Bengali, Cuisine, UK

কেজরী – বিলেতি খিচুড়ি

কেজরী। না না, নাম শুনে ধরে নেবেননা দিল্লির কেজরির কথা বলছি। ওসব আপ ফাপের রাজনীতির ঘেঁষ না ধরে পাতি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ুন। তবে এ নামের যা মাহাত্ম্য তাতে রাজনীতির ছোঁয়া বর্জন করা দুষ্কর। রান্নার নাম যেমন বিলিতি, রাঁধার পদ্ধতিও বিলিতি। আর ডালের চিহ্নমাত্র নেই এ পদে তাই খিচুড়ি বললে পাপ হবে। তবে আমাদের রোজকার হেঁশেলের খিচুড়ি কিভাবে কেজরীতে পরিবর্তিত হলো তার হিসেব আমার কাছে ছিলনা। তবে আমার উইকি সব জানে, সে দেখাচ্ছে খিচুড়িই ভারতে আগে প্রচলিত ছিল। সাহেবরা সব সম্পত্তির সাথে সাথে খাবারের রেসিপির ওপরও দখলদারি বসাতে ছাড়েনি। ধরে নেয়া যেতেই পারে ভারত ফেরত কোনো বিলিতি শেফের হাত ধরে খিচুড়ি আঠেরো শতকে পৌঁছে গেছিল সাত সমুদ্র পারে। ইংরেজি ধ্বনিতত্ত্ব এক আজব ব্যাপার, ক দিয়ে শুরুর শব্দগুলো এরা শুরু করে খ উচ্চারণ করে, কিন্তু খ দিয়ে কোনো শব্দ শুরু হলে তা উচ্চারণ করতে লেজে গোবরে অবস্থা। সেভাবেই অনুমান করা যায় খিচুড়ির জগাখিচুড়ি উচ্চারণের থেকে রেহাই পেতে খিচুড়ি পরিণত হলো kedgeree তে।

কাজের কথায় আসি। সেদিন দোকান থেকে কম দামে হ্যাডক মাছ পেয়ে ভাবলাম কদিন আগে খাওয়া এক অপূর্ব ফরাসি মাছের বড়া বানানোর চেষ্টা করবো। তা রেসিপি খুঁজতে গিয়ে হাতে হ্যারিকেন, তাজা মাছ নয়, চাই সল্ট কড জাতীয় শুকনো মাছ, খানিকটা আমাদের শুঁটকির মতো, তবে নুন মাখিয়ে শুকানো বলে তেমন চড়া গন্ধ হয়না। যাক, আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হলো রান্নার প্ল্যান। শেষ রক্ষা তো ভাজা মাছ বা জিরে গুঁড়ো দিয়ে ঝোল আছেই। এখানে ব্রেকফাস্ট খেতে গেলে poached haddock পাওয়া যায় তবে বাঙালি হয়ে মাছকে দুধে সেদ্ধ করতে রুচি হলোনা তাই ভাবলাম হ্যাডকের আরেক নামকরা রেসিপি বানানো যাক, কেজরী।

বিলিতি মতে রান্না, তাই রান্নার আদ্ধেক উপকরণ বিলিতি, আবার ভারতের আমদানি খাবার তাই খানিক মসলাপাতি আমাদের রান্নাঘরের মতই। খানিক দোনোমোনার পর বানিয়েই ফেল্লাম কেজরী। আহা তার যা স্বাদ, টেনিদার খট্টাঙ্গ পলান্নর কথা মনে পড়ে গেলো। বেশি বাহানায় না গিয়ে বলেই ফেলি সেই কেজরী তৈরীর উপায়। পরিমান নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেননা, খালি নুনটা বাদ দিয়ে বাকি মসলা অল্প কম বেশি হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবেনা। আমি বানিয়েছিলাম দু কাপ চালের সাথে, অন্য পরিমান রান্নার জন্য হিসেব মতো বাকি উপকরণগুলো কমবেশি করতে হবে।

