Cuisine

লইট্যা মাছের ঝাল চচ্চড়ি

যতদিন থেকে ব্লগ লেখা শুরু করেছি তাতে সাধারণত বিভিন্ন তত্ত্বের কচকচি আর গুরুগম্ভীর আঁতলামোই বেশি। আজ বরং অন্য স্বাদের কিছু লিখলাম। ২০১০ সালে যখন শেষ বারের জন্য কলকাতা গেছিলাম বাবাকে বলে রেখেছিলাম যে মাংস রোজ রোজ খাওয়াতে হবেনা, তবে মাছ যদি রোজ পাওয়া যায় তাহলে বেশ হয়।  এখানে ফেরার পর থেকে মাছ রান্না করেছি কয়েকবার তা সে Seabass কে গুরজালির মত করে রান্নাই হোক বা তেলাপিয়ার তেল ঝাল, রান্না ঠিকঠাক জমেনি আর মাছও যা পেয়েছি তা ঠিক আমাদের বাংলার মাছের মত নয়। একদিন পমফ্রেট খেয়েছিলাম বটে, আর ভারতীয় (আদতে বাংলাদেশী) রেস্তোঁরায় পাঙ্গাশ মাছ দেয় কম পয়সায় সারার জন্যে, কিন্তু সে রান্না ঠিক বাড়ির রান্নার মত নয়।  তাই মাছ না খেতে পাবার ফ্রাস্ট্রু ছিল বেশ কিছুদিন। সেদিন হঠাৎ ঠিক করলাম বাড়ির থেকে বেশ দুরে এক চিনে দোকানে যাবার। একে রবিবার, মেয়ে ঘ্যানঘ্যান করছে সারা সকাল, জেনিফার বলল চিনে দোকানে যাওয়া যাক অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম যাব যাব। গিয়ে দেখে এলাহী কান্ড, যেমন তেমন দোকান নয়, এখানে যাকে বলে superstore বাঁদিকে হোলসেলার ডানদিকে খুচরো জিনিসপত্র। চিনে খাবারের সাথে Chilli Oil আমার খুব প্রিয় সেই খুঁজতে খুঁজতে হাজির হলাম মাছের এলাকায়। একজোড়া পমফ্রেট কিনব কিনব ভাবছি, হঠাৎ দেখলাম ইংরেজিতে লেখা Loittya. ভাবলাম ব্যাপারখানা কী, এরকম নামের মিল তো পাওয়া সম্ভব নয় এ মাছ নির্ঘাত লইট্যাই হবে। ব্যাস ঠিক হয়ে গেল লইট্যা খাব, কিনে ফেললাম এক কিলোর বরফে জমানো লইট্যা। সাথে কিনলাম একগাদা মুলো আর বেগুন। বাড়ি এসে খেয়াল হলো আরে মুলো বেগুন তো লাগে লইট্যা শুঁটকিতে তাজা মাছে নয়। যাই হোক লইট্যা তো পাওয়া গেছে সেই আনন্দেই বাড়ি ফিরলাম।

আর বাকি বাঙাল বাড়ির মত আমাদের বাড়িতেও কিছু ফেলা হতনা খাবার আর লইট্যার স্বাদ তো দারুন। তেমন দেখিনি ঘটি বাড়িতে লইট্যা রান্না হতে, তবে ঘটি বাঙালের বিবাদ এখন পুরনো ব্যাপার, সেই দিকে নজর না দিলেও চলে। কিন্তু বাজারে ছোটবেলায় দেখতাম দোকানদারেরা বলত লটে মাছ যেটা শুনতে অনেকটা এপার বাংলার মত তাই মনে হয় চল যে একদম ছিলনা তা নয়। চাটগাঁর ভাষায় বলি লইট্যা বোধহয় সারা বাংলাদেশই সেই নামে জানে। এপার বাংলায় কিভাবে রান্না হয় জানা নেই তবে বাকি দু-দশটা বাঙাল বাড়ির মত আমাদের বাড়িতেও লইট্যা রান্না হত কষে ঝাল দিয়ে, সেই শুকনো শুকনো তরকারী গরম ভাত দিয়ে খাবার তুলনা হয়না। ছোটবংলায় লইট্যা পাওয়া যেত জলের দরে তেমন চাহিদা ছিলনা বলে। ওল কচু কচুর লতি এসবের মত লইট্যাও ধরা হত গরীব মানুষের খাবার নাকউঁচু লোকদের নয়। এখন দিনকাল পাল্টানোর সাথেসাথে লইট্যার জায়গা চড়া দাম হাঁকা ও ক্যালকাটা ভজহরি মান্না তেরো পার্বন ইত্যাদি ঘরোয়া বাঙালি রেঁস্তোরায় না হলেও বাজারে বাকী মাছের মত লইট্যাও আকাশছোঁয়া। লইট্যা নিয়ে একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ল।  এ মাছের ইংরাজি নাম Bombay Duck. বহু ভাবনাচিন্তার পর আসল কারণ জানা গেল।  লইট্যার প্রথম চল ভারতের পশ্চিম দিকে। এই মাছের নাম ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে বাংলায় ও তার চাহিদা এমন বাড়ল যে পশ্চিম থেকে লইট্যা আসত কলকাতায় বম্বে মেলে। লইট্যার চড়া গন্ধের জন্যে Bombay Mail (ডাক) এর নাম গিয়ে দাঁড়ালো চড়া গন্ধওলা যে কোনো কিছু। তাই লোকে ঠাট্টা করত যে গন্ধটা Bombay ডাকের (Mail) মত, কিন্তু সাহেবরা দুই দুই পাঁচ করে তার মানে ধরল লইট্যার নাম Bombay Duck. নামে আর কি আসে যায়, জিভে জল আসে সেটাই আসল।  কিছু কিছু রান্না আছে যা কোনো একটা এলাকার সাথে আগাপাশতলা জড়িয়ে।  লইট্যা মাছ তেমনি আমার কাছে বাঙাল পরিচয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে। বাকি  বাংলাদেশের প্রায় সব মাছই এখন কলকাতায় পাওয়া যায় তবে লইট্যা মাছ অনেকটা শুঁটকি মাছের মতই পুরোপুরি বাঙাল। চোখ বন্ধ করে বলতে পারি দুই বাংলার বাইরে লইট্যা খেতে পাওয়া প্রায় দুষ্কর যদিও পশ্চিম কূলে আর সাউথ চায়না সিতে পাওয়া যায় লইট্যা।  আর বেশি জ্ঞান না দিয়ে শেয়ার করলাম এই রান্নাটা।  আমার রেসিপিতে পরিমান সময় এসব আর ঘটা করে তেমন লিখলাম না, সেটা যে রান্না করবে তার ওপরেই ছাড় দেয়া রইল।

