Bengali, Life experience, Memory, Nostalgia

জলপাইগুড়ির দিনরাত্রি

সেই কবে তারাপদ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম এক জবরদস্ত অযোধ্যা সিং-এর রাম খাওয়ার গল্প, যার শেষের লাইনটা ছিল সেই অযোধ্যা আর নেই, আর সেই রামও আর নেই। নাঃ এটা পলিটিক্যাল লেখা নয়, রাম নিয়ে রসিকতা করার ধ্যাষ্টামো আমার নেই। সে রাম খালি হনুমানদের, আমি যে রামের কথা বলছি সেটা একান্তই এই হনুর। মাল গাঁজা সহযোগে বেলেল্লাপনার চরম উদাহরণ রেখে গেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার দিনরাত্রিতে। হঠাৎ করে সে বইয়ের কথা মনে পরে মনটা চলে গেলো ১৮-১৯য়ে, হ্যাঁ সে ছিল একটা সময় বটে। জলুতে তখন ফার্স্ট ইয়ার। সব পোনাদের উপদেশ মেনে লেখাপড়া ডকে, আরে বাপু ক্যাম্পাসিং এমনিও হয়না, ওমনিও হয়না, পড়ে আর কি ছিঁড়বি। কাজেই চালাও দেদার বিড়ি সিগ্রেট বাংলু। জলুর কথা মনে পড়ায় ভাবলাম, সুনীল সমরেশ সন্দীপনের কলকাতার দিনরাত্রির চেয়ে আমাদের জলুর দিনরাত্রিগুলো কম রঙিন ছিলোনা। রামের কথাই যখন উঠল তাহলে রাম দিয়েই শুরু করি। ফোর্থ ইয়ারের নামকরা মাতাল পোদুদা একদিন রাতে আমাদের হোস্টেল এ এসে আমাদের দুজনকে নাম ধরে খোঁজা শুরু করলো, কিবে তোর নাম হনু? হ্যাঁ দাদা। আর তুই খেঁচু। হ্যাঁ। শুনেছি তোরা নাকি হেভি মাল খাস? এই দেখ এক বোতল রাম, চল রুমে চল। আর বোতল মানে পাঁইট ফাঁইট নয়, পুরো খাম্বা। তবে আদ্ধেক আগেই সাঁটিয়ে এসেছিলো মহাপুরুষ। আহা সেই যে হল অফ ফেমে নাম ওঠার অনুভূতি হয়েছিল, জীবনে আর কখনো সেরম কৃতার্থ বোধ করিনি। পুরো চার বছরের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ উজাড় হয়ে যাবে, সেসব থেকে বেছে বেছে দুটো ঘটনাই শেয়ার করলাম। তখনকার বন্ধুবান্ধব সব এখন দায়িত্বশীল চল্লিশ ছুঁইছুঁই ধেড়ে মানুষ, কাজেই তাদের আর বিব্রত করলাম না আসল নামধাম বলে, পড়ে যাদের যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে যাবে, আর বাকিদের বলি আসল নাম দিয়ে কি ঘন্টা হবে হ্যাঁ?