প্রথমে বড় একটা হ্যাডকের ফিলে একটা ফ্রাইং প্যান জাতীয় কিছুতে গরম জলে সেদ্ধ করতে হবে। মাছের ছাল থাকলে ছালের দিকটা নিচের দিকে রাখতে হবে। ৪-৫ মিনিট পর মাছ আঁচ থেকে নামিয়ে জল ঝরিয়ে অল্পক্ষন ঠান্ডা করতে হবে। মাছ ঠান্ডা হয়ে গেলে কাঁটা আর ছাল টা ছাড়িয়ে একটা কাঁটাচামচ দিয়ে ছোট ছোট ফ্লেকে ভেঙে নিন। আর একটা সসপ্যানে ৩-৪ টে ডিম সেদ্ধ করে নিতে হবে। ডিমগুলো হার্ড বয়েল করলেই ভালো। ডিম সেদ্ধ হয়ে গেলে চাকা চাকা টুকরো করে রেখে দিতে হবে। এরপর একটা বড় সসপ্যানে বেশ খানিকটা মাখন দিয়ে একটা বড় পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কেটে ভেজে নিতে হবে। পেঁয়াজে যেন বাদামী রঙ না ধরে যায়। ভাজা পেঁয়াজে এরপর ৩-৪ টে গোটা এলাচ, ১-২ টো তেজপাতা, ২ ইঞ্চি লম্বা দারচিনি আর একটু হলুদ গুঁড়ো ওই প্যানের ভেতর দিয়ে আবার খানিক কষাতে হবে। এবার ওই মসলার মধ্যে চাল দিয়ে অল্পক্ষন ভাজতে হবে একদম কম আঁচে। এই ফাঁকে এক লিটার গরম জলে দু-তিন টুকরো ফিশ স্টক গুলে নিন। ফিশ না থাকলে চিকেন স্টক ও চলবে। আর জলের পরিমান কতখানি চাল তার ওপর নির্ভর করবে। চাল বেশি যাতে না সেদ্ধ হয়ে যায় তার জন্যে প্রথমে একটু কম জল দিয়ে রান্না শুরু করাই ভালো। পরে দরকার পড়লে অল্প গরম জল দিতে হতে পারে। যদি ফ্রেশ স্টক বানাতে পারেন তাহলে তো কেল্লা ফতে, তবে আমি কিউব দিয়েই বানিয়েছিলাম, মন্দ হয়নি। এবার ওই ফিশ স্টক চাল আর পেঁয়াজ ভাজার মধ্যে দিয়ে আঁচ বাড়িয়ে দিতে হবে। জল ফুটে উঠলে স্বাদ মতো নূন দিয়ে চালটা ভালো করে নাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে তলা না ধরে যায়। এবার ঢাকা দিয়ে আঁচ কমিয়ে ভাত রান্না হতে দিন। মাঝে মধ্যে দেখে নিতে হবে তলা ধরে যাচ্ছে কিনা, ধরলে চাল আবার খানিকটা নাড়িয়ে দিয়ে হবে, আর দরকার পড়লে অল্প গরম জল যোগ করতে পারেন। চাল যখন প্রায় সেদ্ধ হয়ে গেছে, তখন ঢাকনা খুলে মাছ আর ডিমের টুকরোগুলো সেখানে ঢেলে দিয়ে আবার ঢাকনা চাপা দিন। ২-৩ মিনিট পর অনেকটা কুচোনো পার্সলে পাতা দিয়ে দিন ভাতের মধ্যে। আলতো করে ভাত মাছ আর ডিম মিশিয়ে নিয়ে আঁচ বন্ধ করে দিন। কেজরী তৈরী। শেষে তাতে অল্প কুচোনো পার্সলে ছড়িয়ে এক টুকরো লেবুর সাথে পরিবেশন করুন। এদেশে এমনি এমনিই সার্ভ করতে বলে, কিন্তু হাজার হোক খিচুড়ির জাতভাই বলে কথা, সাথে ভাজা কিছু না থাকলে তেমন জমবেনা খাওয়াটা। ভাজা যা ইচ্ছে বানাতে পারেন, নিদেনপক্ষে আমার মত অমলেট হলেও যথেষ্ট।

কেজরী

যদি রান্নার মসলা বা অন্য উপকরণগুলো না পান তাহলেও এই রেসিপিটা রান্না করে দেখতে পারেন। হ্যাডকের জায়গায় যেকোনো সাদা কাঁটাছাড়া মাছ ব্যবহার করতে পারেন। পারলেই না পেলে ধনেপাতা দিয়ে দিন। হলুদের পরিবর্তে জাফরান দিয়েও বানানো যায় তবে সে মশা মারতে কামান দাগার মতো ব্যাপার হবে। আমাদের খিচুড়ির মতো এখানে আলু বা অন্যান্য সবজি দেয়ার কোনো নিয়ম দেখিনি, তবে চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে। নিন এবার ঢুকে পড়ুন হেঁশেলে, আর ব্লগ পড়ে কাজ নেই।
Advertisements
Standard