Bengali, east bengal, Sourav Ganguly

দাদাগিরি এবং ঘটি বাঙালের রেষারেষি

দাদাগিরি ১৯শে আগস্টের শো। সম্পূর্ণ এপিসোড।
(সূত্র: BDUpload )

আমি ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক একদম ছোটবেলা থেকেই। উদ্বাস্তু পরিবারে জন্ম, বাঙাল আচার বিচার জীবনধারায় বড় হয়েছি, তাই ইস্টবেঙ্গল ছাড়া যে অন্য কাউকে সমর্থন করা যায় সেকথা কখনও মাথায়ই আসেনি। তারপর যত বড় হয়েছি যুক্তি তথ্য ইত্যাদি দিয়ে নিজের সব পছন্দ অপছন্দ গুলোকে আবার ঝালিয়ে নিতে হয়েছে। সেই নিক্তিতে পছন্দ অপছন্দের লিস্টিটারও অনেক অদলবদল হয়েছে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের থেকে সমর্থন তুলে নেবার কথা কখনও মাথায়ই আসেনি, যতই সে ইপিএল বুন্দেসলিগা ইউএফা কাপের তাবড় তাবড় খেলুড়েরা টিভির পর্দায় কেত মারুক না কেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব হলো ঘুরে দাঁড়ানোর নাম। ইস্টবেঙ্গলের সাথে জুড়ে আছে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের লড়াই করার ইতিহাস। যদিও এখন যুগের ধর্ম মেনে আদ্ধেক খেলোয়াড়ই বিদেশী, তার মানেই যে দলের আদর্শ পাল্টে গেছে তা তো নয়। তার ওপর বন্ধুর দাদু ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের ডাকসাইটে খেলোয়াড়, পাড়ার আরেক বন্ধুও খেলেছে ইস্টবেঙ্গলে, সেই সূত্রে ইস্টবেঙ্গলের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছিলো অনেক দিনের। এখন বহুদিন মাঠে গিয়ে খেলা দেখিনা, তবু মোহনবাগানের ইস্টবেঙ্গলের সাথে খেলা থাকলেই আবার ফিরে যাই কুড়ি পঁচিশ বছর আগে। তা কদিন আগেই দেখলাম দাদাগিরি নামের অনুষ্ঠানে নাকি কেউ একজন বাঙালদের নিয়ে অনেক কুরুচিকর মন্তব্য করেছে আর সৌরভ গাঙ্গুলী তাতে বাধা না দিয়ে আরো হাসাহাসি করেছে। এই নিয়ে ইস্টবেঙ্গলের ফেসবুক তোলপাড়। কেউ দাদার মুণ্ডপাত করছে তো কেউ সেসব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের যারা ওই শোতে উপস্থিত ছিল। তোলপাড় হচ্ছে ইন্টারনেট, হওয়াটা দরকার, কিন্তু এপার বাঙলা ওপার বাঙলার রেষারেষির ভূমিকাটা জানা প্রয়োজন।

একশ বছর আগে বাঙালদের প্রতি বিদ্বেষমূলক ব্যবহার ছিল হয়তো দৈনন্দিন ঘটনা। আর সেভাবেই সৃষ্টি ইস্টবেঙ্গল দলের। ১৯২০ সাল থেকেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ তাই ঘটি বাঙালের দ্বন্দ্ব হয়ে দাঁড়ালো। আওয়াজ টিটকারি ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসবের লক্ষ্য ছিল বাঙালরা। দেশভাগের পর ভিটেমাটিছাড়া মানুষরা যখন পশ্চিমবঙ্গে এলো, তখন তাদের বেশিরভাগেরই এসেছে খালি হাতে। সরকার থেকে পুনর্বাসন মেলে কলকাতার শহরতলিতে যেখানে তখন জলাজমি ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। এক চিলতে জমি, সেখানে রোদ ঝড় জল মাথায় করে, দিন আনি দিন খাই করে শুরু হয়েছিল সেই মানুষগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। কোনোদিন কেউ কিছু পাইয়ে দেয়নি তাদের। নিজের সামর্থ্য আর একরাশ স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই সহায় ছিলোনা তাদের। বাকিটা ইতিহাস। বাঙাল মানেই টিঁকে থাকার লড়াই, উদ্যম অধ্যবসায়, পায়ের তলায় জমি খুঁজে নেয়ার উদগ্র প্রচেষ্টা।

কিন্তু সেই অসম্ভব একরোখা মনোভাবের মানুষেরা যখন পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা শুরু করলো, তখন প্রথম প্রথম সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায় হলেও এপার বাঙলার মানুষরা মেনে নিয়েছে বাঙালদের। আস্তে আস্তে ঘটি হেঁশেলঘরেও ঢুকে পড়েছে কচুর লতি, পুইঁশাক আবার তেমনি বাঙালরাও রান্নায় জুড়তে শিখেছে খানিক চিনি। ঘটি বাঙাল বাড়ির মধ্যে বিয়েও আজ হামেশাই হয়, কেউ সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা। ইস্টবেঙ্গলে ঘটি খেলোয়াড় খেলে যেমন মোহনবাগানে খেলে বাঙাল প্লেয়ার। নিমরাজি হয়েও, খানিক চাঁদ সদাগরের মনসা পুজোর মতো ঘটিরা জায়গা করে দিয়েছে বাঙালদের তাদের দৈনন্দিন জীবনে। উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষগুলোর ওপর তারা চড়াও হয়নি রাজাকারদের মতো। আমার আগের প্রজন্ম দুই তরফেই বাঙাল, তাদের জীবনে প্রথম স্থায়িত্ব আসে পশ্চিমবঙ্গে আসার পর। তাদের বাকি জীবন পশ্চিমবঙ্গে নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় কাটাতে পারার জন্যে এই ঘটিদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কৃতিত্ব তৎকালীন সরকারের অবশ্যই, কিন্তু যার যতটুকু যোগ্য কৃতজ্ঞতা সেটা স্বীকার করাটাই যথার্থ।

