Durga puja, Nostalgia, short story

এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় – দুই মাতালের ষষ্ঠী উদযাপন

এই কাহিনীর স্থান, কাল, পাত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যদি কেউ এই ঘটনার সাথে কোনো বাস্তবিক চরিত্রের সাযুজ্য খুঁজে পান তবে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

এই কাহিনীর প্রেক্ষাপট কলকাতার অগুন্তি সরকারি আবাসনগুলির কোনো একটি। সেখানে দুর্গাপুজো হচ্ছে প্রায় গত বিশ বছর ধরে। খুব যে আড়ম্বর করে তা নয়, কিন্তু পুজোর অছিলায় পাড়ার প্রায় হাজার বাসিন্দা একজোট হয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করে যথাসাধ্য। পাড়ার মাঝে চত্বরে প্যান্ডেল হয় একটা, অনেকটা জায়গা জুড়ে, আর পুজোর পাঁচদিন কিছু না কিছু সাস্কিতিক পোগাম। কচিকাঁচাদের উৎফুল্লতা সবচেয়ে বেশি – নতুন জামাকাপড়, সাথে হাতখরচের কিছু পয়সা তা দিয়ে দেদার ফুচকা ঘুঘনি চালতা কুলের আচার, সময়মত বাড়ি না ফেরার চোখরাঙানি নেই, সব মিলে জমজমাট ব্যাপার। বয়স একটু বাড়লে তখন আবার এক-দু ঘন্টা আড্ডাও মারা যায় রাতের দিকে। সমস্যাটা হলো সাবালক হয়ে। উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে ফেলা মানেই অনেকটা গুপী বাঘার মতো যা চাই পরতে খাইতে পারি যেথায় খুশি যাইতে পারি সানিধাপামাগারেসা গাইতে পারি অবস্থা। অনেকের এই সাবালকত্বে পদার্পন হয় নিতান্তই নিরাড়ম্বর ভাবে।তবে এই গল্পের গুপী বাঘা সে পথ মাড়ায়নি। মাড়ায়নি বলেই এ গল্পের অবতারণা।

জগাই আর মাধাই এই পাড়াতেই বড় হয়েছে। একসাথে খেলাধুলো ঝগড়াঝাঁটি মারপিট। দুজনেই সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে যে যার কেরিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত। কে কি পড়ছে তা অপ্রাসঙ্গিক। তবে পাড়ার বাইরে বেরিয়ে দুজনেরই প্রচুর সদ্যপ্রাপ্ত সাবালকত্বের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে বিগত ২ মাসে। সেগুলো একে অপরকে খুলে না বলতে পেরে দুজনেরই পেট ফুলে ফেঁপে উঠছে। এমন সময় হঠাৎ করে না বলে কয়ে দুর্গাপুজোর আগমন। তা দুজনেরই কলেজ আপাতত বন্ধ। দিনক্ষণ পাঁজি পক্ষ দেখে জগাই মাধাই ঠিক করলো ষষ্ঠীর দিন তারা বিকেল বিকেল পাড়া থেকে বেরিয়ে পড়বে, গন্তব্য এসপ্ল্যানেড। তখন মোবাইল ফোনের যুগ আসেনি, তাই খুটখুট করে মেসেজ করে যোগাযোগের চল ছিলোনা। কাউকে ডাকতে হলে হয় তার বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়তে হবে, আর নিতান্তই আলসে হলে বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়তে হবে। তবে এযাত্রা হাঁকডাক নৈব নৈব চ। বন্ধুবান্ধব কেউ জেনে গেলেই হয় ঘন্টার পর ঘন্টা কৈফিয়ত দিতে হবে নাহলে সব দঙ্গল মিলে একসাথে যেতে হবে।  প্ল্যানমাফিক তাই ষষ্ঠীর বিকেলে দুজনে মাঞ্জা মেরে বিশ্বকর্মা সেজে গুটিগুটি পাড়া থেকে বেরিয়েই ট্যাক্সি। স্কুলজীবনে যে তারা ট্যাক্সি চাপতনা তা নয়, তবে কলেজ মানেই অ্যাডাল্ট, তাই পিতৃদেবের হোটেলে খেয়েও পকেটে রেস্ত তখন অনেক বেশি। জগাইয়ের পরনে এক ধবধবে সাদা জামা, তার নাম আবার Fried Water. মাধাই পরেছে Van Heusen এর ফর্মাল জামা। কলকাতা তখনো অনেকটা কলকাতাতেই ছিল, জ্যামজট থাকলেও এসপ্ল্যানেড যেতে বিশেষ সময় লাগলোনা। লিন্ডসে স্ট্রিটে নেমে দুজনে ঢুকে পড়লো গ্লোব সিনেমার পানশালায়। হ্যাঁ, তখন সিনেমা হলে বার থাকতো, রেস্টুরেন্ট ও।

দুজনে মিলে একটা টেবিলে বসেই তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো আশেপাশের লোকজনের হাতে হাতে ঘোরা রঙবেরঙের গেলাসগুলো দেখে নিলো। কলেজ যাওয়া ইস্তক দুজনেরই বেশ কিছু জ্ঞান আহরণ হয়েছে এ বিষয়ে। কি ব্র্যান্ড, খেতে কেমন, কোন তরলের সাথে কি খাবার খেতে হবে। বিশেষ কালবিলম্ব না করে দুজনে ঠিক করলো গ্রীন লেবেল বলে এক তরুণ তুর্কি। এর মধ্যে খাবারের অর্ডার দিতে না দিতেই আশ্চর্য ব্যাপার। গ্রীন লেবেলের রিপ্রেজেন্টেটিভ স্ক্রাচকার্ড নিয়ে হাজির। সেসব ঘষে পাওয়া গেলো গিফট। যদিও জগাই মাধাই নিজেদের কীর্তিকলাপ খানিক ফুলিয়ে ফাঁপিয়েই বলেছিলো, তবু একটা ব্যাপার সেই প্রথম গিফট পাওয়া থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো, যে গ্রীন লেবেলের লোকটাকে বারে বারে তবু আসতেই হবে ফিরে। তা সে এসেছিলোও। ৭ বার। গ্রীন লেবেলের সোনালী রঙের ছোঁয়ায় সন্ধ্যে তখন সত্যিই সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে। চিরুনি, পেন, কাপ, বেল্ট – টাকাকড়ি মিটিয়ে যখন তারা বার থেকে বেরোচ্ছে হাতে একরাশ গিফট নিয়ে, তাদের ভাবখানা ছিল যেন খেলার শেষে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ প্রাইজ পেয়েছে। ওয়েটারের চোখে যেন ছিল খানিকটা বিস্ময় খানিকটা সম্ভ্রম, আশেপাশের টেবিলের গুঞ্জন আর আড়চোখে চাউনি যেন তাদের সেই অতিমানবিক প্রদর্শনীরই নীরব সমাদর। বাস্তব হয়তো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, তবে জগাই মাধাই তা জানেনা, ওদেরকে সেটাই ভাবতে দিন।

গ্লোবের বারে বসে এদিকে কারো খেয়াল হয়নি সময় কত হলো সেটা দেখার। আর সময়ের দামও তেমন ছিলোনা যে ঘনঘন ঘড়ি দেখতে হবে। কিন্তু কটা বাজে সে খেয়াল হতেই দুজনের নেশা খানিকটা চটকে গেলো। মোটে সাড়ে ৮টা। পাড়ায় তার মানে পোগাম চলছে পুরোদমে, জগাই মাধাই দুজনেরই বাবা মা তার মানে পাড়ায়।  খানিক সময় নষ্ট করার অভিপ্রায়ে ওরা এসে ভিড়লো দু পা হেঁটে নিউ এম্পায়ার সিনেমা হলে। তাদের বার-কাম-রেস্টুরেন্ট ওপরতলায়, সেখানেও একবার ঢুঁ মারা হয়ে গেলো জগাই মাধাইয়ের। ঢুকুঢুকু দু পেগ হুইস্কি মেরে আবার ঘড়ির দিকে চাওয়া। সময় যেন কাটতেই চাইছেনা। সবে তখন বাজে ৯টা। দুই বন্ধু কোনোমতে চৌরঙ্গীর রাস্তা টপকে ঢুকে পড়লো ময়দানে। ময়দান ঘুটঘুটে অন্ধকার আর রাস্তার উল্টোদিকেই ঝলমলে এসপ্ল্যানেড। নেশাটা যেন একটু চড়ছে। আলাপে ঢুকে পড়ছে শীর্ষেন্দু সুনীল কলেজ ভবিষ্যৎ। একটু জিরিয়ে নিতে দুজনে বসেপড়লো ঘাসের ওপর। ঠিক জুৎ হচ্ছেনা। জগাই এলিয়ে পড়লো হেমন্তের শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর, খানিক পর  মাধাইও। নেশাটা যেন একটু দেরি করে চড়ছে। মোটে পৌনে ১০টা।

তবু ফেরার চেষ্টা করতে হবে। পুজোর বাজারে গাড়ি পাওয়া দায়। বহু ড্রাইভার দুই মাতালকে নিয়ে কলকাতার কুখ্যাত এলাকায় যেতে বিশেষ উৎসাহ দেখালোনা। অবশেষে এক দয়ালু চালক জগাই মাধাইয়ের সরকারি আবাসনের থেকে কিঞ্চিৎ আগে অবধি নিয়ে যেতে রাজি হলো। হেঁটে পাড়ায় ফেরার সাধ্য কারোরই নেই তখন, অগত্যা রিকশা ভরসা। পারে ফেরা মানে ষষ্ঠীর রোমাঞ্চকর অভিযানের সেখানেই ইতি, তাই জগাই মাধাই মনের আনন্দে গান ধরলো।মাধাই সিটে বসে, জগাই পাদানিতে ঝুলতে ঝুলতে।

এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়

Gilbey’s Green Label – সোনালী সন্ধ্যার অনুঘটক
Source: Quickcompany.in

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। দুজন চুপচাপ জর্দা পান খেয়ে গুটিগুটি বাড়ি ঢুকে ঘুমিয়ে পরদিন বন্ধুদের বলতে পারতো তাদের কান্ডকারখানা। কিন্তু বিধি বাম। আসল গল্পের শুরু তো এখান থেকেই। রাত সাড়ে ১০টা -১১টা। পাড়ার মুখে বসা গণশক্তির ষ্টল পেরিয়ে, পচা ডোবা পেরিয়ে রিক্সা এসে থামলো মণ্ডপের সামনে। গান কিন্তু তখন থামেনি। …”এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়”…পাদানি থেকে গড়িয়ে নামলো জগাই…”এ কি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু”…ভাড়া মিটিয়ে একে অন্যের গায়ে ঠেকা দিয়ে জগাই মাধাই মর্ত্যে পদার্পন করলো। মণ্ডপে ঢুকে গুটিকয় চেয়ার বিছিয়ে আরাম করে বসে দুজনে চারপাশটা একটু জরিপ করে নিলো। কেউ সন্দেহ করেনি তো? মন্ডপ আর তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জনাবিশেকের মাঝে তখন এক থমথমে নিঃস্তব্ধতা। নাঃ সব স্বাভাবিক।খালি দুজনের বন্ধুবান্ধব বাদে। বিনেপয়সায় তামাশা দেখার সুযোগ পেলে সবাই খানিক ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতো ছেঁকে ধরে, তেমনি এবেলাও তার ব্যতিক্রম হলোনা।

সবাইকে সব বিস্তারে বর্ণনা করে গিফট দেখাতে গিয়েই হলো প্রথম গুগলি। কোথায় গিফট, কোথায় কি? সেই বার থেকে বেরোনোর সময় কোঁচড়ে করে যত গিফট নিয়ে বেরিয়েছিল জগাই আর মাধাই, সে সব পড়ে আছে ময়দানে। আবার ফিরে যাবে কি তারা, ফেলে আসা জিনিসগুলোকে কুড়িয়ে আনতে? না, তারা পাগল নয়, মাতাল মাত্র। কিন্তু বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হয়ে, সারা সন্ধেবেলাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেও তাদের মনে খানিকটা খেদ রয়ে গেছিলো। কোথাও না কোথাও একটা খামতি রয়ে গেছে। তাই জগাই গিয়ে মাঝবয়েসী টেনিদার সামনে চেয়ার টেনে বসে ঠোঁটে আলতো করে একটা ক্লাসিক সিগারেট ঝুলিয়ে বললো, আগুন হবে? টেনিদা হঠাৎ বিষম খেয়ে পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ কানুবাবুকে বলল বাড়ি চলেন। জগাই সিগারেট ধরিয়ে ফুড়ুৎ করে খানিক ধোঁয়া ছেড়ে দুটো চেয়ার নিয়ে মণ্ডপে প্রতিমার পাশে গ্যাঁট হয়ে বসলো। মাধাই আবার খানিক পালোয়ান টাইপ। তার খানিক পাঞ্জা না খেলে ঘুম আসবেনা। সে এবার ওপাড়ার রিজুর সাথে একদফা মারপিট করে নিলো। যাকে বলে আসর জমজমাট।

জগাই তারপর যখন চোখ খুললো তার বদ্ধ ধারণা হলো সে মারা গেছে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, ছোট্ট এক চিলতে এক বেঞ্চ। মাথাব্যথা। হাতড়ে হাতড়ে আলো জ্বেলে আরেক আশ্চর্য ব্যাপার। সে রয়েছে একটা গুমটি ঘরে আর ঘরের ভেতর আরো ২-৪ জন অচেনা লোক। চোখের চশমা গায়েব, ঘড়ি নেই হাতে, মানিব্যাগ টাও হাপিস। ঘরে কনকনে ঠান্ডা। মরেই যখন গেছি, খানিক ঘুমিয়ে নেয়া যাক আগে, ভাবলো জগাই।

সপ্তমীর সকালে ৭টা নাগাদ হুঁশ ফিরলো তার। গুমটি ঘরটা থেকে বেরিয়েই পড়লো। আরে এ তো পাড়ার ক্লাবঘর। পেটে চরম খিদে এদিকে টাকাকড়ি সব গায়েব, শেষে টিউকল থেকে গাদাখানেক জল খেয়ে ল্যাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরলো জগাই। পরনের Fried Water তখন সবুজ আর কালোর মাঝামাঝি রঙে দাঁড়িয়েছে। ঘন্টা চারেক আরো ঘুমিয়ে আমতা আমতা করে কোথায় ছিল রাতে, জামার কি করে ওই দশা হলো এসব বিবৃতি দিয়ে বাড়ি থেকে যখন বেরোলো, মাধাই তখন অঞ্জলি দিতে নেমে পড়েছে। জগাইয়ের সব জিনিসপত্র ওর বাড়িতেই গচ্ছিত ছিল। এতক্ষনে দুজনেরই সাবালকত্ব প্রাপ্তি হয়েছে, এক রাত্রির ঘটনার জেরে। মাথা হেঁট করে, বকাঝকা খেয়ে, মাঝে কেউ এসে আবার প্রণামও ঠুকে দিয়ে গেলো – দুজনে প্রতিজ্ঞা করলো আর কখনো তামসিক ফুর্তি করবেনা। অনেক লোকসান। সেই প্রতিজ্ঞা বজায় ছিল অনেকদিন। অষ্টমী অবধি।

এরপর বহু বছর গড়িয়ে গেছে। তবু দুর্নাম রয়েই গেছে। ওই এক রাত্রির জেরে পাড়ায় যারা তাদের চিনতোনা সবাই হয়তো জেনে গিয়েছিলো ওদের দুজনের নাম। জগাই মাধাইকে একসাথে দেখলেই বন্ধুরা বলত আজ কি খেল দেখাবি। চুইং গাম খেতে খেতে পাড়ায় ঢুকলেই জিজ্ঞাসা কি খেয়ে এলি। এখন আর অত লুকোছাপা নেই। জগাই মাধাই কেউই থাকেনা পাড়ায় বহু বছর। তবু পুজোর সময় পাড়ায় দুজনকে দেখলেই লোকে আজও মনে করিয়ে দেয় পঁচিশ বছর আগের সেই সোনালী সন্ধ্যার কথা। জগাই মাধাইয়ের মনে চাগিয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া গিফটগুলোর জন্যে একদলা মনখারাপ। আর মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো সুর –

এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়

Advertisements
Standard
Bengal, Bengali culture, calcutta

কোয়েস্ট মল, ধুতি এবং কাছাখোলা বাঙালিয়ানা

আমি নিজে যে কতখানি বাঙালি তা নিয়ে আমারই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই যেমন প্যানপেনে উত্তমকুমারের সিনেমা পছন্দ নয়, বাংলা রকের আদ্ধেক শব্দই বুঝতে পারিনা, বাংলা বই যে শেষ কবে পড়েছি তা মনে পড়েনা, বাংলা যেন তেমন শুনিনা – তার চেয়ে পছন্দ স্প্যানিশ পপ-রক নয় ইয়ান্নি/ভ্যানজেলিসের অর্কেস্ট্রা। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি রবীন্দ্রসঙ্গীতও শুনিনা তা নয়, কিন্তু সারাক্ষন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে থাকি তাও নয়। ধুপধুনো দিয়ে পুজো করিনা। বিবেকানন্দ পড়িনি, তিনি কি কি বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে গেছেন সেগুলো এদিক ওদিক একটু আধটু জেনে সন্দেহ হয় তাঁর ভাবনাচিন্তাগুলো আদৌ আজকের যুগে খাটে কিনা। সুভাষচন্দ্র যে এখনো বেঁচে আছেন তাও বিন্দুমাত্র মনে হয়না। কলকাতার চেয়ে ক্যালকাটা লিখতেই পছন্দ করি। আর ওই বাঙালিরা যে সবথেকে বুদ্ধিমান ভারতীয়দের মধ্যে, সেটা মনে হয় ডাহা ঢপ। ওই What Bengal thinks today প্রবাদটা চরম ক্ষতি করে গেছে বাঙালীজাতির ইগোর জন্যে, ওই একটা কথাতেই যা বার খেয়ে বসে আছে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, তার ঘোর এখনো ভাঙেনি।

তবু এসবের বাইরে বিদেশে বসে কারো সাথে বাংলা কথা বলতে পারলে মন ভালো হয়ে যায়, কেউ কলকাতা থেকে হজমি নিয়ে আসলে গুঁড়োগুলো হাত থেকে চেটে চেটে খাই, মাছ রান্না হলে থালায় ভাত নিই দুগুণ। স্প্যানিশ গান শুনে হেজে গিয়ে শেষে চালাই লক্ষীছাড়ার সোনালী, বা শানের ও মাঝিরে। বইয়ের কথা মনে পড়লেই চোখে ভাসে সুনীল শীর্ষেন্দু সমরেশ। আর ইন্দ্রজাল কমিক্স। বিদেশে থেকেও বন্ধুবান্ধবকে কাকুতিমিনতি করে জোগাড় করি দুর্লভ সব সংখ্যা। দুর্গাপুজোয় ৫ পাউন্ড চাঁদা দিয়ে ঠাকুর দেখতে যাই যদি খিচুড়ি আর লাবড়া পাওয়া যায় সেই আশায়। তাই সাবেকী মতে বাঙালি কিনা সে নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আদপে আমার নিজের সত্ত্বার মধ্যে অনেকটাই যে বাংলাভিত্তিক তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। টেনিদা ঘনাদা পটলদা – হাঁদা ভোঁদা নন্টেফন্টে বাঁটুল – সুমন অঞ্জন নচিকেতা – পরশপাথর লক্ষীছাড়া ভূমি চন্দ্রবিন্দু ঘুরেফিরে মনে ধাক্কা মেরে জানান দিয়ে যায় যে হুঁহুঁ বাবা ছাড় পাবে এতো সহজে? তবে বাঙালি বলে জাহির করার আদিখ্যেতা কখনো ছিলোনা আমার, আর এখনো চেষ্টা করি কোনরকম দল বা গোষ্ঠীর নড়া না ধরতে। একজন মানুষ – এর বাইরে যে কোনো পরিচয় খুঁজতে যাওয়া থেকেই যত বিপদ্রব। তবু আজ দুপুরে যখন পড়লাম যে এক পরিচালক ধুতি পরে এক মলে যাওয়ায় তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি, তখন মনে হলো বাঙালি বিপন্ন। তার খুব নিজের পাড়া কলকাতাতেই।