দিন

সেটা ৯৭ সালের মে মাসের কথা। ফার্স্ট ইয়ার। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার ২ সপ্তা আগে অন্ডকোষ টাকে উঠে গেছে, তখন প্রমাদ গণছি কেন সারাটা বছর না ঘষে কাটিয়েছি, এবার হয়ত খেলাম ইয়ার ল্যাগ। এমন সময় টাউনে ব্যাপক বাওয়াল হয়ে কলেজ বন্ধ। সে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। এবার কি করা? বাড়ি যাবার বেশ ১০-১২ দিন দেরি আছে কিন্তু কলেজে কিচ্ছু করার নেই আর টাউনে যাওয়া বন্ধ ফের বাওয়ালির ভয়ে। এমন সময় একদিন সকল ৯টায় সবে দাঁত মাজছি এমন সময় হোস্টেলের করিডোরে দেখতে পেয়ে রামুদা হাঁক মারলো, হনু মদ খাবি চল। ভাবলাম খোরাক দিচ্ছে, উত্তর দিলাম দাঁড়াও ৫ মিনিটে আসছি। ৫ মিনিট পর দেখি কি কেলো, রামুদা এসে হাজির, আমাকে আর খেঁচুকে নিতে। ভাবলাম হোস্টেলে বসে বসে ছেঁড়ার চেয়ে খানিক মাল টেনেই দেখা যাক, সকালে কখনো খাইনি। সাড়ে ৯টা নাগাদ তিন মূর্তি গিয়ে হাজির হলাম কলেজ মোড়ে. পাতি দরমার দোকান, তাতে সকালে খিচুড়ি চা বিস্কুট এসব বাদ দিয়ে আড়ালে আবডালে বাংলাও পাওয়া যায়। চেনা লোকদের পেতে একটু সুবিধা বেশি। তা সে দোকানে গিয়ে গোটা কয় বাংলা নিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে। সামনে NH 31 ফাঁকা বললেই চলে। গরম আসছে আসছে তবে তখন আজকালেরমতো পেছন ফাটানো গরম পড়তোনা। তাই গাছের ছায়ায় আরাম করে বসে আড্ডা জমলো চরম, সাথে বাংলার মৌতাত। তখন সিগারেট খাওয়া ছাড়িনি তাই মদ সিগারেট জুটি জমে গেলো। ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে বাংলার বোতলের সারিও জমতে লাগলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে কেএকজন এসে ক্যারমবোর্ড পেতে ফেললো, ব্যাস সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন কে পাল্লা দিয়ে কত বোতল মাল টানলো তার একটা কম্পিটিশন ছিল, তাই পরিষ্কার মনে আছে ৯টা সাড়ে নটা থেকে দুপুরে খাবার সময় অবধি পাঁচ বোতল বাংলা সাঁটানো হয়ে গেছে। দুপুরে গিয়ে অনেক্ষন ধরে চান করলাম যাতে ধুনকিটা কমে আসে। রাতে আবার গাঁজলুদার সাথে মাল খাবার প্ল্যান যাতে কেঁচে না যায়। ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে উইংসে ঢুকেছি তো ছানা ধরলো আমায়, মাল খেতে গেলাম ওকে বলিনি কেন। কি কান্ড, বললাম আবার চল তাহলে। আবার চললাম কলেজ মোড় সাইকেল চেপে। ছানা সবে মাল খাওয়া ধরেছে, খানিক ট্রেনিং দিয়ে দিলাম বাংলা কিভাবে খেতে হবে তার। এক দেড় বোতল খাবার পর কে একজন এসে জুটলো, খুব সম্ভব চামচিকে। ছানাকে এর মধ্যে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে বেশ গোটাকয় রসগোল্লা খাইয়ে দিয়েছি যাতে নেশাটা চড়া হয়। আবার একের পর এক বোতল জমতে লাগল। মনে আছে যে বেঞ্চিতে বসে মাল খাচ্ছিলাম আমাদের পাশে একটা ট্রাকওয়ালা ভাত খাচ্ছিলো। নেশার ঘোরে ছানাকে বললাম এই দ্যাখ, লোকটা না মাছভাজা খাচ্ছে। এই বলে দুজনে যা অট্টহাস্য লাগলাম, ট্রাকওয়ালা হাফ খাবার খেয়েই মানে মানে কেটে পড়লো। সময় প্রায় আড়াইটে তিনটে হঠাৎ মনে হলো যে না, এবার যথেষ্ট হয়েছে। নেশাটা বেশ চড়েছে, সাইকেল চালিয়ে ফিরতে আর পারবোনা। মনে হয় পাকেচক্রে আবার রামুদাকেই খুঁজে পেলাম রিক্সা করে হোস্টেল দিয়ে আসার জন্যে। ছানা তো তখন বেশ বুঁদ হয়ে আছে। মুখ বন্ধ পাছে জনতা খোরাক দেয়। এদিকে আমার ততক্ষনে ন বোতল বাংলা খাওয়া হয়ে গেছে। খেয়াল ছিল যে বমি করতে হতে পারে, তাই আমার বালতিখানা নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমার রুমমেটের খাটে। প্ল্যান হলো একটু ঘুমোনো।