তাই এই রেষারেষি, ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেয়া ঘটি বড় না বাঙাল, এ সবই খানিকটা খুনসুটি। ঘটিরা সেটা যেমন উপভোগ করে, বাঙালরাও তাই। ওদের গেঁড়িগুগলি তো আমাদের কচু ঘেঁচু , ওদের নুচি নেবু নঙ্কা তো আমাদের বেঙ আর ভ্যাক। ওরা বলে ওরে লোটা, আমরা ডাকি ওরে মাচা। আমাদের পূর্ব প্রজন্ম যারা প্রথম এখানে বসবাস করা শুরু করে তাদের লড়াই আজ শেষ। তাদের একমাত্র আশা ছিল “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। দুধে ভাতে না থাকলেও, প্রতিদিন প্রাণের ভয় আজ আর নেই। আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে ঘটি বাঙালের মিলমিশে। কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে গেলে বাঙাল পরিচয়টা আপনা থেকেই চলে আসে। আমাদের সেটুকু দায়বদ্ধতা রয়ে গেছে আগের প্রজন্মের প্রতি। তাই শুঁটকি খাই বললে লোকে যখন নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করে কোথাকার বাঙাল, বুক ফুলিয়ে বলতে পারি চাটগাঁ। ছোটবেলায় পিসি জোর করে নিয়ে যেত চট্টগ্রাম পরিষদের অনুষ্ঠানে। তখন মনে হতো এসব কিম্ভূত ব্যাপারে আবার কেন, কোথায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেব না এখানে হ্যাজাচ্ছি। কিন্তু আজ ভাবলে মনে হয় সেটা আসলে ছিল অনেকটা রীলে দৌড়ের মতো, আগের প্রজন্মের হাত থেকে আমাদের হাতে মশালটা ধরিয়ে দেয়া।

তাই ঘটি আর বাঙাল যে ভাই ভাই এক ঠাইঁ তা নয় এখনো। খেলার মাঠে গালিগালাজ ইঁট পাটকেল এখনো পড়ে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান এখন আর ঘটি বাঙালদের যুদ্ধ নয়। অনেক বাঙালই মোহনবাগানকে সমর্থন করে, আবার অনেক ঘটি ইস্টবেঙ্গলকে। আর সেই লড়াইটা এখন খানিকটা প্রতীকী। তবু অনেক সময় অতি উৎসাহে মাত্রা ছাড়িয়ে যায় শালীনতা। অনেক সময়ই ঘটি বাঙাল বাগবিতণ্ডায় গা জ্বলে উঠেছে অপমানে, যোগ্য জবাব দিয়ে তবেই মন হয়েছে শান্ত। তারপর মাথা ঠান্ডা হলে ভেবে দেখছি যে গোটা ব্যাপারটাই কি অপ্রয়োজনীয়। আর ঠিক সেই অনুভূতিই হলো যখন দাদাগিরির খবরটা পেলাম।

প্রথমে ফেসবুকে পড়ে কিছুই বোঝা গেলোনা কি হয়েছে। আস্তে আস্তে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারে বোঝা গেলো যে শোতে গোটা বাঙালদের অপমান করা হয়েছে। অনেক খুঁজেপেতে ইউটিউবে একটা ছোট ক্লিপ পেলাম যেখানে দাদা বলছে (বাঙালরা) পাঁচিল টপকে টপকে এসেছে? আর বৈদ্যুতিন মাধ্যমে চলেছে রাগ দুঃখ অভিমানের পালা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম একটা সম্পূর্ণ ক্লিপ গোটা অনুষ্ঠানটার। অবশেষে দেখলাম কি সেই অতি কুরুচিকর প্রোগ্র্যাম।

কিন্তু যা দেখলাম তা তো যা পড়লাম বিভিন্ন জায়গায় তার সাথে খুব একটা মিললনা! হ্যাঁ ওই সৌগত ঘোষ লোকটা খুব গা জ্বালানো ভঙ্গিতে বাঙালদের নিয়ে কটূক্তি করেছে বটে, কিন্তু তার সাথে সৌরভকে টানার খুব একটা যুক্তি চোখে পড়লোনা। বরং দেখলাম অনুষ্ঠানের শুরুতেই দাদা বলছে ইস্টবেঙ্গল ঢুকলো ভালোভাবে কিন্তু মোহনবাগান হোঁচট খেলো কেন? আর ওই পাঁচিল টপকে এসেছে মুহূর্তটায় গিয়ে দেখলেও চোখে পড়বে যে ইস্টবেঙ্গলের অনিন্দ্যবাবু যথার্থ জবাবই দিয়েছেন। গোটা অনুষ্ঠানে তিনি দারুন টেম্পেরামেন্ট দেখিয়েছেন, নিচু রুচির খেউড় করে লোক হাসানোর চেষ্টা করেননি। মোহনবাগানকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকার জন্যে ধন্যবাদ দিয়েছেন, তেমনি মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে ১৯১১ সালের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারানো দলের সাত জনই বাঙাল ছিল। পাঁচিল টপকে আসার কমেন্টে সৌরভ মোহনবাগান প্রার্থীর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসেছে ঠিকই কিন্তু সেটাকে সব ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা যেভাবে বাঙালদের অপমান করার সমর্থন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, ব্যাপারটা আদপে সেরকম কিছুই নয়। সৌরভকে ক্ষমা চাইবার দাবি তো যথাযথ নয় একদমই। সৌরভ গাঙ্গুলী যথেষ্ট দক্ষ ভাবে গোটা অনুষ্ঠানটা সঞ্চালন করেছে। আর বাঙালরা হার না মানার আরেক নাম। এই সব ঠুনকো সমালোচনাতে যদি গায়ে ফোস্কা পড়ে এখন, তাহলে বলতেই হয় সেটা খুব একটা বাঙাল সুলভ আচরণ নয়। নানা অজুহাতে কাঁদুনি গায় তো মোহনবাগান। আমরা ওদের দলে কবে থেকে ভিড়লাম?

