আমাদের কীর্তি। সন্ধ্যে বেলা পানু ধরলো খেঁচুকে, গালাগাল ধাক্কাধাক্কি পানুর নাক ভাঙলো, আমাদের দুজনের আবার ragging শুরু হলো, পানুর বাবার বন্ধু প্রফেসর আমাদের দুজনকে সাসপেন্ড করার হুমকি দিলো – মানে সব মিলে ঘেঁটে ঘ। মোটের ওপর খোরাকটা মনে হয় আমাদের ওপর দিয়েই গেলো, পানুকে রোজ রোজ নাক দেখাতে টাউনে নিয়ে যাওয়া আসা করতে করতে। তবে হ্যাঁ, অত সবের পর শিক্ষা একটা হয়েছিল তবু, যে পাঁড় মাতাল ছাড়া কারো সাথে মদ খেতে বসার অনেক ঝঞ্ঝাট। সে ঘটনার পর থেকে পেঁচো মাতালদের সাথেই ঠেক হতো বেশি।

জলু গিয়েছি প্রথম বার তা সে নয় নয় করে হয়ে গেছে একুশ বছর প্রায়। এখন স্বাধীনতা প্রচুর, লুকিয়ে চুরিয়ে ব্ল্যাকে মদ কিনতে হয়না। ঘরেই খাওয়া যায়। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার, ফাইনাল, চাকরি – যত বয়েস বেড়েছে, মাল খাবার সুযোগও বেড়েছে, আর সেটা যত সহজলভ্য হয়েছে, নেশাভাঙের যে থ্রিলটা ১৩-১৪ তে ছিল, ২৩-২৪এ তার অনেকটাই চলে গেছে। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার যে রোমাঞ্চ সেটা চলে যাবার পর মদ খাওয়াটা তেমন আর উপভোগ্য রইলোনা। দারু খেতে বসে মদের চেয়ে খাওয়ার অর্ডার হতো বেশি। শেষ যে কবে মাল খেয়ে আউট হয়ে গেছি মনেই পড়েনা। ৭ বছর আগে পুজোয় বাড়ি গিয়ে, সেটাই বোধহয় শেষ বার।

তাই জলুর রঙবেরঙের দিনরাত্রির কথাগুলো মনে পড়লে মন চলে যায় কুড়ি বছর পেছনে। বিছানার পাশে বালতি। খোরাকের থেকে বাঁচতে ছাদের ট্যাঙ্কের ওপর শোয়া দালাল। অ্যানিভার্সারীর বাংলা মেশানো রসনা। সিদ্ধিতে মেশানো মাকড়সার জাল। ফাঁকা বোতল ভেঙে নেশার ঘোরে তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়া। হাইওয়ের ধারে বাংলা আর ক্যারম। কলেজে প্রথম দিন ফাইনাল ইয়ারের ছেলের জল বলে দেয়া বাংলা। পোদুদার কাছে ব্যাপ্টিজম। Holy Water এর বদলে রাম। নস্টালজিয়া। কোথায় আজ সেই রাম, কোথায় সেই অযোধ্যা, থুড়ি জলু। হেথা নয় বন্ধু অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। নাকি জলু আছে সেই জলুতেই, খালি চরিত্রগুলো পাল্টে গেছে?
Standard
Bengal, Bengali culture, calcutta