কোয়েস্ট মল, বেকবাগান
Source: http://www.skycrapercity.com

এটা যে একটা ছুটকো ঘটনা তা নয়। গত বছর মোকাম্বোতে এক ড্রাইভারকে ঢুকতে না দেয়া নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। তারপরের ঘটনাও পার্ক স্ট্রিটে, cross-dressing মানুষদের বুক করা মিটিংয়ে না যেতে দেয়া। তবে এই দুই ঘটনার পিছনেই রয়েছে অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য। ড্রাইভার সে যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল গরিব দেখতে লোকদের ঢুকতে না দেয়া। একইভাবে crossdresser দের না ঢুকতে দেয়ার পিছনে রয়েছে সামাজিক কলঙ্কের চিন্তা। ঠিক যে কথাটা বলছিলাম আগে, বিশেষ করে কলকাতায় বিভিন্ন জাতি ধর্মের লোক একসাথে বসবাস করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে ওপরের প্রতি সৌজন্যমূলক। তা বলে বাঙালি সমাজ যে কুসংস্কার মুক্ত, সেটা মনে করাটা হবে পাগলের প্রলাপ। সামাজিক ভেদাভেদ আগেও ছিল, গরিব মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ নতুন কিছু নয়। তেমনি নতুন নয় সমকামী মানুষদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা বিদ্রুপ। এই রোগ আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। লজ্জার ব্যাপার কিন্তু নতুন করে আশ্চর্য হবার কিছু না। এই কোয়েস্ট মলে হওয়া ঘটনাটা মনে দাগ কাটে কারণ কর্তৃপক্ষের না ঢুকতে দেয়ার নির্দেশের মূল লক্ষ্য হলো ধুতি পরা লোকজন। ধুতি পাঞ্জাবি হলো খাঁটি বাঙালিয়ানার এক প্রতীক। বাঙালি সংস্কৃতির খোদ রাজধানীতেই এই জাতীয় বৈষম্যের মধ্যে খানিকটা সিঁদুরে মেঘ দেখাটা স্বাভাবিক বৈকি।

জীবনে দুবার ধুতি পড়েছি ভাই আর বন্ধুর বিয়েতে। দুবারই পেট খারাপ হয়েছিল, একাধিকবার বড় বাইরে যাবার যে কি কেলো ধুতি নিয়ে, তার আমি ভুক্তভোগী। তার পর থেকে ঠিক করেছি লোকে পয়সা দিলেও ধুতি এড়িয়ে চলব আজীবন। কিন্তু আসল ঝামেলা তো ধুতি নিয়ে নয়। ধুতি তো একটা সিম্বলমাত্র। আসল সমস্যা হলো এই যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ, তা মোকাম্বোই বলুন বা ওয়ান স্টেপ আপ, কিম্বা কোয়েস্ট মল, যেখানে যে যার ইচ্ছেমতো নিয়ম তৈরী করে চলেছে। এদের নিয়মকানুনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন কেউ তোলেনি আগে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মোকাম্বোর ঘটনার এক বছর পরেও যে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে, সেই বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে কলকাতাকে লন্ডন বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, আদপে লন্ডন বানাতে গেলে শুধু যে গোটা দুই বিগ বেন খাড়া করলেই হবে তা তো নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও যে বদলাতে হবে সে দিকটা বোধহয় তিনি ভেবে দেখেননি। এই জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ পশ্চিমি দুনিয়ায় কেউ করলে তাকে জনগণ অবিলম্বে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। শুধু যে নিজের আঁতে ঘা লাগলে তখনই তা নয়। অঢেল উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ অবিচার দেখে ভুক্তভোগীদের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অঢেল উদাহরণ আছে কলকাতাতেও। আর আশ্চর্যের ব্যাপারটা সেখানেই। যে শহরে এক পয়সা ট্রামভাড়া বাড়ার প্রতিবাদে আগুন জ্বলেছিল, সেখানে এই জাতীয় ধ্যাষ্টামো করার সাহস এদের কোথা থেকে এলো আর কবে থেকে সেটাই ভাবার।

ব্রিটেনে ভোটের সময় এক ব্লগে লিখেছিলাম Know your enemy. এই শত্রূ ঠিক শ্রেণীশত্রূ নয়, বরং খুঁজে বার করা যে সমস্যাটার জন্যে মূল দায়ী কে। কোয়েস্ট মলের ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে গেলে আসলে দেখা যাবে সর্ষের মধ্যেই ভূত। আমরা তো মোকাম্বো কোয়েস্টএর মুণ্ডপাত করতেই পারি আর সেরকমটাই হতে চলেছে যখন মানুষজন কোয়েস্ট মলের সামনে ধুতি পরে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু এই যে বাঙালিয়ানার আঁতে ঘা লেগেছে সেই হুজুগে খানিক বাওয়ালি করা, তার বাইরে একটু ভেবে দেখা যাক এসবের ব্যুৎপত্তি কোথায়। এই যে ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন রেস্তোরাঁ বা শপিং মলের এদের তো একটাই উদ্দেশ্য, যত বেশি সম্ভব বিক্রিবাটা। এই সব মলের খদ্দের কারা? বাংলাটা ঠিক আসেনা টাইপের মিলেনিয়ালরা নয়? ধুতি পরে বাজার করতে এলে ম্যানেজমেন্টের কি আসে যায় । আসলে সমস্যা কি যারা বাজার করতে যায় তারাই চায় না অন্য শ্রেণীর লোকেরা সেখানে যাক? আর এই যে কোয়েস্ট মল নিয়ে এতো হাঙ্গামা, গোটা পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে ভাবলে কটা লোকে সেখানে যায় বা যাবার সামর্থ রাখে? রিপোর্টটায় আরেকটা ব্যাপার পড়লাম যেটা আরো দুশ্চিন্তার। প্রথমে যখন নিরাপত্তারক্ষী সে পরিচালককে ঢুকতে বাধা দেন তিনি নাকি তখন তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলেন ম্যানেজার কে জানতে চেয়ে। মানে সমস্যাটা কি আরো গভীর, যে কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমান করতে গেলে ইংরেজিতেই কথা বলতে হবে? নাহলে কি কপালে ঘাড়ধাক্কা? এই যে জেনারেশন এক্স ওয়াইদের বাংলা না বলতে পারার ক্যালি, ধুতি না পরতে জানার ক্যালি, যারা এসব করে তাদের প্রতি উন্নাসিকতা – এসব কারণও কি পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে কোয়েস্ট মলের কর্তৃপক্ষকে? নিজে অন্যের থেকে আলাদা হতে চাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু অন্য কেউ যদি আমার মতো না হয়, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করাটা বিকৃতরুচির পরিচয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন সব দোকানে বাংলা নাম লেখা নিয়ে আন্দোলন করছিলেন তখন ভেবেছিলাম আবার একটা সিম্বলিজম নিয়ে ক্যাও। কিন্তু ইদানিংকালের এই সব ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বাঙালির বাঙালিয়ানা বিলোপ করার একটা চেষ্টা চলছে। কে দায়ী, অবাঙালি ব্যবসায়ীকূল, নাকি না-বাঙালি ট্যাঁশ মিলেনিয়ালরা, নাকি মল মালিক আর রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা তার হিসেব পরে করা যাবে, কিন্তু সেটা প্রতিরোধ না করতে পারলে এরকম আরো ঘটনা ঘটবে ভবিষ্যতে। ঐতিহ্য সংস্কৃতি এসব নিয়ে আগে কখনও মাথা ঘামাইনি, এগুলো কারো পিতৃদত্ত্ব সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের ধারা মেনে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি এদেরও পরিবর্তন হতে বাধ্য, আপনি চান বা না চান। এবং সেই বদলে এয়ারটেলের বিজ্ঞাপনের খোরাকী বাংলাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু বাংলায় কথা বলা, বাঙালি পোষাক পরা, নাক উঁচু পাঁচতারা জায়গায় খেতে যাওয়া — এ সবই ব্যক্তিগত পছন্দের। কিন্তু কেউ যদি সেটা না করে, তাকে ব্রাত্য করে দেয়া, হীনমন্যতায় ভোগানো কখনোই মেনে নেয়া যায়না। এও একপ্রকার বৈষম্যবাদ, আর সেই জন্যেই এক একটা ছুটকো ঘটনার জন্য অগোছালো প্রতিবাদে চিঁড়ে ভিজবেনা।