তবে যদি ধরে নেন এ লেখা পরে যে সৌরভের অন্ধ ভক্ত আমি, তাই তার সাতখুন মাফ, সেটা বিন্দুমাত্রও সত্যি না। খেলোয়াড় সৌরভকে যথেষ্টই ভালো লাগতো, কিন্তু তার সাথে মানুষ সৌরভের যে অনেকটাই ফারাক সেটা বহুদিন আগে থেকেই খেয়াল করেছি। সৌরভ যে আদপে ক্ষমতার দাস সেটা বিগত কয়েক বছরে মাঠের বাইরে সৌরভের কীর্তিকলাপ দেখলেই নজরে পড়ে। পুরসভা নির্বাচন, সিএবি সচিব নির্বাচন, ডালমিয়াকে সরানো, আবার তার ছেলের হাত ধরেই সিএবিতে ফেরা, ক্রিকেট একাডেমির জমি, পার্ক স্ট্রিটে রেস্তোরাঁ – অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য আর ক্ষমতার অলিন্দের হাতছানি যে সৌরভকে চিরকাল প্রভাবিত করে এসেছে তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। খেলোয়াড় এবং ভারতের অধিনায়ক সৌরভ যতটাই অনুপ্রেরণা জাগায়, মাঠের বাইরের সৌরভের এই অন্যরূপ দেখে মনে হয় যে সেই অন্য সৌরভের ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্রও এই মানুষটার মধ্যে নেই। তাই পাঁচিল টপকে আসার বিষয়ে সৌরভকে অকারণে সমর্থন করার কোনো কারণ আমার নেই।

আমার বক্তব্য হলো ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান স্পেশাল এপিসোডে দু পক্ষই যে একে উভয়কে নিয়ে কিছু না কিছু বলবে সেটাই প্রত্যাশিত। ক্ষমা যদি চাইতেই হয়, সেটা চাইবার কথা যে ওই মন্তব্য করেছে সেই সৌগত ঘোষের। অনিন্দ্যবাবু শালীন ভাবে জবাব দিয়েছেন যে সীমান্তে পাঁচিল কোনোকালে ছিলোনা যে পাঁচিল টপকে আসতে হবে। বাঙালরা এসেছে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে। সৌরভকে কাঠগড়ায় তোলার মতো অপরাধ হয়নি কিছু। তার মানে কি জবাব নেই বাঙালদের খোঁচা মারা টিপ্পনীর? আছে বৈকি। কিন্তু সে জবাব হবে মাঠে। তার চেয়ে বড় জবাব আর কিছু হয়না। কারন যতবার ডার্বি, মাচা তোরা হারবি। এ তো কথায়ই আছে।

পুনঃশ্চ: এই লেখাটা কিন্তু ঘটি বাঙাল নির্বিশেষে লেখা। ইস্টবেঙ্গল মানে আর ওপার বাংলা নয়, যেমন মোহনবাগানও আর কেবল ঘটিদের ক্লাব নয়। এই গোটা ঘটনাটার সূত্রপাত বাঙালদের নিয়ে। তাই লেখার মূল উদ্দেশ্য কিছু বাঙাল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকের সৌরভকে লক্ষ্য করে মুন্ডপাতের দাবির যথার্থতা নিয়ে। অনেক জোগাড়যন্ত্র করে ভিডিওটা জোগাড় করেছি। লিঙ্কটা দেয়া রইলো, অনুগ্রহ করে দেখুন, আর তারপর বিচার করুন সৌরভ অনুষ্ঠানে মোহনবাগানের হয়ে পক্ষপাতিত্ত্ব করেছে কিনা।
Advertisements
Standard
calcutta, Football, Nostalgia

একটা ম্যাচ, একটা গুলি, একটা বাস

সব মানুষেরই জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যা সারা জীবনের মতো মনে দাগ রেখে যায়। আমারও জীবনে সেরকম সময় বহু এসেছে যেগুলোর কথা মনে পড়লেই গায়ে শিহরণ জাগে। তা সে ময়দানে অন্ধকারে বান্ধবীর হাত ধরে পুলিশের গাড়ির তাড়া খাওয়া, বা চলন্ত বাসে হাত ফস্কে মনে হওয়া যে দুটো আঙুলের তফাৎ ঝুলে থাকা আর চাকার তলায় যাওয়ার মধ্যে, কিম্বা বন্ধুদের সাথে বাজী রেখে রেলব্রিজ পার হতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারা যে মালগাড়ি নয়, পেছনে আসা ট্রেনটা রাজধানী এক্সপ্রেস, এখনও চোখ বুজলেই সেই সময়গুলো এমন সজাগ হয়ে ওঠে যে মনেই হয়না আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। মন চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঘটনাটা আদপে ঘটেছিল। অগুন্তি সেসব স্মৃতির মধ্যে সবার প্রথমে যেটা মনে আসে সেটা ছিল এক বসন্তের বিকেল। সেদিন ছিল খানিকটা বিরহ, খানিকটা উত্তেজনা খানিকটা কলজে খাঁচাছাড়া আর বাকী সময়টা বিx টাকে করে বাড়ি ফেরা — রোমাঞ্চের সব সরঞ্জামই মজুদ ছিল সেদিন।