তা সে গুড়ে বালি, জনগণ মাতাল পেলেই উল্লাসে ফেটে পরে খোরাক দেখার জন্যে। সেদিন আমি ছিলাম পুরো ঠিকঠাক, বুঝতে পারছিলাম নেশা বেশি হয়ে গেছে কিন্তু একটু ঘুমিয়ে নিলেই কেটে যাবে। এদিকে জনগন বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্যে রুম ভর্তি করে ফেলেছে। আমার রুমমেট পড়েছে চরম বিপদে। বমি করলে ওর বিছানা নষ্ট, এদিকে আমাকে সরাতেও পারছেনা। চেষ্টা করলো খানিক তেঁতুলজল কোথা থেকে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতে। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও যখন মুখে গ্লাস গুঁজে দিলো, তখন ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। মুখ ভর্তি তেঁতুলজল পাশ ফিরে ওর খাটের পাশ দিয়ে ফেলে দিলাম। অবস্থা বেগড়বাঁই দেখে রুমমেট হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে ওর খাটেই ঘুমোতে দিলো।

এদিকে নেশার ঘোরে থাকায় ছানার খোরাক মিস করে গেলাম। ছানা ছিল খুব অধ্যবসায়ী ছেলে। শরীরচর্চা করতো, নিয়ম মেনে চলতো। মদ খেয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল চলে গেছে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা। রুমে ফিরে ছানা নাকি তাই গোটা পঞ্চাশ ডনবৈঠক দিয়ে দিলো, তার পরও কিছু হচ্ছেনা দেখে আমাদের কাঠের আলমারিতে নাকি দুমদাম ঘুঁষি মারতে শুরু করলো। আমাদের তাপস পাল ছিল পালোয়ান, ছানার রুমমেট, সেও ছানার সেই ফর্ম দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছিলো কি করে ফেলে সেই ভয়ে।

খোঁয়ারি যখন ভাঙলো, দেখি সন্ধ্যে নটা। যতদূর মনে পড়ছে স্পেশাল খাবার ছিল সেদিন। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে গেলাম গাঁজলুদাকে ধরতে আবার রাতের রাউন্ড শুরু করার জন্যে, কিন্তু সব কীর্তিকলাপ শুনে সেদিন আর গাঁজলুদা নিয়ে গেলোনা সাথে। ওই দিনের আগে পরে বেশ কিছু বার সারা দিন ধরে বেলেল্লাপনা করেছি কিন্তু ন বোতল বাঙলার রেকর্ড সেই একবারই।

রাত

দিনের বেলা মাতলামির গল্প মনে করা সহজ কারণ খুব বেশিদিন সারাদিন ধরে ড্রিংক করা হয়ে ওঠেনি। রাতের বেলার গল্প আলাদা। এতো রাশি রাশি গল্প মনে আসে রাতের যে তার ফিরিস্তি একসাথে দেয়া মুশকিল। গোলমালের ব্যাপার হলো যে তার অনেক গল্পেই বাকি সবাই খোরাকের অংশীদার আমি ছাড়া, আমিই ছিলাম খোরাকের কারণ। সে দিনগুলোর কথা আর নাই বা বললাম, তবে ইয়ারমেটদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমাকে সামলে রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। ফার্স্ট ইয়ারের কথাই বলি, কারণ সেকেন্ড ইয়ার থেকে আমরা খানিকটা হলেও সিনিয়র হয়ে গেলাম। তাই প্রথম বছর উইংসে বাইরে থেকে মদ কিনে সদলবলে খাওয়ার আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

এমনি এক দিন দিনু মানে দিনবাজার থেকে এক বোতল হুইস্কি কেনা হয়েছে, গোটা ৭-৮ জন খাবো বলে। আমাদের ৭ নম্বর রুম ছিল তাস, সিগারেট আর মালের ঠেক, তাই আমাদের রুমেই সব এসে জুটলো। সবে পেগ বানিয়ে দু চুমুক দিয়েছি দেখি দরজা দিয়ে কে উঁকি মারছে। পানুপন্ডিত। পানু ছিল আমাদের পাশের রুমে। সিধেসাধা ছেলে, আমাদের ইয়ারের এক মেয়ের ওপর তার প্রচুর ব্যথা তখন। সবে দিন দুই আগে উইংসের সবাই ওকে পরামর্শ দিয়েছে যে সেই মেয়ের মন জিততে হলে গান গাইতে হবে। সেই দু দিন ধরে পানুর রুমমেটরা আমাদের গালি পাড়ছিলো যে সারাদিন পানু তাদের বেসুরো গলায় গান শোনাতে চাইছে। ভাবলাম বেশ তো সুযোগ। পানু আমাদের জিজ্ঞেস করলো, তোরা কি মদ খাচ্ছিস? – হ্যাঁ তুই খাবি? ভেবেছিলাম বলবে না, দেখি ঝপ করে রুমে চলে এসে আমাদের মাঝে বসে পড়লো। – বড় বড় গায়করা স্টেজে গান গাইতে ওঠার আগেই মদ খায়। আমিও খাই, গলাটা ভালো হবে। পানুর যুক্তি শুনে আমরা হাঁ। খোরাক দেখার জন্যে আমরা পানুকে বড় বড় পেগ বানিয়ে দিলাম। সেই তার প্রথম মাল ধরা, কিন্তু টপাটপ বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে ফেললো। আমরাও মজা দেখার জন্যে ওকে আরো বড় পেগ বানিয়ে খাওয়ালাম। নেশাটা যাতে চড়ে আরো, তাই খানিক চিনি, গ্লুকন ডি এই সব ও খাওয়ালাম যখন ও বললো যে মাথা ঝিমঝিম করছে। ওকে বলা হলো যে সুগার কমে গেছে, বেশি করে চিনি খেতে হবে। এখনো জানিনা চিনি খেলে নেশা বাড়ে কিনা কিন্তু তখন সেটা সবাই বিশ্বাস করতাম। হুইস্কির বোতল আর হাফ কৌটো গ্লুকন ডি শেষ করার পর ঠিক করলাম এবার হোস্টেলের বাইরে যাওয়া যাক।