কোয়েস্ট মল, ধুতি এবং কাছাখোলা বাঙালিয়ানা

আমি নিজে যে কতখানি বাঙালি তা নিয়ে আমারই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই যেমন প্যানপেনে উত্তমকুমারের সিনেমা পছন্দ নয়, বাংলা রকের আদ্ধেক শব্দই বুঝতে পারিনা, বাংলা বই যে শেষ কবে পড়েছি তা মনে পড়েনা, বাংলা যেন তেমন শুনিনা – তার চেয়ে পছন্দ স্প্যানিশ পপ-রক নয় ইয়ান্নি/ভ্যানজেলিসের অর্কেস্ট্রা। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি রবীন্দ্রসঙ্গীতও শুনিনা তা নয়, কিন্তু সারাক্ষন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে থাকি তাও নয়। ধুপধুনো দিয়ে পুজো করিনা। বিবেকানন্দ পড়িনি, তিনি কি কি বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে গেছেন সেগুলো এদিক ওদিক একটু আধটু জেনে সন্দেহ হয় তাঁর ভাবনাচিন্তাগুলো আদৌ আজকের যুগে খাটে কিনা। সুভাষচন্দ্র যে এখনো বেঁচে আছেন তাও বিন্দুমাত্র মনে হয়না। কলকাতার চেয়ে ক্যালকাটা লিখতেই পছন্দ করি। আর ওই বাঙালিরা যে সবথেকে বুদ্ধিমান ভারতীয়দের মধ্যে, সেটা মনে হয় ডাহা ঢপ। ওই What Bengal thinks today প্রবাদটা চরম ক্ষতি করে গেছে বাঙালীজাতির ইগোর জন্যে, ওই একটা কথাতেই যা বার খেয়ে বসে আছে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, তার ঘোর এখনো ভাঙেনি।

তবু এসবের বাইরে বিদেশে বসে কারো সাথে বাংলা কথা বলতে পারলে মন ভালো হয়ে যায়, কেউ কলকাতা থেকে হজমি নিয়ে আসলে গুঁড়োগুলো হাত থেকে চেটে চেটে খাই, মাছ রান্না হলে থালায় ভাত নিই দুগুণ। স্প্যানিশ গান শুনে হেজে গিয়ে শেষে চালাই লক্ষীছাড়ার সোনালী, বা শানের ও মাঝিরে। বইয়ের কথা মনে পড়লেই চোখে ভাসে সুনীল শীর্ষেন্দু সমরেশ। আর ইন্দ্রজাল কমিক্স। বিদেশে থেকেও বন্ধুবান্ধবকে কাকুতিমিনতি করে জোগাড় করি দুর্লভ সব সংখ্যা। দুর্গাপুজোয় ৫ পাউন্ড চাঁদা দিয়ে ঠাকুর দেখতে যাই যদি খিচুড়ি আর লাবড়া পাওয়া যায় সেই আশায়। তাই সাবেকী মতে বাঙালি কিনা সে নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আদপে আমার নিজের সত্ত্বার মধ্যে অনেকটাই যে বাংলাভিত্তিক তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। টেনিদা ঘনাদা পটলদা – হাঁদা ভোঁদা নন্টেফন্টে বাঁটুল – সুমন অঞ্জন নচিকেতা – পরশপাথর লক্ষীছাড়া ভূমি চন্দ্রবিন্দু ঘুরেফিরে মনে ধাক্কা মেরে জানান দিয়ে যায় যে হুঁহুঁ বাবা ছাড় পাবে এতো সহজে? তবে বাঙালি বলে জাহির করার আদিখ্যেতা কখনো ছিলোনা আমার, আর এখনো চেষ্টা করি কোনরকম দল বা গোষ্ঠীর নড়া না ধরতে। একজন মানুষ – এর বাইরে যে কোনো পরিচয় খুঁজতে যাওয়া থেকেই যত বিপদ্রব। তবু আজ দুপুরে যখন পড়লাম যে এক পরিচালক ধুতি পরে এক মলে যাওয়ায় তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি, তখন মনে হলো বাঙালি বিপন্ন। তার খুব নিজের পাড়া কলকাতাতেই।