সন তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, তবে সেটা খুব সম্ভব ছিল ১৯৮৬ কি ৮৭ সাল। মানে আমি তখন ৭ কি ৮। বার টা মনে আছে খুব, সেটা ছিল শনিবার। বাবার হাফ ছুটির দিন, তার মানে দুপুরে বিবিধ ভারতী শুনে ৩টেয় বাবা বাড়ি ফিরলে বাবুঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবে জাহাজ দেখাতে। শনিবার বিবিধ ভারতীতে সিনেমার গান শোনার ছাড় ছিল। বাবা বাড়ি আসার ঠিক আগে কি পরে একটা গান চালালো, পরে জানতে পেরেছিলাম যে সেটা আশা ভোঁসলের গাওয়া ত্রয়ীর গান। “কথা হয়েছিল তবু কথা হলনা, আজ সবাই এসেছিলো শুধু তুমি এলেনা”। গানটা শুনেই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। তারপর বসন্তের বিকেল বলে কথা। কথায় কথায় বাবা বললো সল্টলেকে ফুটবল খেলা নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। তখন বাওয়াল, ক্যালানো এসব জানতামনা তাই আলুনি ভাষাতে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল মহামেডানের ফুটবল ম্যাচ ছিল সল্টলেকে। মহামেডান নাকি ৩-১ গোলে জিতছিলো রেফারি ভুল পেনাল্টি দিয়েছে তারপর স্কোর ৩-৩। মহামেডান সাপোর্টাররা (হ্যাঁ তখন ফ্যান মানে সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান আর ভাতের ফ্যানই বুঝি, সমর্থকের মানে তখন সাপোর্টার) ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করেছিল, পুলিশ বেদম পিটিয়েছে আর দুটো ব্লকের মধ্যে দেয়াল থাকায় তারা পালাতে পারেনি ডান্ডার বাড়ি থেকে। ঝামেলা টামেলা তখন বুঝিনা তেমন, ইস্টবেঙ্গল ড্র করেছে সেটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

তখন সবে ১-২ বছর হলো এসেছি কলকাতায়, গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া আমার একমাত্র রিক্রিয়েশন। পাড়ায় অনেক ছেলে থাকলেও আমি বেরোতাম না বিকেলে বাড়ি থেকে। রান্না ঘরের জানলা থেকে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা করা দেখতাম। আসলে প্রথম ৫-৬ বছর আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল ১। কলকাতায় ওই দঙ্গলে যোগ দিতে আমার কিছু বছর লেগেছিলো। কৃষ্ণনগরে থাকতে পাগল ছিলাম ট্রেন দেখার জন্যে। কলকাতায় এসে তার সাথে জুড়লো জাহাজ দেখা। তখনও কলকাতা ডকে বড়বড় জাহাজ নোঙ্গর ফেলতো, গঙ্গা তখনও পুরো মরে যায়নি। গঙ্গার ধারে বাবুঘাট প্রিন্সেপ ঘাট ফেয়ারলী প্লেস আর যে যে ঘাটগুলো আছে, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে ইঁটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। জোয়ারের সময় সে সব সিঁড়ি জলের নিচে চলে যেত, কিন্তু ভাঁটা হলে সেই খিলান পার হয়ে জলে গিয়ে দাঁড়ালে যেন মনে হতো নদীর মাঝে চলে এসেছি। চোখের সামনে বিরাট বিরাট জাহাজ, আর বড় বড় বয়া জলে ভেসে থাকতো জাহাজ নোঙ্গর করার জন্যে। তার পিছনে শেষ বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যেত, সে দৃশ্য মনে ধরে উদাস হয়ে যাবার বয়েস তখনও হয়নি, আর স্মার্টফোনের যুগও সেটা ছিলোনা যে টকাটক ছবি তুলে রাখবো। তার বদলে খুঁজতাম জাহাজগুলো কিরকম দেখতে, কত তলা উঁচু কেবিন, কটা চিমনি, জাহাজের কি নাম। আমার মেজোমামা ছিল জাহাজী, সেই সূত্রে জাহাজ মানেই ছিল অন্য একটা পৃথিবী, যা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে ছিল তখনও।

যাক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। বেলা ৪টে নাগাদ সেজেগুজে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকার পর কমলা রঙের ৩৯ আসতে দেখেই বুঝে গেলাম যে বাবাই-পুকাই আসছে। মানে বাসের গায়ে ওই নাম লেখা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখতাম রোজ, তখন বাড়িঘর অত হয়নি, বাসের রঙ দেখে বলতে পারতাম ৩৯ না ৪২এ। বাবাই পুকাই কে ছিল জানিনা, হয়তো বাস মালিকের দুই ছেলের নাম। পেছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে কাটা সিট পাওয়া গেলোনা, তাই লম্বালম্বি জেন্টস সিটেই বসে পড়লাম যেখানে সিটের নিচে পেছনের চাকা। কাটা সিটগুলোর জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতাম কারণ বাইরেটা দেখতে হলে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাটা পথ যেতে হয়না। বাস যথারীতি নিয়ম মেনে এগিয়ে চললো আমাদের কুষ্টিয়ার বাসস্টপ থেকে। কুষ্টিয়া থেকে পার্কসার্কাস অবধি রাস্তায় কখন কোথায় রয়েছি তার জন্যে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হতোনা তখন। মোড় ছাড়িয়ে প্রথমে নাকে আসতো রাসবাড়ির মাঠে চরা মোষের গন্ধ আর রাস্তার পাশের নর্দমা থেকে আসা গোবরের গন্ধ। তারপর বন্ডেল রোড থেকে মোড় ঘুরে ক্যালকাটা কেমিকেলের বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধ, তাতে ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট সবই মিলেমিশে গেছে। তারপর আবার বার দুই বেঁকেচুরে রাস্তা শেষে পৌঁছায় লোহাপুলে। সেখান থেকে ৪ নম্বর ব্রিজ অবধি ছিল ট্যানারি, তার যা গন্ধ নাড়ি উল্টে আসার জোগাড়। আর জানলা দিয়ে চাইলে দেখা যেত সারিসারি খাটালের মতো কাঠামো, সেখান থেকে গরু বা মোষ ঝুলছে আর নর্দমাগুলো একটা কমলা আর বাদামির মাঝামাঝি রঙের তরলে ভর্তি। বাস সেই ৪ নম্বর ব্রিজের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষে বেঁকে ব্রিজের ওপর উঠলে তবে সে গন্ধ যেত। সেদিনও সেই পুরোনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। হয়না মানে ৪নম্বর ব্রিজ অবধি। আসল ঘটনার এখানেই সূত্রপাত।