এয়ারটেল পোস্টপেড মোবাইলের বিজ্ঞাপন আনন্দবাজার পত্রিকায়
Source : Facebook

এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম কাল, মজা করে বললাম হোকক্যালানো। খবরটা পড়ে হয়তো অনেকেরই তাই মনে হয়েছে। এই ধরনের খবর বাজারে বেরোলেই সবার ষোল আনা বাঙালিয়ানা চাগিয়ে ওঠে। অনেকটা তেড়ে মেরে ডান্ডা করে দিই ঠান্ডা ধরনের হাবভাব। কিন্তু দায়ী কে সেটা ঠিক করবে কে? দায়ী কি সিকিউরিটি গার্ড যে নামমাত্র বেতনের বিনিময়ে হয়তো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে লোককে আটকাচ্ছে চাকরি না খোয়ানোর জন্যে? মলের ম্যানেজমেন্ট যারা নিত্যনতুন সুযোগসুবিধা না দিলে লোকে শপিং করতে যাবে অন্য জায়গায়? দায়ী কি মলের মালিকরা যারা হয়তো লাখ লাখ টাকা উপরি দিচ্ছে লোকাল পার্টিকে? নাকি দায়ী আমরা সাধারন পাবলিক যারা শাড়ির দোকানে বাংলা বললেও ঝাঁ চকচকে মলে গেলেই ইংরেজীতে কথা বলতে শুরু করি, অষ্টমীর দিন কেত মেরে ধুতি পাঞ্জাবি পরি কিন্তু অন্য সময় রাস্তায় ধুতি পরা লোক দেখলে নাক সিঁটকাই। আমরা যারা কলকাতার বাঙালিয়ানাকে এক ও অদ্বিতীয় ভেবে নিয়ে বাকী পশ্চিমবঙ্গের কথার টান, পোষাকআষাক আচার আচরন নিয়ে হাসাহাসি করি। আর যারা এই ব্যবহারগুলি করি তারাও কী সম্পূর্ণ দোষী? আমাদের যেভাবে বড় করা হয়েছে যেখানে বাংলা বই পড়া বারন, ইংরেজীতে কথা না শিখলে কপালে জোটে তিরস্কার, আবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে দক্ষিণীর স্বরলিপিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াটাও চাই। ক্যালানি যে দেবেন, কাকে দেবেন ক্যালানি? ওই সিকিউরিটি গার্ডটা আমাদের ঠুনকো অন্তঃসারশূন্য সমাজের এক বলির পাঁঠা মাত্র। মারধোর করে এই বিকার থামানো যাবে কি? চাই নতুন আইন যেখানে কোন শ্রেণী, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে পক্ষপাতমুলক ব্যবহার হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মনে পড়ে কিভাবে শব্দবাজি বন্ধ করা হয়েছিল? বা ময়দান থেকে বইমেলা সরানো? প্রশাসনের উদ্যোগ থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। একদিনে না হলেও সুরাহা সম্ভব। চাই উদ্যোগ আর সদিচ্ছা।

তাহলে উপায়? প্রতিবাদের কী দরকার নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু দরকার সেই প্রতিবাদ যাতে ঠিক জায়গায় পৌঁছায়। আর শুধু প্রতিবাদ নয়, তাই আমাদের নিজেদের মনের ভেতর উঁকি মেরে দেখা। আমরা প্রস্তুত তো এই জড়দ্গব সমাজ পাল্টানোর জন্য? চাই আরো সহমর্মিতা মানুষের প্রতি। কেউ বাকী সবার থেকে আলাদা হওয়া মানেই যে সে উদ্ভট, অপাংক্তেয় নয় সেই চিন্তা করার ক্ষমতা যেদিন হবে সেদিন আর বাঙালিয়ানা রক্ষা করার জন্যে দারোয়ান ঠ্যাঙাতে হবেনা।

Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — অন্তিম পর্ব ১৯০০-১৯৮০

লেখাটা শুরু করেছিলাম কলকাতা নিয়ে আমার যা যা স্মৃতি আছে সেগুলো বয়ান করার জন্য। দেখতে দেখতে সেই লেখা হয়ে দাঁড়ালো কলকাতার তিনশ বছরের ইতিহাসে। ইতিহাসে কোনো আগ্রহ স্কুলে থাকার সময় একদম ছিলনা, পরে ইতিহাস জানার ইচ্ছে হলেও দেখলাম ইতিহাস আসলে হলো যে যেরকম করে বলতে চায় তার বলা গল্প। আগের দুটো পরিচ্ছদে কলকাতা নিয়ে যা লিখলাম সেটা আমার ভার্সন বলা যেতেই পারে, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর তথ্যের সঙ্কলন। যা শুরু করেছি তা শেষ অবধি চালিয়ে যাব বলেই মনস্থির করলাম, তাই এই লেখাটা কলকাতার আধুনিক যুগ নিয়ে, তবে রেঞ্জটা ১৯৮০ তেই শেষ করব।  বাকি অংশটা অন্য আরেক লেখায় লিখব, আমার নিজের স্মৃতি থেকে, বেদের মত চর্বিতচর্বন করে নয়।  

বিংশ শতকের গোড়ার কলকাতা বলতে গেলে অতীতের কঙ্কাল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতাকে ঘিরে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য তখন শেষের দিকে। আঠার শতকের সেই লন্ডনকে টেক্কা দেয়া বিত্ত বৈভব তখন প্রায় লুপ্ত, উত্তর কলকাতার বাবুসমাজও তখন অবক্ষয়ের পথে।  কোম্পানিকে ভর করে সঞ্চিত সম্পদ অপব্যয় করে তাদের অবস্থা পড়তির দিকে। বরং সমাজে চালকের জায়গা করে নিয়েছে উচ্চবংশের উচ্চশিক্ষিত মানুষজন, তবে আগের দুই শতকে যা খুব কম দেখা গেছে সেই সাধারণ ঘরের অতি মেধাবী মানুষেরাও তখন একাসনে অবস্থান করে নিয়েছে। ১৮৮৫ সালে গড়ে ওঠা কংগ্রেসের হাত ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও শুরু হয় উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ঠিক করলেন বাংলার এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার উত্থান বন্ধ করার জন্যে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা কে দুই ভাগে ভাগ করা হবে।  সারা ভারত তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল, যার প্রধান বিরোধিতা হলো কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। বহু প্রতিবাদ বিরোধ জনআন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করে।  কিন্তু সেই Divide  and Rule এর যে বিষ ছড়িয়ে দিয়ে গেল ব্রিটিশ সরকার সেই ছ বছরে, তার জের এখনো হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান পরিবার ভোগ করে চলেছে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার সাথে সাথে ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেল দিল্লিতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁচ যাতে সরকারের গায়ে না লাগে।  দুশ বছরেরও বেশিকাল ধরে যে কলকাতাকে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বানিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, বাংলা বিহার উড়িষ্যা অসমের কাঁচামাল হরণের পর তার প্রয়োজন তখন ফুরিয়েছে, আর কলকাতার সেই তিলোত্তমা রূপও তখন আর নেই – কলকাতা মানে তখন এক পূতিগন্ধময় অস্বাস্থ্যকর Black Hole।

কলকাতার গল্প তো এখানেই শেষ হতে পারত, অতীতের সেই সোনার দিনগুলো পেরিয়ে সে তখন কাতারে কাতারে মানুষের ভারে ন্যুব্জ এক শহর, যার তুলনা হতে পারতো মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন বা উর। না, কলকাতা সেখানে থেমে যায়নি, বরং রাজধানী খেতাব থেকে মুক্তি পেয়ে বোধহয় আপন খেয়ালে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে।  তার প্রধান কারণ অবশ্যই যে ব্রিটিশ রাজধানী হবার সূত্রে যে পরিকাঠামো গত দুই শতকে তৈরী হয়ে ছিল, তার প্রভাব বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয়নি, অন্তত রাজধানী বদলের সাথে সাথে তো নয়ই।  কলকাতা তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী, তাই তার রাজনৈতিক প্রভাব বা তাৎপর্য ব্রিটিশদের কাছে তখনও অশেষ। তার সাথে যোগ হবে কলকাতার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাফল্যের তুঙ্গে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ আশুতোষ জগদীশচন্দ্র প্রফুল্লচন্দ্র সি ভি রমন বিবেকানন্দ প্রমুখ মানুষের  অবদানের পথ ধরে কলকাতার উনিশ শতক থেকে কুড়ির শতকে পা রাখা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে প্রফুল্লচন্দ্র গড়লেন বেঙ্গল কেমিকেল যা এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে।  ১৯০৮ অলিম্পিক এ শোভাবাজার এর নর্মান প্রিচার্ড  সোনা পেলেন, ১৯১৩য় রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রথম এশীয় নোবেল। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইতিহাস সৃষ্টি করলো প্রথম ভারতীয় ফুটবল দল যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।  এসব তথ্য এখন হয়ত কেবলই পরিসংখ্যান অথবা কুইজের প্রশ্ন কিন্তু সেই সময়ে ফিরে গেলে কলকাতার যে আমূল পরিবর্তন ঘটছিল দুশ বছর পুরনো এক ঔপনিবেশিক সত্ত্বার প্রভাব কাটিয়ে দেশীয় স্বাধীন চিন্তা এবং মেধার উন্মেষে তা এককথায় অভূতপূর্ব আর বিস্ময়কর। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারত স্বাধীন হওয়া অবধি কলকাতার ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভিত্তি করে।  ক্ষুদিরাম প্রাফুল্ল চাকি থেকে শুরু করে সেই বিপ্লবী প্রতিবাদ জারি রয়ে গেল বারীন ঘোষ, চিত্তরঞ্জন, অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষ যতীন দাস বিনয় বাদল দীনেশ এঁদের মধ্যে। গোটা ভারতের মত কলকাতাও সেই জ্বালাময়ী সময়ের সাক্ষী বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে সারা বাংলা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সবার দান অশেষ আর প্রত্যেকের অবদান নিয়েই এক একটা গোটা অধ্যায় লিখে ফেলা যায় কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলনের ভূমিকা কলকাতার পরবর্তীকালের ইতিহাসের পক্ষে অপরিসীম হলেও সে বিষয়ে আর গভীর আলোচনায় জড়ালাম না।