লইট্যা মাছ টুকরো টুকরো করে কেটে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখে দিতে হবে। ১ ইঞ্চি সাইজের পিস করলেই হবে।  মাথা লেজ বাদ দিয়ে রান্না করলেই ভালো, তাহলে শক্ত কাঁটা থাকবেনা। পেঁয়াজ কুচো করে কাটতে হবে।  কতখানি লাগবে সেটা কতটা কাই দরকার তার ওপর।  আমি ১ কিলো মাছে ৫০০ পেঁয়াজ দিয়েছিলাম, তবে আর একটু বেশি দিলে ভালো হত।  রসুন লাগবে অনেকটা।  আমি দেড়খানা বড় রসুন দিয়েছিলাম স্বাদ একদম ঠিকঠাক হয়েছে। বেশি দিলে হয়ত মাছের চেয়ে রসুনের গন্ধ বেশি পাওয়া যাবে। টমেটো বড় বড় পিস করে কেটে রেখে দিতে হবে। বড় কড়ায় বেশ খানিকটা সর্ষের তেল দিয়ে সেটা গরম হলে পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হবে।  খানিকটা ভাজা ভাজা হয়ে এলে যখন বাদামী রং ধরবে তখন রসুনবাটা আর গোটাকয় কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ভেজে তারপর টমেটো শুকনো লঙ্কা নুন হলুদ দিকে অনেকক্ষণ কষাতে হবে। শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো বা বাটা যাই হোক না কেন অনেকটা দিতে হবে লালচে রং আর ঝালের জন্য।  কড়ায় পেঁয়াজ রসুন টমেটো সব যখন মিশে যাবে আর তেল ওপরে ভেসে উঠবে, তখন মাছগুলো কড়ায় দিয়ে দিতে হবে।  লইট্যা মাছ এমনিতে খুব নরম তাই সাবধানে মাছের টুকরোগুলোকে মসলায় মাখিয়ে করা ঢাকা দিয়ে দিতে হবে। এই মাছে প্রচুর জল তাই আলাদা করে জল দেয়ার দরকার নেই মাছ থেকে বেরোনো জলেই রান্না হবে।  আঁচ একটু পর ঢিমে করে দিয়ে খানিকক্ষণ ফোটাতে হবে। মাঝে মাঝে ঢাকা নামিয়ে দেখে নেয়া দরকার কড়ার তলা ধরে না যায় যাতে।  এমনিতে জল যতক্ষণে মরে যাবে কড়ায় ততক্ষণে মাছ রান্না হয়ে গেছে।  অল্প কাঁচা সর্ষের তেল আর কুচোনো ধনেপাতা ওপরে ছড়িয়ে দিলেই তৈরী লইট্যা মাছের শুকনো তরকারী। এখানে বলা নিস্প্রয়োজন যে ভাত ছাড়া এ রান্না খেলে তেমন আনন্দ পাওয়া যাবেনা। গরম ভাতে শুধু শুধু তরকারী বা পাতলা মুসুর ডালের সাথেই সাধারণত লইট্যা মাছ জমে দারুন। বলে রাখা ভালো যে কখনো আগে লইট্যা খায়নি যে এতে বড় শিরদাঁড়ার কাঁটাটা খাবার সময় ছাড়িয়ে নিলে খালি সুতোর মতো কিছু কাঁটা আছে যেগুলো মুখে আটকায়না।  শিরদাঁড়া তেমন দরকার হলে গোটা মাছ হালকা সেদ্ধ করে ছাড়িয়ে নেয়া যায় তবে অত ঝক্কি করার তেমন দরকার নেই।

পরের বার ইচ্ছে আছে মাছের বড়া বানানোর, তবে তার রেসিপি লেখার মত কিছু নয়। যদি শুঁটকি মাছ রান্না করি তখন আবার লিখবখন।
Advertisements
Standard

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s