৩৯ নম্বর বাস সাধারনত ৪নম্বর ব্রিজের শেষে দাঁড়াত। সেখান থেকে বাঁক নিয়ে ব্রিজের ওপরে উঠে তারপর সোজা ব্রিজের অন্যপারে পরের স্টপ। সেদিন বাস সবে ঘুরে খানিক দূর এগিয়েছে হঠাৎ দেখি স্পিড কমিয়ে বাস একদম দাঁড়িয়ে গেলো। প্রথমে ভাবলাম কি ব্যাপার, ব্রিজের ওপর তো স্টপ হয়না। কেউ কি হাত দেখিয়েছে দাঁড়ানোর জন্যে? এসব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেলো ড্রাইভারের সিটের দিক থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক হাতে ইঁট তলোয়ার এসব নিয়ে বাসের দরজায় হাজির। একজন হাঁক মারলো, তাড়াতাড়ি সব বাস খালি করে দাও, এ বাস জ্বালানো হবে।

জ্বালানো হবে মানে? খবরের কাগজে দেখেছি বাস জ্বালানোর ছবি কিন্তু এভাবে চাক্ষুষ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি এমনিতেই সারা জীবন ভীতু টাইপের, বাস জ্বালানোর কথা শুনেই আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করলাম, আমাদের তারপর কি করবে? ধরে ঠ্যাঙাবে, মেরে ফেলবে? যদি কিছু না করে ছেড়েও দেয় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতেও অনেক সময় লাগবে। বাবার কি হবে? জ্বালাবে কেন? না খেলার মাঠে যে ঝামেলা হয়েছে সেখানে প্রচুর মহামেডান সাপোর্টার মার্ খেয়েছে, এখন পার্কসার্কাসের মহামেডান সাপোর্টাররা তার বদলা নেবে। তখনও ধর্ম, রাজনীতি এসব ব্যাপারে তেমন ধারণা হয়নি, আর কলকাতা লীগে তার প্রভাব কেমন ছিল তাও জানা নেই। তবে মহামেডান সমর্থক মানেই যে মুসলমান সেটা সত্যি বলে মনে হয়না। খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম সল্টলেকে লাঠি খেয়ে পার্কসার্কাসে বাস জ্বালানোর মতলব দেখে।

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কোনও ঘটনা চোখের সামনে দেখে মনে হয় যেন সুপার স্লো রিপ্লে দেখছি, এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক মিনিটের সমান। আমি যখন সাত পাঁচ ভেবে চলেছি কি হবে না হবে এসব নিয়ে, আর এক কন্ডাকটর সামনের দরজায় যারা ঘেরাও করেছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় অন্য কন্ডাকটর আর বাস ড্রাইভারের মধ্যে যে কি চোখের ইশারা হয়ে গেলো খেয়াল করতে পারলামনা, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম কন্ডাকটর বলছে বাস ছাড়লেই জানলার পাল্লা তুলে দিয়ে সিটের নিচে বসে পড়তে। অন্য কন্ডাকটর তখন বাসে ফিরে এসেছে লোকজনকে নামতে অনুরোধ করতে। এমন সময়, যখন মনে হচ্ছে এ শর্মার গল্পের এখানেই ইতি, বাসটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে জ্যান্ত হয়ে উঠলো আর কন্ডাকটর দুজন সামনে পিছনের দুটো দরজা দিলো বন্ধ করে। এখন ৩৯ বাসের একটা ছোট ইতিহাস বলি, আমাদের তখনকার পিকনিক গার্ডেন এলাকার মতো ৩৯ বাসও কুখ্যাত। কত লোক যে চাপা পড়েছে ৩৯এর নিচে তার ঠিকানা নেই। আমাদের বাস ঘিরে খার খাওয়া লোকজন ইট পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস যেই স্টার্ট দিয়েছে আদ্ধেক লোক ভ্যানিশ। পরের ২ মিনিট সময়টা এখনও এতো পরিষ্কার মনে আছে যে এক এক সময় মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

বাস যেই চালু হলো, সামনে থেকে অমনি সব জনতা হাপিস, কিন্তু পেছন থেকে লোকজন শুরু করলো বাসের বডিতে বাড়ি মারতে, জানিনা লাঠি না কি ছিল। আমি এতো সব অ্যাকশনের মাঝে আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছি এদিকে বাবা আমার সিটের পেছনের পাল্লা তুলে দিয়ে আমার ঘাড় ধরে সিটের নিচে বসিয়ে দিলো। বাস তো এগোতে শুরু করেছে এমন সময় বাইরে হাতের চাপড়, লাঠি এসবের মাঝে বাসের পেছনের চাকার ওপরে, ঠিক আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানেই একটা বিকট আওয়াজ পেলাম। মনে হলো বাসের একটা দিক বুঝি ভেঙেই পড়লো। আমাদের বাস কিন্তু না থেমে এগিয়ে চললো, আর একটু এগিয়ে যখন ফুল স্পীডে ব্রিজের একদম মাঝে চলে এসেছে, তারপর আর সে বাস একদম সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো। তখনও জানিনা আবার কোথায় লোকজন ঘাঁটি বেঁধেছে বাস থামানোর উদ্দেশ্যে, তাই বাস থামাবার কোনও কথাই নেই। দরজা বন্ধ, জানলার পাল্লা তোলা, আমাদের বাস এগিয়ে চললো অনেকটা দুর্ভেদ্য ট্যাঙ্কের মতো। একে একে পেছনে রেখে এলাম পার্কসার্কাস ময়দান, পদ্মপুকুর, আনন্দ পালিত, মৌলালি। এসব স্টপেজে হয়তো কিছু লোকের নামার কথা কিন্তু গন্ডগোলের আশঙ্কায় তারাও আর বেশি উচ্চ্যবাচ্য করলোনা। প্রথম স্টপ সেই এসপ্ল্যানেড। বাস হুড়মুড় করে খালি হয়ে গেলো। আমরাও দোনোমোনো করে নেমে পড়লাম সেখানে। জাহাজ দেখতে যাওয়া তখন মাথায় উঠেছে, মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আমাদের নামিয়ে বাবাই-পুকাই চলে গেলো হাইকোর্টের দিকে। এখনো মনে হয় সেদিন ওই ড্রাইভার ওরকম অতিমানুষিকভাবে বাস চালিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে জীবনটা আজ অন্যরকম হয়ে যেত কি?