এরই মাঝে মাঝে কিছু বিক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা আজকের কলকাতার উত্থানের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে সেগুলো তুলে ধরলাম। ১৯২৪ সালে কলকাতা অবশেষে পেল সেই অপূর্ব মর্মর সৌধ যার ভিত্তিপ্রস্তর ইংলন্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ করে গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে – ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কলকাতায় এখনো কেউ আসলে যদি জিগ্গেস করে কি কি দ্রষ্টব্য ছাড়া চলবেনা, ভিক্টোরিয়া সেই তালিকায় একদম প্রথমে থাকবে। প্রায় একশ বছর পেরিয়েও এই সৌন্দর্য আর লাবন্যে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। এই ১৯২৪ সালেই কলকাতা কর্পোরেসানের প্রথম মেয়র হলেন চিত্তরঞ্জন দাশ।  এর কিছুদিন পরেই এসে উপস্থিত হলেন এক যুগোস্লাভিয় সেবিকা, যাঁর নাম এখন কলকাতার পরিচয়ের সাথে সমার্থক। সুদুর লাতিন আমেরিকার, দূর প্রাচ্যের ক্যাথোলিক দেশগুলিতেও কলকাতার নাম ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে এই মহিয়সী মহিলার আত্মদান অনস্বীকার্য —  মাদার টেরেসা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে গঙ্গার দুকুল বাঁধা পড়ল কারিগরী বিদ্যার এক অসাধারণ উদাহরণে। হাওড়া ব্রিজ আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় কোন নাটবল্টু ছাড়া কেবলমাত্র রিভেট দিয়ে গড়া এই সেতু কেমন করে আজও এই বিপুল পরিমান যানবাহন বহন করে চলেছে। এই সময়ের কলকাতা যেমন দেখেছে প্রগতি আর সাফল্য তেমনই ক্ষণেক্ষণে ঢেকে গিয়েছে দুঃশঙ্কার মেঘে। বিদেশীদের divide and rule নীতির কবলে পরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে বিভেদের বিষ ছড়িয়ে গেল, তার সাক্ষ্য বহন করবে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার বলি হলো সবচেয়ে বেশি মানুষ। কলকাতার পুরনো কিছু ছবিতে দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা লাশ হিংস্র ধর্মান্ধতার আর সাম্রাজ্যবাদের শিকার। বিশ্বযুদ্ধের সময় গোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের উপহার কলকাতার মন্বন্তর যেখানে লাখে লাখে মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায় খাদ্যের যোগান থাকা সত্তেও। ১৯৪১ এ ২২শে শ্রাবণ চলে গেলেন কবিগুরু, কলকাতা তথা বাংলার সাহিত্য জগতে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি করে।  আর কিছু বছর পর, ১৯৪৫ য়ে জাপান যাবার পথে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন ভারতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতাহী সুভাষ যাঁর অন্তর্ধান আজও এক রহস্য।  এই সব টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৭ সালে এল সেই দিন, যার জন্যে সারা ভারতের মাতা কলকাতাও অপেক্ষা করে ছিল অনন্ত কাল, নতুন ভারতের পটভূমিতে সূচনা হল কলকাতার নতুন রূপান্তরের।  ঔপনিবেশিক অতীতকে ভিত্তি করে, এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের উদ্দেশ্যে সেই রূপান্তর।

স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতা যে রাতারাতি এক সম্পূর্ণ পরিবর্তীত মহানগরে পরিনত  হবে সেই আশা কেউই করেনি। তখনকার কলকাতা প্রাণে ভারতীয় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি কার্যকলাপে তখনও বিদেশী, ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেলেও অধিকাংশ শিল্প বানিজ্য প্রতিষ্ঠান তখনও চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। এছাড়া স্বাধীনতার পরে দেশভাগের সাথে সাথে কাতারে কাতারে হিন্দু পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে, আর স্বভাবতই রোজগারের আশায় বেশির ভাগই হাজির হয় কলকাতায়। কলকাতার তখনকার নগর পরিকাঠামো এই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জন্যে বিন্দুমাত্রও প্রস্তুত ছিলনা, কিন্তু তখনকার কলকাতায় সম্প্রসারণের জায়গা ছিল প্রচুর। হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের ঠাঁই হলো কলকাতার দক্ষিনে যোধপুর যাদবপুর টালিগঞ্জ বেহালা বেলেঘাটা ইত্যাদি এলাকায়। এই বিপুল পরিমান মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা করে দেয়ার জন্যে সরকার অনেক ফ্ল্যাট তৈরির কাজে হাত লাগলেও, বেশির ভাগই তৈরী করে নিল নিজেদের আশ্রয় জমি দখল করে বস্তি বানিয়ে। তুলনামূলক ভাবে অবস্থাপন্ন বাঙালরা গেল আর একটু উত্তরে, বালিগঞ্জ কালিঘাট ভবানীপুরের দিকে, প্রধানত এপার বাংলার মানুষদের এলাকার সীমানায়। পূর্বের বাঙাল আর পশ্চিমের ঘটি এই দুই বিপরীত সংস্কৃতির মানুষের এই প্রথম বিপুল হারে সংমিশ্রন। ভাষা আচার জীবনযাপনের যে চরম বৈষম্য ছিল প্রথমের দিকে, সেটা সম্পূর্ণ দূর হতে লেগেছে আরো কয়েক দশক, কিন্তু এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রনে কলকাতার বাঙালি সমাজ এক নতুন এবং অনন্য মাত্রা পেল।  স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া এবং আরো বেশ কিছু বছর পর অবধি আরো প্রচুর মানুষ প্রানের ভয়ে বা জীবিকার সন্ধানে পূর্ব বাংলা থেকে বাসা গুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে কলকাতায়, আর এই শহর তাদের গ্রহণ করেছে সানন্দে। নিউ ইয়র্ককে লোকে বলে big apple কিন্তু কলকাতা যে পরিমান মানুষের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের উপায় করে দিয়েছে সে হিসেব খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তার পরিবর্তে এই শহর পেয়েছে তার অনন্য পরিচয়। এ শহর ঘটির নয়, বাঙালের নয়, দেশ স্বাধীনের পর রয়ে যাওয়া হাজার হাজার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের নয়, চিনে দর্জি, ইহুদি পারসী আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের নয় নয় জীবিকার খোঁজে আশা বিহারী ঠেলাওয়ালা উড়ে ঠাকুর মারোয়ারী ব্যবসায়ীর — এ শহর এদের সবার সম্মেলনে গড়ে ওঠা এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো নয় কিন্তু ভাষা ধর্ম জাতির বৈচিত্রে কলকাতার সমগোত্রের মহানগরী ভারতে কেন সারা পৃথিবীতে বিরল। 

এই বিপুল সংখ্যক জনগণ কলকাতায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে আরো একটা ঘটনা ঘটছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে তার হার অনেকগুণ বেড়ে গেল। ভারতবর্ষে কম্যুনিস্ট মার্ক্সবাদী দর্শন এবং রাজনীতির পথিকৃৎ বলতে গেলে মানবেন্দ্রনাথ রায়।  জমিদার সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার দাবি করার প্রস্তাব বিশেষ করে ভারতবর্ষের মত বৈষম্যমূলক দেশে সাধারণ মানুষের কাছে প্রবল সমর্থন পেতে লাগলো। বিশেষ করে দেশভাগের পর যখন ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে কংগ্রেস ছাড়া আর কারো নাম করা যায়না আর কংগ্রেস তখন কুলীন জনগনের পার্টি আম জনতার নয়।  এই পটভূমিতে কলকাতায় বামপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় স্বাধীনতার পর পরই যার চূড়ান্ত পরিনতি হলো বামপন্থী দলের ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসীন হওয়া। ষাটের দশকে গোটা বিশ্বের বামপন্থী আন্দোলনের হাওয়া কলকাতাতেও চরম ভাবে প্রতিফলিত হয় যার হাত ধরে এলো কলকাতার দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁস ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। সাহিত্যে সুনীল সমরেশ শীর্ষেন্দু শক্তি চলচ্চিত্রে সত্যজিত ঋত্ত্বিক মৃনাল সেন অভিনয়ে উত্তম সুচিত্রা সৌমিত্র উৎপল দত্ত সঙ্গীতে মান্না দে সলিল চৌধুরী এঁদের হাত ধরে বাঙালির যে চরম বুদ্ধিগত উত্তরণ ঘটে এই সময় তার মূলে ছিল বামপন্থী আন্দোলন এবং উদারিকরনের আহ্বান। সেই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক বিস্তারে কলকাতার অবদান অনস্বীকার্য। ধর্মতলা কলেজ স্ট্রীট পার্ক স্ট্রীট এককথায় সমগ্র মধ্য এবং দক্ষিন কলকাতা এই নতুন সীমানাহীন জীবনের হাতছানিকে বাস্তবে রুপান্তরের অভিযানের কেন্দ্রে।

বামপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কলকাতার তরুণ প্রতিভারা নেতৃত্বে থাকলেও আসল লড়াইটা চলছিল সমস্ত বাংলায়, কৃষক শ্রমিক মজুরদের হাত ধরে।  একই ভাবে কলকাতার শহরতলীতেও সেই প্রতিবাদী বামপন্থী আন্দোলনের কৃতিত্ত্ব লেখক শিল্পীদের সাথে সাথে সেই অগুন্তি অদৃশ্য মানুষদের যাদের এতদিন কোনো ভাষা ছিলনা।  মিছিল ধর্মঘট অবস্থান ঘেরাও সব বিভাগে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের যে জোয়ার কলকাতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ষাটের দশকে সেখানে বড় ভূমিকা ছিল কলকাতার সেই উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গীয় সম্প্রদায়ের।  যাদবপুর বিজয়্গড় লেক গার্ডেন্স টালিগঞ্জ বালিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষদের কলোনিগুলো হয়ে উঠলো সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা এই মানুষরা ভারতে এসেছিল সবকিছু খুইয়ে, কলকাতায় তাদের আশ্রয় বলতে অস্বাস্থ্যকর একচালা ঘর, জীবনধারনের জন্য প্রত্যেকদিন লড়াই।  এই অবস্থায় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্যবাদ এই মানুষদের আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল বৈষম্যমুক্ত এক সমাজের। 