রাতের সেই সবে শুরু। পানুকে বললাম তুই যদি সেই মেয়ের মন জয় করতে চাস তাহলে চল বাইরে লেডিস হোস্টেলে। বাইরে হাওয়া খেলে নেশাও কমবে আর সুস্থ বোধ করলে তাকে একটা গানও শোনাতে পারবি। পানুপন্ডিত টোপ খেয়ে গেলো। দলবল মিলে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেলের বাইরে। দু চারটে সিনিয়র দাদারা কমন রুম থেকে আমাদের সাবধান করে দিলো। ১ নম্বর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সব হাঁটা মারলাম কলেজের দিকে। প্ল্যান ছিল একে একে সব লুকিয়ে পড়বে, তারপর পানুকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করবে আর খোরাক নেবে। সাইকেল ভাড়া নেয়ার দোকান অবধি গিয়ে পানু বসে পড়লো বেঞ্চিতে। ওর নাকি বেদম মাথা ঝিমঝিম করছে। আমরা ওকে লেডিস হোস্টেলের রাস্তা দেখিয়ে বললাম চল হোস্টেলে ফিরে চল। খোঁয়াড়ি অনেকটা হলেও পানু ঠিকই ধরে ফেলল ওকে কোথায় যেতে বলছি। এদিকে পানু বলছে ও হোস্টেলে ফিরবে, আর আমরা মজা লোটার জন্যে বলছি আমরা এখন হাওয়া খেতে বেড়িয়েছি, এক্ষুনি ফিরবোনা, ওর ইচ্ছে হলে ও একা ফিরতে পারে। আমরা গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে আর পানু এদিকে ২-৩ বার হোস্টেল যাওয়ার চেষ্টা করে গোটা ৫০ গজ গিয়ে আবার ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে পড়লো। এখনো মনে আছে পানুর দুলে দুলে খানিক দুর হেঁটে আবার ফিরে আসা।

সেই বসে থাকা অবস্থায় পানুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো যে মদ খাওয়া অতীব খারাপ কাজ আর আমি আর খেঁচু হলাম গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাকি আমরাই খারাপ করে দিয়েছি। ভাবো কান্ড কুড়ি বছরের ধেড়ে খোকা যেচে রুমে এসে হাফ বোতল ফাঁক করে দিয়ে গেলো, আর আমরা হলাম গিয়ে দোষী। যাক সেসব গায়ে না মেখে সবাই বসে রইলাম কি করে তা দেখার জন্যে। অবশেষে আমাদের হোস্টেলের থার্ড ইয়ারের গোটা দু-তিন দাদারা বাইরে থেকে মাল খেয়ে ফিরছিলো, পানু তাদের দেখে ধরলো। দাদা আমাকে একটু হোস্টেল পৌঁছে দেবে আমি আজকে মদ খেয়েছি খুব মাথা ঝিমঝিম করছে। তা সে দয়ালু দাদারা নিজেরা খোরাক নেয়ার জন্যে পানুকে সাইকেলে চাপিয়ে হোস্টেলে নিয়ে গেলো।