তবে ওই বিকেলটা যেরকম আতঙ্কের সাথে শুরু হয়েছিল, শেষটাও হলো এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এসপ্ল্যানেডএর চত্বরে যেটা তখনও ট্রাম লাইনে ছেয়ে থাকতো, সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলাম বাপব্যাটায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম যে পার্কসার্কাসের ঘটনাটা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু পুলিশ। আবার ৩৯ ধরার কোনো প্রশ্নই নেই, আর অন্য কোন বাস যে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি যাবে তাও জানা নেই। শেষে ঠিক করলাম ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরবো। ২৪ নম্বর ট্রাম, মোমিনপুর আলিপুর হয়ে হাজরা মোড় বা বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রামে যখন উঠছি তখন বিকেল পড়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাসে একদম সামনের সিটদুটো পেয়ে গেলাম। ট্রাম চললো ময়দানের বুক চিরে, চারদিকে সবুজে ঘেরা রাস্তাঘাট ধরে। আলিপুরের দিকে যখন পৌঁছলাম তখন রাস্তায় এল জ্বলে গেছে। নিয়ন বা সোডিয়াম আলো তখন পিকনিক গার্ডেনে নেই, তাই প্রাণ ভরে দেখতে লাগলাম আলিপুরের গাছগাছালি, উঁচু দেয়ালের বাড়িঘর আর নিয়ন বাতির আলো-আঁধারি। ৪ নম্বর ব্রিজের ঘটনাটার মতো সেই আলো-আঁধারির ছবিটাও মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। অবশেষে হাজরা মোড় হয়ে, বন্ডেল গেট পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম ৭-৮টার সময়।

একটা রহস্যের সমাধান তখনও হয়নি। বাস চালু হবার পর সেই বিকট শব্দটার। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি তার উত্তর খুঁজে পেতে। একদিন রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাই-পুকাই আসছে। বাসটা যখন আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে তখন খেয়াল করলাম যে বাসের প্যাসেঞ্জার দিকের পেছনের দিকে, ঠিক যেখানে আমরা বসেছিলাম, সে জায়গাটায় বাসের গায়ে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে গোলমতো টোল। আর বাসের অ্যালুমিনিয়াম যেমন চকচকে সাদা রঙ, সে জায়গাটা যেন কেমন একটা পোড়া পোড়া কালচে রঙ। ভাবলাম কেউ কি গুলি করেছিল বাসের দিকে তাক করে সেদিন?

তারপর তো কেটে গেছে বছরের পর বছর। আমাদের সেই ৮৬-৮৭র পিকনিক গার্ডেনও পাল্টে গেছে আস্তে আস্তে।নতুন বাড়িঘর, দোকানপাট। খাটালগুলো একে একে উঠে গেলো রাস্তার ধার থেকে। নতুন নতুন বাসরুট দিনের পর দিন। ক্যালকাটা কেমিকেলের বিচিত্র গন্ধগুলোও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা। বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায়ই দেখা যেত বাবাই-পুকাই চলেছে তার গায়ের ক্ষতটা নিয়ে। স্কুলে যাবার সময়ও প্রায়ই দেখতে পেতাম। আর সেই টোলটায় চোখ পড়লেই মনটা পিছিয়ে যেত বছরের পর বছর, ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটায়। তারপর হঠাৎ একদিন বড় হয়ে গেলাম। চার বছর কাটালাম পাড়ার বাইরে। ফিরে এসে শুরু হলো চাকরি। আলসে বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস দেখার শখ মিটে গেছে বহুদিন। তবু দেখা হয়েই গেছে। পাল্টে গেছে চেহারা, সামনের গ্রিলের রঙ কমলা নেই, তবু পেছনের চাকার ওপর টোলটা রয়েই গেছে। সারানো হয়নি গ্যারেজে গিয়ে নাকি ইচ্ছে করেই সারায়নি কে জানে। তারপর কখন একদিন থেকে আর দেখা নেই তার। কালের নিয়ম মেনেই সব বেসরকারি বাস যখন নীল হলুদ রঙের হয়ে গেলো তখন রঙের সাথে সাথে বাসের বডিটাও মেরামতি হয়ে গেছে। কিম্বা তাতুদার বাসের মতো বাবাই-পুকাইও রোদে জলে পুড়ছে কোথাও কোনো পুকুরের পাড়ে। হয়তো আজও সে চলে বেড়ায় পিকনিক গার্ডেন থেকে বাবুঘাট। ৮৬-৮৭র সেই বিকেলটার সাক্ষী আজ কেবল আমি। বাবাই-পুকাইয়ের গায়ের টোলটা কি সত্যিই গুলি ছিল? এখন ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো দেখতাম গুলি না, হয়তো ছিল একটা থান ইঁট। কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে যা বিশ্বাস করে এসেছি, আজ তা নাকচ করারও কোনো কারণ নেই। নাহয় সেই একটা দিনের স্মৃতি ঠিক তেমনিই রইলো যেমন এক আট বছরের আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। হোকনা তার খানিকটা কল্পনা। দাগটা কি গুলির ছিল না ইঁটের? আজ আর সেটা নাই বা জানলাম।
Standard
Cuisine