এই ছবিটা আমূল পাল্টে গেল সত্তরের দশকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বাধ্য করলো লাখে লাখে হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসতে। সবাই যে আসতে পেরেছিল তা নয়, তবু কলকাতার জনসংখ্যা এই সময় যেমন হঠাত এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেল, তেমনি বিশ্বজুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের নুতন ভাঙাগড়ার প্রভাব এসে পৌছালো কলকাতার অলিগলিতেও। এক শ্রেণী চাইছিল সশস্ত্র সংগ্রাম বলশেভিক বিপ্লবের মত বা মাওয়ের পথ অনুসরণ করে।  অন্য দল ছিল তখনও রাশিয়াবাদী, তাত্ত্বিক বামপন্থাকে প্রশ্ন করা মানেই প্রতিক্রিয়াশীল ছাপ পড়ে যাওয়া। এই টানাপোড়েনের মাঝে শুরু হলো নকশালবাড়ি আন্দোলন, যার আঁচ কলকাতাকেও গ্রাস করে নিল সাথে সাথে। শুরু হয়ে গেল প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্ধ, ছেচল্লিশয়ের দাঙ্গার পর আবার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭২ সালে মুখ্যমন্ত্রী হলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।  নকশাল বিপ্লব দমন করতে তিনি তাদের চেয়েও ক্রুর ভূমিকা নিলেন যেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কিনা জানা নেই। শুরু হয়ে গেল পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক হত্যা, গুপ্ত হত্যা, নকশালদের হাতে পুলিশ আর সিপিএম খুন, সিপিএমের হাতে নকশাল খুন, কংগ্রেস আর পুলিশের হাতে নকশাল আর সিপিএম খুন। অবশেষে এসবের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৭ সালে সেই প্রায় কুড়ি বছরের আন্দোলনের ফল হিসেবে সিপিএম এলো ক্ষমতায় — তবে নকশাল পিরিয়ড চলেছিল আরও অনেক বছর ধরে, সিপিএম ক্ষমতায় আসার পরেও।

কলকাতার স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেটা দাঁড়াল রাজনৈতিক ইতিহাসে কিন্তু কলকাতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে রাজনীতি তাই এর চেয়ে সহজভাবে এই তিরিশ বছরের  ঘটনাবলী লেখা যেতনা। রাজনীতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কলকাতার গতিবিধি নজর করে নেয়া যাক এক ঝলকে। স্বাধীনতার পর থেকে বিপুল পরিমান মানুষের সমাগম কলকাতার নগর পরিকাঠামোর উপর অসীম চাপ সৃষ্টি করে।  বিধান রায়ের স্বপ্নের প্রকল্প সল্টলেক এলাকায় নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জলাজমি ভরিয়ে গড়ে ওঠা সেই উপনগরিতে তখন মানুষ যাবার কোন আগ্রহই দেখায়নি, তবু দুই দশক পরে যখন কলকাতার পথব্যবস্থা প্রায় অচল, প্রচুর পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা এই উপনগরী তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু যারা সল্টলেকে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত মানুষ জমি এবং বাড়ি তৈরির মূলধন তাদের তখন ছিল।  তবে সল্টলেকে সরকারি কিছু ফ্ল্যাটও তৈরী হয় সাধারন নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য। একইভাবে বলা যেতে পারে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তৃতি। বালিগঞ্জ ছাড়িয়ে গোলপার্ক ঢাকুরিয়া যাদবপুর সেই সময়ে প্রচুর সম্প্রসারিত হয়, বিশেষ করে রিফিউজি মানুষদের সংস্থানের জন্য। একের পর এক গড়ে ওঠে সরকারি চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি ন্যুনতম ভাড়ায়। আরেক দিকে কলকাতা বেড়ে উঠছিল দক্ষিন পশ্চিমে বেহালায় যা স্বাধীনতার আগে ছিল মূলত জলাঞ্জলি আর শিল্পাঞ্চল। কলকাতার পরিবহন পরিষেবা গড়ে ওঠে ষাটের দশকের গোড়ায় মূলত সরকারি CSTC বাস দিয়ে, তার পর একে একে যুক্ত হয় প্রাইভেট বাস মিনিবাস ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে তৈরী হয় মেট্রো রেলের মাস্টার প্ল্যান যার পরিনতি ১৯৮৪ সালে ভারতবর্ষের প্রথম ভূতল পরিবহম ব্যবস্থা যা আজও কলকাতার গর্ব। ষাটের দশকে গড়ে ওঠে রবীন্দ্র সদন।  জীবনযাত্রার দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলকাতা তখন শিক্ষা সংস্কৃতি পান্ডিত্যে ভারত সেরা যার নমুনা চলচ্চিত্রে সংগীতে লেখায় শিল্পে অগুন্তি।  মানুষ বামপন্থী আন্দোলনের আবেগে অনুপ্রানিত হয়ে প্রতিবাদী চিন্তাধারার প্রতিভূ যেখানে expressionয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কলকাতায় তখন পাড়ায় পাড়ায় গান নাচ আবৃত্তি আঁকা ইত্যাদির ছড়াছড়ি। সেখানে খেলার স্থান তবে শুন্য। কলকাতার তিন প্রধান ছাড়াও প্রথম ডিভিসন ফুটবল লিগের দলগুলো অসাধারণ ফর্মে থাকলেও, কলকাতা থেকে খুব কম ফুটবলারই উঠে এসেছে সেই সময়। তবু তখনো ভারতে ফুটবল মানেই কলকাতা। 

আশির দিকে কলকাতায় এলেন ফরাসী লেখক দমিনিক লাপিয়ের। শহর তাঁর মন জয় করে নিল, কলকাতাকে তিনি বললেন City of Joy. এ শহরে দারিদ্র্য প্রবল, পরিকাঠামো অচল তবু মানুষের মুখে হাসি আছে, আছে জীবনকে উপভোগ করার আত্মবিশ্বাস। একাধারে কলকাতা যেখানে যাত্রা শুরু করেছিল কুড়ির শতকের গোড়ায়, সেই একই প্রগতি বজায় থেকেছিল আশির দশকের গোড়া অবধি। আশির পরের কলকাতায় প্রগতি থেমে যায়নি বরং বেড়েছে, শুধু পরবর্তী সময়কালের লেখাটা নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা করে লিখব বলেই আশিতে এই লেখা থামানোর পরিকল্পনা। কলকাতা এই সময় অবধিও ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসে কলকাতার যে হার না মেনে নেয়ার ক্ষমতা দেখা গেছে, সেখান থেকেই বলা যেতে পারে যে কলকাতা এখনো মৃতনগরী নয়, কলকাতা আছে কলকাতাতেই। আমার শহর আমার গর্ব আমার City of Joy.

Standard
calcutta, History

কলকাতার একাল সেকাল — দ্বিতীয় পর্ব ১৮০০-১৮৯৯

সেই ১৬৯০ সালে জোব চার্নক ইজারা নেবার সময়ের তিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রাম থেকে আঠার শতকের শেষে শৌর্য স্থাপত্য বৈভবে লন্ডনের সমগোত্রে উত্থান — কলকাতার এই একশ বছরের যাত্রা রূপকথার চেয়ে কম বৈচিত্রপূর্ণ নয়। তবে সেই ঠাটবাট কেবলমাত্র সীমিত ছিল এক শ্রেণীর মানুষের উপর যারা ব্রিটিশ শাসকদের তোষামোদ করে তাদের স্নেহভাজন হয়েছিল। কলকাতাবাসী বাঙালি সমাজে তখনও ভাগ ছিল দুটো, ধনী আর গরিব। শহরের সেই আমূল পরিবর্তনের সময় উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের বর্ণনা আধুনিক বাঙলা সাহিত্যের শুরুর দিকের লেখায় পাওয়া গেলেও সাধারন মানুষের জীবনযাপন নিয়ে তেমন লেখালেখি হয়নি। উনিশ শতকের কলকাতা সাক্ষী হয়ে থাকবে আর এক আমূল পরিবর্তনের যার কেন্দ্রে থাকবে সেই অকিঞ্চিৎকর মানুষদের জীবনযাত্রার বদল, আর শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিবর্তন। 

প্রথম পরিচ্ছেদের আঠার শতকের কলকাতায় লিখেছিলাম কলকাতা আগাগোড়া ব্রিটিশদের গড়া শহর, এই শহরের শুরু থেকে এমনকী এখনো পর্যন্ত সেই সময়কার প্রভাব কলকাতার অস্থিমজ্জায় জুড়ে আছে প্রায় সকল ক্ষেত্রে —শিল্প শিক্ষা সমাজব্যবস্থার পরিকাঠামোয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পরিকাঠামো তৈরীর পর ইংরেজদের প্রয়োজন হয়ে পড়ল skilled workforce বা শিক্ষিত লোকবল সেই বিশাল আর ক্রমবর্ধমান প্রসাশনিক কার্যকলাপ আর সাম্রাজ্য চালানোর জন্য যা জীবিকার খোঁজে আসা ইংরেজদের মধ্যে ছিলনা। ফলে সেই ঘাটতি মেটানোর জন্য কলকাতাবাসী বাঙালি অধিবাসীদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হল এক শিক্ষাব্যবস্থা যা পরবর্তীকালে কলকাতা তথা বাঙালি চিন্তার উন্মেষ আর বিকাশে এক অনস্বীকার্য অবদান। স্বাধীন চিন্তার বিকাশের জন্য ইংরাজী শিক্ষা যে অপরিহার্য নয় তার উদাহরন মধ্যযুগে চৈতন্যদেব থেকে কবীর থেকে লালন ফকির, সেখান থেকে রামকৃষ্ণ অবধি অনেকেই আছে, কিন্তু ইংরেজী শিক্ষা এবং সাহিত্যের মাধ্যমে এক নতুন চিন্তাধারা, শত সহস্র মাইল দুরের এক জগৎ সম্বন্ধে ধারনা আর সেখানকার সাহিত্য বিজ্ঞান শিল্প কলায় প্রভাবিত হয়ে বাংলা ভাষা আর চিন্তাধারার নবজাগরন সেই প্রথাকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালানোর পরিকল্পনা থেকে একের পর এক চালু হল হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল, স্কটিশ চার্চ, প্রেসিডেন্সি কলেজ ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেগুলো এখনো পর্যন্ত কলকাতার শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের প্রথম সারিতে। 