কোয়েস্ট মল, বেকবাগান
Source: http://www.skycrapercity.com

এটা যে একটা ছুটকো ঘটনা তা নয়। গত বছর মোকাম্বোতে এক ড্রাইভারকে ঢুকতে না দেয়া নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। তারপরের ঘটনাও পার্ক স্ট্রিটে, cross-dressing মানুষদের বুক করা মিটিংয়ে না যেতে দেয়া। তবে এই দুই ঘটনার পিছনেই রয়েছে অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য। ড্রাইভার সে যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল গরিব দেখতে লোকদের ঢুকতে না দেয়া। একইভাবে crossdresser দের না ঢুকতে দেয়ার পিছনে রয়েছে সামাজিক কলঙ্কের চিন্তা। ঠিক যে কথাটা বলছিলাম আগে, বিশেষ করে কলকাতায় বিভিন্ন জাতি ধর্মের লোক একসাথে বসবাস করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে ওপরের প্রতি সৌজন্যমূলক। তা বলে বাঙালি সমাজ যে কুসংস্কার মুক্ত, সেটা মনে করাটা হবে পাগলের প্রলাপ। সামাজিক ভেদাভেদ আগেও ছিল, গরিব মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ নতুন কিছু নয়। তেমনি নতুন নয় সমকামী মানুষদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা বিদ্রুপ। এই রোগ আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। লজ্জার ব্যাপার কিন্তু নতুন করে আশ্চর্য হবার কিছু না। এই কোয়েস্ট মলে হওয়া ঘটনাটা মনে দাগ কাটে কারণ কর্তৃপক্ষের না ঢুকতে দেয়ার নির্দেশের মূল লক্ষ্য হলো ধুতি পরা লোকজন। ধুতি পাঞ্জাবি হলো খাঁটি বাঙালিয়ানার এক প্রতীক। বাঙালি সংস্কৃতির খোদ রাজধানীতেই এই জাতীয় বৈষম্যের মধ্যে খানিকটা সিঁদুরে মেঘ দেখাটা স্বাভাবিক বৈকি।

জীবনে দুবার ধুতি পড়েছি ভাই আর বন্ধুর বিয়েতে। দুবারই পেট খারাপ হয়েছিল, একাধিকবার বড় বাইরে যাবার যে কি কেলো ধুতি নিয়ে, তার আমি ভুক্তভোগী। তার পর থেকে ঠিক করেছি লোকে পয়সা দিলেও ধুতি এড়িয়ে চলব আজীবন। কিন্তু আসল ঝামেলা তো ধুতি নিয়ে নয়। ধুতি তো একটা সিম্বলমাত্র। আসল সমস্যা হলো এই যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ, তা মোকাম্বোই বলুন বা ওয়ান স্টেপ আপ, কিম্বা কোয়েস্ট মল, যেখানে যে যার ইচ্ছেমতো নিয়ম তৈরী করে চলেছে। এদের নিয়মকানুনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন কেউ তোলেনি আগে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মোকাম্বোর ঘটনার এক বছর পরেও যে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে, সেই বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে কলকাতাকে লন্ডন বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, আদপে লন্ডন বানাতে গেলে শুধু যে গোটা দুই বিগ বেন খাড়া করলেই হবে তা তো নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও যে বদলাতে হবে সে দিকটা বোধহয় তিনি ভেবে দেখেননি। এই জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ পশ্চিমি দুনিয়ায় কেউ করলে তাকে জনগণ অবিলম্বে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। শুধু যে নিজের আঁতে ঘা লাগলে তখনই তা নয়। অঢেল উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ অবিচার দেখে ভুক্তভোগীদের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অঢেল উদাহরণ আছে কলকাতাতেও। আর আশ্চর্যের ব্যাপারটা সেখানেই। যে শহরে এক পয়সা ট্রামভাড়া বাড়ার প্রতিবাদে আগুন জ্বলেছিল, সেখানে এই জাতীয় ধ্যাষ্টামো করার সাহস এদের কোথা থেকে এলো আর কবে থেকে সেটাই ভাবার।