লইট্যা মাছের ঝাল চচ্চড়ি

যতদিন থেকে ব্লগ লেখা শুরু করেছি তাতে সাধারণত বিভিন্ন তত্ত্বের কচকচি আর গুরুগম্ভীর আঁতলামোই বেশি। আজ বরং অন্য স্বাদের কিছু লিখলাম। ২০১০ সালে যখন শেষ বারের জন্য কলকাতা গেছিলাম বাবাকে বলে রেখেছিলাম যে মাংস রোজ রোজ খাওয়াতে হবেনা, তবে মাছ যদি রোজ পাওয়া যায় তাহলে বেশ হয়।  এখানে ফেরার পর থেকে মাছ রান্না করেছি কয়েকবার তা সে Seabass কে গুরজালির মত করে রান্নাই হোক বা তেলাপিয়ার তেল ঝাল, রান্না ঠিকঠাক জমেনি আর মাছও যা পেয়েছি তা ঠিক আমাদের বাংলার মাছের মত নয়। একদিন পমফ্রেট খেয়েছিলাম বটে, আর ভারতীয় (আদতে বাংলাদেশী) রেস্তোঁরায় পাঙ্গাশ মাছ দেয় কম পয়সায় সারার জন্যে, কিন্তু সে রান্না ঠিক বাড়ির রান্নার মত নয়।  তাই মাছ না খেতে পাবার ফ্রাস্ট্রু ছিল বেশ কিছুদিন। সেদিন হঠাৎ ঠিক করলাম বাড়ির থেকে বেশ দুরে এক চিনে দোকানে যাবার। একে রবিবার, মেয়ে ঘ্যানঘ্যান করছে সারা সকাল, জেনিফার বলল চিনে দোকানে যাওয়া যাক অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম যাব যাব। গিয়ে দেখে এলাহী কান্ড, যেমন তেমন দোকান নয়, এখানে যাকে বলে superstore বাঁদিকে হোলসেলার ডানদিকে খুচরো জিনিসপত্র। চিনে খাবারের সাথে Chilli Oil আমার খুব প্রিয় সেই খুঁজতে খুঁজতে হাজির হলাম মাছের এলাকায়। একজোড়া পমফ্রেট কিনব কিনব ভাবছি, হঠাৎ দেখলাম ইংরেজিতে লেখা Loittya. ভাবলাম ব্যাপারখানা কী, এরকম নামের মিল তো পাওয়া সম্ভব নয় এ মাছ নির্ঘাত লইট্যাই হবে। ব্যাস ঠিক হয়ে গেল লইট্যা খাব, কিনে ফেললাম এক কিলোর বরফে জমানো লইট্যা। সাথে কিনলাম একগাদা মুলো আর বেগুন। বাড়ি এসে খেয়াল হলো আরে মুলো বেগুন তো লাগে লইট্যা শুঁটকিতে তাজা মাছে নয়। যাই হোক লইট্যা তো পাওয়া গেছে সেই আনন্দেই বাড়ি ফিরলাম।

আর বাকি বাঙাল বাড়ির মত আমাদের বাড়িতেও কিছু ফেলা হতনা খাবার আর লইট্যার স্বাদ তো দারুন। তেমন দেখিনি ঘটি বাড়িতে লইট্যা রান্না হতে, তবে ঘটি বাঙালের বিবাদ এখন পুরনো ব্যাপার, সেই দিকে নজর না দিলেও চলে। কিন্তু বাজারে ছোটবেলায় দেখতাম দোকানদারেরা বলত লটে মাছ যেটা শুনতে অনেকটা এপার বাংলার মত তাই মনে হয় চল যে একদম ছিলনা তা নয়। চাটগাঁর ভাষায় বলি লইট্যা বোধহয় সারা বাংলাদেশই সেই নামে জানে। এপার বাংলায় কিভাবে রান্না হয় জানা নেই তবে বাকি দু-দশটা বাঙাল বাড়ির মত আমাদের বাড়িতেও লইট্যা রান্না হত কষে ঝাল দিয়ে, সেই শুকনো শুকনো তরকারী গরম ভাত দিয়ে খাবার তুলনা হয়না। ছোটবংলায় লইট্যা পাওয়া যেত জলের দরে তেমন চাহিদা ছিলনা বলে। ওল কচু কচুর লতি এসবের মত লইট্যাও ধরা হত গরীব মানুষের খাবার নাকউঁচু লোকদের নয়। এখন দিনকাল পাল্টানোর সাথেসাথে লইট্যার জায়গা চড়া দাম হাঁকা ও ক্যালকাটা ভজহরি মান্না তেরো পার্বন ইত্যাদি ঘরোয়া বাঙালি রেঁস্তোরায় না হলেও বাজারে বাকী মাছের মত লইট্যাও আকাশছোঁয়া। লইট্যা নিয়ে একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ল।  এ মাছের ইংরাজি নাম Bombay Duck. বহু ভাবনাচিন্তার পর আসল কারণ জানা গেল।  লইট্যার প্রথম চল ভারতের পশ্চিম দিকে। এই মাছের নাম ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে বাংলায় ও তার চাহিদা এমন বাড়ল যে পশ্চিম থেকে লইট্যা আসত কলকাতায় বম্বে মেলে। লইট্যার চড়া গন্ধের জন্যে Bombay Mail (ডাক) এর নাম গিয়ে দাঁড়ালো চড়া গন্ধওলা যে কোনো কিছু। তাই লোকে ঠাট্টা করত যে গন্ধটা Bombay ডাকের (Mail) মত, কিন্তু সাহেবরা দুই দুই পাঁচ করে তার মানে ধরল লইট্যার নাম Bombay Duck. নামে আর কি আসে যায়, জিভে জল আসে সেটাই আসল।  কিছু কিছু রান্না আছে যা কোনো একটা এলাকার সাথে আগাপাশতলা জড়িয়ে।  লইট্যা মাছ তেমনি আমার কাছে বাঙাল পরিচয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে। বাকি  বাংলাদেশের প্রায় সব মাছই এখন কলকাতায় পাওয়া যায় তবে লইট্যা মাছ অনেকটা শুঁটকি মাছের মতই পুরোপুরি বাঙাল। চোখ বন্ধ করে বলতে পারি দুই বাংলার বাইরে লইট্যা খেতে পাওয়া প্রায় দুষ্কর যদিও পশ্চিম কূলে আর সাউথ চায়না সিতে পাওয়া যায় লইট্যা।  আর বেশি জ্ঞান না দিয়ে শেয়ার করলাম এই রান্নাটা।  আমার রেসিপিতে পরিমান সময় এসব আর ঘটা করে তেমন লিখলাম না, সেটা যে রান্না করবে তার ওপরেই ছাড় দেয়া রইল।