ব্যাপারটা সেখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু দুটো ভিন্ন ধরনের ঘটনা বললাম কারণ সব সময় সব কিছু অনাবিল ফুর্তি আর খোরাক দিয়ে শেষ হয়নি তাই। হোস্টেলে চুলকানোর লোকের অভাব ছিলোনা। সেরকমই একজন আমাদের ইয়ারমেট দেখলো বেশ মজার ব্যাপার পানুপন্ডিত আমাদের মানে আমার আর খেঁচুর ওপর খেরে আছে। ও পানুকে প্রচুর পিন মারলো যে আমরা একদম বাজে ছেলে, পানুর উচিত আমাদেরকে বাওয়াল দেয়া। ও আমাদের ক্যালালে আমরা নাকি পালাবার পথ পাবোনা। আর পানুর ব্যথা পানুর হিরোগিরির খবর শুনে নিশ্চয় ওর ওপর ফিদা হয়ে যাবে। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে পরদিন চান করার সময় অন্য উইংসের আরেক পানু আমাদের পানুর প্যান্ট গামছা সব লুকিয়ে দিলো। পিন খেয়ে পানু ভাবলো সেটাও আমাদের কীর্তি। সন্ধ্যে বেলা পানু ধরলো খেঁচুকে, গালাগাল ধাক্কাধাক্কি পানুর নাক ভাঙলো, আমাদের দুজনের আবার ragging শুরু হলো, পানুর বাবার বন্ধু প্রফেসর আমাদের দুজনকে সাসপেন্ড করার হুমকি দিলো – মানে সব মিলে ঘেঁটে ঘ। মোটের ওপর খোরাকটা মনে হয় আমাদের ওপর দিয়েই গেলো, পানুকে রোজ রোজ নাক দেখাতে টাউনে নিয়ে যাওয়া আসা করতে করতে। তবে হ্যাঁ, অত সবের পর শিক্ষা একটা হয়েছিল তবু, যে পাঁড় মাতাল ছাড়া কারো সাথে মদ খেতে বসার অনেক ঝঞ্ঝাট। সে ঘটনার পর থেকে পেঁচো মাতালদের সাথেই ঠেক হতো বেশি।

জলু গিয়েছি প্রথম বার তা সে নয় নয় করে হয়ে গেছে একুশ বছর প্রায়। এখন স্বাধীনতা প্রচুর, লুকিয়ে চুরিয়ে ব্ল্যাকে মদ কিনতে হয়না। ঘরেই খাওয়া যায়। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার, ফাইনাল, চাকরি – যত বয়েস বেড়েছে, মাল খাবার সুযোগও বেড়েছে, আর সেটা যত সহজলভ্য হয়েছে, নেশাভাঙের যে থ্রিলটা ১৩-১৪ তে ছিল, ২৩-২৪এ তার অনেকটাই চলে গেছে। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার যে রোমাঞ্চ সেটা চলে যাবার পর মদ খাওয়াটা তেমন আর উপভোগ্য রইলোনা। দারু খেতে বসে মদের চেয়ে খাওয়ার অর্ডার হতো বেশি। শেষ যে কবে মাল খেয়ে আউট হয়ে গেছি মনেই পড়েনা। ৭ বছর আগে পুজোয় বাড়ি গিয়ে, সেটাই বোধহয় শেষ বার।

তাই জলুর রঙবেরঙের দিনরাত্রির কথাগুলো মনে পড়লে মন চলে যায় কুড়ি বছর পেছনে। বিছানার পাশে বালতি। খোরাকের থেকে বাঁচতে ছাদের ট্যাঙ্কের ওপর শোয়া দালাল। অ্যানিভার্সারীর বাংলা মেশানো রসনা। সিদ্ধিতে মেশানো মাকড়সার জাল। ফাঁকা বোতল ভেঙে নেশার ঘোরে তার ওপরই ঘুমিয়ে পড়া। হাইওয়ের ধারে বাংলা আর ক্যারম। কলেজে প্রথম দিন ফাইনাল ইয়ারের ছেলের জল বলে দেয়া বাংলা। পোদুদার কাছে ব্যাপ্টিজম। Holy Water এর বদলে রাম। নস্টালজিয়া। কোথায় আজ সেই রাম, কোথায় সেই অযোধ্যা, থুড়ি জলু। হেথা নয় বন্ধু অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। নাকি জলু আছে সেই জলুতেই, খালি চরিত্রগুলো পাল্টে গেছে?
Advertisements
Standard