ব্রিটেনে ভোটের সময় এক ব্লগে লিখেছিলাম Know your enemy. এই শত্রূ ঠিক শ্রেণীশত্রূ নয়, বরং খুঁজে বার করা যে সমস্যাটার জন্যে মূল দায়ী কে। কোয়েস্ট মলের ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে গেলে আসলে দেখা যাবে সর্ষের মধ্যেই ভূত। আমরা তো মোকাম্বো কোয়েস্টএর মুণ্ডপাত করতেই পারি আর সেরকমটাই হতে চলেছে যখন মানুষজন কোয়েস্ট মলের সামনে ধুতি পরে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু এই যে বাঙালিয়ানার আঁতে ঘা লেগেছে সেই হুজুগে খানিক বাওয়ালি করা, তার বাইরে একটু ভেবে দেখা যাক এসবের ব্যুৎপত্তি কোথায়। এই যে ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন রেস্তোরাঁ বা শপিং মলের এদের তো একটাই উদ্দেশ্য, যত বেশি সম্ভব বিক্রিবাটা। এই সব মলের খদ্দের কারা? বাংলাটা ঠিক আসেনা টাইপের মিলেনিয়ালরা নয়? ধুতি পরে বাজার করতে এলে ম্যানেজমেন্টের কি আসে যায় । আসলে সমস্যা কি যারা বাজার করতে যায় তারাই চায় না অন্য শ্রেণীর লোকেরা সেখানে যাক? আর এই যে কোয়েস্ট মল নিয়ে এতো হাঙ্গামা, গোটা পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে ভাবলে কটা লোকে সেখানে যায় বা যাবার সামর্থ রাখে? রিপোর্টটায় আরেকটা ব্যাপার পড়লাম যেটা আরো দুশ্চিন্তার। প্রথমে যখন নিরাপত্তারক্ষী সে পরিচালককে ঢুকতে বাধা দেন তিনি নাকি তখন তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলেন ম্যানেজার কে জানতে চেয়ে। মানে সমস্যাটা কি আরো গভীর, যে কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমান করতে গেলে ইংরেজিতেই কথা বলতে হবে? নাহলে কি কপালে ঘাড়ধাক্কা? এই যে জেনারেশন এক্স ওয়াইদের বাংলা না বলতে পারার ক্যালি, ধুতি না পরতে জানার ক্যালি, যারা এসব করে তাদের প্রতি উন্নাসিকতা – এসব কারণও কি পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে কোয়েস্ট মলের কর্তৃপক্ষকে? নিজে অন্যের থেকে আলাদা হতে চাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু অন্য কেউ যদি আমার মতো না হয়, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করাটা বিকৃতরুচির পরিচয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন সব দোকানে বাংলা নাম লেখা নিয়ে আন্দোলন করছিলেন তখন ভেবেছিলাম আবার একটা সিম্বলিজম নিয়ে ক্যাও। কিন্তু ইদানিংকালের এই সব ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বাঙালির বাঙালিয়ানা বিলোপ করার একটা চেষ্টা চলছে। কে দায়ী, অবাঙালি ব্যবসায়ীকূল, নাকি না-বাঙালি ট্যাঁশ মিলেনিয়ালরা, নাকি মল মালিক আর রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা তার হিসেব পরে করা যাবে, কিন্তু সেটা প্রতিরোধ না করতে পারলে এরকম আরো ঘটনা ঘটবে ভবিষ্যতে। ঐতিহ্য সংস্কৃতি এসব নিয়ে আগে কখনও মাথা ঘামাইনি, এগুলো কারো পিতৃদত্ত্ব সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের ধারা মেনে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি এদেরও পরিবর্তন হতে বাধ্য, আপনি চান বা না চান। এবং সেই বদলে এয়ারটেলের বিজ্ঞাপনের খোরাকী বাংলাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু বাংলায় কথা বলা, বাঙালি পোষাক পরা, নাক উঁচু পাঁচতারা জায়গায় খেতে যাওয়া — এ সবই ব্যক্তিগত পছন্দের। কিন্তু কেউ যদি সেটা না করে, তাকে ব্রাত্য করে দেয়া, হীনমন্যতায় ভোগানো কখনোই মেনে নেয়া যায়না। এও একপ্রকার বৈষম্যবাদ, আর সেই জন্যেই এক একটা ছুটকো ঘটনার জন্য অগোছালো প্রতিবাদে চিঁড়ে ভিজবেনা।