লইট্যা মাছ টুকরো টুকরো করে কেটে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখে দিতে হবে। ১ ইঞ্চি সাইজের পিস করলেই হবে।  মাথা লেজ বাদ দিয়ে রান্না করলেই ভালো, তাহলে শক্ত কাঁটা থাকবেনা। পেঁয়াজ কুচো করে কাটতে হবে।  কতখানি লাগবে সেটা কতটা কাই দরকার তার ওপর।  আমি ১ কিলো মাছে ৫০০ পেঁয়াজ দিয়েছিলাম, তবে আর একটু বেশি দিলে ভালো হত।  রসুন লাগবে অনেকটা।  আমি দেড়খানা বড় রসুন দিয়েছিলাম স্বাদ একদম ঠিকঠাক হয়েছে। বেশি দিলে হয়ত মাছের চেয়ে রসুনের গন্ধ বেশি পাওয়া যাবে। টমেটো বড় বড় পিস করে কেটে রেখে দিতে হবে। বড় কড়ায় বেশ খানিকটা সর্ষের তেল দিয়ে সেটা গরম হলে পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হবে।  খানিকটা ভাজা ভাজা হয়ে এলে যখন বাদামী রং ধরবে তখন রসুনবাটা আর গোটাকয় কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ভেজে তারপর টমেটো শুকনো লঙ্কা নুন হলুদ দিকে অনেকক্ষণ কষাতে হবে। শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো বা বাটা যাই হোক না কেন অনেকটা দিতে হবে লালচে রং আর ঝালের জন্য।  কড়ায় পেঁয়াজ রসুন টমেটো সব যখন মিশে যাবে আর তেল ওপরে ভেসে উঠবে, তখন মাছগুলো কড়ায় দিয়ে দিতে হবে।  লইট্যা মাছ এমনিতে খুব নরম তাই সাবধানে মাছের টুকরোগুলোকে মসলায় মাখিয়ে করা ঢাকা দিয়ে দিতে হবে। এই মাছে প্রচুর জল তাই আলাদা করে জল দেয়ার দরকার নেই মাছ থেকে বেরোনো জলেই রান্না হবে।  আঁচ একটু পর ঢিমে করে দিয়ে খানিকক্ষণ ফোটাতে হবে। মাঝে মাঝে ঢাকা নামিয়ে দেখে নেয়া দরকার কড়ার তলা ধরে না যায় যাতে।  এমনিতে জল যতক্ষণে মরে যাবে কড়ায় ততক্ষণে মাছ রান্না হয়ে গেছে।  অল্প কাঁচা সর্ষের তেল আর কুচোনো ধনেপাতা ওপরে ছড়িয়ে দিলেই তৈরী লইট্যা মাছের শুকনো তরকারী। এখানে বলা নিস্প্রয়োজন যে ভাত ছাড়া এ রান্না খেলে তেমন আনন্দ পাওয়া যাবেনা। গরম ভাতে শুধু শুধু তরকারী বা পাতলা মুসুর ডালের সাথেই সাধারণত লইট্যা মাছ জমে দারুন। বলে রাখা ভালো যে কখনো আগে লইট্যা খায়নি যে এতে বড় শিরদাঁড়ার কাঁটাটা খাবার সময় ছাড়িয়ে নিলে খালি সুতোর মতো কিছু কাঁটা আছে যেগুলো মুখে আটকায়না।  শিরদাঁড়া তেমন দরকার হলে গোটা মাছ হালকা সেদ্ধ করে ছাড়িয়ে নেয়া যায় তবে অত ঝক্কি করার তেমন দরকার নেই।

পরের বার ইচ্ছে আছে মাছের বড়া বানানোর, তবে তার রেসিপি লেখার মত কিছু নয়। যদি শুঁটকি মাছ রান্না করি তখন আবার লিখবখন।
Standard
Football, Foreign footballers

African footballers in Calcutta Football: A tale of exploitation and hope

Growing up in Calcutta in the 80’s reminds me of sepia themed memories permanently etched in my mind. One such memory was getting introduced to football commentary on the radio we had, one out of the only two channels to the outer world. Amongst many stalwarts of the then Calcutta football like Krishanu-Bikash, Shishir-Subroto, there surfaced a new name Cheema Okorie. 

His imposing stature and ability to score in almost every match gave him a legendary status in Calcutta football. Many years later, I started to wonder how he was first spotted, and how a large number of footballers of African descent came to Calcutta during the years to come. My intrigue rekindled when I recently read an article of Christopher – of the much daunted troika Chhema-Chibu-Christo (how maidan knows them) has passed away last year and nobody had any more details. 

I came across this article whilst searching for Christopher, and I must suggest this to anyone interested in the history of Calcutta football of recent times. I know now how that supply chain works, but this article is an eye opener for many other reasons. On one side, this article is a tale of exploitation of foreign footballers in a then unregulated market, and the still existent mean rivalry amongst different local team owners dating back from the colonial era. However, on the other side, it’s also a story of hope, of people in far flung countries like Nigeria, Ghana and Kenya packed their bags, with very less or no money and set for this alien city, to become professional footballers, in the leagues almost surely unheard of in the world press. Not many made it to the top, but their struggle and success teaches you never to lose faith in our human existence, and be humble at what we have got or done with our life.

krishanu-dey-cheema-okerie-C-Kingfisher-East-Bengal-FC-flickr

Two extremes of then Calcutta football – diminutive Krishanu Dey, known as a magical ball-charmer, next to Cheema Okorie, one of the famous African trio, with large build and strength unknown to Calcutta maidan

Standard