উনিশ শতকের প্রথম দিকে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে কলকাতার বাঙালী সমাজের উদারপন্থা বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল। বোম্বাই মাদ্রাসের মত প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতেও এই পরিবর্তন ঘটেছিল, তবে বাঙালি জীবনে দীর্ঘদিনের ভিনদেশী শাসনের প্রভাবে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যুক্তিবাদী চিন্তাধারা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল, যার ফল হল কলকাতায় পাঠশালার পরিবর্তে ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রথম দিকের স্নাতকদের মধ্যে মুক্তচিন্তার  প্রসার যার শুরু আঠার শতকে রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব এবং এই তালিকায় জুড়ে গেল আরো অনেক নাম — বিদ্যাসাগর , ঠাকুর পরিবার, বিবেকানন্দ, ডিরোজিও, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ। সংস্কৃতে একটা কবিতার লাইন এই সময়ের চিন্তার বিবর্তনের সাথে যথোপযুক্ত “বিদ্যত্বঞ্চ নৃপতঞ্চ নৈব তুল্য কদাচন। স্বদেশে পুজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে॥”  সমাজে অর্থবলই যে সম্ভ্রম উপার্জনের একমাত্র উপায় নয় সেটা উনিশ শতকের এই চিন্তাবিদদের উত্থানে প্রমানিত হয়ে গেল কলকাতার বাঙালি সমাজে, যেখানে উচ্চশিক্ষিত আইকনের অভাব ছিল এই সময়ের আগে পর্যন্ত। ফলে প্রথমদিকে কলকাতার শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞানচর্চায় অগ্রনী মানুষরা সচ্ছল অর্থবান পরিবার থেকে আসলেও শতাব্দীর শেষের দিকে শিক্ষার ওপর ধনী মানুষদের কায়েমী অধিকার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। 

এই প্রসিদ্ধ মানুষদের নতুন চিন্তাধারার পরিনাম হল বাংলার রেনেসাঁস আর সামাজিক উদারীকরণ।  রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার গল্প এখন ইতিহাস কিন্তু তার রূপায়ন তখনকার গোঁড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে কিরকম দুঃসাধ্য এখনকার সমাজ চেতনা থেকে তা কল্পনা করাও দুস্কর। সেরকম বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য বিদ্যাসাগরকে কুলীন বাঙালি সমাজের কাছে কেমন হেনস্থা হতে হয়েছিল তা কারও অজানা নয়। এই জাতীয় প্রথাগুলোর বিলুপ্তি বা পরিবর্তনের পিছনে তখনকার নব্য বাঙালি চিন্তাধারার মানুষদের অবদান বিচার করলে তার খানিকটা কৃতিত্ব যাবে তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের আর তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার। Change comes from within কথাটা এক্ষেত্রে খুব উপযুক্ত, কারন তারা আগ বাড়িয়ে কেবলমাত্র প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ করে সেই প্রথাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেনি, যেটা করলে সেটা দেখাত শাসকশ্রেণীর সম্পূর্ণ বাঙালি জাতীর ওপর হস্তক্ষেপ, ফলে তার প্রতিবাদ হতো অনেক জোরালো। তার পরিবর্তে ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত বা জীবনদর্শনে অনুপ্রেরিত বাঙালি সমাজের প্রতিভু মানুষদের মাধ্যমে আনা পরিবর্তনগুলোয় সাধারন মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে সেই সমাজ পরিবর্তক মনিষীরা যাদের পরবর্তীকালে সমাজ সাগরে গ্রহন করেছে তাদের দূরদর্শিতার প্রমান পেয়ে আর সেই সাথে সমাজে শিক্ষার বিকাশের মাধ্যমে উদার চিন্তার উন্মেষে। 

উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন এই ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কার্যকলাপ চালানোর জন্য বিভিন্ন স্কুলকলেজ স্থাপনা করা হচ্ছিল, সেখানে সাধারণত খুব মেধাবী না হলে সাধারন নিম্নবিত্ত (নাকি সাধ্যবিত্ত!) মানুষদের উপস্থিতি ছিল নগন্য যা পাল্টাতে শুরু করে শতাব্দীর মাঝামাঝি মিশনারিদের আগমনে। খ্রীষ্টধর্ম যে পৃথিবীর সব ধর্মের চেয়ে মহান এবং অন্য ধর্মের মানুষদের তাদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি — এই ধারনা সেই মিশনারিদের প্রধান লক্ষ্য হলেও তাদের জীবনের মূল ব্রত ছিল সেবা তা অনস্বীকার্য, আর সেই ব্রত থেকেই প্রধানত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য হলেও, বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল স্থাপনার মাধ্যমে সাধারন মানুষদের কাছে খুলে গেল শিক্ষা বিন্যাসের দরজা। লা মার্টিনিয়ার, সেন্ট জেভিয়ার্স, লোরেটো, বেথুন, ক্যালকাটা বয়েজ প্রমুখ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও কলকাতার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জগতে অগ্রনী ভুমিকায় রয়েছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রগতির সাথে সাথে শিল্প আর বানিজ্যের বিপুল সম্প্রসারণ ঘটেছিল উনিশ শতাব্দীর কলকাতায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী হিসাবে কলকাতার হয়ে উঠেছিল আমদানী-রপ্তানির মুল কেন্দ্র। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে কলকাতায়ও শুরু হল এক শিল্প বিপ্লব যা উনিশ শতকের কলকাতার সেই আমূল পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অণুঘটক। প্রথম একশো বছর কলকাতা বন্দর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কিন্তু বানিজ্যের পরিমান সেই তুলনায় তেমন বেশী ছিলনা। শুরুর দিকে কলকাতা বন্দরের পশ্চাদভুমি সীমিত ছিল হাওড়া হুগলি চব্বিশ পরগনা থেকে উত্তরে নদিয়া মুর্শিদাবাদ অবধি। উনিশ শতাব্দী মাঝামাঝি সেই পশ্চাদভুমি বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল বিহার উড়িষ্যা সমগ্র পূর্ব ভারত, সম্পূর্ণ অবিভক্ত বাংলা, উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলি। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতা বন্দরের যতগুলো জেটি ছিল তার বেশীর ভাগই এই সময়ে নির্মিত। এই বিশাল বিস্তারের মুল কারন ছিল গঙ্গার দুই পাড়ে পাটশিল্পের আর সেই সাথে বস্ত্রশিল্পের পত্তন। ইংরেজদের মূল রপ্তানির বস্তু ছিল সেই পাট আর কাপড়, সেই সাথে যেত নীল ইউরোপে আর আফিম চিনে। নীল চাষিদের দুর্দশার বিবরন অনেকেরই জানা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে কিন্তু সেই নীলকর সাহেব বা তাদের তাঁবেদার জমিদারেরাও যে কলকাতার সেই বাড়বাড়ন্তের অংশীদার সেদিক থেকে ভেবে দেখলে কলকাতার ইতিহাস সেই শুরু থেকেই স্থানীয় মানুষদের শোষন আর নিপীড়নের কাহিনী। 

পাট আর বস্ত্রশিল্পের বাইরে খনি বিশেষ করে কয়লাখনির ব্যবসাও এই সময়ে প্রথম চালু হয়। আসানসোল রানীগঞ্জ ইত্যাদি কয়লা বলয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয় রেলপথে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেই পারে যে কলকাতা ততদিনে বাকী ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর সাথে রেলপথে যুক্ত হয়ে গেছে, ফলে আভ্যন্তরিন খনিজ অঞ্চলগুলোর সাথে রেল যোগাযোগ ও তার সাথে রপ্তানির পরিমান বৃদ্ধি কলকাতা বন্দরের সম্প্রসারণের প্রধান কারন। কলকাতাকে আমদানি রপ্তানির কেন্দ্র করে গঙ্গার দুই তীরে গড়ে উঠেছিল আরো বিভিন্ন কারখানা জেসপ টিটাগড় পেপার মিল। সেই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে সামিল হতে অনেক ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরাও চলে আসে কলকাতায়, যারা বেশীরভাগ ইংরেজ হলেও ছিল ডাচ ফরাসী জর্জিয় আর্মেনিয়রা। এই বাকী শ্রেণীর মানুষরা সাধারণত খুচরো ব্যবসায় সামিল হলেও, ইংরেজরা সেই ক্রমবর্ধমান বাজার থেকে মুনাফা বাড়ানোর আশায় চালু করল এক সিস্টেম যেখানে কাঁচামাল আসত ব্রিটেন থেকে, তারপর তৈরী হওয়ার পর ফেরত যেত আবার সেই বিলেতে, অনেক বেশীগুন লাভে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝি তাই কলকাতার বাজার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে খুচরো ব্যবসায়ীরা দোকান বা কাঁচা বাজারে ব্যবসা চালাতে লাগল, অন্যদিকে পাইকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করল বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যম গোটা দেশের সাথে বানিজ্য। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বলতে যা বুঝি তার প্রথম সংস্করন এই ব্যবসাগুলি। সাধারন কাঁচা ব্যবসা গোটা শহরে ছড়িয়ে থাকলেও, এই দ্বিতীয় প্রকারে ব্যবসাগুলি ছড়িয়ে ছিল কেবল চৌরঙ্গী, এসপ্ল্যানেড স্ট্র্যান্ড রোড অবধি —যা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাহেবদের খাস তালুক। এসপ্ল্যানেডের নতুন জৌলুসি দোকানপাট সুপারস্টোরের পরতের পিছনে গলিঘুঁজিতে এস এন ব্যানার্জি রোড বা বিবাদী বাগে এখনও চোখে পড়বে সেইসব দোকানগুলোর অবশেষ। 