এয়ারটেল পোস্টপেড মোবাইলের বিজ্ঞাপন আনন্দবাজার পত্রিকায়
Source : Facebook

এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম কাল, মজা করে বললাম হোকক্যালানো। খবরটা পড়ে হয়তো অনেকেরই তাই মনে হয়েছে। এই ধরনের খবর বাজারে বেরোলেই সবার ষোল আনা বাঙালিয়ানা চাগিয়ে ওঠে। অনেকটা তেড়ে মেরে ডান্ডা করে দিই ঠান্ডা ধরনের হাবভাব। কিন্তু দায়ী কে সেটা ঠিক করবে কে? দায়ী কি সিকিউরিটি গার্ড যে নামমাত্র বেতনের বিনিময়ে হয়তো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে লোককে আটকাচ্ছে চাকরি না খোয়ানোর জন্যে? মলের ম্যানেজমেন্ট যারা নিত্যনতুন সুযোগসুবিধা না দিলে লোকে শপিং করতে যাবে অন্য জায়গায়? দায়ী কি মলের মালিকরা যারা হয়তো লাখ লাখ টাকা উপরি দিচ্ছে লোকাল পার্টিকে? নাকি দায়ী আমরা সাধারন পাবলিক যারা শাড়ির দোকানে বাংলা বললেও ঝাঁ চকচকে মলে গেলেই ইংরেজীতে কথা বলতে শুরু করি, অষ্টমীর দিন কেত মেরে ধুতি পাঞ্জাবি পরি কিন্তু অন্য সময় রাস্তায় ধুতি পরা লোক দেখলে নাক সিঁটকাই। আমরা যারা কলকাতার বাঙালিয়ানাকে এক ও অদ্বিতীয় ভেবে নিয়ে বাকী পশ্চিমবঙ্গের কথার টান, পোষাকআষাক আচার আচরন নিয়ে হাসাহাসি করি। আর যারা এই ব্যবহারগুলি করি তারাও কী সম্পূর্ণ দোষী? আমাদের যেভাবে বড় করা হয়েছে যেখানে বাংলা বই পড়া বারন, ইংরেজীতে কথা না শিখলে কপালে জোটে তিরস্কার, আবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে দক্ষিণীর স্বরলিপিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াটাও চাই। ক্যালানি যে দেবেন, কাকে দেবেন ক্যালানি? ওই সিকিউরিটি গার্ডটা আমাদের ঠুনকো অন্তঃসারশূন্য সমাজের এক বলির পাঁঠা মাত্র। মারধোর করে এই বিকার থামানো যাবে কি? চাই নতুন আইন যেখানে কোন শ্রেণী, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে পক্ষপাতমুলক ব্যবহার হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মনে পড়ে কিভাবে শব্দবাজি বন্ধ করা হয়েছিল? বা ময়দান থেকে বইমেলা সরানো? প্রশাসনের উদ্যোগ থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। একদিনে না হলেও সুরাহা সম্ভব। চাই উদ্যোগ আর সদিচ্ছা।

তাহলে উপায়? প্রতিবাদের কী দরকার নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু দরকার সেই প্রতিবাদ যাতে ঠিক জায়গায় পৌঁছায়। আর শুধু প্রতিবাদ নয়, তাই আমাদের নিজেদের মনের ভেতর উঁকি মেরে দেখা। আমরা প্রস্তুত তো এই জড়দ্গব সমাজ পাল্টানোর জন্য? চাই আরো সহমর্মিতা মানুষের প্রতি। কেউ বাকী সবার থেকে আলাদা হওয়া মানেই যে সে উদ্ভট, অপাংক্তেয় নয় সেই চিন্তা করার ক্ষমতা যেদিন হবে সেদিন আর বাঙালিয়ানা রক্ষা করার জন্যে দারোয়ান ঠ্যাঙাতে হবেনা।