ইন্টারনেটে একটা লিঙ্কে দেখলাম কলকাতা বন্দরে এইসব ব্যবসার প্রসারে প্রায় দু কোটি ডলারের আমদানি রপ্তানি হত উনিশ শতকের মাঝের দিকে। সেই বিপুল পরিমান বানিজ্যকে সাহায্য করতে কলকাতা শহরের নাগরিক পরিকাঠামোর প্রচুর উন্নতি হয়েছিল সেই যুগে। কলকাতা শহরে চলল প্রথম ট্রাম, শুরু হল প্রথম রেলপথ। একে একে তৈরী হল গঙ্গার ওপর সেতু দুই পাড়কে রেল আর সড়কপথে জুড়তে।  কলকাতার বিভিন্ন সব সৌধ বা দর্শনীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থাপত্যগুলি যেমন রাজ ভবন, শহীদ মিনার সব উনিশ শতকেই তৈরী। এই সময়ে কলকাতার ভৌগোলিক কী পরিবর্তন হয়েছিল তা ঠিক জানা নেই তবে মনে পড়ছে জিপিও বা ইস্টার্ন রেলের অফিসের পেছনে গঙ্গা বইত যা এখন অনেক পশ্চিমে সরে গিয়েছে। তবে কলকাতার সেই বানিজ্যিক সুবর্ন যুগে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে চলে আসে প্রচুর মানুষ। মাল পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে সড়ক বা রেলব্যবস্থা তখনকার দিনে বহুল প্রচলিত হলেও যাত্রী পরিবহন ছিল বিরল এবং দামী, ফলে সাধারন দিনমজুরদের পক্ষে সেই পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করা ছিল দুঃসাধ্য। এর পরিনাম হিসাবে সেই শ্রমিকরা কলকাতাতেই বসবাস করা শুরু করে সাধারণত ব্রিটিশদের সেবকদের এলাকায়। এই জায়গাগুলো সাধারণত ছিল জীবনধারণের অনুপযুক্ত, নিকাশী ব্যবস্থা প্রায় অদৃশ্য, পানীয় জলও অস্বাস্থ্যকর — কলকাতার বস্তি অঞ্চলগুলোর সূত্রপাত সেই সময় থেকে।

Tristram Hunt এর লেখা একটা বই হঠাৎ চোখে পড়েছিল একদিন এই ব্লগ লেখার সময়। বইটার নাম Ten cities that made the empire। দোকানে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে নিলাম কি বক্তব্য কলকাতা নিয়ে সেটা জানার জন্য। দেখা যাচ্ছে যে উনিশ শতকের শেষের দিকে নয়, এই অধোগতির শুরু প্রথম দিকেই। ২০০৮ এর লেম্যান ব্রাদার্স এর পতন দিয়ে যেমন বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা শুরু, তেমনই ১৮৩০ সালে এক সিন্ডিকেট ব্যবসার পতনকে হান্ট বলছেন কলকাতার জাঁকজমকের শেষ অধ্যায়। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে ম্যানচেস্টারে তাঁতশিল্প্রের বিপুল সম্প্রসারণে কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব তখন অনেকটাই বিলুপ্ত। কলকাতাকে ঘিরে কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তখনকার লেখাতে পরিস্কার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, প্রাসাদনগরী জাতীয় ভুষণের পরিবর্তে কলকাতা মানে তখন দাঁড়িয়েছিল দারিদ্র্য, মহামারী, আকাল, অস্বাস্থ্যকর ইত্যাদি রূপকে। 

রবীন্দ্রনাথের “ধনের ধর্মই অসাম্য” কথাটা কলকাতার পত্তন আর বিস্তারের ক্ষেত্রে দারুনভাবে প্রযোজ্য। উনিশ শতকের শুরু থেকে শেষ অবধি কলকাতা যত বেড়েছে তত বেড়েছে অসাম্যও — একদিকে ব্রিটিশদের কুলীন কলকাতা এসপ্ল্যানেড চৌরঙ্গী ফোর্ট উইলিয়াম অন্যদিকে বাবুদের চারণক্ষেত্র উত্তর কলকাতা। এই দুইয়ের মাঝে ফাঁকফোকরে গলিঘুঁজিতে জায়গা করে নিচ্ছিল ভাগ্যের খোঁজে আসা খেটে খাওয়া মানুষের দল। এই অসাম্য সমাজের সব স্তরেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। ইংরেজরা প্রথম কলকাতা আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদারেরা ছিল তাদের সহযোগী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারা ভারত জুড়ে ব্যবসা বিস্তার করার পর তাদের আর এই আঞ্চলিক সাহায্যের দরকার রইলনা, তাই ইংরেজদের সহায়ক বাবু সম্প্রদায় উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশদের অধীনে খিদমত খাটা পোষ্যে পরিনত হল। ক্ষমতালোভী কিছু মানুষ সেটা মেনে নিয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশদের প্রশাসনিক পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এনেছিল। সেই স্বাধীনতার প্রথম বিপ্লবের আগে অবধি ব্রিটিশদের ধারনা ছিল যে তাদের বণিকের ছদ্মবেশ মানুষ মেনে নিয়েছে কলকাতার জাঁকজমক দেখে বা ভাগ্যের পরিহাস ভেবে। সিপাহী বিদ্রোহ তাদের সেই ধারনা ভেঙে দেখিয়ে দিল যে অসন্তোষ খোদ ব্রিটিশদের রক্ষাকারী সেপাইদের মধ্যেই অনেক, বাকী নিপীড়িত লোকজন যাদের দুর্দশার ফলে ব্রিটিশদের সেই প্রাচুর্য, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তো আরো অনেকগুন বেশী। তাছাড়া সিপাহী বিদ্রোহে মানুষ যে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত সেটাও ইংরেজরা টের পেল ১৮৫৭ তে, আর নজর দিল রাজস্ব আদায়, কোনরকম রাখঢাক না রেখে আর তাদের বিরুদ্ধে রব তোলা প্রতিবাদীদের রাজদ্রোহ ইত্যাদির মোড়কে কঠোর বিচারে। 

প্রথম দেড়শ বছরে কলকাতার যে বিস্তার জাঁকজমক হয়েছিল সেখান থেকে পরবর্তী সময়ের পতনের কাহিনীও উনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই শুরু। সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজদের অত্যাচার যেমন বেড়ে গিয়েছিল তেমনি এটাও পরিস্কার ছিল যে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও সম্ভব। এছাড়া ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত মানুষরা ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে সেখানকার স্বাধীন মুক্ত সমাজের ধারনায় দিক্ষিত হয়ে এক স্বাধীন ভারতের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠল। স্বাধীনতা সংগ্রামে সেই নতুন মাত্রা যোগ হয়ে উনিশ শতকের শেষের কলকাতা তখন ভারতের ব্রিটিশ বিরোধিতার পুরোভাগে। সেই প্রতিবাদ তীব্র আকার নেয় কয়েক বছর পর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ রায়ের সময়, যার ফলস্বরূপ ১৯১১য় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লিতে। কলকাতা পরবর্তী শতাব্দীতে তার অস্তিত্বের গুরুত্ব ক্রমাগত হারাতে থাকে সেই সময় থেকেই। কলকাতাকে নদীর গতিপথের সাথে তুলনা করলে আঠার শতকে কলকাতা ছিল দুর্দম উচ্ছল দুর্বার পার্বত্য অঞ্চলে নদীর প্রবাহের মত। উনিশ শতকে তার প্রকৃতি সমভুমিতে নদীর মত বিপুল বিস্তৃত আর শেষের শতকে কলকাতা মোহনার দিকে চলা নদীর মত দিকে দিকে চড়া দ্বীপ ইত্যাদিতে পরিপূর্ন, প্রথম অধ্যায়ের সেই বাঁধনছাড়া উচ্ছাসের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই, বরং অত্যধিক ব্যবহারে পলি জমে জমে নদীর চেয়ে চড়া বড় হয়ে উঠেছে। বিংশ শতকের কলকাতা যেমন আকার আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনই তার অবক্ষয়ের হারও সমানুপাতিক বেড়েছে। 

একাধারে বিচার করলে কলকাতার ঠাটবাট যেমন প্রবল পরিমান বেড়েছিল উনিশ শতকের প্রথম দিকে, তারপর মাঝের বছরগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে আর তার সাথে স্থাপিত হয় গঙ্গার দুই তীরের শিল্পবলয়, আর শেষের বছরগুলো পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃত। কলকাতার ইতিহাসের এরকম ঘটনাবহুল শতাব্দী বোধহয় আর আসেনি যেখানে শুরুর ব্রিটিশ প্রভাব কাটিয়ে শেষের দিকে এই শহর এগিয়ে চলেছিল তার নিজের সত্তার সুলুকসন্ধানে, যা পরবর্তী যুগে কলকাতার বিবর্তনের প্রথম ধাপ। 
Standard