Standard
Bengali, Cuisine, UK

কেজরী – বিলেতি খিচুড়ি

কেজরী। না না, নাম শুনে ধরে নেবেননা দিল্লির কেজরির কথা বলছি। ওসব আপ ফাপের রাজনীতির ঘেঁষ না ধরে পাতি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ুন। তবে এ নামের যা মাহাত্ম্য তাতে রাজনীতির ছোঁয়া বর্জন করা দুষ্কর। রান্নার নাম যেমন বিলিতি, রাঁধার পদ্ধতিও বিলিতি। আর ডালের চিহ্নমাত্র নেই এ পদে তাই খিচুড়ি বললে পাপ হবে। তবে আমাদের রোজকার হেঁশেলের খিচুড়ি কিভাবে কেজরীতে পরিবর্তিত হলো তার হিসেব আমার কাছে ছিলনা। তবে আমার উইকি সব জানে, সে দেখাচ্ছে খিচুড়িই ভারতে আগে প্রচলিত ছিল। সাহেবরা সব সম্পত্তির সাথে সাথে খাবারের রেসিপির ওপরও দখলদারি বসাতে ছাড়েনি। ধরে নেয়া যেতেই পারে ভারত ফেরত কোনো বিলিতি শেফের হাত ধরে খিচুড়ি আঠেরো শতকে পৌঁছে গেছিল সাত সমুদ্র পারে। ইংরেজি ধ্বনিতত্ত্ব এক আজব ব্যাপার, ক দিয়ে শুরুর শব্দগুলো এরা শুরু করে খ উচ্চারণ করে, কিন্তু খ দিয়ে কোনো শব্দ শুরু হলে তা উচ্চারণ করতে লেজে গোবরে অবস্থা। সেভাবেই অনুমান করা যায় খিচুড়ির জগাখিচুড়ি উচ্চারণের থেকে রেহাই পেতে খিচুড়ি পরিণত হলো kedgeree তে।

কাজের কথায় আসি। সেদিন দোকান থেকে কম দামে হ্যাডক মাছ পেয়ে ভাবলাম কদিন আগে খাওয়া এক অপূর্ব ফরাসি মাছের বড়া বানানোর চেষ্টা করবো। তা রেসিপি খুঁজতে গিয়ে হাতে হ্যারিকেন, তাজা মাছ নয়, চাই সল্ট কড জাতীয় শুকনো মাছ, খানিকটা আমাদের শুঁটকির মতো, তবে নুন মাখিয়ে শুকানো বলে তেমন চড়া গন্ধ হয়না। যাক, আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হলো রান্নার প্ল্যান। শেষ রক্ষা তো ভাজা মাছ বা জিরে গুঁড়ো দিয়ে ঝোল আছেই। এখানে ব্রেকফাস্ট খেতে গেলে poached haddock পাওয়া যায় তবে বাঙালি হয়ে মাছকে দুধে সেদ্ধ করতে রুচি হলোনা তাই ভাবলাম হ্যাডকের আরেক নামকরা রেসিপি বানানো যাক, কেজরী।

বিলিতি মতে রান্না, তাই রান্নার আদ্ধেক উপকরণ বিলিতি, আবার ভারতের আমদানি খাবার তাই খানিক মসলাপাতি আমাদের রান্নাঘরের মতই। খানিক দোনোমোনার পর বানিয়েই ফেল্লাম কেজরী। আহা তার যা স্বাদ, টেনিদার খট্টাঙ্গ পলান্নর কথা মনে পড়ে গেলো। বেশি বাহানায় না গিয়ে বলেই ফেলি সেই কেজরী তৈরীর উপায়। পরিমান নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেননা, খালি নুনটা বাদ দিয়ে বাকি মসলা অল্প কম বেশি হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবেনা। আমি বানিয়েছিলাম দু কাপ চালের সাথে, অন্য পরিমান রান্নার জন্য হিসেব মতো বাকি উপকরণগুলো কমবেশি করতে হবে।

প্রথমে বড় একটা হ্যাডকের ফিলে একটা ফ্রাইং প্যান জাতীয় কিছুতে গরম জলে সেদ্ধ করতে হবে। মাছের ছাল থাকলে ছালের দিকটা নিচের দিকে রাখতে হবে। ৪-৫ মিনিট পর মাছ আঁচ থেকে নামিয়ে জল ঝরিয়ে অল্পক্ষন ঠান্ডা করতে হবে। মাছ ঠান্ডা হয়ে গেলে কাঁটা আর ছাল টা ছাড়িয়ে একটা কাঁটাচামচ দিয়ে ছোট ছোট ফ্লেকে ভেঙে নিন। আর একটা সসপ্যানে ৩-৪ টে ডিম সেদ্ধ করে নিতে হবে। ডিমগুলো হার্ড বয়েল করলেই ভালো। ডিম সেদ্ধ হয়ে গেলে চাকা চাকা টুকরো করে রেখে দিতে হবে। এরপর একটা বড় সসপ্যানে বেশ খানিকটা মাখন দিয়ে একটা বড় পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কেটে ভেজে নিতে হবে। পেঁয়াজে যেন বাদামী রঙ না ধরে যায়। ভাজা পেঁয়াজে এরপর ৩-৪ টে গোটা এলাচ, ১-২ টো তেজপাতা, ২ ইঞ্চি লম্বা দারচিনি আর একটু হলুদ গুঁড়ো ওই প্যানের ভেতর দিয়ে আবার খানিক কষাতে হবে। এবার ওই মসলার মধ্যে চাল দিয়ে অল্পক্ষন ভাজতে হবে একদম কম আঁচে। এই ফাঁকে এক লিটার গরম জলে দু-তিন টুকরো ফিশ স্টক গুলে নিন। ফিশ না থাকলে চিকেন স্টক ও চলবে। আর জলের পরিমান কতখানি চাল তার ওপর নির্ভর করবে। চাল বেশি যাতে না সেদ্ধ হয়ে যায় তার জন্যে প্রথমে একটু কম জল দিয়ে রান্না শুরু করাই ভালো। পরে দরকার পড়লে অল্প গরম জল দিতে হতে পারে। যদি ফ্রেশ স্টক বানাতে পারেন তাহলে তো কেল্লা ফতে, তবে আমি কিউব দিয়েই বানিয়েছিলাম, মন্দ হয়নি। এবার ওই ফিশ স্টক চাল আর পেঁয়াজ ভাজার মধ্যে দিয়ে আঁচ বাড়িয়ে দিতে হবে। জল ফুটে উঠলে স্বাদ মতো নূন দিয়ে চালটা ভালো করে নাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে তলা না ধরে যায়। এবার ঢাকা দিয়ে আঁচ কমিয়ে ভাত রান্না হতে দিন। মাঝে মধ্যে দেখে নিতে হবে তলা ধরে যাচ্ছে কিনা, ধরলে চাল আবার খানিকটা নাড়িয়ে দিয়ে হবে, আর দরকার পড়লে অল্প গরম জল যোগ করতে পারেন। চাল যখন প্রায় সেদ্ধ হয়ে গেছে, তখন ঢাকনা খুলে মাছ আর ডিমের টুকরোগুলো সেখানে ঢেলে দিয়ে আবার ঢাকনা চাপা দিন। ২-৩ মিনিট পর অনেকটা কুচোনো পার্সলে পাতা দিয়ে দিন ভাতের মধ্যে। আলতো করে ভাত মাছ আর ডিম মিশিয়ে নিয়ে আঁচ বন্ধ করে দিন। কেজরী তৈরী। শেষে তাতে অল্প কুচোনো পার্সলে ছড়িয়ে এক টুকরো লেবুর সাথে পরিবেশন করুন। এদেশে এমনি এমনিই সার্ভ করতে বলে, কিন্তু হাজার হোক খিচুড়ির জাতভাই বলে কথা, সাথে ভাজা কিছু না থাকলে তেমন জমবেনা খাওয়াটা। ভাজা যা ইচ্ছে বানাতে পারেন, নিদেনপক্ষে আমার মত অমলেট হলেও যথেষ্ট।

কেজরী

যদি রান্নার মসলা বা অন্য উপকরণগুলো না পান তাহলেও এই রেসিপিটা রান্না করে দেখতে পারেন। হ্যাডকের জায়গায় যেকোনো সাদা কাঁটাছাড়া মাছ ব্যবহার করতে পারেন। পারলেই না পেলে ধনেপাতা দিয়ে দিন। হলুদের পরিবর্তে জাফরান দিয়েও বানানো যায় তবে সে মশা মারতে কামান দাগার মতো ব্যাপার হবে। আমাদের খিচুড়ির মতো এখানে আলু বা অন্যান্য সবজি দেয়ার কোনো নিয়ম দেখিনি, তবে চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে। নিন এবার ঢুকে পড়ুন হেঁশেলে, আর ব্লগ পড়ে কাজ নেই।
Standard